| 19 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: চিন্তামণির দরবার (পর্ব-১৩) । জয়তী রায় মুনিয়া

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

বাক্য ও জীবন

নমস্কার বন্ধুরা চিন্তামণির দরবারে আপনাদের সু স্বাগতম। আজ এমন একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যার প্রভাব আমাদের রোজকার জীবনে প্রবল। হেঁয়ালি না করে বলে ফেলি, সেটা হল বাক্য। হ্যাঁ বন্ধুরা, বাক্য উচ্চারিত হয় জিহ্বা দিয়ে, জিহ্বায় সরস্বতীর অবস্থান যদি হয় বাঁচা যায়, আর যদি শয়তান অবস্থান করে তাহলে ধ্বংস হয়ে যায় জীবন। বাক্যের একটি আঘাতে চুরমার হয়ে যায় অটল বন্ধুত্ব, নিবিড় প্রেম, পিতা মাতা সন্তানের ভিতরের অমলিন সম্পর্ক … সব শেষ হয়ে যায় বাক্যের জ্বলন্ত আগুনে। আবার, ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক সুন্দর হয়ে ওঠে মধুর বাক্যের জল সিঞ্চনে। নিরাশ প্রাণে আশা জাগে। নতুন করে বেঁচে ওঠে মৃত প্রাণ। তাই, বাক্যের গুরুত্ব অসীম।

বাক্য কয়েকটি শব্দের সমষ্টি। অথবা একটি মাত্র শব্দও বাক্য হতে পারে। মানুষের মনের ভাব প্রকাশ বাক্যের সাহায্যেই সম্পূর্ণ হয়। মনের ভাব–অর্থাৎ মনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ফুটে ওঠে বাক্যের মাধ্যমে।

মন দেখা যায়না। স্পর্শ করা যায়না। অথচ মন হল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকট ইন্দ্রিয়। শরীর নানা ভাবে তুলে ধরে মনের ভাব। বাক্য তার মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্থ বহু পরিবার কথা হারিয়ে ফেলেছিল। বাংলাদেশে থাকাকালীন রাশভারী ছিলেন, অথচ কলকাতা এসে হয়ে উঠলেন তোষামুদে , অকারণ হ্যা হ্যা করা মানুষ। ভিতরের কষ্টের কথা ক্ষতের কথা বলতে না পেরে হয়ে উঠছেন অবিন্যস্ত।

রেপড হওয়া চোদ্দ বছরের এক মেয়ে এসেছিল আমার কাছে। ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে থাকা শুধু। শরীরের চাইতে মন হয়েছিল অনেক বেশি রক্তাক্ত। তখন তার নিরাময় নির্ভর করছিল স্বাভাবিক কথা বলার উপর। সেই আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার লড়াই সহজ ছিল না।
তখন চারিদিকে নেতিবাচক কথার ভিড়ে মেয়েটি আরো অসহায় হয়ে পড়ছিল। এক সময় তার মনে হচ্ছিল আর বুঝি সে বাঁচবে না। রেপড হয়ে সে আত্মহত্যা করেনি কিন্তু যেদিন তার মা এসে বলল — তোর জন্য সমাজে মুখ দেখাতে পারছি না।
সেই রাতেই মায়ের শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ে সে। দুটো মিষ্টি কথা, দুটো সহানুভূতির বাক্য … যদি বলত মা অথবা সমাজ, বেঁচে যেত একটা প্রাণ। নয় মাস সময় লাগে জন্ম নিতে, শেষ হয়ে যায় এক নিমেষে।

বিষ বাক্য অমৃত বাক্য

দুটি ই সত্য। দুটি ই সমান ক্ষমতাবান। একটি ধ্বংস অপরটি সৃষ্টি। একটি অন্ধকার অপরটি আলো। সকালে উঠে কেউ যদি বলে ওঠে — আজ দিন খুব খারাপ যাবে। হয়ত উল্টো ই হবে। কিন্তু, মন সারাদিন খচ খচ করবে। কেন মন এমন করবে? কারণ, মনের উপর বাক্যের প্রভাব পড়ে।

বাক সংযম ও সমাজ

প্রাচীনকালে বাক্য ব্যবহারের উপর বাধা নিষেধ ছিল। রীতিমত প্রশিক্ষণ নেওয়া ছিল বাধ্যতা মূলক। ঋষি বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণে ভাষা প্রয়োগ শিক্ষা জরুরি ছিল। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবারে অনুশাসন ছিল সঠিক শব্দ ব্যবহার করার দিকে। রীতিমত কড়া নজর রাখা হত , কে কিভাবে কথার প্রয়োগ করছে অর্থাৎ অপপ্রয়োগ করছে কি না? কেন এত সাবধান হওয়া? সামান্য বাক্যই তো। তার তো কোনো শরীর নেই। বাক্য ইঁট পাথর ও নয় যে ছুঁড়ে দিলে আঘাত লাগবে? তবে? কিসের এত ভয়? কিসের জন্য এত সাবধান বাণী? কথা হল, ইঁট পাথরে ক্ষতিগ্রস্থ হয় শরীর, যা দেখা যায়, ঔষধ লাগানো যায়, নিরাময় হয়। কিন্তু, বাক্যের কঠিন আঘাত ক্ষতিগ্রস্থ করে মন। সে আঘাত দেখা যায় না। নিরাময় অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সামাজিক ক্ষেত্র সুন্দর রাখার জন্য বাক – সংযম জরুরি। প্রতিটি মানুষের সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করা হবে তার একটা সুষ্পষ্ট গাইড লাইন অলিখিত ভাবে মেনে চললে সমস্যা কম হয়। আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমা ছাড়িয়ে লোক পোস্ট দিচ্ছে, কত মানুষকে আঘাত করছে, সমাজের কোনো দিক দিয়ে ভালো হচ্ছে না। উল্টে, বেড়ে যাচ্ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, শিক্ষা রুচি বিসর্জন দিয়ে নিকৃষ্ট বাক্যের ছোঁড়া ছুঁড়ি হচ্ছে। মানুষের ভিতরকার বিষ বাক্যের মাধ্যমে যখন বেরিয়ে আসে, তখন তার ছোবল একশত বিষধর সর্পের চাইতে বেশি ছাড়া কম নয়।

পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জিহ্বা। এই ইন্দ্রিয় দমন সবচেয়ে কঠিন। ফেসবুক আমাদের সমাজের প্রতিরূপ। সেখানে যখন শোভোনতার বেড়া ডিঙিয়ে যাওয়া হয় তখন বোঝা যায়, মানুষ এই জিহ্বা ইন্দ্রিয়ের কাছে কতখানি পরাজিত।


আরো পড়ুন: চিন্তামণির দরবার (পর্ব-১২) । জয়তী রায় মুনিয়া


মন ও জিহ্বা

কথায় বলে, হাতের তির আর মুখের কথা — একবার ছুটে গেলে আর ফেরানো যায় না। তাহলে করণীয় কি? চিন্তা শক্তির উন্নতি ঘটাতে হয়। প্রতিদিন কিছু সময় মৌন থাকলে , চিন্তা শক্তির উন্নতি সাধন হয়। কি করে? মৌন থাকা মানে শুধু মুখ বন্ধ নয়, মন বন্ধ। অর্থাৎ, জাগন্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকা। কোনো ফোন নয়, বই নয় , এমনকি চিন্তাও নয়। যা কিছুই বাইরের বস্তু তাই আমাদের চিন্তা শক্তিকে প্রভাবিত করে। ক্লান্ত করে তোলে। সেই ক্লান্ত মন আর ভালো কিছু করতে চায় না। এমনভাবে মন কিন্তু ক্লান্ত হচ্ছে রোজ। লোকের ব্যবহার, অফিসের চাপ, পরিবারে ঝামেলা… মন অবসাদে পূর্ন হয়ে যায়। তখন , অনেকেই বেশি খান। এবং, ভুলভাল কথা বলেন। অথবা, ফেসবুক ভুল পোস্ট দিয়ে ফেলে। কোনোটাই নিজের কন্ট্রোলে থাকে না। এর ফলে একটা সাময়িক তৃপ্তি ঘটে, কিন্তু, বহু দিকে সর্বনাশ হয়ে যায়। তাই, জিহ্বার উপর কন্ট্রোল আনতে গেলে নিজেকে নিয়ে একটু বসতে হবেই। যা কিছু চারিদিকে ঘটছে সেগুলো হতাশাজনক , সমাধানের কোনো পথ নেই, অনেক সময় মনে হয় ঝেড়ে দুই কথা শুনিয়ে দেওয়া উচিত ছিল — বেশিরভাগ তাই ই করে। এমন ঘটনা ঘটেছে, এই প্রতিবাদ ডেকে এনেছে মৃত্যু। বাড়িতে কুরুক্ষেত্র বেঁধে গেছে। তবে কি অন্যায় দেখে চুপ করে থাকতে হবে? ওইখানেই হল কন্ট্রোল মনের ম্যাজিক। সে বিচক্ষণ পরামর্শ দেবে। এমন ভাবে ব্যবহার করবে বাক্য কে, যা তখন নোংরা ধুয়ে দেওয়ার জলধারা হবে, রক্ত বইয়ে দেওয়ার তরবারি হবে না! জিহ্বার ব্যবহার সু প্রযুক্ত হবে কি না নির্ভর করে সু শৃঙ্খলিত মনের উপর। সু শৃঙ্খল মন লাভ করতে গেলে প্রতিদিন ট্রেনিং দেওয়া প্রয়োজন। সে ট্রেনিং থাকলে জিহ্বা মানবে আমাদের শাসন। সুতরাং, পরিবেশ অস্থির হোক বাক্য যেন অস্থির এলোমেলো না হয়। পরিবেশের উপর অদুন্তুষ্ট মন, ভুল করতে পারে। তাই, পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে জিহ্বা সবচেয়ে খারাপ — এমন কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাক্য নির্ভর করে চিন্তনের উপর। চিন্তন সংযম করার উপায় জানা থাকলে, বাক্য অবধারিত বিবেচনা যুক্ত হবে। মধুর না হোক যুক্তি থাকবে। তাতেও যদি পরিবর্তন না হয় , দেখতে হবে বাক্যের বিষ যেন অন্তরকে স্পর্শ না করে।

প্রশিক্ষিত মন এবং বিষ বাক্য

বিষ বাক্য ছোবল দেবেই। তার উত্তরে আরো বিষ ঢেলে কোনো লাভ হবে না। গরলে ভরে যাবে চারিধার। বাক্যের যেহেতু শরীর নেই তাই সে সবচেয়ে বেশি আহত করে মনকে। বাক্যের আঘাতে জর্জরিত মন শেষ পর্যন্ত আশ্রয় খুঁজে নেয় মৃত্যুর। প্রতিদিন নিজেকে নিয়ে বসতেই হবে। কারণ, বাক্য রূপী বিষধর সর্প চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারণে হোক অকারণে আপনি ই যে তার পরের লক্ষ্য নন, সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তাই , তৈরি করুন মন – দূর্গ। ছোবল পড়লেই যেন ঠিকরে যায়। কিছু আসে যায় না কে কি বলল। যদি পারেন সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখুন। যদি পরিবারের কেউ হয়, তবে রোজ ধ্যান করে মনের শক্তি বাড়িয়ে বলুন — একলা এসেছি। একলাই যেতে হবে। মাঝের সময়টুকু বাধ্যতা মূলক সম্পর্কে আছি। বরং, যে আমায় কটু কথা বলছে সে ভালো থাকুক।
বিষে বিষক্ষয় — এই প্রবাদ এক্ষেত্রে খাটবে না। এখানে আপনার বাক্যের ভান্ডারে থাকুক অমৃত। শক্তিশালী হয়ে উঠুন আপনি সেই অমৃত গুণে। বিষ ছোবল মারবেই। কিন্তু, আপনার অমৃত রূপী শক্তিশালী মন রক্ষা করবে।

ইতিবাচক বাক্য

এতক্ষণ গেল নেতিবাচক বাক্যের কথা। ইতিবাচক বাক্য সম্বন্ধে একটু জানতে হবে। আগেই বলেছি, বাক্যের অসীম ক্ষমতা। মৃত্যু পর্যন্ত ঘটিয়ে দিতে পরে। তেমনি আবার জাগিয়ে তুলতে পারে আশাহীন প্রাণে আশা, মৃতপ্রায় প্রাণে নতুন আলো। চারিদিকে এমন একটি বাতাবরণ তৈরি করে যেখানে প্রতিবিম্বিত হয় জীবনের আলো। এমন লোকের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকার চেষ্টা করুন, যাদের মধ্যে রয়েছে ইতিবাচক ভাবনা। এমন কিছু কাজ করুন, যা আপনার সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে সাহায্য করবে। কি ঘটে গেছে অথবা ঘটতে চলেছে… একদম ভাবতে হবে না। কারণ, কোনোটাই আমার হাতে নেই। হাতে আছে বর্তমান। কাজেই , এইসময় , বলতে হবে এমন বাক্য, যা ইতিবাচক ভাবনাকে প্রতিফলিত করে। এতে নিজের শরীর মন বাঁচবে, সেই সঙ্গে বাঁচবে সমাজ।।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত