আবহ , আবাহন—হে জীবন

                     

                   মূল অসমীয়াঃ গীতালি বরা
বাংলা ভাষান্তরঃ নন্দিতা ভট্টাচার্য

 


১৯৭৭ সালে শোনিতপুর জেলার দক্ষিণ কলাবরীতে জন্ম। গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি ও অসমীয়া বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন । ‘ সাদিনের’ পাতায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় । গীতালি বরা সম্প্রতি অসম প্রকাশন পরিষদ থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা ‘প্রকাশের’ সহযোগী সম্পাদক।প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘সম্ভবত(২০০৬) , এবং অর্গল খোলা প্রিয়ম্বদা(২০০৮),এপল এপল(২০১০),এবং নিরবধি নিরঞ্জনা (২০১৩)। গীতালি ‘সম্ববত’ বইটির জন্য ২০০৮ সনে যুবা পুরস্কার, অতি সন্মানিত মুনিন বরকটকি পুরস্কার লাভ করেছেন।
‘বুদ্ধজায়া’ তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশিত উপন্যাস।


 

Death twitches my ear
‘Live’ , he says…

‘I’m coming .( Virgil)

 

শেষবারের মত যখন যমুনা ওর মৃত সন্তানটিকে স্পর্শ করেছিল , ও কিছু বুঝতে পারছিল না , ওর কোন বোধ কাজ করছিল না – নিজের রক্তমাংসে গড়া এক ক্ষুদ্র শরীরকে স্পর্শ করার আনন্দ না সেই শরীর প্রাণহীন হওয়ার বিষাদ ! পরে যখন ও সেই মুহূর্তের কথা ভাবছিল , ওর মনে পড়ছিল মুংখের সেই বিখ্যাত পেইন্টিংয়ের কথা — যেখানে আকাশ পৃথিবীর সমস্ত রঙ শুষে নিয়ে প্রগাঢ় , প্রকট হয়ে উঠেছে একটি চিৎকার।

যমুনা নিজেকে মৃত বলে ভাবতে শুরু করেছে । একটি রক্তমাংসের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া জীবন্ত শিশুকে রূপ দিতে অক্ষম শরীরটাকে ও ঘেন্না করতে শুরু করল।
বোধ-অবোধের সীমারেখা কোথাও হারিয়ে যাওয়ার পর একটি অসাড় বিচ্ছিন্নতা ওকে পেয়ে বসছিল । ও ধরেই নিয়েছিল ওর প্রিয় পাহাড়ের কাছে ও আর কখনও দাঁড়াতে পারবে না ।নদীর সেই উলঙ্গ খাঁজে ও পা রাখবে না জলস্রোত যাকে ফেলে রেখে অন্য পথে তার শরীর মেলেছে । কি জানি কি জানি –কোনও বীজ অঙ্কুরিত না হওয়া অরণ্যকে ও ভালবাসবে , যেখানে ফলফুলহীন বৃদ্ধ বৃক্ষরা মৃত্যুর ক্ষণ গুনছে।

যমুনা বাসন্তীকেও ভালবাসতে পারছিল না । কারণ রোগা–ডিগডিগে কালকুলো , লোকের বাড়ী বাড়ী কাজ করা মানুষটি সারাদিন শুধু খিক খিক করে হাসে। মাত্র পনেরদিন হল বাসন্তী যমুনাদের বাড়ীতে কাজে লেগেছে – সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যাবেলা ফিরে যায়। এই পনেরদিনেই বাসন্তী যমুনার ঘরটা ধুলোবালি–মাকড়সার জাল পরিষ্কার করে ঝকঝকে করে তুলেছে। পর্দা বিছানার চাদর থেকে বহুদিন পর নতুন করে ধোয়া কাপড়ের ফুরফুরে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।

যমুনা কি জানি ভেবে নিয়েছিল ; বিশৃঙ্খল ঘরের ধুলো ও মাকড়সার জাল ওর বেদনা ও অক্ষমতার সঙ্গী—এভাবেই একটা দগদগে ঘা-কে জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে এবং প্রথম ও শেষবারের মত নিজের সন্তানকে স্পর্শ করার ভয়ংকর অব্যক্ত মুহূর্তকে। সেই স্মৃতির ভার বয়ে বয়ে ও নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিল।

বাসন্তী একদিন যমুনার ঘরের গাঢ় নীল পর্দাগুলো সরিয়ে দিল। রোদের টুকরো জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে এসে ফুটফুটে প্রজাপতির মত যমুনার গালে মুখে পড়ল । যমুনা তখনও পর্যন্ত অন্য সমস্ত সুন্দর জিনিস সহ ফুল ও প্রজাপতিকেও ঘেন্না করতে শুরু করেছে। ও বাসন্তীর গালে ঠাস্‌ করে একটি চড় বসিয়ে দিল।

                                * 

ঘরের কাজকর্ম সেরে ছোট শহরের প্রধান রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তা ধরে হনহন করে যাচ্ছিল মানুষটা ।কাচা রাস্তার বাঁকে একটি টিলা ওপরের দিকে উঠে গেছে সেখানেই উঁচু উঁচু সেগুণ গাছের সারি । বাঁদিকে আদিগন্ত একটি মাঠ। জায়গাটা নির্জন। এখানে এসে মানুষটার তালগোল পাকিয়ে যায়।দূরের গ্রাম থেকে কাশি ঘণ্টার শব্দও ভেসে আসছিল। ঝি ঝি পোকা ও উচ্চিংড়ের ডাক অলৌকিক স্বরের মত শূন্যে ভেসে রয়েছে। জোনাকি পোকার ঝাঁক ঘিরে ধরেছিল মানুষটাকে । ও মাঠে  নেমে গেল এবং এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। একটু দূরে মাঠের মাঝে একটি টিলা । টিলার ওপরে একটি কুল গাছ জ্যোৎস্না-আলো মেখে রয়েছে—তলায় একটা ছোট ঢিপি ।

মানুষটা ঢিপির কাছে হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল। ঢিপিটার ওপরে কয়েকটা গাছপালা গজিয়ে উঠেছে—একটা অচেনা লতা কোলঘেঁষা বাচ্চার মত ঢিপিটাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। মানুষটা আক্রোশে গাছগুলোকে উপড়ে ফেলল । ছিঁড়েখুঁড়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলেছিল অচেনা ঝোপঝাড়গুলোকে । গভীর মমতায় এবার ঢিবিটার গাঁয়ে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল—আমি এসছি সোনা ভয় পাস না । শুয়ে থাক । একটু আগে আকাশে ফুটে ওঠা তারাগুলো একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল –

অনেকক্ষণ পর একজন বয়স্ক মানুষ অগোছাল পায়ে নিচু রাস্তা থেকে হেঁটে টিলায় উঠে এল এবং ঢিবির পাশে বসে থাকা মানুষটার মাথায় হাত রেখে বলল—চল বাসন্তী – বাড়ী চল । অনেক রাত হল।‘

বৃদ্ধ শ্বশুরের পাশে পাশে টিলা থেকে বাসন্তী নিচু রাস্তায় নেমে এল । সেখান থেকে পাহাড়ি রাস্তার পথ ধরল।

হ্যা। এখন বাড়ী গিয়ে ওকে মাতাল ,উপার্জন অক্ষম স্বামী ও বৃদ্ধ শ্বশুরের জন্য খাবারের যোগান দিতে হবে।
এই দু’জন মানুষের ও’ই তো ভরসা ।

                             **

সেদিন রাতে যমুনাকে ওর স্বামী বলল বাসন্তীর ন’মাসের ছেলেটা মারা যাওয়ার পাঁচমাসও পুরো হয়নি—যমুনা মৃত সন্তান প্রসব করার পরই তো বাসন্তীর কোল খালি হয়েছে। বাসন্তী দুদিন কাজে আসেনি । ওর স্বামী খবর নিয়ে এল , বাসন্তীর জ্বর । কদিন পর কাজে আসবে।
                            ***

সকালেঘুম থেকে উঠেই যমুনা বিড়বিড় করতে লাগল –‘আজ বাসন্তী আসবে, আজ বাসন্তী আসবে—ও ঘরের সব পর্দাগুলো সরিয়ে দিল।

অনেকদিন পর ও জানালার বাইরে তাকাল –আকাশ মেঘাছন্ন । রোদ নেই। প্রথম শরতের পাতলা কুয়াশায় মাখা একঝাক ঠাণ্ডা বাতাস হুড়হুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল ।

‘ কোনও কথা নেই ।‘ যমুনা নিজেই নিজেকে বলল—‘মেঘ সরবেই, রোদ উঠবে । শেষবেলায় – কাল –পরশু – অথবা তারপর কোনও একদিন।‘

                                          

                                                     

  

 

                                  

                               

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত