Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্ব

ধারাবাহিক: উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য (পর্ব-২) । ফয়েজ আলম

Reading Time: 7 minutes

পশ্চিমারা শাসন শোষণের স্বার্থে, উপনিবেশ কায়েম রাখার স্বার্থে যেজ্ঞানভাষ্য তৈরি করেছে তাতে উপনিবেশিতদের মানসিকভাবে দাসে পরিণত করেছে। মনোজগতের এই উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই উত্তর উপনিবেশী ভাবচর্চা জরুরি। উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপনিবেশক সংস্কৃতির প্রভাব বহাল থাকে স্বাধীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে, যাকে বলা হয় উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি। এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাই হলো বি-উপনিবেশায়ন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার পর এখন আত্ম-উদবোধন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম মূলত উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, সাংস্কৃতিক ও ভাবাধিপত্যের নিরবচ্ছিন্ন কিন্তু অসম উপস্থিতি ছুড়ে ফেলার জন্য। এর শুরু সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতায়, বোধ ও ভাবের সংগ্রামে। উত্তর উপনিবেশবাদ নিয়ে আরো গভীরভাবে জানতে ইরাবতীর ধারাবাহিক ফয়েজ আলমের উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য লেখাটির আজ থাকছে পর্ব-২।


   

উপনিবেশের জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানরোপণ পদ্ধতির বিরুদ্ধে কথাবার্তা আরও আগেও যে হয়েছে তা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। ভারতেও ঈশ্বর গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং বিশেষ করে নজরুল-সুকান্তের লেখায় উপনিবেশী জ্ঞানচর্চার বিরুদ্ধে নিজস্ব বোধ দাঁড় করানোর টুকিটাকি প্রয়াস শনাক্ত করা সম্ভব। তবে এরা উপলব্ধি করেননি যে, উপনিবেশকের জ্ঞানচর্চা পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ-কারণে তাদের বিকল্প চিন্তা কেবল ব্যক্তিগত ভিন্নতাবোধে পর্যবসিত হয়েছে মাত্র। কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অন্তর্গত স্ববিরোধিতার কারণে সেইসব ভাবনাও কখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। বঙ্কিম যেমন ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তেমনি মুঘলদের কাছ থেকে ভারতের শাসন ছিনিয়ে নেওয়ার কারণে উপনিবেশী শক্তির কাছে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন। মধুসূদন রাবনকে উপনিবেশী প্রবণতার বিরুদ্ধে দাড় করিয়ে দিয়ে নিজে প্রায় সারাজীবন মাতাল হয়ে ছিলেন সমকালীন উপনিবেশের জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক আবহে। রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতির কথা বলেছেন সত্য, আবার নানা উপলক্ষে পশ্চিমের উপনিবেশী শক্তির সাফাই গেয়েছেন যথেষ্ট আত্মতুষ্টির সঙ্গে।

উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্ব নিয়ে কথাবার্তা শুরু হওয়ার পর তাত্ত্বিক ও চর্চাকারীদের কাছে ফ্রন্ৎজ ফানো ও আরো দু-একজন অগ্রজ লেখক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন।  উপনিবেশের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মনোজাগতিক ক্ষয়ক্ষতি এবং তা কাটিয়ে ওঠার প্রসঙ্গ নিয়ে ফানো অনেক জরুরি কথা বলেছেন, উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও তার ভাবনা বেশ বাস্তবানুগ। ফানো লিখেছেন পঞ্চাশ-ষাটের দশকে। এ-প্রসঙ্গে কাছাকাছি সময়ের আলবার্ট মেমির নামও উল্লেখ করা যায়। আলবার্ট মেমি উপনিবেশিত তিউনিসিয়ার ইহুদি পরিবারের মানুষ, ওখানে ১৯২০ সালে জন্ম। যৌবনে পড়াশোনা ও পেশাগত সূত্রে ফ্রান্সে আবাস স্থাপন করেন। দি কলোনাইজার অ্যান্ড দি কলোনাইজ্ড (১৯৫৭) গ্রন্থে মেমির বক্তব্যের সারকথা হলো, উপনিবেশী শাসনের কারণে উপনিবেশক ও উপনিবেশিত উভয়ই পারস্পরিক প্রভাবে একরকম অন্যোন্যনির্ভর সম্পর্কে উপস্থিত হয়। যে-পরিস্থিতির কথা মেমি বলছেন সেটি উত্তর-উপনিবেশী অবস্থার একটি রূপ। তবে মেমি পরিস্কার করে বলেননি যে, পারস্পরিক পরিবর্তনে উপনিবেশকের পরিবর্তন ঘটে তার স্বার্থ ও সুবিধাজনক অবস্থান অর্জনের অনুকূলে, উপনিবেশিতের বেলায় ঠিক উল্টোটা।

ফ্রন্ৎজ ফানোই প্রথম বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন উপনিবেশী শাসকগোষ্ঠী কীভাবে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ওপর বিভিন্নমুখী দৈহিক-মানসিক নির্যাতন চালায়, উপনিবেশিতের মনোজগৎকে বিকৃত করে, তার মধ্যে সঞ্চারিত করে দেয় উপনিবেশকের কতিপয় বৈশিষ্ট্য; এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা দেয় হীনমন্যতার বোধ। উপনিবেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসকরা ওইসব বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে আবির্ভূত হয় উপনিবেশী প্রশাসকদের বিকল্প রূপে। আবার উপনিবেশী সংস্কৃতির মনোজাগতিক প্রভাবের কারণে স্বাধীনতার পরও গণপর্যায়ে সেই ধারা অনেকটাই অক্ষুন্ন থাকে।

সক্রিয় কমিউনিস্ট ছিলেন না ফানো। এ-সত্ত্বেও কমিউনিস্ট চিন্তাভাবনা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করেছেন তিনি। উপনিবেশের অবসানে জনতার লড়াই-প্রসঙ্গে স্থানীয় বুর্জোয়াদের অবস্থান এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থায় তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা ও প্রবণতা নিয়ে তার বিশ্লেষণ নানাভাবে মার্কসীয় চিন্তাধারার ওপর নির্ভরশীল। বিচিত্র জীবনযাপন করে গেছেন ফানো। তিনি নিজেই উপনিবেশের অনপনেয় প্রভাবের ফসল। তার বাপ কালোমানুষ, মায়ের দিক থেকে উপনিবেশকের রক্ত ছিল শরীরে।

ফ্রান্ৎজ ফানো আমাদের কাছে স্বল্পপরিচিত বলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে। তার জন্ম ১৯২৫ সালে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফরাসি কলোনি মার্তিনিকে, মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কৈশোরে স্বদেশী মানুষের ওপর উচ্ছৃঙ্খল ফরাসি সেনাবাহিনীর নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যার মতো ঘটনা উপনিবেশক চরিত্র সম্পর্কে একটা স্থায়ী ছাপ ফেলে থাকবে তাঁর মনে। ১৯৪৪ সালে তিনি নিজেই ফরাসি বাহিনীতে যোগ দিয়ে জার্মানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এক পর্যায়ে আহত হয়ে মার্তিনিকে ফিরে আসেন স্বল্পসময়ের জন্য। ব্যাচেলর ডিগ্রি নেন ওখান থেকে। পরে প্যারিস ও লিয়নে পড়াশোনা করেন মেডিসিন ও সাইকিয়াট্রি নিয়ে। ১৯৫১ সালে সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন। এসময়ে লেখেন প্রথম গ্রন্থ ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক। ১৯৫৩ সালে চলে আসেন আলজিরিয়ায়। ১৯৫৬ সালে ফরাসি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে আলজিরিয়ার স্বাধীনতার জন্য ফ্রন্ট লিবারেশন ন্যাশনালে যোগ দেন। অস্থায়ী আলজিরিয় সরকারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঘানায় অবস্থানকালে তার দেহে লিউকোমিয়া ধরা পড়ে। ১৯৬১ সালের ৬ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে মৃত্যুবরণ করেন ফানো।

ফানোর চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ ও উদ্দীপ্ত হয়েছেন সাঈদ; বিভিন্ন উপলক্ষে সে-ইঙ্গিতও রেখেছেন। উপনিবেশের রাজনৈতিক পরিণতির ওপর জোর দিয়েছেন ফানো, সে প্রসঙ্গে এসেছে উপনিবেশিতের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মনস্তত্ত্বের কথা। আর সাঈদ সাংস্কৃতিক অধ্যয়নকে অবলম্বন করেন সাহিত্যে তার প্রকাশের ধারাবাহিক চিহ্ন ধরে। উপনিবেশকের সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার সক্রিয় আধিপত্যের ভেতর দিয়ে উপনিবেশিতের সংস্কৃতি ও বাস্তবতা কীভাবে বিকৃত হয়, তা শনাক্ত করেন। প্রাচ্য নিকৃষ্ট এবং পশ্চিম উৎকৃষ্ট–এই মনোভাবের ওপর ভর করে কীভাবে পশ্চিমে বিশাল একগুচ্ছ রচনা বিকশিত হয় এবং ক্রমে তা উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা ও টিকিয়ে রাখার প্ররোচনা জোগায় পশ্চিমের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মনে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ পাওয়া যায় অরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে। অরিয়েন্টালিজম উপনিবেশবাদ কর্তৃক উপনিবেশিতের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে বিকৃত করার জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার এক অসামান্য বিশ্লেষণ। প্রাচ্যের প্রতি পশ্চিমের মনোভঙ্গির যে-বিকাশ সাঈদ চিহ্নিত করেন, তার মূলে আছে ‘আনতা’ (Otherness) সম্পর্কে পশ্চিমের চিন্তকদের ধারণা।


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক: উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য (পর্ব-১) । ফয়েজ আলম


সাঈদ বলেন, মানুষের আত্মপরিচয় নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ‘আন-এর ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দূর বা অজানা কিছুকে জানার চেষ্টার প্রাথমিক পর্যায়ে সেই অজানা তার কাছে দেখা দেয় এমন কিছু হিসেবে, যা নিজ’ নয় এবং যা নিজের থেকে অন্যরকম। এই প্রক্রিয়ায় তা হয়ে ওঠে ‘আন’। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হলে সেই ‘আন’কে হতে হবে ‘নিকৃষ্ট’। পশ্চিম তার পার্শ্ববর্তী প্রাচ্যকে এভাবেই ‘আন’ হিসেবে নির্মাণ করে এবং তাকে নিকৃষ্ট ধরে নিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করে নিজ মনোভঙ্গিতে, ক্রমে জ্ঞানচর্চায়, সংস্কৃতিতে (সাঈদ ১৯৯৫; ৫৪, ৩৩২)। সাঈদ দেখান, এই ‘আনতা’র নিকৃষ্টতার বোধ পশ্চিমের মানুষদের প্ররোচিত করেছে ‘আন’কে পরাস্ত করতে, দখল ও শাসন করতে, ‘আনে’র এলাকায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে তা বজায় রাখতে।

সেই এস্কিলাস থেকে শুরু করে কিসিঞ্জারের রচনাতেও এই মনোভাবের চিহ্ন বিদ্যমান। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা ও টিকিয়ে রাখার যাবতীয় সাংস্কৃতিক সক্রিয়তার পেছনে এই মানসিক অবস্থা অনেকখানি দায়ী। এরই অংশ হিসেবে উপনিবেশকে নিকৃষ্টরূপে চিত্রিত করা হয় উপনিবেশকের লেখায়। উপনিবেশকের শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানচর্চার ধরণ চাপিয়ে দেয়া হয় উপনিবেশিতদের মধ্যে। সেই শিক্ষাব্যবস্থা ও চিন্তার মধ্যে জড়িয়ে থাকে এই বক্তব্য যে, উপনিবেশের মানুষের সবকিছুই নিকৃষ্ট। এর ফলে এই শিক্ষা ও চিন্তা গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজের সম্পর্কে নিকৃষ্টতার ধারনা প্রভাব ফেলে উপনিবেশিতের মনোভঙ্গিতে। তার মধ্যেও জন্ম নেয় হীনমন্যতার বোধ। একবার তার সঞ্চার ঘটে গেলে উপনিবেশিতরাই উপনিবেশকের সাংস্কৃতিক অভিপ্রায়ের ধারক ও বাহক হয়ে ওঠে। এই গোটা প্রক্রিয়া চিহ্নিত করা যায় আমাদের দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও। এখানে প্রধানত শিক্ষাব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক উৎপাদন ও ভোগের ধরনের মধ্যে উপনিবেশী প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে সক্রিয়। যেমন জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমা, শস্তা উপন্যাস, সাংবাদিকতা, বিজ্ঞাপনসহ সাহিত্যের একটা বিশাল এলাকায় উপনিবেশী বিন্যাসের সক্রিয় প্রভাব শনাক্ত করা যায়। অরিয়েন্টালিজমের প্রণোদনায় উত্তর-উপনিবেশী চিন্তাভাবনা, লেখালেখি ক্রমে বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। এ-তর্কে এসে যুক্ত হন প্রাক্তন-উপনিবেশের অনেক মেধাবী ভাবুক–ভারত, কেনিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, মিশর প্রভৃতি বিভিন্ন দেশ থেকে। এইসব চিন্তকদের চিন্তা-ভাবনায় উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্ব নানাদিকে সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এদের দু-একজনের চিন্তা সম্পর্কে একটু আলোকপাত করি। উত্তর-উপনিবেশী তাত্ত্বিক হোমি কে ভাবা ভারতীয় পারসি। জন্ম মুম্বাইয়ে। ওখানে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেওয়ার পর অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়,  পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ফেলো হোমি ভাবা তাত্ত্বিক  হিসেবে পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা করে বেড়ান। তার একটা মর্যাদাকর অবস্থান আছে। ভাবা তার রচনায় পশ্চিমা পন্ডিত যেমন, জ্যাক দেরিদা, জ্যাক লাঁকা, মিশেল ফুকো প্রমুখের নানা পর্যবেক্ষণ আমলে নেন। প্রায়ই তার লেখায় এসে পড়ে মিমিক্রাই, হাইব্রিডিটি, ডিসপ্লেসমেন্ট, আনহোমলি প্রভৃতি ধারণা।

ভাবার চিন্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতি সম্পর্ক রয়েছে সাঈদের অরিয়েন্টালিজমের। ভাবাও বলেন, পশ্চিমের সাংস্কৃতিক ভাবনায় ‘আন’ ও ‘আনতা’র (other/otherness) ধারণা নিয়ন্ত্রক তাড়নার মতো বলবান; এবং পশ্চিমের কাছে ‘আনে’র অর্থ পশ্চিমের বিপরীতে একীভূত কোনো উপস্থিতি। অবশিষ্ট বিশ্বকে একটি মাত্র ব্লকে ফেলে বিচার করার পশ্চিমা প্রবণতা মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। তার মতে এই সাংস্কৃতিক ধারণাগুলো নিজেরাই এক এক রকম নির্মিতি, বর্ণনা-সার মাত্র (দ্র. নেশন অ্যান্ড ন্যারেশন, ১৯৯০)।

আবার সাঈদ থেকে কিছুটা দূরত্ব নিয়ে একটি জটিল প্রশ্ন সমতলে তুলে আনেন ভাবা। তিনি ফানোর উপনিবেশক ও উপনিবেশিতের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক অবস্থানের মাঝখানে স্থাপন করেন হাইব্রিডিটির ধারণা–উপনিবেশক সংস্কৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির উপস্থিতির মধ্য দিয়ে অর্জিত সংকর আত্মপরিচয়ের (Hybrid Indentity) বাস্তবতা। ভাবা মনে করেন, উপনিবেশী গোষ্ঠীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না ক্ষমতা ও ডিসকোর্স। স্থানীয়রাও কথা বলেছে, নিজেদের মতো করে, পশ্চিমের জ্ঞানের উৎস অর্থাৎ গ্রন্থ সম্পর্কে প্রশ্ন  তুলেছে। উপনিবেশকেরা পুনর্গঠিত, শনাক্তযোগ্য,  প্রায়-নিজের মতো করে তৈরি করতে চেয়েছে ‘আন’কে। কিন্তু এই আকাঙক্ষা অবিকৃত থাকেনি। কারণ স্থানীয়রা নির্বাক ও নিষ্ক্রিয় পুতুলমাত্র হয়ে থাকেনি। উপনিবেশিত যখন উপনিবেশককে পুনরায় লেখে, তখন তা অনুলিপি হয় না, বরং ভিন্ন কিছুতে পরিণত হয়। এভাবে উপনিবেশিতের প্রত্যাখ্যানও অবদমিত থাকে না, বরং ভিন্ন কিছু রূপে বারবার উচ্চারিত হয়; ভাবার মতে এই ভিন্ন কিছুই হলো বদলে যাওয়া, সংকর (Hybrid) (ভাবা, ১৯৮৫)। ভাবার পরবর্তীকালীন চিন্তায়ও হাইব্রিডিটি গুরুত্বপূর্ণ। দি লোকেশন অব কালচার (১৯৯৪) এবং অন্যান্য লেখায় তিনি যে-বক্তব্য উপস্থাপন করেন তার মূল কথা হলো উপনিবেশী ও স্থানীয় সংস্কৃতির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের উপস্থিতি চিহ্নিত করা যায়। এই সংকর অবস্থার মধ্যেই উপনিবেশী সংস্কৃতি অনেক বেশি শক্তিশালী। বর্তমান পৃথিবীর প্রাক্তন উপনিবেশগুলোর দিকে তাকালে এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, সহজাত প্রবৃত্তি, নানারূপ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং পাশাপাশি অবস্থানের কারণে উপনিবেশক সংস্কৃতি ও উপনিবেশিত সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক লেনদেন-সীমিত মাত্রায় হলেও-চলে এসেছে। মানুষের  দেশান্তর এবং মিডিয়া টেকনোলজির বিশ্বব্যাপী বিস্তারের ফলেও সংস্কৃতির গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে মিশ্র বা পরিবর্তিত নতুন একটা রূপ গড়ে ওঠে। এ-প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত। ভাবা বলেন :

উপনিবেশকের উপস্থিতি (Colonial Presence) বরাবরই দোটানায়: একদিকে আসল ও কর্তৃত্বময়তার  চেহারায়, অন্যদিকে ব্যবধান নিয়ে পৌনঃপুনিক উচ্চারণের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত।…উপনিবেশী ক্ষমতাকে যদি উপনিবেশক কর্তৃত্বের শাসন-নিয়ন্ত্রণ বা স্থানীয় ঐতিহ্যের নীরব অবদমনের ফল মনে না করে সংকরায়ণের উৎপাদন হিসেবে দেখি, তাহলে পরিপ্রেক্ষিতে একটা গুরুতর পরিবর্তন আসে। এতে কর্তৃত্ব-সম্পর্কিত প্রচলিত জ্ঞানভাষ্যগুলোর পেছনের কারণ হিসেবে উন্মোচিত হয় দোটানার অনিশ্চয়তা। এবং সেই অনিশ্চয়তার ওপর ভর করে আঘাত করার একটা সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে আধিপত্যের জ্ঞানভাষিক (ডিসকার্সিভ) শর্তগুলো পরিণত হয় হস্থক্ষেপের ভিত্তিমূলে (ভাবা, ১৯৮৫; ১৪৪-৬৫)।

সংস্কৃতির সংকর প্রকাশের ব্যাপারটি তাত্ত্বিকভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন ভাবা। তবে অনেক উত্তর-উপনিবেশী পণ্ডিতই এই সংমিশ্রণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সংস্কৃতির সংকরায়ণের প্রবণতা বাড়তি শক্তি ও সুবিধার প্রতীক। উপনিবেশক ও উপনিবেশিত-এ দ্বিমেরুর বিন্যাস এখানে ভেঙে যায়। স্থানীয় সংস্কৃতিও যে উপনিবেশক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছে, সে-বাস্তবতা সামনে চলে আসে।

সংকরায়ণ বলতে পুরোনো ফর্মের শেষ হয়ে যাওয়া বোঝায় না।  যেমন আমাদের এখানে সংস্কৃতির আধিপত্যশীল ধারার পাশাপাশি এখনো টিকে আছে জারিগান, পালাগান, মেয়েলি গীত, কিস্সা -এইসব প্রাক-উপনিবেশী রীতি। সংকর সংস্কৃতির বিনির্মাণ করতে গিয়ে আমরা যে-মৌখিক রীতিগুলো বাদ দেবো তা নয়; বরং প্রাক-উপনিবেশী রুপকল্পগুলো প্রাধান্য তো পাবেই, চমৎকার মানদ- হিসেবেও কাজ করবে। আরেক তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একাধিক কারণে খ্যাতিমান, জাক দেরিদার বিখ্যাত বই অফ গ্রামাটোলজি অনুবাদ এর একটা। কলকাতার মানুষ বাঙালি গায়ত্রী কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক। এ-বিভাগে পড়াতেন এডওয়ার্ড সাঈদও। অনেকে গায়ত্রীকে মনে করেন মার্কসিস্ট-নারীতাত্ত্বিক বিনির্মাণবাদী। কেবল জ্যাক দেরিদার অফ গ্রামাটোলজি  অনুবাদের সূত্রেই যে তার খ্যাতি তা নয়, সাম্রাজ্যবাদ ও আন্তর্জাতিক নারীবাদের মৌলিক কিছু বিষয় নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানভাষ্যে নিম্নবর্গের মানুষদের, বিশেষত নারীদের উপেক্ষা করার নিয়মিত প্রবণতা চিহ্নিত করেছেন তিনি। তার ক্রিটিক অব পোস্ট কলোনিয়াল রিজনে (১৯৯৯) তিনি দেখান যে, পশ্চিমের অধিকাংশ অধিবিদ্যাগত রচনায় বর্বর ইউরোপীয়দের মানুষ বলেই গণ্য করা হয়নি। এছাড়াও নিম্নবর্গের প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সামনে নিয়ে এসেছেন গায়ত্রী।

কেনীয় লেখক এনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গার উত্তর-উপনিবেশী কৌশলগুলো নিয়ে সাঈদ আলোচনা করেছেন কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম  গ্রন্থে। এনগুগি উপনিবেশকের ভাষা ও সংস্কৃতিকে যতটা সম্ভব বর্জনের পক্ষপাতী। বি-উপনিবেশায়নের কার্যকর উপায়গুলো খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ায় তার চিন্তাভাবনাও বিশেষ প্রভাবসম্পাতি। তার ডিকলোনাইজিং দি মাইন্ড (১৯৮৬) খুবই গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এনগুগি মনে করেন, কেবল উপনিবেশকের সংস্কৃতিকে বর্জন করলেই চলবে না। উপনিবেশকের সংস্কৃতিকে প্রতিরোধের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তিও গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় ভাষা পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তাকে তর্কের ঊর্ধ্বে মনে করেন তিনি। ভাষাকে তিনি চিহ্নিত করেন উপনিবেশী জ্ঞানভাষ্যের সন্ত্রাসের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে, কেননা ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মপরিচয়ের প্রক্রিয়াটিও।

উত্তর-উপনিবেশবাদ ও নারীবাদের সম্পর্ক কেমন, কোথায়? এরকম একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাইে উঠে আসে। কারণ উত্তর-উপনিবেশী অধ্যয়নে স্থানীয়দের যেমন নিষ্পেষিত মনে করা হচ্ছে, তেমনি নারীবাদও মনে করে নারী বহু শতাব্দী ধরেই নিষ্পেষিত, পুরুষতন্ত্রের দ্বারা। উত্তর-উপনিবেশবাদ ও নারীবাদ আসলে এখনো পাশাপাশি বিকাশমান। তবে উত্তর-উপনিবেশী অধ্যয়ন নারীবাদকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছে মনে করার কারণ আছে। এ-তত্ত্বে যেহেতু স্থানীয়দের অবদমিত মনে করা হয়, তাই নারীও সেই অবদমনের শিকার বলে ধরে নিতে হবে। তাহলে নারীকে মনে করতে হবে দ্বিগুণ অবদমিত–একবার পিতৃতান্ত্রিক উপনিবেশক শাসকদের দ্বারা, আবার উপনিবেশে অবদমিত পিতৃতন্ত্রের দ্বারা।

ইউরোপের নারীরা কিন্তু এ-জাতীয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আসেনি। কারণ ইউরোপ কলোনি ছিল না। গায়ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, উপনিবেশক সমাজের (অর্থাৎ ইউরোপের) নারীদের দ্বারা তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের নারীদের প্রতিনিধিত্ব কতটা সঠিক? ওরা কি এ-কাজে তাদের উপনিবেশী মনোভঙ্গি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে? নারীবাদী তাত্ত্বিক জুলিয়া ক্রিস্তেভার অ্যাবাউট চাইনিজ উইমেন গ্রন্থের আলোচনা সূত্রে তিনি ক্রিস্তেভার মধ্যে উপনিবেশী প্রবণতাও শনাক্ত করেন (স্পিভাক ১৯৮৮; পৃ ১৩৮)। গায়ত্রী মনে করেন প্রান্তিক নারীরা নিজেরাই নিজেদের কথা বললে তা সঠিক হবে, অন্য কেউ বললে নয়। এ সত্ত্বেও নিজের মত উপেক্ষা করে তিনিই আবার প্রান্তিক নারীদের পক্ষে কথা বলেছেন।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>