Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

পার্বতী বাউল সকল বাঙালির সম্পদ । ফারহানা আনন্দময়ী

Reading Time: 4 minutes

এ-কেবলই এক বাউল গান নয়। এ যেন স্বর্গীয় এক অনুভব- এক সাধিকার স্বরে আর সুরে। পার্বতী বাউল। তার একতারার টুং টাং, ডুগডুগির বোল, পায়ে ঘুঙুরের তাল, দীঘল চুলের ঘূর্ণি- আর এই সবকিছু ছাপিয়ে তার কণ্ঠের মায়া- বিশ্বজুড়ে কত সঙ্গীতপ্রেমীকে সম্মোহিত করে রেখেছে দশকের পরে দশক। পার্বতী বাউল, আদ্যপান্ত একজন শিল্পী। শিল্প আর শিল্পীকে তো মানচিত্রের কাঁটাতারে বেঁধে রাখা যায় না কখনো। পার্বতী তাই আমাদের সকল বাঙালির সম্পদ। ইউনেস্কো ঘোষিত Masterpieces of the oral and intangible heritage of humanity -এর তালিকাভুক্ত একজনা।

বাবার চাকরিসূত্রে পার্বতী বাউলের জন্ম আসামের কুচবিহারে। তাঁর জন্ম বাংলাদেশে না হলেও তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বাংলাদেশের মানুষ, চট্টগ্রামেই ছিল তাঁদের বাস। সে-শুধু সাধারণ স্মৃতিময় নয়, পার্বতীর জন্মকথা ইতিহাসের এক অংশ! পার্বতীর পিতামহ যোগেশচন্দ্র পারিয়াল ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের ব্রিটিশবিরোধী যুব-আন্দোলনে সহযাত্রী। পার্বতীর বাবাও চট্টগ্রামেই থাকতেন। তাঁর বাবার লেখাপড়াও এখানে। পরে গিয়ে তিনি কলকাতায় এঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করেন। পার্বতীর মা-বাবা পশ্চিম-বাংলায় চলে গেলেও ওর পিতামহ ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের আগে পর্যন্ত এ-দেশেই রয়ে গিয়েছিলেন- এমনকী ১৯৪৭-এ দেশভাগের পরেও তিনি জন্মস্থান ছাড়েননি। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ে বাবার নিরাপত্তার জন্যই পার্বতীর বাবা ওর দাদুকে কলকাতায় নিয়ে যান। যুদ্ধ শেষ হবার পরে তাকে আর ফিরে আসতে দেননি এ-দেশে।

দক্ষিণ রাউজানের পারিয়ালপাড়া গ্রামে একটি সম্মানীয় পরিবারের সদস্য ছিলেন পার্বতীর পূর্বপুরুষেরা। পারিয়াল গোত্রে পার্বতীর পূর্বপুরুষেরা জন্ম নিয়েছিলেন। সেইসূত্রে আজকের পার্বতী বাউল কিন্তু এই পৃথিবীতে নাম লিখিয়েছিলেন মৌসুমী পারিয়াল নামে। সেই গ্রাম থেকে যখন পার্বতীর দাদু শেষবারের মতো চলে যান ১৯৭১-এর আগে আগে, তিনি তার ঘরবাড়ি তালা দিয়ে চাবি নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। পার্বতীর দাদু বার্মা থেকে চা আমদানীর ব্যবসা করতেন। চা রাখবার জন্য তার একটা গুদামঘরও ছিল। তিনি যখন দেশ ছাড়েন, ‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়’ এই ভাবনা অন্তরে নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন। তাই ঘর-দুয়ার তালাবন্ধ করে চাবি সাথে করে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরে আর কোনোদিন তার জন্মভিটায় ফেরা হয়নি। পার্বতীর বাবা তাঁকে আর ফিরতে দেননি। সেই গ্রামে তাদের দুটো মন্দির-ও ছিল; শিব মন্দির আর কালী মন্দির। মন্দিরের জমির অধিকারী ছিল সেই পারিয়াল গোত্র।

মন্দির দুটো এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু সেগুলো ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে অধিকৃত হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে পার্বতী বাউল বলেন, ‘২০১৪ তে আমি যখন চট্টগ্রামে গেলাম, আমাদের সেই গ্রামটাতে গিয়েছিলাম। কী আশ্চর্য! আমার দাদু তার ঘরবাড়ি যেমন রেখে গিয়েছিলেন; আজও এত বছর পরেও গিয়ে দেখি, সেভাবেই রয়েছে। জীর্নদীর্ণ ভগ্ন-করুণ দশা- কিন্তু তালাবদ্ধ; দাদু যেমন রেখে গিয়েছিলেন। কেউ লুট করে নেয়নি, কিংবা নিতে পারেনি। কারণ আমার দাদুকে এই গোত্রের সকলে খুব ভালোবাসতো, মান্য করতো। তারা আগলে রেখেছিল আমাদের ভিটেবাড়ি।’

পার্বতী বাউল সেই পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন, যে পরিবারের সাথে বাউলদের কোনো সংযোগ ছিল না। কারণ চট্টগ্রাম বাউল অধু্যিষত জনপদ নয়। আর তার পূর্বপুরুষের কেউ বাউল দর্শনের সাথে যুক্ত ছিল না, বাউলচর্চাও করেননি। পার্বতী শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়ে এই বাউলপথের সন্ধান পান। তাও এমন নয় যে, তিনি বাউলদর্শনে দীক্ষা নিতে সেখানে গিয়েছিলেন; তিনি বিশ্বভারতীতে চিত্রকলায় লেখাপড়ার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলেন। কিন্তু পার্বতীর নিয়তি বাঁধা ছিল বাউল গানের সাথে। শান্তিনিকেতনে যাবার পথে ট্রেনে বাউল গান শুনবার অতুল অভিজ্ঞতা নেই কারো; এটা কখনো হবার নয়। ট্রেনে, সন্ধ্যে নামবার মুখে, পার্বতীর কম্পার্টমেন্টে এলেন এক অন্ধ বাউল- হাতে একতারা। আমুল দুধের টিন ফুটো করে একতারাটি বানানো। গান ধরলেন বাউল আর সেই প্রথম বাউল গানে মন হারিয়েছিলেন পার্বতী।

এরপর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা ফুলমালা বাউলের সাথে। ফুলমালাদি বলে ডাকতেন পার্বতী। ফুলমালাদি’র গান শুনে দিদির কাছেই প্রথম বাউল হবার ইচ্ছে প্রকাশ করেন আর দিদির সাথেই শুরু করেন মাধুকরী। টানা এক বছর ফুলমালাদি’র সাথে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে ট্রেনে মাধুকরী করেন তিনি। তারপর একদিন বিশ্বভারতীর কলাভবনে বাউল গান গাইতে আসেন সনাতন দাস বাউল। সনাতন বাউলের কন্ঠে ‘কালিয়া’ শুনে সেদিন পার্বতীর বৃন্দাবন দর্শন হয় গানে-গানে, চোখের জলে। আর সেই জলে মন শুদ্ধ করে পার্বতী ভাবেন যে ব্যক্তি তাঁর গানে আমায় বৃন্দাবন দর্শন করিয়ে দিতে পারে, সে না আরও কতকিছু করার সাধ্য রাখে! এই ভাবাদেশেই পার্বতী তাঁর গুরুর সন্ধান পান।

শান্তিনিকেতনে পড়তে যাওয়ার প্রথম দিকে পার্বতী বাউলদেরকে এড়িয়ে চলতে শুরু করছিলেন কিছুদিন। যা পড়তে এসেছিলেন, অর্থাৎ চিত্রকলা, সেই পাঠে মনোযোগ দেবেন ব’লে মনকে স্থির করেছিলেন। কিন্তু নিয়তি তাকে যুক্ত করে দিল বাউলদের সাথেই। বিশ্বভারতীতে তার প্রথম পাঠ্যসূচিতে ছিল বাউলদের স্কেচ আঁকা। এবং সেই কাজে পার্বতীকে যেতে হলো বাউল-আখড়ায়। মিলতে হলো, মিশতে হলো অনেক বাউলের সঙ্গে, শুনতে হলো অজস্র বাউল গান। পার্বতী আর বেরোতে পারলেন না বাউল গানের জগৎ থেকে। ফুলমালা বাউলের একনিষ্ঠ অনুরাগী হলেন পার্বতী। ফুলমালার কণ্ঠস্বরের মাধুর্য পার্বতীকে মুগ্ধ করতো। পার্বতী চাইলেন, ফুলমালার কাছেই দীক্ষা নেবেন; তাই তার সাথে সাথে থাকতেন সর্বক্ষণ। শুনতেন। শিখতেন। কিন্তু ফুলমালা শুধু এটুকুতেই তুষ্ট হলেন না। পার্বতীকে বললেন, ‘আমাদের সাথে তোমাকে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বাউল গান গাইতে হবে, গান গেয়ে ভিক্ষে করতে হবে। তুমি রাজি?’ পার্বতীর রক্তে-মননে-মগজে তখন বাউলের একতারার সুর ছাড়া আর কিছু বাজে না তো। তিনি রাজি হয়ে গেলেন ফুলমালার এই শর্তে। শান্তিনিকেতনের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া সব ছেড়ে তিনি বাউলদের সাথে ট্রেনে গান গাইতে থাকলেন, সাথে ভিক্ষা করতে থাকলেন।

কিন্তু বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ তা মানবে কেন? তারা পার্বতীর শিক্ষার্থী-অনুমোদন বাতিল করে বিশ্বভারতী থেকে বহিষ্কার করলো। তাতে পার্বতীর কোনও ভাবান্তরই হলো না। সেই যে ট্রেনে প্রথমদিনে অন্ধবাউলের গান শুনে বাউল হবার সাধ জেগেছিল, তার সেই সাধপূরণে পথ আরও মসৃণ হলো যেন! পার্বতী হয়ে উঠতে থাকলেন পার্বতী বাউল!

এভাবে এক বছর পথে-পথে, ট্রেনে-ট্রেনে বাউলদের সঙ্গে গাইবার পরে ফুলমালা বাউল তাকে বাউল সাধনার গভীরে যেতে পরামর্শ দিলেন। নিয়মিত চর্চা আর শৃংখলাই হলো সাধনার একমাত্র পথ। আর এজন্য পার্বতীকে একজন বাউলকে গুরু মানতে হলো, তিনি সনাতন বাবা, সনাতন দাশ বাউল। তার বাউল জীবনের পথে সনাতন বাবাই ছিলেন পার্বতীর দীক্ষা গুরু, যাঁর সাথে পার্বতী বাউল দীর্ঘ পঁচিশ বছর কাজ করেছেন। আর তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন শশাঙ্ক গোঁসাই, মুর্শিদাবাদে এই গুরুর কাছে শিক্ষা নিয়েছিলেন তিন বছর। এরপরের জীবনপর্ব পার্বতী বাউলের ভক্তরা কমবেশি সকলেই জানেন। বাউলদর্শনে পূর্ণ দীক্ষিত হয়ে পার্বতী বাউল আজ নিজেই একজন সঙ্গীত ও দর্শন বিষয়ের শিক্ষক; বিশ্বজোড়া তার পরিচিতি। চল্লিশটিরও বেশি দেশে বাউল গেয়ে দর্শক-শ্রোতাদেরকে তার সম্মোহনীসুধায় পূর্ণ করে রাখেন- যখন তিনি আর তার একতারা গেয়ে ওঠে- ‘শ্যামসায়রে নাইতে যাবি, গায়ের বসন ভিজবে ক্যানে সায়রে সাঁতার দিয়ে আসবি ফিরে, বলি গায়ের বসন ভিজবে ক্যানে কিছুদিন মনে মনে, ঘরের কোণে শ্যামের পীরিত রাখ গোপনে’

সূত্র: বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকার

  কৃতজ্ঞতা: আজাদী              

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>