| 15 এপ্রিল 2024
Categories
২৬ মার্চ

২৬ মার্চ সংখ্যা: এই ফটো অনুপমের মুখস্থ । মিলন কিবরিয়া

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

অনুপমদের বাসার সামনের রুমের দেয়ালে মাঝ বরাবর টাঙানো আছে ফটোটা, সাদা মাটা একটা সাদা-কালো ছবি। বেশি বড় নয়, এপাশে ওপাশে লম্বা চওড়ায় চার ইঞ্চি করে হবে। চারপাশে পাতলা কাঠের ফ্রেম আর স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে বাঁধানো। চারজন মানুষের একটা গ্রুপ ফটো; মা, বাবা, ভাইয়া আর অনুপম। একটা টুলে পাশাপাশি বসে আছে মা আর বাবা; ওরা দুই ভাই দুই পাশে দাঁড়িয়ে। মায়ের পাশে সটান দাঁড়িয়ে ভাইয়া আর বাবার পাশে একটু কোল ঘেষে অনুপম। বাবার পরণে স্যুট-টাই, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা; টাইটা একটু নিচের দিকে ভাঁজ হয়ে আছে। মায়ের পরণে শাড়ি, কপালে টিপ, ডান হাতে ঘড়ি আর বাম হাতে চুড়ি। ভাইয়া আর তার পরণে হাফ শার্ট আর হাফ প্যান্ট। ভাইয়ার পায়ের স্যান্ডেলের একটার ফিতা খোলা। টুলের একটা পায়া দেখা যায়, অন্য পায়াটা মায়ের শাড়ির পিছে ঢাকা পড়েছে। সবার পিছনে একটা আঁকা ছবি। সেই ছবিতে দূরে একটা পাহাড় থেকে ঝর্ণা নেমে আসছে, সেই ঝর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে একটা হরিণ মুখ নামিয়ে পানি খাচ্ছে। হরিণের গায়ে কালো ছিটে দাগ আর মাথায় আঁকাবাঁকা শিং।

ছবিটা অনুপমের মুখস্থ। আর হবেই বা না কেন! কত হাজার বার যে এই ছবিটা দেখেছে তার কোন গোনা গুনতি নেই। এমনিতে রুমে ঢুকলেই ছবিটা চোখে পড়ে, এ ছাড়াও কত কত দিন এই ছবির সামনে একা একাই দাঁড়িয়ে থেকেছে। দেখতে দেখতে পুরো ছবিটা একেবারে মুখস্থ হয়ে গেছে, খুটি-নাটি সব কিছু তার জানা। এতো মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করলে সে নির্ঘাত ক্লাসে ফার্স্ট হতো!

রুনু এই ছবিতে নেই। এই ছবি তোলার পাঁচ মাস পরে রুনুর জন্ম; একাত্তরের জানুয়ারিতে। মায়ের কাছ থেকে শুনে অনুপম হিসাব করে বের করেছে ছবিটা তোলা হয়েছে ঊনিশ শ’ সত্তর সনের আগস্ট মাসে। তখনো সে স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি; বাসায় বসে অ-আ-ক-খ আর শতকিয়া শিখছে। আর ভাইয়া বুকের কাছে বই-খাতা ধরে সেই বছর থেকেই স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, শার্টের বুক পকেট থেকে উঁকি দেয় পেন্সিল। এই রকম একটা আবছা মতো দৃশ্য অনুপমের চোখের উপর হালকা কুয়াশার মতো ভেসে ভেসে মিলিয়ে যায়। মা বলে, সেই দিনটা একটা উৎসবের মতো ছিল, ছবি তুলতে যাওয়ার দিনটা। সবাই সেজে গুজে ট্রাংকে তুলে রাখা জামা কাপড় পরে পাড়ার স্টুডিওতে গিয়েছিল। ফটোগ্রাফার তাদের সবার মুখে ফেস পাউডার বুলিয়ে দিয়েছিল, তাতে নাকি ফটোতে চেহারা উজ্জ্বল হয়। এই কথা মনে করে মা এখনো হাসে। গল্পটা শেষ করে মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অনুপম এই ঘটনার কিছুই মনে করতে পারে না। কিন্তু এতোবার শুনেছে যে মনে হয় সব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।    

একাত্তরের কথা অনুপমের মনে পড়ে আবার মনে পড়েও না। মনে পড়েবেই বা কি ভাবে? ভাইয়ার থেকে সে দেড় বছরের ছোট। তারপরও অনেক ঘটনা চোখের উপর ভাসে। বার বার শুনতে শুনতে আর বার বার ভাবতে ভাবতে এমনটি হয়েছে। অনুপমের তাই মনে হয়। আবার মনে হয় সব সত্যি সত্যি দেখতে পাচ্ছে, সিনেমার মতো।  

সব থেকে পুরানো যে ঘটনা মনে পড়ে অনুপমের সেটা খুব ভয়ের আর আতঙ্কের। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে বড় চকিটার নিচে তোষক পেতে সবাই শুয়ে আছে। কারো মুখে কোন কথা নেই, এমনকি রুনুও যে কিনা সারা রাত ট্যা ট্যা করে কাঁদে সেও চুপ। কেবল মাঝে মাঝে বাবা আর মা ফিসফিস করে কথা বলছে, কি বলেছিল তা আর অনুপমের মনে পড়ে না। শুধু তাদের বাসা নয়, চারদিক অন্ধকার। হঠাৎ হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে সব; বাবা-মা সহ সবাই, চকিটা এমনকি ঘরটাও। অনুপম অনেক বার চেষ্টা করেছে পুরো রাতের ঘটনাটা মনে করার। মনে করতে পারেনি। এখন অনুপম জানে সেই রাত ছিল একাত্তরের ২৫ মার্চের রাত। ভয়াল রাত্রি।

তারপর মনে পড়ে, বাবা অফিসে যাচ্ছে। বাবার মাথায় টুপি। এই সময়েই বাবা অফিসে যাওয়ার সময় টুপি পরা শুরু করে। এখন অনুপম জানে, এই টুপির নাম জিন্নাহ ক্যাপ। জান বাঁচানোর চেষ্টায় বাবা ওই ক্যাপ পরা শুরু করেছিল। টুপি পরা বাবাকে অন্য রকম লাগছিলো বলেই হয়তো মনে আছে। কেমন যেন বোকা বোকা। অফিসে যাওয়ার সময় দরজার কাছে এসে মা বাবাকে দাঁড় করিয়ে দোয়া-কালাম পড়ে বাবার বুকে তিনবার ফু দিত। তারপর তাকের উপর থেকে কাপড়ে মোড়ানো কোরান শরিফ এনে বাবার কপালে ছুঁইয়ে চুমু দিয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে রাখতো। এই সময় মা প্রায়ই কেঁদে ফেলতো, কোন শব্দ না করেই। শুধু চোখ থেকে দুই-তিন ফোঁটা পানি গাল বেয়ে নেমে আসতো। বাবা শেষ মুহূর্তে মায়ের ভাইয়া আর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করে বেরিয়ে যেত।

তারপর কখন তারা বাসা ছেড়েছে, কি ভাবে বাসা থেকে বের হয়েছে মনে পড়ে না। মা বলে, আর ঢাকায় থাকা সম্ভব ছিল না। সারাক্ষণ ভয় আর অনিশ্চয়তা, এ ভাবে কি বাঁচা যায়! বাবার অফিসের করিম সাহেবকে আর্মিরা একদিন এসে তুলে নিয়ে গেল আর ফিরে আসেনি। একে তুলে নিয়ে গেছে, ওকে মেরে ফেলেছে; এখানে গুলি করেছে, ওখানে আগুন দিয়েছে, অফিস থেকে ফিরে বাবার এই সব কথা। পাড়ায়ও খালি ভয় আর ফিস ফিস। আজ এই বাসায় তালা ঝুলছে তো কাল ওই বাসায়। সবাই এক এক করে যে যেদিকে পারছে চলে যাচ্ছে। মা এমনিতেই খুব ভীতু। আরো বেশি ভীত হয়ে পড়লো। এই যে এখন অনুপম ক্লাস থ্রিতে পড়ে তবু তাকে আগলে আগলে রাখে, বাবা অফিস থেকে ফিরতে দেরি করলে এখনো টেনশন করে।

আমি আর পারছিলাম না। মা বলে, সারা রাত ঘুম আসে না, বুকটা ঢিপ ঢিপ করে, তল পেটের ভিতরে সারাক্ষণ মোচড়াতে থাকে। তোর বাবা অফিস থেকে না ফেরা পর্যন্ত শান্তি পাই না। ভয়ের চোটে আমার আমাশা হয়ে গেল।

এরপর। বাবার অফিসে আবারো আর্মি এলো, তল্লাশি করলো সবাইকে আর কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। তখন মা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। বাবা মনে হয় অফিসে বসেই ঠিক করে ফেলেছিল, আর ঢাকায় থাকা নয়। পালাতে হবে। সেই রাতে মার এমনই টেনশন হলো যে কিছুই খেতে পারেনি, কেবল বমি করেছে বার বার।

পরদিন খুব ভোরে বেরিয়ে পড়লো সবাই, প্রথমে নানার বাড়ি যাবে। চেনা পথ না ধরে অজানা পথে পা বাড়াল। নদী পার হতে হবে, আগে শহর ছাড়তে হবে। তারপর পথ খুঁজে নেয়া যাবে। সেটাই অনুপমের প্রথম নৌকায় ওঠার স্মৃতি। হুড়মুড় করে উঠছে আর গাদাগাদি করে পার হচ্ছে। কত কত মানুষ!

তারপর হাঁটা আর হাঁটা। মা বলে, ওই সময়ে আমরা সারাটা পথ হেঁটেছি। জীবনে এতোটা পথ হাঁটিনি।

মা অবশ্যই ভুল বলে। অনুপমের ঠিক ঠিক মনে পড়ে পরে আরো দুইবার নদী পার হয়েছে। মাকে মনে করিয়ে দিলেও বলবে সারাটা পথ হেঁটেছি।

মায়ের কোলে রুনু আর কাঁধে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ। রুনুর দুধের কৌটা, গরম পানির ফ্লাস্ক, কাঁচের তৈরি ফিডার, অ্যালুমিনিয়ামের মগ আর চামচ – এই সব ছিল বাবার হাতের একটা ব্যাগে। ভাইয়ার হাতে একটা চটের ব্যাগ, তাতে অল্প কিছু জামা-কাপড় আর টুকি টাকি জিনিস। এতো মানুষ অনুপম এক সাথে আগে দেখেনি। নৌকা থেকে নেমে মনে হল, সামনের মানুষেরা যে দিকে যাচ্ছে সবাই সেই দিকেই যাচ্ছে। ওরাও পা মেলাল সবার সাথে।

হঠাৎ করেই শুরু হলো দৌড়।

দৌড়, দৌড় আর দৌড়। সে কি দৌড়! অনুপম গতবার যে স্কুলের একশ’ মিটার দৌড়ে সেকেন্ড হলো তখনো এতো জোরে দৌড়াতে পারেনি, পারলে ঠিকই ফার্স্ট হতো। তারপরও সে বাবার সাথে তাল মিলাতে পারছিল না। বাবা এক হাতে ব্যাগ আর অন্য হাতে অনুপমকে শক্ত করে ধরে ছিল। বাবার সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে তার পা মাটি থেকে উপরে উঠে যাচ্ছিল। পা মাটিতে নামার সময় মনে হচ্ছিল পড়ে যাবে। পড়েও গিয়েছিল একবার। পিছে পিছে রুনুকে কোলে নিয়ে মা, সবার সাথে  তাল রাখতে থেমে থেমে কোনমতে দৌড়াচ্ছিল। ভাইয়া সবাইকে পার হয়ে জোর কদমে সামনে এগিয়ে গেল। বাবা চিৎকার করে বলল, অপূর্ব, এক সাথে থাকো।

সামনে, পিছনে আরো কত মানুষ। কারো হাতে স্যুটকেস, কারো হাতে ট্রাংক, কারো কাঁধে ব্যাগ, কারো মাথায় বস্তা। সবাই দৌড়াচ্ছে।    

অনুপম চোখ বুঁজলে এখনো পষ্ট দেখতে পায়, সবাই দৌড়াচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই দৌড়টা শুরু হয়েছিল। পিছন থেকে এক দল মানুষ চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসছে দেখে সবাই দৌড়াতে শুরু করলো। মা বলে, ভয় পেলে কোন যুক্তি কাজ করে না। তখন সবার মৃত্যুর ভয়। পিছনে ধাওয়া করে আসছে মিলিটারি, সেই সাথে আসছে মৃত্যু। কথা বলার সময় নেই, দাঁড়ানোর উপায় নেই। বাঁচতে হলে পালাতে হবে, কোন ভাবেই ধরা পড়া চলবে না। একই কথা সবার মুখে মুখে, আর ভয় চেহারা জুড়ে।  

অনুপম কোন ভাবেই বাবার সাথে আর পারছিল না। বুঝতে পেরে বাবা দৌড় থামিয়ে হাতের ব্যাগটা মাটিতে রেখে ওকে দুই হাতে কোলে তুলে নিল। কয়েক পা এগিয়ে থেমে গেল, ফিরে এসে ফেলে যাওয়া ব্যাগ এক হাতে তুলে নিল। এক হাতে ব্যাগ, আর এক হাত দিয়ে অনুপম কোলে ধরা। অনুপম দুই হাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ছিল। অনুপম তো একটু বড় হয়েছে, রুনুর মতো ছোট নেই। বাবার কোল থেকে বার বার পিছলে যাচ্ছিল, একটু থেমে বাবা আবার ওকে কোলে টেনে তুলে দৌড় শুরু করছিল। মা আর রুনুর জন্যও মাঝে মাঝে থামতে হচ্ছিল। মা শুধুই পিছিয়ে পড়ছিল। কাছাকাছি এলে আবার বাবা দৌড় শুরু করত। এক সময় মা বলল, আমি আর পারছি না। বাবাও মনে হয় আর পারছিল না।

এবার আর দৌড় নয়, মাটির রাস্তা ছেড়ে আলপথ ধরে কাছাকাছি একটা ঝোপ দেখে সেই দিকে জোরে হাঁটা ধরল। সামনে কিছু দূর এগিয়ে গাছ-পালা ঘেরা, লতায়-পাতায় ঢাকা একটা ঝোপ মত জায়গা দেখে সবাই সেখানে ঢুকে পড়লো। সাথে সাথে মা চিৎকার করে উঠল, অপূর্ব কই? বলেই বাবার দিকে তাকাল। বাবা ভয় পাওয়া গলায় বলল, সামনেই তো ছিল। অনুপমের দিকে তাকিয়ে বলল, মায়ের খেয়াল রেখো। যেন অনুপম অনেক বড়। তারপর দৌড়ে ঝোপ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।

অনেকক্ষণ হয়ে গেল বাবার ফিরার নাম নেই। দূরে যে পথ তারা পার হয়ে এসেছে সেখানে কালো ধোঁয়া পাক খেয়ে খেয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। আশে পাশে আর কাউকে দেখে যাচ্ছে না। একটা ভয়াবহ নীরবতা! গাছের পাতাও মনে হয় নড়ছে না। অনুপম ঝোপের পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেল একটা ডোবা। এত বড় নদী নৌকায় পার হওয়ার সময় যে কথা তার মনে হয়নি সেই কথাটাই তার মনে পড়লো সাথে সাথে, সে তো সাঁতার জানে না।

তোর বাবা এখনো আসছে না কেন? মা বার দুই এই কথা অনুপম নাকি নিজেকে বলেছে বোঝা গেল না। আর ফিস ফিস করে সারাক্ষণ একই কথা আওড়াচ্ছে ‘আল্লাহ আল্লাহ, আমার ছেলে আমার ছেলে’।

হঠাৎ অনুপমই প্রথম দেখতে পেল, বাবা দৌড়ে ঝোপের দিকে আসছে। কোন কথা না বলে মাকে হাত দিয়ে ইশারা করে দেখাল বাবা আসছে। মা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। মা যা জানতে চায়, বাবা এসে সেই কথাই বলল, অপূর্ব আসেনি?

বাবার কথা শুনে মা তলপেট চেপে বসে পড়ল। বাবাও মায়ের সামনে বসে পড়ল, বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকল অনুপম। মায়ের হাত ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল বাবা, কারো মুখে কোন কথা নেই।

‘আবার দেখি’ বলে বাবা উঠে দাঁড়াতে যেতেই মা শক্ত করে বাবার হাত চেপে ধরল, মুখে কোন কথা নেই কেবল দুই চোখ বেয়ে টপ টপ করে পানি ঝরে পড়ছে। মা আর বাবাকে যেতে দিল না। মা বলে, আমি খুব ভীতু রে! খুব ভয় পেয়েছিলাম। তোর বাবাও যদি অপূর্বের মত হারিয়ে যায়, খুঁজে না পাই। যদি মিলিটারিরা মেরে ফেলে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমি খুব নিষ্ঠুর রে! স্বার্থপর! মায়ের চোখ দুইটা পানিতে টলমল করে উঠে, মা আঁচলে চোখ মোছে।

নানার বাড়িতে কি ভাবে পৌঁছেছিল সেটা অনুপমের মনে পড়ে না। তবে সেখানে সবাই ভয়ে ভয়ে থাকলেও অনেক মজা হয়েছিল। গাছে উঠা শিখতে গিয়ে পড়ে ব্যথা পেয়েছিল। কাছাকাছি বয়সের অনেকের সাথে মিলে অনেক হৈ হুল্লোড় করেছে। মাটির নিচ থেকে মিষ্টি আলু তুলেছে, নারার আগুনে পুড়িয়ে খেয়েছে। খড়ের গাঁদায় লুটোপুটি খেয়েছে। ছোট মামার সাথে পাশের খালে বড়শি বেয়েছে। কোন কারণ ছাড়াই লাফালাফি করেছে।

নানার বাড়ি রাস্তার ধারেই। প্রায় দিনই মানুষ ছোট বড় দলে এই রাস্তা পার হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেত। এই রকম যে কোন দল পার হওয়ার সময় মা সামনে গিয়ে দলের দিকে তাকিয়ে সবাইকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত। কখনো কখনো দলের সাথে এগিয়ে যেত, কখনো পিছনে গিয়ে আসতে থাকা দলের সাথে হেঁটে হেঁটে আসতো, কখনো দলের কাউকে ভাইয়ার নাম জানিয়ে, কখনো চেহারার বর্ণনা দিয়ে খোঁজ জানতে চাইত। মা বলে, সবাই নিজের জান বাঁচাতে ব্যস্ত। কে কার খবর রাখে! খুব খারাপ সময় ছিল।

বাবা প্রতিদিনই সকালে বের হয়ে যেত, কোন কোন দিন দুপুরে কোন কোন দিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত। বাবা ফিরে আসার আগ পর্যন্ত সবাই ঘুরে ফিরে একই কথা বলত, যে দিন বাবার একটু দেরি হতো সেই দিন বেশি বেশি বলত। ভাইয়াকে আজ মনে হয় সাথে নিয়েই ফিরবে। বাবা বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে সবাই বাবাকে ঘিরে দাঁড়াত। বাবা আজ কোথায় কোথায় খুঁজেছে, কত দূর দূর গিয়েছে, কি ভাবে খোঁজ করেছে তার বর্ণনা দিত। সবার সামনে থাকতো মা, আর মায়ের কোল ঘেঁষে অনুপম। বাবার কথাগুলোর কিছুই অনুপমের মনে পড়ে না, কিন্তু দৃশ্যটা চোখ বুঁজলে পষ্ট দেখতে পায়।

দেশ স্বাধীন হয়ে গেল, ভাইয়া আর ফিরল না, খুঁজেও পাওয়া গেল না। মা মনে করে ভাইয়া বেঁচে আছে, ফিরবে। মা বলে, অপূর্বর ঠিকানা মুখস্থ ছিল। স্কুলে ভর্তির সময় ভাইয়াকে বাবার নাম, মায়ের নাম, বাসার ঠিকানা, বাড়ির ঠিকানা মুখস্থ করানো হয়েছিল। এই ঠিকানা বললে কেউ না কেউ ভাইয়াকে ঠিকই বাসায় পৌঁছে দিবে। কোন না কোন ভাবে খোঁজ পাওয়া যাবে।

কিন্তু ভাইয়া আর আসে না। অনুপম স্কুলে যাওয়া শুরু করে, ওর বুক পকেট থেকে ভাইয়ার মতোই পেন্সিল উঁকি দেয়। মা তাকিয়ে দেখে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রুনু হামাগুড়ি ছেড়ে হাঁটতে শুরু করে। ফ্রক পরে তির তির করে হাঁটে। একটা গ্রুপ ফটো তোলার আলাপ হয়, সেই ফটোতে রুনু থাকবে। আজ পর্যন্ত রুনুর কোন ফটো তোলা হয়নি। ভাইয়া সেই ফটোতে থাকবে না। এই কথাটা মা বা বাবা কেউই মুখ ফুটে বলে না। যাব যাব করেও তাই যাওয়া হয় না।  

ফটোর ফ্রেমে ভাইয়া একই রকম থেকে যায়, একটুও বড় হয় না। এই ফটো অনুপমের মুখস্থ।  

             

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত