Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,সরস্বতী আজো একটি ব্র্যান্ড

সরস্বতী আজো একটি ব্র্যান্ড  । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

Reading Time: 6 minutes

   

তিনি নদীই হোন বা অযোনিসম্ভূতা দেবী।  তিনি শুভ্রাই হোন বা কৃষ্ণা । আপাততঃ নদী বা দেবী দুটোই ভেবে নিয়ে আমরা সরস্বতীর পায়ে বছরের পর বছর চোখ বুঁজে ফুল ছুঁড়ে আসছি । নদীর পুজো করাই যায় কারণ নদী আমাদের জীবনে অপরিহার্য এক প্রাকৃতিক সম্পদ।  কিন্তু যদি ভেবে নিই তিনি আমাদের মধ্যে কোনো একজন সাহসী, পরাক্রমশালী আদর্শ মেয়ে তাহলে সমাজের স্তরে স্তরে এমন মেয়ের গল্পও কিন্তু আমাদের খুব চেনাজানা । নদীর জল বর্ণহীন। তাই আমার কাছে সরস্বতীও বর্ণহীনা। 

এমন  গল্প ভাবিয়ে তোলে আজো যেখানে সরস্বতী নামের মেয়েটি পুরুষের লালসার স্বীকার হয় একাধিকবার । সেই সমাজের  শক্তিমান পুরুষদের সম্ভোগ লালসার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে যায় মেয়েটির জীবন । তবুও সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে । অব্যাহত থাকে তার লড়াই। চলুন সেই  কিম্বদন্তীর কড়চা খুলি আধুনিক ভাবে। তবে পুরাণ বলছে মেয়েটির জর্জরিত, জীবন কিন্তু নদীর সঙ্গে সংপৃক্ত ছিল।

কোনও এক সময়

একদিন  ব্রহ্মার তলব তাঁর মেয়ে সরস্বতীকে । সে মেয়ে তখন নদী। উঠে এল পাতাল থেকে। বাপের চাহনী সুবিধের নয়, তা মেয়ে জানত। বাপ বলল,

-এবার তোমাকে আমার কাছে সর্বক্ষণ থাকতে হবে, এ আমার আদেশ । 

মেয়ে বলল, কারণ? বাপ বলল, আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা গায়ত্রী জপ করব।

মেয়ে বলল, সে আবার হয় না কী? তুমি না বাবা আমার ? ঐ পুজোর ছুতোয় আবার আমার গায়ে হাত দেবে? আমি পুরুষদের থেকে সর্বদা দূরে দূরে থাকতে পছন্দ করি। আমি তোমায় বিলক্ষণ চিনি।

– সব পুরুষ আর আমি বুঝি এক হলুম? ব্রহ্মা বলল

মেয়ে বলল, আমি কি আর জানিনা? তোমার চারটে মাথা, আটটা চোখ, সর্বদা ঘুরছে আমার পেছন পেছন।

– মনে রেখো তুমি আমার মেয়ে। বাবার চিৎকার আবারও

সরস্বতী গর্জে উঠে বলল, তো কী? তাহলে জেনে রাখো তোমার জন্যেই বিশেষতঃ আমি পাতালে থাকি। আড়ালে থাকি। পাছে… 

মেয়েটা তখন ছুটল মহাদেবের কাছে। 

-ঐ দ্যাখো, মহাদেব! বুড়োটা কি বলে! বলে কিনা আমাকে ভোগ করবে।

-হ্যাঁ, বলিস কী রে? ব্যাটা বুড়ো, বাপ্‌ হয়ে তোর দিকে নজর দেয়? মহাদেব বললেন। 

-জানো? ঐ যে তোমাদের স্বর্গের দালাল? কি যেন নাম? হ্যাঁ, মদনবাবুকেও বলছিল চুপি চুপি, আমি শুনেছি সে কথা….” মদন কিছু করো, এই সুন্দরী কন্যার প্রতি সম্ভোগ লালসা রূপায়িত হচ্ছেনা যে ” 

-বলিস কিরে? এত বড় আস্পর্ধা ব্রহ্মার! এই সেদিন করে সভায় সর্বসমক্ষে বড়মুখ করে ব্রহ্মা বলল, ” ঠিক যেমন গ্রিক দেবী কুমারী এথেনা পিতা জিউসের কপাল থেকে নির্গত হয়েছিলেন, আজ থেকে আমার মানস কন্যা এই মেয়েটির নাম দিলাম সরস্বতী ”  আর আজ সে তোকে কামনা করছে?  এড়িয়ে চল, পালিয়ে যা মা!

সরস্বতী বলল,

-কোথায় যাব? তাঁর দুষ্ট দৃষ্টি যে সর্বদা আমাকে চোখেচোখে রেখেছে। নিস্তার নেই আমার।

মহাদেব বললেন,

-তবে রে? দাঁড়া, ঐ কামদেব মদনকে আগে ভস্মীভূত করি! ব্যাটার দালালি করা বের করছি আগে।  ব্রহ্মা ভেবেছেটা কি তার পেশীর জোর আমার থেকেও বেশী? এবার দ্যাখ, কে বেশী শক্তিমান। কার কত বাহুবল?

সরস্বতী বলল, বাঁচালে মহাদেব! তুমি‌ই আমার সত্যিকারের পিতাশ্রী। 

আবার দিনকয়েক পর….

 

ব্রহ্মা গেলেন ক্ষেপে। সরস্বতীকে তেড়ে গিয়ে তার প্রতি খুব দুর্ব্যবহার করে বললেন, তবে রে? আমি তোর কে ভুলে যাসনি রে মেয়ে। আজ আমি ছাড়া কে চিনত তোকে? কোথায় ছিলি তুই? 

মহাদেব তখন শরবিদ্ধ করে ব্রহ্মাকে হত্যা করলেন। তখন ব্রহ্মার পত্নী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতীকে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের অনুরোধ, উপরোধে, দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ব্রহ্মার প্রাণ ফিরিয়ে দেন।

আবারো কোনও একদিন

বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির সময় অগ্নির করাল গ্রাসে সৃষ্টি প্রায় ধ্বংসের মুখে তখন সেই  বিপর্যয়কে রুখতে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন নদী সরস্বতীর কাছে…

– সুন্দরী, কি অপরূপ লাবণ্যময়ী তুমি! তোমার নরম চাহনী, তরঙ্গায়িত, সুললিত শরীর, একটু জল দেবে?  প্রচুর জল চাই, প্রাণ ভরে দিতে পারবে তোমার জল? 

সে মেয়ে ভাঙে তবু মচকায়না। পারলে চ্যালাকাঠ নিয়ে তাড়া করে ইন্দ্রকে। ইন্দ্রের  ছলকলা বুঝতে বাকী নেই বুদ্ধিমতী মেয়ের। স্বর্গে তার খুব নাম খারাপ। মেয়েছেলে দেখলেই সে ছোঁকছোঁক করে! মনে মনে ভাবল সরস্বতী।

– আমি কী বুঝিনা তোমার দুরভিসন্ধি? আসল কথা বলো! 

ইন্দ্র বলল,

– পালাবে আমার সঙ্গে?  সরস্বতীকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আগুন নেভাতে আদেশ দিল ।

ইন্দ্রের মতলব বুঝতে পেরে  সরস্বতী  তখন সমুদ্রের দিকে ধাবমান ।

সে বলল,

– বাপু তুমিও সুবিধের নও।  ব্রহ্মা স্বয়ং আদেশ দিলে তবেই সেই আগুন নেভাতে আমার গতিপথ ঘোরাব । কিন্তু তোমার সঙ্গে কিছুতেই  যাবনা।

অবশেষে ব্রহ্মার অনুরোধে সরস্বতী সম্মত হল । গঙ্গা, যমুনা, মনোরমা, গায়ত্রী ও সাবিত্রী এই পাঁচ নদী তার সঙ্গ নিতে চাইল কিন্তু সরস্বতী একাই গেল সেই অগ্নিনির্বাপণ কাজে । একা ক্রেডিট নেবেন তিনি। পিঠের শিরদাঁড়ার জোর আছে সে মেয়ের। নিজের ব্র্যান্ড তৈরী করতে হবে। আরো পাঁচজন সঙ্গে  থাকলে ব্র্যান্ড ডাইলুশ্যান! যাই বল সরস্বতী ব্র্যান্ড নিঃসন্দেহে জবরদোস্ত ।  

পথে ক্লান্ত হয়ে ঋষি উতঙ্কর আশ্রমে বিশ্রাম নিতে গেল সরস্বতী আর তখুনি মহাদেব বললেন   

– ও মেয়ে? এত ঘুরিসনা। অত ধকল কী মেয়েছেলের সহ্য হয়? আবার পথে বিপদ হতে পারে। যা সব বদমায়েশ লোকজন পথেঘাটে!অসভ্য পুরুষদের চোখে ঘুরছে সর্বক্ষণ।

নে, এবার আগুণ নিভিয়ে দে তোর জল দিয়ে। আমি তোর সুবিধের জন্য সমুদ্রাগ্নিকে একটি পাত্রে ভরে  নিয়ে এসেছি ।

সরস্বতী তখন উত্তরে ব‌ইতে শুরু করল। ভারতের উত্তরপশ্চিমে পুষ্করে গিয়ে তার দ্বিতীয় বিশ্রাম হল । যার জন্য পুষ্কর হ্রদ হল এখনো একটি তীর্থক্ষেত্র ।মহাদেব কে চিরটাকাল প্রণতি জানায় সে মেয়ে। আপনিই আমার যথার্থ পিতাশ্রী… এই বলে।

অন্য কোনদিন

আবারো স্বর্গে দুই দাপুটে ঋষি, বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠর কত অত্যাচার সহ্য করল এই মেয়ে। দুই ঋষির কী ছোঁকছোঁকানি এই সরস্বতীকে নিয়ে! দুজনেই চায় এই মেয়েকে ভোগ করতে। এ মেয়েকে না পেলে তাঁদের জীবন বৃথা। এদের ভোগলিপ্সার যেন বিরাম নেই। বহু নারীতে উপগত পুরুষ। মুনি সেজে বসে আছে ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে।

একবার ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীর তীরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন । কাছেই বিশ্বামিত্রের আশ্রম। বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রে আদায়-কাঁচকলায়। এদিকে দুজনারই প্রবল ইচ্ছে সরস্বতী কে পাবার । একই সঙ্গে দুজনেরই টার্গেট সরস্বতী।

বিশ্বামিত্র এসে সরস্বতীকে বললেন

– বশিষ্ঠকে নিয়ে প্রচন্ড বেগে  লন্ডভন্ড করে প্রবাহিত হও নয়ত খুব খারাপ হবে  , বলে দিলাম ।

সরস্বতী প্রথমে রাজী হননি । সে মনে মনে ভাবল,  নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে এ বুড়োর।

– আমি তো কারো ক্ষতি করিনা সাধু! তুমি কি চাও বল তো।

– আমি চাই ব্যাটা পাজি বশিষ্ঠ যেন আমার ত্রিসীমানায় না থাকে।

ও তাই বল! তাহলে কী আমায় তুমি রক্ষে করবে? কথা দাও। সরস্বতী বলে বিশ্বামিত্র কে।

আগে তো আমার কথা রাখো তারপর দেখি, বিশ্বামিত্র নরমে গরম।

অবশেষে বিশ্বামিত্রের অনুরোধ উপেক্ষা না করতে পেরে সরস্বতী তার দুকুল ছাপিয়ে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠকে নিয়ে বানভাসি হলেন । নদীর ঢেউয়ের সর্বোচ্চ শিখরে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠ । একবার উঠছেন আবার একবার নামছেন ঢেউয়ের দোলায় । বিশ্বামিত্র তো বেজায় খুশি । মনে মনে ভাবল, এদ্দিনে বশিষ্ঠ জলে ডুবে মারা যাবে আর তিনি  তখন সরস্বতীকে লাভ করবেন।  কিন্তু এই প্লাবনে বশিষ্ঠের কোনো হেলদোল নেই দেখে তাঁর একটু সন্দেহ হল । বিশ্বামিত্র বুঝলেন এই ফাঁকে বিশ্বামিত্রের হাত থেকে পালিয়ে সরস্বতী বশিষ্ঠকে নিশ্চয়ই রক্ষা করছে । অতএব সরস্বতীর এইরূপ ছলকলায় যারপরনেই অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন ও সরস্বতী অচিরেই রক্ত রূপী নদীতে পরিণত হল । মুনি ঋষিরা যখন সরস্বতীর তীরে স্নান করতে এলেন তখন বিশুদ্ধ জলের পরিবর্তে রক্ত দেখে খুব আশ্চর্য হলেন । সরস্বতী তাঁদের কাছে কেঁদেকেটে সব কথা খুলে বললেন ও বিশ্বামিত্রের এহেন দুরাভিসন্ধির কথাও জানালেন  । নিজের মুক্তি চাইলেন ও পুনরায় পূত:সলিলা সরস্বতী রূপে ফিরে চাইলেন নিজের জীবন । সে যাত্রায় সেই দয়ালু মুনিঋষিদের প্রার্থনায় শাপমুক্ত হলেন সরস্বতী এবং পুনরায় বিশুদ্ধ হল নদীর জল । এই কারণে সরস্বতীর অপর এক নাম “শোন-পুণ্যা” ।

এবার দেখি সরস্বতী নামে আমাদের মেয়েটি কি সুখী বিবাহিত জীবন পেয়েছিল নাকি সারা জীবন ধরে কদর্য এই পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি ঘৃণায়, লাঞ্ছনায় বিয়ের মত প্রহসনের দিকে পা বাড়ান নি ? না কী  আজকের দিনের মত বিবাহ-বিচ্ছিন্নাই থেকে গেলেন আজীবন?  না কী  একাধিক সপত্নীর সঙ্গে ঘর করার অসহ্য বেদনা বুকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে ? 

 নাহ, তিনি পালিয়ে যান নি। পরাজিত হন নি । তিনি দাপটের সঙ্গে লড়ে গেছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করে গেছেন পুরুষের কামনার স্বীকার হতে হতে । কিন্তু বেঁচে রয়েছেন আজো মানুষের মনে কারণ তিনি জয়ী । 

কালের কপোলতলে

বিষ্ণু ভাবছিলেন গঙ্গা, লক্ষ্মীর পর সরস্বতীর সঙ্গে যদি ঘর বাঁধা যায়। অমন সুন্দরী, বিদুষীকে ঘরণী করলে মন্দ হবেনা। সরস্বতী তা বুঝতে পেরেই সমূলে বিষ্ণুর সেই প্ল্যানে কুঠারাঘাত করলেন। পুরুষের প্রতি তদ্দিনে তার ঘৃণা জন্মেছে। বিয়ের ফাঁদে আর নয়।  

দুই স্ত্রী গঙ্গা আর লক্ষ্মীর মধ্যে বিষ্ণু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন । নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুঃখ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন । একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল ।  প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি ।  

গঙ্গার মুখোমুখি হলেন ।

– শোনো গঙ্গা এটা কিন্তু ঠিক হচ্চেনা। তোমার স্বামী কিন্তু লক্ষ্মীরও স্বামী। সেটা মনে আছে তো? লক্ষ্মী কেমন মনে মনে কষ্ট পায়, ডুকরে কাঁদে, তুমি দেখতে পাওনা?

লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন ।

সরস্বতী বললেন, যা বাবা, যার জন্যে চুরি করি, সেই বলে চোর?

সে নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছে বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিল ।

ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সঙ্গে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সঙ্গেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন। বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে সরস্বতী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।  

সে যুগে বিয়ের ফাঁদে আদৌ কি বাঁধা পড়তেন দেবদেবীরা ?  রক্তমাংসের সম্পর্কের মত দেবদেবীদেরও তো কৈশোরে বয়ঃসন্ধির সুবাদে দেহরসের ক্ষরণ ও সেই হেতু ছোঁকছোঁকানিও ছিল । ছিল ইভ-টিজিং ও মোলেষ্টশান । আর জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলি দেব-দৈত্যকুলে রেপিষ্টের সংখ্যাও নিদেন কম ছিলনা সেযুগে । তারা লিভটুগেদার বা “থাকাথাকি’তে বিশ্বাসী ছিলেন না বিয়ের মত লিগাল ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাসী ছিলেন সে তো পরের কথা সেক্স ও ভায়োলেন্স এর দাপট কিন্তু এ যুগের চেয়ে সেযুগে কিছু কম ছিলনা । সরস্বতী সাজগোজ , পোশাক-আষাকের মধ্য দিয়ে আর সর্বোপরি তাঁর গুণ, বুদ্ধি আর বিদুষী ব্যক্তিত্ত্বের দ্বারা পিতৃসম ব্রহ্মা থেকে শুরু করে প্রেমিক তুল্য নারায়ণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন । যাকে আমরা এখন শহুরে ভাষায় বলি “হেড টার্নার’ ।  হতেই পারে । সমাজে এমন মেয়ের কদর তো হবেই যিনি একাধারে রূপসী আবার বিদুষী । পুরাণে বলা হয় সরস্বতী ছিলেন অসম্ভব ঝগড়াটে আর মেজাজ ছিল দাপুটে । হতেই পারে । যিনি একহাতে বশিষ্ঠ থেকে বিশ্বামিত্র আর অন্যহাতে ব্রহ্মা থেকে বিষ্ণুকে নাচাতে পারেন তিনি তো অযোনিসম্ভবা, অসামান্যা । কিন্তু আজকের সমাজের চিত্রটাও ঠিক তেমনি আছে অনেক ক্ষেত্রে । 

এমন সরস্বতী যেন বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে নির্ভয়া, দামিনী বা আমানত হয়ে যাকে মনে রাখার জন্য বছরে একটি নির্দ্দিষ্ট দিন পালন করা হবে আর পূজা-পাঠ-অঞ্জলি-আরতি এ সব তো মনগড়া ! আসল তো সে মেয়ের ব্র্যান্ড যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়ে যাবে । সে তো আমাদেরই ঘরের চেনা একটা নির্ভীক মেয়ে অথবা শুধুই মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয়!

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>