আশাপূর্ণা দেবী চির বিদ্রোহিনী

আজ কথাসাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর প্রয়াণ দিবস। ইরাবতী পরিবার জানায় বিনম্র শ্রদ্ধা।


 

ছোটবেলায় দু বোনে মিলে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। উত্তর একটা চাই-ই। রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে লিখে দিলেন ”আশাপূর্ণা-সম্পূর্ণা’। সেই চিঠি মাকে দেখাতেই মা বললেন ‘ তোরা পারলি, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।’আশাপূর্ণা দেবী আমৃত্যু দুর্মূল্য স্বপ্নকে মুল্যবান বাস্তবে পরিণত করে গেছেন। ছোটবোন না পারলেও আশাপূর্ণা পেরেছিলেন সাহিত্য জীবনে সম্পূর্ণা হতে। পেরেছিলেন ‘সাহিত্যের আঙিনায় অজস্র ফুল ফোটাতে। পেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখিকার আসন।

আশাপূর্ণা রচনাবলী ১০ খন্ড। উপন্যাসের সংখ্য ২০০, গল্প সংকলন গ্রন্থ প্রায় ৯০। ছোটগল্প প্রায় ৪০০০(?) শিশুকিশোর গ্রন্থ ৮০ ঘর ছুঁয়েছে। এ ছাড়া আছে প্রবন্ধ, রম্যরচনা, স্মুতিচরণা। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুদিত তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৬২। তাঁর গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে ২২ টি। বাংলা ছাড়াও হয়েছে হিন্দি,তামিল,তেলেগু ওড়িয়া এবং অসমিয়াতে । রঙ্গমঞ্চে অভিনীত কাহিনী ৭। এই সুবিশাল বইয়ের সংখ্যা দেখে আমাদের বিস্মিত হতে হয়। একজন গৃহবধূর পক্ষে ঘনিষ্ঠভাবে সংসারে জড়িয়ে থেকেও এত বিচিত্র দূরগামী অন্তর্ভেদী পর্যবেক্ষণ এবং বিপুল সৃষ্টিশীলতা কিভাবে সম্ভবপর হল? কেন কবি যে বলেছেন -” যে পারে সে আপনি পারে…”

ভাবতে অবাক লাগে যে মানুষটি তাঁর জাদু কলমে একই মানের লেখা দিয়ে এত বছর ধরে বাঙালীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন, তিনি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তো দুরের কথা একটি দিনের জন্যও কোন ইস্কুলে পড়েন নি। তিনি কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হননি। না হলেও বাংলা সাহিত্যের যে খুব একটা কিছু ক্ষতি হয়েছে এমন মনে করার কারণ নেই। পড়েছেন তিনি জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কৌতূহলী চোখ মেলে দেখেছেন। কান পেতে শুনেছেন। উপাদান সংগ্রহ করেছেন। মনে মনে ভেবেছেন। আর সেইসব ভাবনাগুলোর রূপ দিয়েছেন তাঁর গল্প -উপন্যাসে। আর সেইসব গল্প উপন্যাস সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারটিকে।

১৯০৯-এর ৮ই জানুয়ারী সেকেলে রক্ষণশীল বিশাল যৌথ পরিবারে জন্ম আশাপূর্ণার । মা সরলাসুন্দরী গৃহবধূ। পিতা হরনাথ একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। ঠাকুমার প্রবল প্রতাপে বাড়ীতে স্ত্রী শিক্ষার প্রচলন ছিল না। মা লেখাপড়া জানতেন কিন্তু শাশুড়ীর ভয়ে তটস্থ থাকতেন। লুকিয়ে চুরিয়ে বই পড়তেন। আশাপূর্ণার অক্ষর পরিচয়ও লুকোচুরি করেই হয়েছিল । পাঁচ বছর বয়সে মায়ের কল্যাণে পত্র-পত্রিকা পড়া শুরু। ১৩ বছর বয়সে ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায় প্রথম কবিতা প্রকাশ। ১৫ বছর বয়সে ‘খোকাখুকু’পত্রিকায় কবিতা লিখে পুরস্কার লাভ।

আবার ঐ ১৫ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে গেল আশাপূর্ণার। পাত্র কৃষ্ণনগরের কালিদাস গুপ্ত। ব্যাঙ্কের কর্মচারী। শ্বশুরবাড়ীও একান্নবর্তী পরিবার। বাড়ীর বয়স দু’শো বছর। সাতপুরুষের বাস। বৌ লেখিকা জেনেই বিয়ে হয়েছিল। সুতরাং বউ এর লেখালেখি নিয়ে খুব একটা ঝামেলা হয়নি। তাছাড়া স্বামী কালিদাস গুপ্ত ছিলেন খুবই সহৃদয় ও সহানুভূতিশীল মানুষ। শাশুড়ি যদিও দৃঢ় ব্যক্ত্বিত্বসম্পন্না মহিলা ছিলেন কিন্তু বৌমা সংসারের সব কাজ সেরে যদি নিজের জন্য সময় ব্যয় করে তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না। এইজন্য রাতের বেলাটিই ছিল আশাপূর্ণার লেখার সময়। তাঁর ‘নিজস্ব সময়’। তিনি ছিলেন আদর্শ পত্নী ও আদর্শ গৃহিণী। এইজন্য তাঁর সংসার -ধর্মে ও সাহিত্য-কর্মে কোন বিরোধ ঘটেনি।

আঠারো বছর বয়সে আশাপূর্ণা শ্বশুরবাড়ীর নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে কলকাতার ভবানীপুরে চলে আসেন। প্রথমে শিশু কিশোরদের জন্য, পরে বড়দের জন্য গল্প লিখতেন। ছোটগল্পই ছিল তাঁর ‘প্রথম প্রেম’। তার পর যখন একটু বয়স বাড়ল, অভিজ্ঞতার সঞ্চয় যখন চার দেওয়ালের সীমিত পরিসরকে উন্মুক্ত করে দিল তখন তিনি অবগাহন করলেন উপন্যাসের গভীর সমুদ্রে। আশাপূর্ণার প্রত্যেকটি রচনাই জনপ্রিয় হয়েছিল। তাই সম্পাদকে/ প্রকাশকেরা অবিরাম তাঁর কাছে লেখা চেয়ে গেছেন – তাঁকে থামতে দেননি।

ব্যতিক্রমী কলম আশাপূর্ণার। তাঁর গল্পের মেয়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিবাদী। বিশেষত সমাজে এবং পরিবারে নারীর পরিস্থিতি পুরুষের তুলনায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাঁর কথায়-” পারিবারিক জীবনে ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে মূল্যবোধের বড় বেশি তফাৎ মেয়েরা যেন কিছুই নয়, আর ছেলেরাই পরম মানিক, এইরকম ব্যাপার। এটা আমাকে খুব বিদ্ধ করত কিন্তু আমাদের আমলে তো এমন সাহস ছিল না প্রতিবাদ করব। তাই মনের মধ্যে রাগ-দুঃখ-জ্বালাটা জমত। সেই নিরুচ্চার প্রতিবাদগুলোই এক একটি প্রতিবাদের প্রতিমূর্তি হয়ে দেখা দিয়েছে কাহিনীর নায়িকারূপে।” নীরবে লোকচক্ষুর অগোচরে মানুষ কী দুঃসহ দুঃখ ভোগ করে, ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবন কিভাবে তিলে তিলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় – বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজের মেয়েদের জীবন- চিত্র নিপুণভাবে তিনি এঁকেছেন। মেয়েদের দুর্বিসহ দুঃখ কষ্টের কথা এমন করে আর কেউ বলেন নি।

‘প্রথম প্রতিশ্রুতি,’ ‘সুবর্ণলতা’ও ‘বকুলকথা’ আশাপূর্ণাদেবীর সুবৃহৎ’ ত্রয়ী’ উপন্যাস -বাংলা সাহিত্যে যার জুড়ি নেই বললেই চলে। বিরাট ক্যানভাসে তিন জেনারেশন -মা, মেয়ে ও নাতনীকে ঘিরে এই কাহিনীর বিস্তার। মা সতীবতী নিজে সুশিক্ষিতা। তেজস্বনী মহিলা। সাধ ছিল কন্যা সুবর্ণলতাকে শিক্ষায় দীক্ষায় মনের মতো করে মানুষ করবেন। তাকে শিক্ষিত, স্বাধীন, ক্ষমতাবান করে গড়ে তুলবেন। বাধ সাধলেন শাশুড়ি আর স্বামী। ছল করে মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে এনে, সত্যবতীকে না জানিয়ে, তাঁরা সুবর্ণলতর বিয়ে দিয়ে দেন। সত্যবতী যখন জানতে পারলেন তাঁর আট বছরের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে – তখন আপন সংসার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। স্বামীর এই বিশ্বাসঘাতকতার প্রত্যুত্তর দিলেন চিরদিনের মত সংসারত্যাগ করে।

সুবর্ণলতা বালিকা বয়সেই মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিতা। পিতা ব্যক্তিত্বহীন;থেকেও নেই। স্বামী সন্ধিগ্ধ-চিত্ত স্থূল প্রকৃতির। একটি অর্ধশিক্ষিত অমার্জিত পরিবারের সঙ্গে তাঁকে জীবন কাটাতে হয়েছে। অবাঞ্ছিত সন্তান এসেছে কোল জুড়ে। শেষের মেয়ে দুটি বাদে সকলেই কোকিলের বাসায় কাকের ছানা। সুবর্ণলতাকে কেউ বোঝেনি। মাতা পিতা স্বামী পুত্র কন্যা সকলের দ্বারা তিনি প্রত্যাখ্যাতা। নিজভূমে পরবাসী। একসময় সে অভাব তিনি নিজেই মিটিয়েছিলেন অবসর সময়ে বসে বসে নীরবে নিভৃতে মনের ভাবনাকে মেলে ধরেছিলেন একটি খাতার পাতায়। লেখিকা হয়েছিলেন তাঁর বই ছাপা হয়েছিল। তা দেখে বাড়ি তোলপাড়! ঘরের বউ কিনা বই ছাপাচ্ছে! বড়রা গাল দিচ্ছে। নিজের ছেলেরা হাসাহাসি করছে। বস্তা ভর্তি সমস্ত বই সুবর্ণলতা ছাতে গিয়ে নিজ হাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন এ যেন -ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো।”

সেই আগুনেের ঝলকে বকুল দেখেছিল মায়ের মুখে অসীম ক্লান্তি আর অপরিসীম অন্তর্বেদনার ছাপ। কিন্তু বকুলের নিজের জীবনেও আলো জ্বলল না। বকুলকে নিয়ে বইয়ের তৃতীয় খন্ড। মা দিদিমার মত বকুলেরও জীবন ব্যর্থই বলতে হবে। কিশোরী বকুল মনে প্রাণে ভালোবেসেছিল একটি ছেলেকে। সে ছেলে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্মী ছেলে হয়ে অভিভাবকের কথায় অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করে। চিরদিনের মত বিয়ের সাধ বকুলের এখানেই মিটে যায়। মায়ের মতোই নিঃসঙ্গ তার জীবন। পরে বকুল লেখিকা হয়েছে। মা সে সব দেখে যেতে পারেননি তার আগেই চলে গেছেন এই ট্রিলজীর মা মেয়ে ও নাতনীর জীবনের ট্র্যাজেডীর সার্থক রূপায়ণ ঘটেছে আশাপূর্ণা দেবীর কলমে।

অনেকেই মনে করেন আশাপূর্ণা দেবী আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে নিপীড়িত নারীজাতির মুখপাত্রী। নারী সমাজের দুর্গতি দুর করার জন্য তিনি কলম ধরেছেন। এভাবে দেখলে এই সাহিত্যশিল্পীর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি জীবন-রসিক। জীবনের চলচ্চিত্র যেমন দেখেছেন ঠিক তেমনটি এঁকেছেন। তাঁর স্পষ্ট স্বীকারোক্তি — “ছোটবেলা থেকেই আমার অনুভূতির ব্যাকুলতা আমাকে ভাবিয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে, আমাকে লিখিয়ে ছেড়েছে”…. “আমি লিখেছি ঘরোয়া মেয়েদের নিয়ে….চিরদিনই মনের ভিতরে একটা আপোষহীন বিদ্রোহ ছিল, তাকে যদি নারী মুক্তির পিপাসা বলতে হয়, তাহলে তাই। যদি কিছু বিদ্রোহিণী চরিত্র সৃষ্টি করে থাকি সেটা করেছি প্রতিবাদ করার মাধ্যম হিসাবেই…”।

আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যের মূল সুরই হোল বিদ্রোহ। তিনি চির বিদ্রোহিনী। তিনি সেকালের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন বিদ্রাহ ঘোষণা করেছেন। একালের বিরদ্ধেও আপোষহীন যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ভাঙনের কাল তিনি দেখে গেছেন। একান্নবর্তী পরিবার ভাঙছে। সমাজ ভাঙছে। । সংসার ভঙে টুকরো হচ্ছে। মূল্যবোধের আরো বেশি অবক্ষয় দেখেছেন। আবার এও দেখেছেন বিশ শতকের তুলনায় মেয়েরা আরো বেশি শিক্ষিত, প্রগতিশীল, স্বাবলম্বী। অধিকার সম্পর্কে তারা আরো বেশি সচেতন । কিন্তু এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন যে নারী নির্যাতনে পুরুষের হাত যতখানি নারীর হাতও ততখানি। তিনি বলেছেন – ‘অধিকারহীন অবলাদের কথা বলেছি বৈকি কিন্তু আজকের স্বাধীকারমত্তা সবলাদের দেখেও খুব একটা আনন্দ পাচ্ছি না।’ আশাপূর্ণা দেবীর বড় কৃতিত্ব এখানেই, নারীসমাজ ও বহু বিচিত্র নারীচরিত্রের উদ্ঘাটন।

সাহিত্যে যতকিছু পুরস্কার আছে সবই তিনি পেয়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লীলা পুরস্কার। বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের অমরনাথ ঘোষ স্বর্ণপদক, ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক, জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, পদ্মশ্রী সম্মান, রবীন্দ্রপুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি-লিট, বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি। পেয়েছেন সাহিত্য একাডেমির ফেলোশিপ।

আজ একুশ শতকের দ্বার প্রান্তে দাঁড়িযে দেখছি চরপাশের পৃথিবী মূহুর্মূহু বদলে যাচ্ছে। জীবনকে দেখার ধরণ ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাচ্ছ । সব কিছুর সাময়িক অভিঘাতে নারী -নারীচেতনা -নারীবিশ্ব আমাদের চোখের সামনেই কেমন অজানা ও অচেনা হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে তাঁর রচনা কি আজও প্রসঙ্গিক? নাকি শুধুমাত্র গবেষণার বিষয়বস্তু? আমরা কতটা আশাপূর্ণার গল্প-বিশ্বে দৃষ্টিপাত করেছি? আজকের প্রজন্ম ফেলে আসা অতীতের দিনগুলো নিয়ে কোন রোমান্টিক আবেশ অনুভব করে কি আদৌ? এই পূজনীয়াকে আমরা কি ভুলতে বসেছি?

আজ আশাপূর্ণা দেবীর প্রয়াণ দিবস। জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম।

ঋণ:-
আশাপূর্ণা – পার্থ বসু
সাহিত্যে আশাপূর্ণা দেবীর প্রবেশ সূচনা – শতরূপা সেনগুপ্ত।
প্রতিভাময়ী আশাপূর্ণা – হীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
বাংলা উপন্যাসে ট্রিলজী – অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়।
আশাপূর্ণা:নারীপরিসর- সম্পাদক তপোধীর ভট্টাচার্য।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত