| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

আমার কবিতা ভাবনা

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

প্রতিটি কবির কবিতাভাবনা ভিন্ন হতে পারে। আবার মিলতেও পারে। মূলত এই ভাবনা কয়েকটি স্তম্ভের ওপরে স্থাপনা করলে ভালো হয়। যথা, ভাব, ছন্দ ও আঙ্গিক।

আঙ্গিক দিয়েই শুরু করা যাক। কবিতার আঙ্গিক আমার মতে বিস্তৃত হলেই ভাল। একটু বিশদে আসি। কবিতার প্রেক্ষাপট যদি বিস্তৃত হয় তবে তার  একটা সার্বজনীনতা থাকে। অন্যথায় একেবারে টপিকাল পোয়েম যদি হয় তবে তার আবেদন একটি কালেই সীমাবদ্ধ থাকে, যদি না সেই টপিকটি বিশ্ব ইতিহাসে স্থান পাবার মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়।

এখানে একটু বিশদে বলি, হয়ত বিতর্কিত হতে পারে আমার কথাটি।

ধরা যাক একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। কোন একটি নৃশংস ধর্ষণ বা হত্যা। কাঁটাতারে ঝুলন্ত বালিকা ফেলানি খাতুন বা দিল্লির নির্ভয়াকাণ্ডের মতো কোন বীভৎস অমানবিক ঘটনা। সারাদেশ তোলপাড়। সে সময়ে জনসাধারণের মনোভাব অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই ধর্ষণকারীর তথা হত্যাকারীর বিরোধী। এই সময়ে যথেষ্ট সহানুভূতি উদ্রেককারী সুচারু বাক্য বিন্যাস সম্বলিত একটি কবিতা লেখা হলে তা লোকের মুখে মুখে ফিরতে পারে। কিন্তু সে কবিতা দুশো বছর বাদে আর লোককে টানবে না। কারণ ততদিনে প্রেক্ষাপট পালটে গেছে। হয়ত একটু ভিন্ন আরেকটি চরম ঘটনা ঘটে গেছে এবং সেই ঘটনা নিয়ে অন্য কোন কবি বা একাধিক কবি তাঁদের যন্ত্রণাকে কাব্যবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।

কিন্তু একই কথা আপনি জন কিটসের ওড টু এ নাইটিংগেল সম্পর্কে বলতে পারবেন না। কেননা কবিতাটি অবশ্যই এমন এক নৈর্ব্যক্তিক কবিতা যার প্রেক্ষাপট কোন ইতিহাস বিবৃত করে না। তবে এর মানে এই কখনই নয় যে ইতিহাস নিয়ে লেখা সব কবিতাই কেবল সাময়িক আবেদন রাখে। উপস্থাপনার গুণে একটি এককালীন ঘটনাও সার্বজনীন হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের পূজারিণী কবিতাটাই ধরা যাক। এখানে একটি ধর্ম ও শাসন ব্যবস্থার যৌথ অচলায়তনের বিরুদ্ধে একক অহিংস প্রতিবাদ বিবৃত আছে।

এমন সময়ে হেরিল চমকি/ প্রাসাদে প্রহরী যত —/ রাজার বিজন কানন মাঝারে/ স্তূপপদমূলে গহন আঁধারে/ জ্বলিতেছে কেন যেন সারে সারে/ প্রদীপমালার মতো !

মুক্তকৃপাণে পুররক্ষক/ তখনি ছুটিয়া আসি/ শুধালো , ‘ কে তুই ওরে দুর্মতি ,/ মরিবার তরে করিস আরতি !

মধুর কণ্ঠে শুনিল , ‘ শ্রীমতী ,/ আমি বুদ্ধের দাসী ।

সেদিন শুভ্র পাষাণফলকে/ পড়িল রক্তলিখা ।/ সেদিন শারদ স্বচ্ছ নিশীথে/ প্রাসাদকাননে নীরবে নিভৃতে/ স্তূপপদমূলে নিবিল চকিতে/ শেষ আরতির শিখা !

এই উদাহরণ থেকেই দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি- ভাব। আঙ্গিককে বিস্তৃত করতে ভাবের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকেই যায়।

কবিতা আমার এক ব্যক্তিগত পরিক্রমা। বলা যেতে পারে এক নিজস্ব সফর। এই পরিক্রমার পথে আমার কাছে প্রাধান্য পায় কবিতার ভাব। এই ভাব বলতে আমি একটি দর্শন বুঝি। কেবল বর্ণনামূলক কবিতা, আমার প্রিয় বস্তু নয়। ছোটগল্প আর কবিতার মধ্যে তফাৎ তাহলে কী? যাই হোক, আমাদের ভাবনাগুলো সবই কতগুলো ভাবের বিস্তার। জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে এই ভাবগুলো আমাদের কষ্ট দেয়, আনন্দ দেয়, বিব্রত করে, সুখী করে। ভাবের অনুষঙ্গে আবর্তিত হয় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। এসমস্তই ঘটতে থাকে আমাদের চিন্তা পদ্ধতির মধ্যে। আমরা মেলাতে থাকি পুষ্পের সঙ্গে প্রেম অথবা নারীকে। হত্যার সঙ্গে রক্তকে, রক্তের সঙ্গে পলাশকে। এই মেলানোর কাজে সহায়তা করে কবির শব্দভাণ্ডার। যত শব্দ জমা হয় এক কবির তূণীরে সে কবির ততই শক্তিশালী হবার কথা।

কিন্তু সেকথাও সর্বৈব সত্য নয়। শব্দ তূণীরে থাকলেই চলবে না। শস্ত্রাগারে অস্ত্র থাকলেই চলবে না। তার প্রয়োগ জানা চাই। এই প্রয়োগটা দুই পর্যায়ে হতে পারে। এক অন্য কবিদের উদাহরণগুলি দেখে দেখে তার থেকে শিক্ষালাভ করে। দুই, পরবর্তী পর্যায়ে এটা হতে পারে সম্পূর্ণ নিজস্ব ঢঙে অনায়াস সহজাত দক্ষতায়।

এই দ্বিতীয় প্রয়োগের কুশলতাই একজন বড় কবিকে সহস্র সাধারণ কবির ভিড় থেকে আলাদা করতে পারে। অর্থাৎ আমার মতে অবশ্যই সাধনায় কাব্যলক্ষ্মী ধরা দিতে পারেন, কিন্তু সে লক্ষ্মীর প্রকৃত সাধক কিন্তু তার সাধনা পদ্ধতি নিজে আবিষ্কার করেন অত্যন্ত অনায়াসে। এই কাজটি সফলভাবে করতে গেলে তাই একজন কবিকে অন্যান্য পূর্বসূরি ও সমসাময়িকদের কাজ প্রচুর অধ্যয়ন করতে হয়। এই অধ্যয়ন সজ্ঞানে করতে হবে। এ কারণেই করতে হবে যাতে কবি তার নিজের লেখায় অন্যদের অনুকরণ না করেন। আমি জীবনানন্দ অত্যন্ত যত্নসহকারে পড়ব যাতে আমার লেখায় তাঁর প্রভাব সযত্নে এড়াতে পারি। এই কাজটি যে কবি যত নিষ্ঠার সঙ্গে করতে পারবেন, তিনি ততই স্বকীয় হবেন এবং তার লেখায় নিজস্ব স্বাক্ষর রাখতে পারবেন। সত্যি বলতে কি, যদি কবির লেখা পড়ে তাঁকে আলাদা করে চেনা না যায়, তবে তার কবিতা লেখার তেমন সার্থকতা থাকে কই?

ভাব আর শব্দ একে অন্যকে সাজায় প্রভাবিত করে। সঠিক শব্দ প্রয়োগ কবিতার ভাবকে যে উত্তরণে নিয়ে যায় তা শব্দদুর্বল লেখায় ভাবা যাবে না। কবিতার ভাবকে যেমন শব্দ ধারণ করে ঠিক তেমনি, সঠিক শব্দ ভাবকে দিগন্ত বিস্তৃত করতে পারে।

এই কাজে যে কেবল কঠিন শব্দ প্রয়োগটাই উৎকর্ষ আনতে পারে এমন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হওয়া কখনই উচিৎ নয়। বরঞ্চ বোধগম্যতা এক বিচার্য বিষয় হওয়া প্রয়োজন। যদি অধিক কঠিন শব্দ বা বাক্য-বিন্যাসে ব্যাকরণ অমান্য করে কিছু লাগসই তাক লাগানো শব্দ ব্যবহার করা হয়, তবে তা ক্ষণিক সাফল্য আনতে পারে অবশ্যই, কিন্তু সে আগ্রহী পাঠককে বা কবিতার শিক্ষানবিসকে কবিতাবিমুখ করে ফেলতে পারে। আমার কাছে সেরা কবিতা সেটাই যা বোধগম্য শব্দ বা শব্দবন্ধের সাহায্যে এক অনির্বচনীয় জগতে পাঠককে স্থানান্তরিত করে। পাঠকের কাছে দেয়াল ভেঙ্গে যায়, প্রান্তর উন্মোচিত হয়এক বিশ্বপ্রকৃতি, এক সার্বজনীনতা পাঠককে গ্রাস করে।

এই কথাগুলো প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতার উদ্ধৃতি দিতে পারি। / আমার ভেতরে- যেসব আপত্তি ছিল- সব মেরে ফেলতে পারিনি… কী হবে? জানি তো- ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাওয়াই নিয়তি!- তবু এই মানুষেরও জীবনকে বলবার আছে- ‘নিশ্চিহ্ন হয়েছি, ঠিক…কিন্তু আমি হারিনি…হারিনি…’ এই বক্তব্যে কোন জটিলতা নেই- অহেতুক শব্দ নিক্ষেপ নেই অথচ প্রবল গভীরতা আছে, আছে এক জীবন দর্শন। এই ধরণের কিছু উচ্চারণ আলাদা করে কবির জাত চিনিয়ে দেয়।

ভাব আর শব্দের মেলবন্ধন করায় ছন্দ। ছন্দর মধ্যে, একটি দুলকি চাল থাকে, শেষ থেকে শুরুতে ফিরে আসার একটা ঈঙ্গিত থাকে। ছন্দ আসলে একটা পুনরাবৃত্তিমূলক মোড়ক। একটি সুদৃশ্য ধাকনা দেয়া বাক্স, যার ভেতরে থাকে কবিতা নামক উপহারটি। কবি কোন ছন্দে লিখবেন সেটা তাঁর নিজস্ব বিষয়, কিন্তু ছন্দ আর বিষয়বস্তুর মধ্যে সাযুজ্য থাকা আবশ্যক। এটা বলে বোঝানো যাবে না। ছন্দ আসলে পুনরাবৃত্তি এবং শ্রবণের সমাহার। ছন্দজ্ঞান জরুরি, কিন্তু তা স্বতস্ফূর্ত হওয়া আবশ্যক। জোর করে ছন্দ মেলাতে গেলে, বক্তব্য থেকে বিচ্যুত হবার সম্ভাবনা প্রবল। সবাই রবীন্দ্রনাথ নন, যার ভাব আর ছন্দ হাত ধরাধরি করে চলে। কিন্তু অনুশীলনে অনেকটাই সম্ভব। প্রাথমিক ভাবে অক্ষরবৃত্ত অবলম্বনে কবিতা লেখাটা তুলনামূলকভাবে সহজ। অক্ষরবৃত্তের ওপর দখল তৈরি হলে অন্য ছন্দের কথা ভাবা যেতে পারে বা কোন ছন্দের কথা না ভেবেও লেখা যেতে পারে। কবিতা তখন নিজেই তার ছন্দকে খুঁজে নেবে।

 

এই কথাগুলো বলাটা যত সহজ মনে হয় প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা ততই কঠিন। যে কোন প্রভাব এড়িয়ে নিজের শৈলী প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে এক সচেতন সাধনা প্রয়োজন। প্রথম দিকে কবিকে ভাবতে হবে তার শব্দ ছন্দ ভাব বিষয়বস্তু সমস্ত কিছু নিয়ে। কখনই অন্য কবির কবিতার বই সামানে খুলে রেখে তাকে পরিবর্তিত করে নিজের কবিতা সৃষ্টি করা চলবে না। যা কিছু অধ্যয়ন করতে হবে সে সমস্তই অধ্যয়নের জন্য। তারপরে সমস্ত ভুলে যেতে হবে। এক ধ্যানী সন্ন্যাসীর মতই নিজের মনটা ফাঁকা করে নিয়ে নিজের সাধনা করতে হবে নিজের লেখা লিখতে হবে। দিনের পর দিন এই চেষ্টা চালালে ফল ফলতে বাধ্য। স্বশিক্ষিত হবার কোন বিকল্প হয় না। প্রথমদিকের এই চেষ্টা পরবর্তী কালে এক অনায়াস গতি পাবে। কবি নিজেই বুঝতে পারবেন যে এক ধ্রুপদী গায়কের মত তার কানে সমস্ত সপ্তক খেলা করছে, এবং তার আঙ্গুলে কলমে স্বয়ং ঈশ্বর ভর করেছেন। এই অনুভূতিটা যেই মুহূর্তে সৃষ্টি হবে সেই মুহূর্তেই একজন সাধারণ কাব্য যশোপ্রার্থী সার্থক কবিতে পরিণত হবেন। কসরত করে নকল করে অনেকটা এগোন যায় কিন্তু সেটা এক অন্তর্বর্তী পর্যায় মাত্র এবং কখনই তা শেষ কথা নয়।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত