| 14 এপ্রিল 2024
Categories
শারদ সংখ্যা’২২

শারদ সংখ্যা ভ্রমণ: ছাইয়ের নিচে প্রাণ । চান্দ্রেয়ী চক্রবর্তী

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

সারা পৃথিবী থেকেই যারা ইউরোপ টুরে আসে তাদের কাছে ইতালি দেখা টা লিস্ট এর একেবারে ওপরেই থাকে। থাকবে নাই বা কেনো? সাড়ে চার হাজার বছরের ইতিহাস, অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য, সুন্দর আবহাওয়া কি নেই! অল্প দিনের টুরে সবাই মোটামুটি বড়ো শহর গুলো দেখে, রোম তো বটেই, কেননা কথাতেই আছে all roads lead to Rome. তাছাড়া ফ্লোরেন্স, ভেনিস, মিলান, নেপলস থেকে দক্ষিণ ইতালির অপূর্ব সমুদ্র সৈকত, উত্তর ইতালি গেলে আল্পসের লেক গুলো কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো? সবই অসাধারণ। যারা ইউরোপের মধ্যেই থাকে, তারা একবারে সবটা না দেখে, রয়ে সয়ে সময় নিয়ে দেখে অনেক সময় ই।

বেশিরভাগ পর্যটক ই নাপোলি বা নেপলস যান পম্পে দেখতে বা সেখান থেকে কপ্রি বা আমালফি কোস্ট যেতে। এই জায়গা গুলোর সৌন্দর্য, বা পমপেই এর যে গা হিম করা ইতিহাস তার কারণ যে ভিসুভিয়াস সেটা দেখতে কিন্তু অনেক সময়েই সময়াভাবে যাওয়া হয় না। আসলে যাওয়াটা বেশ ঝামেলার ও। নেপলস থেকে পমপেই স্টেশন, সেখান থেকে এক ঘন্টা বাসে ভিসুভিয়াস, তারপর আবার প্রায় দু কিলোমিটার খাড়া চড়াই উঠলে ভিসুভিয়াস এর ক্রেতার বা জ্বালামুখ টা দেখা যায়। গরম কালে বেশ কষ্টকর ও। আগ্নেয়গিরি র ওপরে তো কোনো বড়ো গাছ নেই। ছায়াও নেই। রাস্তাও নেই, ওই ধুলো আর পাথরের ওপর দিয়েই হাঁটতে হয়।
পমপেই এর মতই আরেকটা শহর হারকুলানিউম। সেটাও একই সময় একই দিনে ভিসুভিয়াস এর অগ্নুৎপাতে পমপেই এর মত ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু বেশির ভাগ টুরিস্ট ই সময় পান না এই তিনটে জায়গায় যাওয়ার।
আমাকেও অনেকে বলেছিল পমপেই আর হারকুলানিউম্ দুটোই যাবার দরকার নেই, একই রকম। আমার হাতে সময় ছিল, হারকুলানিউম্ নেপলস থেকে মাত্র আধ ঘন্টা, তাই আমি ভাবলাম দেখেই যাই। দেখার পরে বুঝলাম ডিসিশন টা ঠিক ই ছিল। তিনটে জায়গা একসাথে দেখলে ইতিহাস এবং ওই জায়গাটার ভূপ্রকৃতি পুরোটাই বেশ বোঝা যায়।
ক্যাম্পানিয়ান আর্ক এর একটা অন্যতম আগ্নেয়গিরি ভিসুভিয়াস এবং এটা সবচেয়ে মারাত্মক আর অ্যাক্টিভ ও বটে। গত একশো বছরে দুবার এতে অগ্নুৎপাত হয়েছে। যদিও ১৯৪৪ সালের পর থেকে আর সেরকম অগ্নুৎপাত হয়নি। এই যে ইতালির পশ্চিম উপকূল জুড়ে এত সুন্দর সুন্দর দ্বীপ, ইশকিয়া, কপ্রী এদের কারণ হলো এই ক্যাম্পানিয়ান ভোলকানিক আর্ক। ঐতিহাসিক সময়ে ভিসুভিয়াস এর সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য অগ্নুৎপাত ৭৯ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট বা অক্টোবর মাসে। তিনদিনের মধ্যে পমপেই, হার্কুলানিয়াম সহ এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যায়। ভিসুভিয়াস যেহেতু স্ট্রাত ভলকানো, এর অগ্নুৎপাতের ভয়াবহতা অত্যন্ত বেশি, বিশাল বিশাল ভলভানিক বম্ব, প্রচুর গ্যাস বেরোতে থাকে এর অগ্নুৎপাতের সময়, লাভা ছাড়াও। 
পমপেই শহর ছিল রোম এর পরেই এই অঞ্চলের এক বিশাল শহর, সমুদ্রের ধারে, ভিসুভিয়াসের কোলে, প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। বেশ বর্ধিষ্ণু, প্রচুর ব্যবসায়ী, রাজ কর্মচারী, জমিদার এদের বাস। অসাধারণ পাথরের কাজ হতো এখানে। আমোদ প্রমোদের ও প্রচুর বন্দোবস্ত। বিশাল বিশাল সরাইখানা, তার সাথে রোমান স্নানাগার। সেযুগে দুপুরের খাওয়া বাড়িতে খাওয়া চল ছিল না। প্রচুর সরাইখানা পুরো শহর জুড়ে। বড়ো বড়ো স্নানাগার গুলোয় অসাধারণ সব ফ্রেস্কো, মোজাইকের কাজ, কাঠের কাজ। শহরের মাঝখানে ফোরাম, সেখানে অ্যাপোলো, জুপিটার এইসব দেব দেবীর মন্দির, এই দু হাজার বছর পরেও তার স্থাপত্য দেখলে মাথা ঘুরে যায়।

আরো পড়ুন: বিশেষ রচনা: নারী বিদ্বেষ । শমীতা দাশ দাশগুপ্ত


খানিক দূরে সমুদ্রের প্রথম তেরেস এর ওপর আরেকটা গঞ্জ হার্কুলানিউম। পমপেই এর মত এত বড় না, কিন্তু বেশ সাজানো গোছানো, তুলনায় একটু ছোট বাড়ি ওয়ালা ছিমছাম এক শহর। পমপেই তে তো অসাধারণ অ্যাম্ফিথিয়েটার ও ছিল। এরকম একটা সময়ে এক শরৎকালে ভিসুভিয়াস জেগে উঠলো। সেই ভিসুভিয়াস যাকে এই শহর গুলোর বাসিন্দা রা তাদের সুখ সমৃদ্ধির কারণ মনে করতো। প্রথম টা ছোট ছোট ভূমিকম্প, তখন তারা ভেবেছিল ভিসুভিয়াস ঠিক থেমে যাবে, তার সাথে এই ভয় ও ছিল তারা তাদের টাকা পয়সা সম্পদ ছেড়ে কোথায় যাবে? এক দিনের মধ্যে আকাশ আগ্নেয়গিরির ধোঁয়ায় ঢেকে গেল, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সবার। তখন বহু লোক পালাতে শুরু করলো, কিন্তু ততক্ষণে অগ্নুৎপাতের সাথে বড়ো বড় ভোলক্যানিক বম্ব এর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। সেগুলোর আঘাতে প্রচুর লোক মারা পড়ছে। তারপর উড়ে আসা ছাই তে ঢেকে গেল সারা শহর। অর্থাৎ আগুনে পুড়ে, দমবন্ধ হয়ে ছাই চাপা পড়ে এই অঞ্চলের প্রায় সব মানুষ মারা পড়েছিল। তিন দিনের মধ্যে ওই বিশাল দুটো শহর আর পুরো অঞ্চল প্রায় ১০ মিটার লাভা ও ছাই এর নিচে চাপা পড়ে গেছিল। পরবর্তী কালে পমপেই এর কিছু অংশ মাটির ওপরে থাকলেও হার্কুলানিউম পুরোটাই চাপা পড়ে গেছিল। মাটি খুঁড়ে একে উদ্ধার করার কাজ এখনও চলছে। চাপা পড়ে গেলেও যেহেতু হার্কুলানিউম এর দূরত্ব পমপেই এর চেয়ে বেশি, এর ঘর বাড়ি ইত্যাদি পমপেই এর চেয়ে ভালো অবস্থায় পাওয়া যায়।
এই শহরেও অপূর্ব মোজাইকের কাজ বাড়ির উঠোনে, দেওয়ালে, সুন্দর সব ফ্রেস্কো। একটা কথা এখানে না বলে পারছি না, এই প্রত্যেকটা জায়গা এমনকি ভিসুভিয়াস এর ওই ক্রটার যেতেও বেশ ভালো টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হয়। আর ইতালিতে এই টিকেট কটার বিষয় টাও খুব স্বচ্ছ নয়, প্রচুর দালাল, প্রচুর লোক ঠকানো। এই যে এত ঐতিহাসিক জায়গা, শিক্ষণীয় বটে, পমপেই বা হারকুলানেউম কোথাও ভেতরে সেরকম কোনো বোর্ড লাগানো নেই যেগুলো পড়ে গাইড ছাড়া ঘোরা যায়। অর্থাৎ গাইড এর জন্য আলাদা করে পয়সা খরচ করতে হবে। আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করে, যাওয়ার আগে গাইড বই পড়ে এই জায়গাগুলো ঘুরতে হয়েছে। ইতালির এই অসম্ভব দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেম প্রায় ই ভীষন বিরক্তির কারণ।
ইতালির এই অঞ্চলে প্রচুর ফল হয়, সরেন্ত র লেবু তো বিখ্যাত। আজকের দিনে বাংলাদেশ, মিশর আর আরও অনেক আফ্রিকার দেশ গুলো থেকে এই অঞ্চলে প্রচুর মানুষ আসেন ওই ফলের বাগান গুলোয় কাজ করতে। পাশেই সমুদ্র, প্রচুর মাছ, সহজ যাতায়াতের ব্যবস্থা।
এখনও ভিসুভিয়াস সংলগ্ন অঞ্চলে প্রায় তিন মিলিয়ন এর বেশি লোকের বাস। ভিসুভিয়াস প্রায় ই জেগে ওঠে যদিও ৭৯ সালের মতো এতটা ভয়াবহ অগ্নুৎপাত তারপরে হয়নি। সেই অগ্নুৎপাতে তৈরি হওয়া তাপের পরিমাণ হিরোশিমা নাগাসাকির পারমানবিক বিস্ফোরণে তৈরি হওয়া তাপের এক লক্ষ গুন ছিল। অর্থাৎ এখন যদি আবার ভিসুভিয়াস রেগে ওঠে আর তার অগ্নুৎপাত ওই ৭৯ সালের অগ্নুৎপাতের ১০০ ভাগের এক ভাগ ও হয়, তাহলে ওই তিন মিলিয়ন লোক নিশ্চিহ্ন হতে বেশি সময় লাগবে না। 
মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, প্রকৃতির কাছে সে নগন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত