irabotee.com,মুক্তিযুদ্ধে

২৬ মার্চ সংখ্যা: ধর্মনিরপেক্ষতাই মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র । যতীন সরকার

Reading Time: 2 minutes

১৯৭১ সাল আমাদের দেখিয়েছে যে, আমরা কীভাবে একত্রিত হতে পারি। একত্রিত হওয়ার শক্তি আমাদেরকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। একইসঙ্গে আরেকটি ব্যাপার মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, জাতিধর্মের ঐক্য আমাদের রক্তে প্রবাহিত। অভিজ্ঞজনেরা বলেন যে, আমাদের সংবিধানের মতো এমন সংবিধান নাকি পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রেরই আছে। আমাদের সংবিধানটি তো আসলে লেখা হয়েছে লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তের অক্ষরে। এর প্রতিটি বাক্য সেই রক্তের ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকারের ধারক। অবিরাম মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে গিয়েই সেই অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। দেশের প্রতি মানুষকে ক্ষুধা থেকে, নগ্নতা থেকে, অশিক্ষা থেকে, কর্মহীনতা থেকে, অ-নিরাপত্তা থেকে মুক্তি দেওয়াই অবিরাম ও অনিঃশেষ মুক্তিসংগ্রামের লক্ষ্য। সে-লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা স্বাধীন দেশে পথচলা শুরু করেছিলাম, স্বাধীনতাকে সার্থক করে তোলার প্রত্যয়ই ধারণ করেছিল আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুই হয়েছিলেন মুক্তি সংগ্রামেরও সেনাপতি।কিন্তু হায়, আমাদের সেনাপতিকেই সপরিবারে নিহত করে অট্টহাস্য করে উঠল স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের ঘৃণ্য দুশমনেরা। এই দুশমনদের এমন নৃশংস-ঘৃণ্য অপরাধের বিপরীতে কেবল নিষ্ফল ক্ষোভে আঙুল কামড়ানো ছাড়া কিছুই যেন করার রইল না আমাদের। তবে স্পর্শকাতর মানুষ চুপ করে থাকলেন না। বেদনার এমন অবদমন বেরিয়ে এল কবির উচ্চারণে। আমাদের সংবেদনশীল কবিবৃন্দের কণ্ঠে এই হাহাকার ধ্বনিত হয়ে উঠল। এমনই একজন কবি অকালপ্রয়াত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ অসহ্য হয়ে ওঠায় রুদ্র রোষে তিনি বলে উঠলেন, ‘স্বাধীনতা— এ কি তবে নষ্ট জন্ম? এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল! জাতির পতাকা আজ খামচে ধরছে পুরোনো শকুন। বাতাসে লাশের গন্ধ— নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান।’ বাতাসে লাশের গন্ধ এখনো মিলিয়ে তো যায়ইনি, প্রতিনিয়ত সে-গন্ধ বরং বাতাসকে কেবলই দূষিত করে চলছে। সেই গন্ধের হাত থেকে কি মুক্তি মিলবে না আমাদের। মিলবে অবশ্যই। তবে সে-মুক্তি আপনা আপনিই আমাদের হাতে এসে ধরা দেবে, আমাদের কিছুই করতে হবে না—এমন ভেবে আত্মপ্রসন্ন হয়ে বসে থাকলে সেটি হবে মূর্খের স্বর্গবাস। ও-রকম মেকি স্বর্গ থেকে মাটিতে নেমে আসতেই হবে। আত্মপ্রসাদের সামান্যতম অবকাশও নেই। জাতির পতাকাকে খামচে ধরেছে যারা সেই পুরোনো শকুনগুলোর নোংরা হাতগুলো ভেঙে না-দেওয়া অবধি আমাদের পরিত্রাণ নেই। শুধু পুরোনো শকুন নয়, ওদের নতুন চেলাগুলোকেও রেয়াত দেওয়া চলবে না। মিত্রের বেশ ধরে আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়া শত্রুদের যথাসময়ে চিনতে পারিনি বলেই অনেক অনেক বিপত্তি এতকাল ধরে পোহাতে হয়েছে। সমস্ত বিপত্তি থেকে পরিত্রাণ লাভের একমাত্র উপায়ই হলো মুক্তিসংগ্রামের মূল্যবোধের আলোতে পথচলা। আমাদের শত্রুদের লক্ষ্যই হলো সেই আলোটি নিভিয়ে ফেলা, অন্তত জনগণের দৃষ্টিসীমা থেকে আলোটিকে দূরে নিয়ে যাওয়া। সেই আলোক বর্তিকাটিকে আড়াল করে খোপ খোপ অন্ধকার ওরা এখানে-ওখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ-রকম অন্ধকারের মূল উপাদানই হলো ধর্মান্ধতা। স্পষ্ট করে বলি : ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতা। আমাদের মানুষের ধর্মপ্রাণতা হচ্ছে ‘ধর্ম’ শব্দটির মূল মর্মের ধারক, আর ধর্মান্ধতা ধর্মের মূল মর্মেরই সংহারক। ধর্মপ্রাণদের চিত্ত শুভবুদ্ধি ও মুক্তবুদ্ধিতে ভরপুর বলেই সাম্প্রদায়িকতা তাদের কাছে একান্তই ঘৃণ্য। মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালে এই ধর্মপ্রাণতা আমাদের ভেতর জাগিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ধর্মান্ধতা কখনো সখনো আমাদের বিভ্রান্ত করেছে। কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার যে শিক্ষা, ধর্মনিরপেক্ষতার যে শক্তি তা সবসময়ই জয়ী হয়েছে এবং ভবিষ্যতের যে জয়, তাও হবে ধর্মনিরপেক্ষতার হাত ধরেই। মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র এটাই।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>