Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,কর্ণের

ইরাবতী ধারাবাহিক: একাকিনী (পর্ব-১১) । রোহিণী ধর্মপাল

Reading Time: 3 minutes
পর পর পাঁচ দিন পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হল পাঞ্চালীর। পাঁচ ভাই স্নান করে সোনার কুণ্ডল আর রত্ন মালা পরলেন। গায়ে জড়ালেন হাওয়ার মতো ফুরফুরে কাপড়। চন্দন দিয়ে তিলক কেটে আগুনের সামনে বসে দ্রৌপদীর হাতটি ধরলেন। 
এই বিয়ের খবর চর মারফত দুর্যোধনের কাছে গেল। দুর্যোধন তো রাগে ফুঁসতে লাগলেন। এক তো দ্রৌপদীকে না পাওয়ার রাগ, লক্ষ্যভেদ করতে পারা তো দূর, ধনুটি তুলতে পর্যন্ত না পারার লজ্জা, তার ওপর সেই কাজটি অনায়াসে অর্জুন করে ফেলল, তার জন্য প্রবল হিংসা, এবং সর্বোপরি নিঃসহায় পাণ্ডবদের সঙ্গে পাঞ্চাল রাজের বন্ধুত্ব, আত্মীয়বন্ধন। দ্রুপদের ধনরত্ন সৈন্যবাহিনী তো কম ছিল না। তাই তো দ্রোণ দ্রুপদকে হারানোর জন্য নতুন যুগের নতুন কৌশল জানা লোক খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। শুধু অর্থ বা লোকবল দিয়ে চলবে না। নতুন কৌশল জানা চাই। তাই তো শেষ পর্যন্ত কৌরবরা এবং অর্জুন। আর সেই প্রতিপত্তিশালী রাজা কিনা ওই ভিখারী পাণ্ডবদের বন্ধু হয়ে গেল!!
আর এই প্রথম বোধহয় কর্ণ খানিক বীরোচিত প্রস্তাব দিলেন। দুর্যোধনকে বললেন, “একথা সত্যি যে পাণ্ডবরা এখন একা নন। দ্রুপদরাজা তাঁর সমস্ত ধন সম্পদ এবং বীর পুত্র ও বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে জামাইদের পাশে থাকবেন। তবু পাণ্ডবরা চাইবে নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হতে। শ্বশুরের বলে নয়। নিজেদের বলে। তার জন্য তো খানিক সময় লাগবে। এই সময়ে চলুন, আমরা সরাসরি আঘাত হানি। লুকিয়েচুরিয়ে মারার চেষ্টা তো অনেক হলো। আমাদেরই মুখ পুড়ল। আর না! পাণ্ডবদের আরও বন্ধু বাড়ার আগে, ধনসম্পদ বাড়ার আগে, প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ার আগেই আমাদের আক্রমণ করা উচিত। তার উপর, ভুলে যাবেন না, যাদববংশও এখন ওদের সহায়। এবং যাদব মানে কৃষ্ণ। অসম্ভব ধুরন্ধর, কূটনীতি জানা, খবরাখবর রাখা কৃষ্ণ। সাম দান দিয়ে আপনি পাণ্ডবদের সঙ্গে মিত্রতা করবেন না। ভেদ করে লাভ নেই। তাই দণ্ডই এখন একমাত্র পথ। বন্ধু, হাতে অস্ত্র ধরি চলুন”।
 দ্রৌপদী দ্যূতসভার দিনেই বুঝেছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের চরিত্র কেমন। একইসঙ্গে লোভী, ক্ষমতাপরায়ণ। আবার কাপুরুষ। অথচ নিজেকে দেখাতে চান মহান রূপে। একেবারেই ঠিক বুঝেছিলেন। কারণ কর্ণের কথা শুনে ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্ম দ্রোণ ও বিদুরের সঙ্গে আলোচনা করলেন। নিজেও যে রাজনীতি বোঝেন না, পাঞ্চাল পাণ্ডব সখ্যের গুরুত্ব বোঝেন না, এমন তো নয়। আর কর্ণ মুখে যাই বলুক না কেন, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভাতে শুধু অর্জুন আর ভীমের দাপটেই কর্ণ সহ রাজারা পরাজিত হয়েছিলেন, এ খবর তো তাঁর কানেও বিস্তারিত পৌঁছেছিল। তাই তাঁর ভরসা বরং ছিল ভীষ্ম দ্রোণের প্রতি। এঁরা দুজন যদি দুর্যোধনের পাশে থাকতে রাজি হয়, তবে কর্ণের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোনো যাবে। নয়ত নয়।
আর এই প্রথম কর্ণের মতো ভীষ্মও প্রথম নিরপেক্ষ পরামর্শ দিলেন। তিনি তো বুঝতেই পারছিলেন ধৃতরাষ্ট্র কী চান। কিন্তু তার ধার দিয়ে না গিয়ে স্পষ্ট বললেন, “আমার কাছে গান্ধারীর ছেলেরা আর কুন্তীর ছেলেরা সমান প্রিয়। তোমার ছেলেদের রক্ষা যেমন করব, পাণ্ডবদের ক্ষতিও তেমন করব না। বরং তোমার উচিত তাদের আদর করে ডেকে নিয়ে অর্ধেক রাজ্য দিয়ে দেওয়া”। 
আর দুর্যোধনকেও একইসঙ্গে বললেন, “তুমি ভেবেছ বারাণাবতের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি আমি বুঝতে পারিনি? শুধু আমি নয়, সবাই জানে পুরোচনের পেছনে কার হাত ছিল। পুরোচনের মতো তোমাকেও সবাই মনে মনে দোষীই ভাবে। বরং পাণ্ডবরা বেঁচে আছেন আর হস্তিনাপুরে ফিরছেন শুনলে সেই অপবাদ ঘুচে যাবে”। দ্রোণও ভীষ্মের কথায় সম্মতি জানালেন।
ভীষ্ম আর দ্রোণের কথায় কর্ণের রূপটি আবার বেরিয়ে পড়ল। সোজা কথায় কর্ণ বললেন, “এতো সেই রকম পরামর্শ হলো। যার খাই, তারই থালায় ফুটো করি। মহারাজ, সমস্ত ধন মান এঁরা পাচ্ছেন আপনার থেকে, আর কথা বলছেন আপনার বিপক্ষে? বাঃ! যে লোক বাইরে সদ্ভাব দেখিয়ে মনে মনে ক্ষতি চায়, তাদের মতো বিপজ্জনক আর কারা! এই সব লোকজন আপনার চারপাশে থাকলে আপনার তো সর্বনাশ হবে”!
এইবার হাল ধরলেন বিদুর। তিনি তো ধৃতরাষ্ট্রেরই ভাই। দাদার চরিত্রটি ভালো রকম জানতেন। তিনি সোজা বললেন, “দেখুন মহারাজ, দ্রুপদ রাজার মতো মহা শক্তিশালী রাজাকে আগেই শত্রু করেছেন। এখন বরং তাঁর সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন। রাজ্যের সব লোক জেনে গেছে পাণ্ডবরা মরেন নি। তারা তাঁদের দেখার জন্য উৎসুক হয়ে আছেন। পাণ্ডবদের না ডাকলে তারাও উত্তেজিত হয়ে উঠবে। আর তাছাড়া, দুর্যোধনের সঙ্গে সঙ্গে আপনার নিজেরও তো পাপস্খালন হবেই। আর পাণ্ডবদের অর্ধেক রাজত্ব দিলে সবাই বুঝবে আপনি জতুগৃহের ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। আপনি পাণ্ডবদের স্নেহ করেন। তাঁদের ভালো চান। আর এইভাবে পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে আপনি পাঞ্চালরাজ আর যাদবদের পাশে পাবেন। রাজ্যের মানুষও সন্তুষ্ট হবে। এবার ভেবে দেখুন, আপনি দুর্যোধন কর্ণ শকুনির কথা শুনে যুদ্ধ করবেন, নাকি আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। এবার সিদ্ধান্ত আপনার”।
এমন করেই বিদুর নিজের মতটি পেশ করলেন, সম্পূর্ণ ভাবে ধৃতরাষ্ট্রের সম্মান যাতে বজায় থাকে, সেটিই যেন তাঁর আসল উদ্দেশ্য। আর তাঁর উদ্দেশ্যও দারুণ সফল হলো। ধৃতরাষ্ট্র বুঝলেন পাণ্ডবদের সমাদর করে ফিরিয়ে না আনলে তিনিই ছোট হবেন। দুর্যোধনকে তো লোকে দুষবেই। তাঁকেও ছাড়বে না। আর চিরকালই সিংহাসনে বসা কাপুরুষরা জনরোষকে ভয় পায়। সুতরাং তিনি আপাতত পাণ্ডবদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তই নিলেন। আর বিদুর নিজে গেলেন পাঞ্চাল রাজ্যে সেই প্রস্তাব নিয়ে। কারণ, যা যা ঘটেছে এর আগে, তিনি না গেলে দ্রুপদ আর যুধিষ্ঠির, কেউই হয়ত ফিরতে রাজি হবেন না।
বিদুর গেলেন এবং কৃষ্ণের পরামর্শে দ্রুপদ রাজিও হলেন। ফলে যুধিষ্ঠিরের আর আপত্তির কোনও জায়গাই থাকল না। এইবার শুরু হল দ্রৌপদীর একাকী যাত্রা। হ্যাঁ, মা কুন্তী আর পাঁচ স্বামী সঙ্গে থাকলেন বটে। তবে সকল বৈরীতাকে তুচ্ছ করে, সমস্ত অপমানকে বিষবৎ পান করে, নিদারুণ মনের যন্ত্রণাকে মনে চেপে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়তে হবে এবার; এই কথা না জেনেই দ্রৌপদী যাত্রা শুরু করলেন। মনের ভেতর দুরুদুরু। কেমন হবে হস্তিনাপুর? কেমন অভ্যর্থনা সেখানে তিনি পাবেন? পাঁচ ভাইয়ের এক স্ত্রী, এই কথা কতটা মেনে নেবে তাঁর শ্বশুরকুল? আর….আর….. সেখানে গিয়ে অন্তত নিবিড়করে তাঁর প্রিয় অর্জুনকে পাবেন তো? কবে আসতে সেই বহু প্রতিক্ষিত সু সময়?

One thought on “ইরাবতী ধারাবাহিক: একাকিনী (পর্ব-১১) । রোহিণী ধর্মপাল

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>