Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,নৃত্য

আত্মপ্রকাশের সামগ্রিক রূপই ছিল নৃত্য । গৌতম গুহ রায়

Reading Time: 4 minutes

“Dance is the mother of all arts. Music and Poetry exist in time, painting and architecture in space. But the dance lives at once in time and Space.“  এই গুরুত্ত্বপুর্ণ কথাগুলো বলেছিলেন Curt Sache, তাঁর “World History of Dance’। আজ, ২৯ এপ্রিল,  বিশ্ব নৃত্য দিবস, আজ নাচ নিয়ে তাই কিছু কথার ইচ্ছা মনে নাচছে

আমাদের সংস্কৃতি চর্চার ভিত যে সমস্ত শাস্ত্র তৈরি করেছে ভরতের নাট্য শাস্ত্র তার মধ্যে প্রধানতমনাট্যশাস্ত্রকে পঞ্চম বেদ বলা হয়, এর সমাজ সংস্কৃতির গুরুত্ব ও ঐতিহাসিকতার কারণে । ভরতনাট্যে তিনটি ভাগ দেখা যায়, নৃত্ত, নৃত্য ও নাট্য নৃত্ত অঙ্গভঙ্গিমার সুষম সমাবেশ,  যখন সেটা ভাবের বাহন রূপে দেখা দেয় তখন তা নৃত্যের পর্যায়ে পড়ে। একটি সঙ্গীত বা সঙ্গীতের পদ যে ভাবের আধার সে তাকে প্রকাশ করার কাজে প্রয়োগ করা হয়। এ যেন নৃত্যে গীতকবিতা। এই ক্ষেত্র আরো ব্যপক হয়ে যখন একটি সমগ্র কাহিনী বলবার ভার নেয় তখন তা অভিনয়। নৃত্যের তথা যাবতীয় অভিনয়ের শিল্পীর সঙ্গে দর্শকের যে সংযোগ সূচিত হয় সেখানে ভারতীয় নাট্য শাস্ত্রে দুটি পারিভাষিক কথার ব্যবহার করা হয়, ‘ভাব’ ও ‘রস’। আমরা জানি যে অভিনয় হলো সেই ধরণের রূপকর্ম, অনুকরণ যার প্রধান অঙ্গ। শিল্পী যা সৃষ্টি করেন সেটা ‘ভাব’, মনের বিশেষ বিশেষ অবস্থা তার বিষয়। ভাব আসলে মনের বিশেষ অবস্থা। যা মস্তিস্কের সঙ্গে সম্পক্তি, তার জন্ম থেকেই তা অন্তরে থাকে। ভাব থেকেই রসের উৎপত্তি। মানুষ কখনো ভালোবাসে, কখনো ভয় পায়, কখনো শোকগ্রস্থ হয়, ক্রুদ্ধ হয়। এর দুটি দিক, একটি মনের অবস্থা, অন্যটি আচরণে, দেহভঙ্গিতে কথায় তার প্রকাশ,  একটি অন্তরের দিক অপরটি বাইরের। রূপকার হিসাবে নৃত্য শিল্পীর কাজ বাইরের আচরণের দ্বারা মনের অবস্থাকে ফুটিয়ে তোলা। এরিস্টটল এই কারণেই প্রধানত অভিনয়কে অনুকরণশিল্প বলেছেন। শিল্পী বিভিন্ন উপাদান, আঙ্গিক, বাচিক ও আভিচারিক  তাঁর সৃজনে ব্যবহার করেন। যেমন একটি ক্রোধান্ধ ভাবের চিত্রণে তাঁর চোখ হয় বিস্ফারিত এবং রক্তিম, স্বর হয় উত্তেজনাপূর্ণ। এইভাবে নানা উপাদানকে জড়িয়ে যে সমগ্র চিত্রটি অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে তাকেই শাস্ত্রের পরিভাষায় বলে ‘ভাব’। শিল্পীর অভিনয় দর্শন করে দর্শক যা উপভোগ করেন তাই হল ‘রস’। ভরতের নাট্যশাস্ত্রে আটটি ‘ভাব’ ও আটটি ‘রস’ সংযুক্ত করা হয়েছে। যেমন ‘রতি’ ভাবের সঙ্গে ‘শৃঙ্গার’, শোকের সঙ্গে করুণ রস। পরে উদ্ভট নামে এক শাস্ত্রকার আরো একটি করে ভাব ও রস যুক্ত করায় মোট নয়টি ভাব ও নয়টি রস পাই আমরা, শান্ত বা বাৎসল্য রসের কথাও বলেন অনেকেনাট্যশাস্ত্র সম্পূর্ণ পড়ে দেখলে অনুভব করা যায় যে আমাদের নাট্যশাস্ত্র একটি গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

নৃত্য ও নাটকের যে উৎস ঘণিষ্ঠতা তা আমাদের অনেকেই ভুলে যান। নৃত্যের শেকড় ভারতীয় সংস্কৃতির গভীর থেকে রস সংগ্রহ করে যুগ যুগ ধরে বহমান।  নৃত্যের মাধ্যমে একজন শিল্পী কাব্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও ছন্দের বিশিষ্ঠ বিভঙ্গে লীলায়িত একটি অনন্য রূপভাবনা দর্শককে রসমার্গে উদবোধিত করে। “ক্ষণে ক্ষণে যন্নবতামুপৈতি তদেব রূপং রমণিয়ায়া”, অনন্তকাল ধরে নতুন নতুন  তরঙ্গে বিশ্বব্যপী এই ছন্দালীলা অমৃতসঞ্চার করে মানবমনকে সংস্কৃত করেছে।

পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই আদিম মানুষের নৃত্য, গীত ও জীবনযাত্রা প্রণালীর  বিস্ময়কর সাদৃশ্য দেখা যায়। এর কারণ প্রত্যেক দেশের মানবসমাজই আদিম কালে সভ্যতা বিকাশের একই স্তরগুলির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির শ্রমের বন্ধনের মধ্যেই মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূলসুত্র খুঁজে পাওয়া যায়। আদিম মানুষ বাঁচত তার সমগ্রতায়। তার কাছে তখন দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্য শ্রম ও সুকুমার কলার কোন প্রভেদ ছিল না। আত্মপ্রকাশের সামগ্রিক রূপই ছিল নৃত্য।

ভারতীয় শিল্প ও ললিতকলার সমৃদ্ধিতে বেদ ও উপনিষদের অবদান অসামান্য। উল্লেখ্য, ক্ষিতিমোহন সেন উল্লেখ করেছেন যে শিল্প সম্বন্ধে ঐতরেয়ের বাণীগুলি অপূর্ব। ঐতরেয় বলেন, শ্লপীরা তাদের শিল্পসৃষ্টির দ্বারাই দেবতার স্তব করেছেন । শিল্পের দ্বারা শিল্পীর যে উপাসনা, তাতে স্বর্গ বা মুক্তি মেলে আ। তার ফললাভ শিল্পের দ্বারা নিজের আত্মাকে সংস্কৃত করে তোলা। এখানেই আমরা চৌষট্টি কলার উল্লেখ পাই, এই তালিকা সেই সময়ের বাস্তব বোধ ও শিল্পসম্পর্কে শ্রদ্ধার পরিচয় দেয়। বৈদিক যজ্ঞকুন্ডগুলিকে কেন্দ্র করে নৃত্যগীতের ভূমিকার উল্লেখ সেসময়ের সাহিত্যে পাওয়া যায়। ছান্দোগ্য উপনিষদে আছে, “তে হ যথৈবেদং বহিস্পবমানেন স্তেষয়মানাঃ সংরক্ষাঃ সর্পন্তি, ইত্যেবমাসসৃপুঃ তে হ সমুপবিশ্য হিং চক্রুঃ”। গাত্রীরা পরস্পর সংলগ্ন হয়ে মণদলাকারে যজ্ঞবেদী প্রদক্ষীণ করতেন । গানের সংগে সম্বেত নৃত্যের এটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন ।

সংস্কৃতিকে যদি সভ্যতার নির্যাসরূপে ভাবা হয় তাহলে এই সংস্কৃতির চতুরঙ্গ হচ্ছে সাহিত্য- সংগীত- চিত্রকলা-নৃত্যকলা। এর মধ্যে প্রাচীনতম ধারা নৃত্য। শুধু ভরত বা ভাস নয় আরো আদিম যুগে নৃত্যের উল্লেখ দেখা যায়। ভারতীয় সভ্যতার গৌরবময় অতীত সিন্ধু সভ্যতা, সেখানে প্রাপ্ত মূর্তিতে নৃত্যের উপস্থিতি প্রমান করে। বৈদিক কালেও নৃত্যের উল্লেখ দেখা যায়। ঋক সংহিতায় পাই, “পপৃক্ষেণ্যমিন্দ্রত্বে হ্যোজোনৃম্নানিচনৃত্মানো অমর্ত” প্রভৃতি শ্লোকে নৃত্যের উপস্থিতি এই নিয়ে গবেষণা বা আলোচনা আজো তেমনভাবে হয়নি । স্কুলের পাঠ্যসূচিতে নৃত্য ও নাটক আজো উপেক্ষিত। তবুও আমাদের আশাম্বিত করে ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর সহকারি সংগঠন বা ইন্টারনাশলান থিয়েটার ইন্সটিটিউট ২৭ মার্চ বিশ্ব নাট্য দিবস ও ২৯ এপ্রিল বিশ্ব নৃত্য দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গোটা বিশ্বে  পালিত হচ্ছে  এবং সমস্যা-বিপন্ন বিশ্বে মানুষের শেষ আশ্রয় হিসাবে তা আরো প্রসারিত হচ্ছে।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে হানাহানির রক্তরাঙ্গা পথে সভ্যতার যে আত্মঘাতী পরিণতির অনুকূলে নিমজ্জিত হবে তা বিশ্বের ক্ষমতাবাজরা উপল্বধি করেছিলেন বিশ্বযুদ্ধের ভষ্মস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। বিশ্বশান্তির বার্তাকে সামনে রেখেই শিক্ষা সংস্কৃতির জগতকে যুক্ত করতেই তৈরি হয়েছিলো ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় ইন্টার ন্যাশনাল থিয়েটার অর্গানাইজেশান। এর শাখা সংঠন ইন্টারন্যাশনাল ড্যান্স কমিটি ১৯৮২ সালে স্থির করে ২৯ এপ্রিল কে ‘বিশ্ব নৃত্য দিবস’ হিসাবে পালন করা হবে। এই দিনটি উনবিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তী নৃত্যশিল্পী জর্জেস নভেরার জন্মদিন।

বাংলার সংস্কৃতি চর্চায় নৃত্য চর্চায় পূর্ণ ভাটা না এলেও, তথাকথিত ‘নবজাগরণ’এর সময় থেকে আমাদের নৃত্যচর্চাকে ব্রাত্য করে দেওয়া হয়। মধ্যবিত্ত লালিত এই নবপজাগরণ, যার একটা অভিমূখ ইউরোপীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও ভারতীর সংস্কৃতিকে প্রান্তিক করে ফেলার জন্য সক্রিয় ছিলো।  এই সময় বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজে যে নাগরিক নাট্যচর্চার বিকাশ ঘটলো নৃত্যচর্চা সেভাবে সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্টপোষকাতা পেলো না। নাট্যশালা ও নাটকের পথ উন্মুক্ত হলেও নৃতকলার প্রতি অবহেলা ছিলো পরিকল্পিত, কারণ এর দেশজ চরিত্রের বুনট আনেক দৃঢ় ছিলো, শাষকের সেখানেই ভয় গোটা দেশেই মুলত গুরুকেন্দ্রিক চর্চা এই প্রধান শিল্পমাধ্যমটিকে শক্ত ভিতের উপর বাঁচিয়ে রেখেছিল। পরবর্তিকালে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াসে শিক্ষিত সমাজে নৃত্যের চর্চা বাংলার মধ্যবিত্তের সামনে  ‘অবরোধ মুক্ত’ হয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এই ঔপনিবেশিক মন আমাদের মধ্যবিত্ত মনকেও দখল করে রেখেছে, এর সার্বিক মুক্তি আজো ঘটেনি । 

 

 

(নৃত্যকে কেন্দ্রে রেখে আলোচনার জন্য যে পরিসর দরকার এখানে তা হবে না, লেখাটি সংক্ষিপ্তকারে থাকলো , সংক্ষিপ্ত তাই তত্ত্বগত কিছু ভুল ব্যখ্যার অবকাশ থাকলো, ত্রুটি মার্জনীয়)

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>