আলমগীর কবির : বায়োস্কোপের দেশে একজন অতঁর পরিচালক

“It (Auteur Cinema) consists, in short, of choosing the personal factor in artistic creaion as a standard of reference and then of assuming that, it continues, and even progesses, from one film to the next” – Andre Bazin

আলমগীর কবিরের ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ডজন খানেক স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপটে অনেক বৈচিত্র্য থাকলেও, ওঁর চলচ্চিত্রগুলির টাইটেল কার্ডে একটা সাধারণ সাযুজ্য রয়েই গেছে, তা’ হচ্ছে প্রায় সব ছবিরই “রচনা, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও চলচ্চিত্রায়নে”- আলমগীর কবির। অর্থাৎ শুধু পরিচালনা নয়, গোটা চলচ্চিত্রটাকে, চিত্রনাট্যসহ, নিজের মধ্যে ধারণ করা ও নির্মাণ করা। অনেকটা একজন লেখক যেমনটি তাঁর বইয়ের ক্ষেত্রে করে থাকেন। এবং একটা সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ছড়িয়ে থাকে ওঁর একটির পর একটি চলচ্চিত্রের মধ্যে। ওঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস। আধুনিক চলচ্চিত্রের ভাষায় যাকে বলা হয়ে থাকে একজন অতঁর (Auteur) পরিচালক।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের হাল আমলের খবরাদি যারা রাখেন তারা জানেন যে, পঞ্চাশের দশকের সিনেমা ভেরিতে (Cinema Verite) থেকে উদ্ভূত হয় সিনেমা ডিরেক্ট (Cinema Direct), যে সিনেমা ডিরেক্টের মূল চারিত্র্যলক্ষণ হচ্ছে যে তা এক ধরণের কোলাজ চলচ্চিত্র। কাহিনীর মাঝে মাঝে সচেতনভাবে ব্যবহার করা হয় প্রামাণ্য ফুটেজ (footage)। এক ধরণের ডকু-ফিক্শন (docu fiction) যেন তা এবং বক্তব্য প্রায়শই তীক্ষ্মভাবে – রাজনৈতিক। ইতালীর ফ্রানসেসকো রোজি, ফ্রান্সের ক্রিস মার্কার, জঁ রুশ, মার্কিন রিচার্ড লীকক, রবার্ট ড্রু এবং সাম্প্রতিককালের সাড়া জাগানো কস্টা গাভরাস এই সিনেমা ডিরেক্ট ধারার বড় সব উদাহরণ, যাঁদের ছবিতে বাস্তব ঘটনাবলী ও কাহিনীচিত্র একত্রে পরিবেশিত, গাভরাসের ‘জেড’ ছবিটি যে ধারার একটি সর্বোত্তম সৃষ্টি বলে সব মহলেই স্বীকৃত। আর অতঁর (Auteur) সিনেমা হচ্ছে ব্যক্তিগত অনুভূতির বিশেষ একটি বিষয় যা একজন পরিচালকের ছবির পর ছবিতে ছড়িয়ে থাকে। ঋত্বিক ঘটকের ক্ষেত্রে তা’দেশভাগের আর্তি, আলমগীর কবিরের ক্ষেত্রে তা বাঙালীত্বের এক অসাম্প্রদায়িক প্রতিবাদী চেতনা। কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, সঙ্গীত এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে চিত্রগ্রহণও অনেক সময় পরিচালকের নিজস্ব সৃষ্টি। আলমগীর কবির এই ধারারই একজন পরিচালক ছিলেন, অন্তত হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ছিলেন।

এক সর্বগ্রাসী বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিপরীতে ভারতবর্ষে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল ত্রয়ীর ছবি আজ একটা দৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। এঁদেরকে ধারণ, ও ক্ষেত্র বিশেষে ছাপিয়েই, ভারতবর্ষে এক নব-প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের আমরা দেখছি— বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, গোবিন্দ নিহালনী, অতঁর ধারার প্রতি যাঁরা অনেকেই তাঁদের আগ্রহ দেখিয়েছেন। সময়ের বিচারে ভারতের এই দ্বিতীয় সিনেমা আলমগীর কবিরের প্রায় সমসাময়িক হলেও আমাদের এই মফস্বলী বাংলাদেশ তো অনেক দিক দিয়েই পিছিয়ে রয়েছে। সেদিক থেকে এদেশে আলমগীর কবিরই অতঁর ধারার পাইওনিয়র নিশ্চয়ই, বিশেষ করে আমরা যদি মনে রাখি ‘ধীরে বহে মেঘনা’ নির্মিত হয়েছে সেই ১৯৭৩ সালে।

প্রথম যৌবনে পশ্চিমের ছোঁয়া এবং যে চলচ্চিত্রিক আবহে আলমগীর কবির নিজেকে পেতে চেয়েছেন, তাতে তাঁর পক্ষে স্বভাবিকই ছিল প্রচলিত ধারায় গল্প বলার চেয়ে ষাট দশকের রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকারদের প্রিয় মাধ্যম সিনেমা ভেরিতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠা। এ সম্পর্কে আলমগীর কবিরের নিজের বক্তব্য ;

            “প্রথমে সমাজ ও রাজনীতিসচেতন সাংবাদিক ও পরে চলচ্চিত্র-ছাত্র হিসেবে ফর্মটি স্বভাবতঃই আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। নিজ জন্মভূমির হাজারো সমস্যার প্রেক্ষিতে এটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অতীব প্রয়োজনীয় চলচ্চিত্র ফর্ম বলে মনে হয়। আমার প্রথম ছবি ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩) থেকেই পূর্ণদৈর্ঘ্যরে অবয়বে সিনেমা ডিরেক্ট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরম্ভ করি। বলাবাহুল্য যাত্রাপথ ছিল কন্টকাকীর্ণ। বক্তব্য কিছু থাক বা না থাক, ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প একটি বিশেষ কারণে এখনও ১৯৪৭-পূর্ব কোলকাতা-স্টুডিও কেন্দ্রিক বায়োস্কোপের রীতিনীতি দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবান্বিত। তেমন অঙ্গনে সিনেমা ডিরেক্ট নিয়ে পরীক্ষা করতে যাওয়া অনেকটা জেনেশুনেই আঁভা গার্দ জাতীয় সুইসাইড প্রচেষ্টার সামিল। তাই বায়োস্কোপে নভেল জাতীয় গল্প বিস্তার দেখতে অভ্যস্থ এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র-ফর্মের বিবর্তন সম্পর্কে অচেতন দর্শক সমালোচক উভয়ের কাছেই ছবিটি দুর্বোধ্য রয়ে গেল। প্রদর্শক পরিবেশকদের আস্থা কিছূটা পুনরুদ্ধারের মানসে পর পর দুটি “নরম” ছবি বানালাম― ‘সূর্যকন্যা’ (১৯৭৬) ও ‘সীমানা পেরিয়ে’ (১৯৭৭)। ১৯৭৯-তে সুযোগ বুঝে দর্শক সমালোচক অসহনশীলতার প্রাচীরে আবার কামান দাগালাম― “রূপালী সৈকতে”। এবার প্রাচীরে উল্লেখযোগ্য ফাটল ধরলো। ১৯৭৩- য়ের তুলনায় দর্শক প্রতিক্রিয়া অধিকতর উৎসাহব্যঞ্জক। দুর্বোধ্য কারণে সমালোচক অনীহা রয়েই গেল। ১৯৮২-তে নিয়ে এলাম “মোহনা”। এবার দর্শকদের সাথে সমালোচকরাও নরম হলেন।”

বহমান মেঘনা সাম্প্রদায়িকতার বেনোজল

‘ধীরে বহে মেঘনা’ একটি পুরোপুরিই অতঁর সিনেমা। যেমনটি ‘রূপালী সৈকত’-ও, যেখানে চলচ্চিত্রকারের নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির অনেক কিছুই প্রতিভাত। যতটা হয় তো বলা যাবে না ‘সূর্যকন্যা’কিম্বা ‘সীমানা পেরিয়ে’সম্পর্কে। ‘ধীরে বহে মেঘনা’ছবিটির শুরুতেই দিল্লী থেকে আগত অনিতার অফ ভয়েস স্বগতোক্তি। ফ্রেমে পর পর স্থিরচিত্রে দেখানো হয় অনিতার মা, বোন, প্রেমিকের ছবি। এরপর ভেসে ওঠে দিল্লী ও ঢাকা নগরীর কিছু প্রামাণ্যচিত্র- সিনেমা ভেরিতে স্টাইলটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়; এই দেশে, যেখানে সিনেমা বলতে এখনও বোঝায় প্রমথেশ বড়ুয়া যুগের উচ্চকিত নাটকীয় সংলাপ ও ক্যামেরা-থিয়েটার।

সুমিত কর্তৃক অনিতাকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিছু প্রামাণ্যচিত্রের রাশ দেখানোর সিচুয়েশন তৈরি ও ওই রাশ দেখানোর মাঝে সুমিতের বর্ণনায় ১৯৭১-য়ের ভয়াবহ কিছু ছবি― চোখবাঁধা অবস্থায় নিহত বুদ্ধিজীবী, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ, এই গোটা সিকোয়েন্সটি নিঃসন্দেহে সিনেমা ভেরিতের বুদ্ধিদীপ্ত এক ব্যবহার। সুমিতের বর্ণনার প্রেক্ষিতে পরিচালক প্রামাণ্যচিত্রে দেখিয়ে যান মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে গেরিলাযুদ্ধের ট্রেনিং, গণহত্যা, পরাজিত পাকিস্তান বাহিনীর আত্নসমর্পণ, যৌথ বাহিনীর সামরিক অগ্রযাত্রা, বিধ্বস্ত জনপদ, ব্রিজ, রেলগাড়ি, দালানকোঠা; মুক্ত যশোরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহ্মেদ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বক্তৃতা, মুজিবনগর সরকারের ঢাকা প্রত্যাবর্তন, মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের করমর্দন; নেপথ্যে সঙ্গীত ‘সাগর ভেঙ্গে বন্যার বেগে আয়/আকাশ ভেঙ্গে ঝঞ্ঝার বেগে আয়’। যা আমাদের অনেক দুঃখে-গড়া ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের সেই নয় মাসের প্রামাণ্য দৃশ্যাবলীকে সিনেমা ভেরিতে স্টাইলে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শরীরে আলমগীর কবির খুব সফলভাবেই গেঁথে দিয়েছেন, যে কাজটি তিনি অন্যত্রও করেছেন― অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।

রাজাকারের প্রহরায় শরণার্থীদের নৌকা সীমান্তের পথে ধায়। মানবেন্দ্রের সংলাপ; ‘ও রাজাকার। টাকা পেলেই খুশী। ওরাই বর্ডার অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসে।…ওখানকার পীস কমিটির চেয়ারম্যান মালেক মন্ডল এসব ব্যবস্থা করে দেয়। মাথা পিছু একশ টাকা। তাছাড়া টুকটাক আরও দিতে হয়’। কিম্বা সংলাপের ওই অংশটা, খানসেনারা বোমা মেরে মানুষ-সমেত নৌকাটা উড়িয়ে দিয়েছিল; কিম্বা ওই মেয়েটির স্থিরচিত্র যেখানে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে তুলে দেয়ার চেয়ে বাঙালী পিতা নিজের হাতেই নিজের মেয়েকে গুলি করে/কাট্ /নাজমা ও তার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট স্বামীর যুগল ফটো; আবহসঙ্গীতে সেই একই ট্রাজেডির সুর; ১৯৭১ সাল, আমাদের জীবনে যখন নেমেছিল এক অদ্ভুত আঁধার— প্রতিটি জীবনই যখন বিপন্ন।

এবং নিশীথ রাত্রিতে দরজায় করাঘাত। একাত্তরের রাত্রি―দরজায় তো নয়, এতো আমার অস্তিত্বের গভীরেই করাঘাত ! বাইরে অপেক্ষমান মিলিটারির জীপ। বাঙালী বিমান অফিসারকে ধরে নিতে এসেছে পাকিস্তানী সৈন্যরা। নাজমা বন্দিনী। আরো দুই লক্ষ হতভাগিনী বাঙালী নারীর আরেকজন হওয়া থেকে যার বেঁচে যাওয়া কিছুটা উপস্থিত বুদ্ধি ও কিছুটা বরাতজোর মাত্র।

খন্ড খন্ড চিত্রে আলমগীর কবির মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলির যন্ত্রণা, বেদনা, আতঙ্ক এবং গৌরবকেও এ ছবিতে উপস্থিত করেছেন, এ দেশের চলচ্চিত্রে যে মুক্তিযুদ্ধের অনুপস্থিতি সর্বদাই আমাদের এক বড় ক্ষোভের কারণ।

সমাজবাদী নেতা মানবেন্দ্র চৌধুরী বা মানুদা চরিত্রটি আলমগীর কবিরের ছবিতে অন্যত্রও দেখেছি, যেমন ‘সীমানা পেরিয়ে’-র রতন মাস্টার। একই ধরণের চরিত্র, একই অভিনেতা― গোলাম মোস্তফা। কিছুটা আর্কিটাইপ যেন, যেমনটি ঋত্বিকের ছিলেন বিজন ভট্রাচার্য।

মানব ও মাধবীর দাম্পত্য জীবনের দৃশ্যটিতে মাধবী যেভাবে খাটের মাথার কাছে গিয়ে পোশাক বদলায়, ব্লাউজ খুলে শোবার জন্যে প্রস্তুত হয়, টয়লেটে যায় এবং পরে বিছানার ওপরের কাপড়টি সরিয়ে বালিশে কাত হয়ে শরীরের আবেদন দিয়ে মানবের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এ পর্যন্ত আমার দেখা সবচে বাস্তবধর্মী ও আবেদনসম্পন্ন দাম্পত্য দৃশ্য। এবং আধুনিকও। আধুনিক এই অর্থেও যেখানে বোন হাসুর ভিন্ন ধর্মের কারো সঙ্গে প্রেমে পড়া নিয়ে মানব বলে;

‘যদি হাসু কাউকে মনেপ্রাণে ভালবাসে আর প্রতিদানে তাই পায় তাহলে ছেলেটি এস্কিমো হলেও আমার আপত্তি নেই’।

তবে ‘যদি ধর্মে না মেলে’ মাধবীর এই উদ্বিগ্ন প্রশ্নেরও একটা গভীর সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে বৈ কি! বিশেষ করে এ দেশের আন্তঃসম্প্রদায়গত সম্পর্কের জটিল ইতিহাসটা যদি আমরা স্মরণে রাখি। ‘ধীরে বহে মেঘনা’ ছবিটির এক বড় সাফল্য হচ্ছে যে, মূলত একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হলেও সাম্প্রদায়িকতার মত এক সামাজিক সমস্যাকে তা খুব বড়ভাবেই ছুঁতে পেরেছে।

মানুদার পার্টির কাজে জড়িত ছিল সুমিত। রাজনীতি সচেতন এক তরুণ সে, যে খুঁজে বের করেছে পঁয়ষট্রি সাল থেকে তখন (১৯৭১ সাল) অবধি মোট দু’হাজার তের জন রাজবন্দী ঢাকা জেলে ছিলেন। জেলখাটা, সাংবাদিকতা, সুমিতের আদলে ব্যক্তি আলমগীর কবিরকে কিছুটা পাওয়া যায় যেন, যদিও হয়তো তা “রূপালী সৈকতে”-র লেনিন চৌধুরীর মত অতটা আত্মজৈবনিক নয়।

কফির কাপে চামচ নাড়ার ফাঁকে “বিস্কিট ফুরিয়ে গেছে। নন্দটা যে সেই কখন গেছে”এ জাতীয় অসংলগ্ন কথার মাঝে একরাশ রজনীগন্ধার মতই সারল্যে ভরা, সদ্য প্রেমে পড়া তরুণী হাসুর কাছে সুমিতের নিজের হৃদয়ের দুর্বলতা ব্যক্ত করা ও দু’জনের প্রেমালিঙ্গন যেমন বাস্তবতায় দৃঢ়, তেমনি রোমান্টিকতায় মিষ্টি। পার্কে ঘুরে ঘুরে গান নেই, নাচ নেই, অথচ কী ব্যঞ্জনাময় রোমান্টিক এই প্রেমদৃশ্য! মিষ্টি এবং একই সঙ্গে কোথায় যেন— গভীর বেদনারও। ওদের ওই সারল্য ভরা প্রেমের দৃশ্যটি চলচ্চিত্রকার যেন নির্মাণই করেন পরের সিকোয়েন্সের ভায়াবহতার অভিঘাতকে আরো তীক্ষ্ম করতে। হাসু আর নন্দকে ২৫শে মার্চ পাকিস্তান বাহিনী ঘরে ঢুকে ধর্ষণ করে হত্যা করে রেখে যায়, কারণ একে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, তদুপরি রাজনৈতিক কর্মী মানুদার নাম ছিল- সেনাবাহিনীর তালিকায়।

নয় মাস যন্ত্রণার এক সাগর পাড়ি দিয়ে সুমিতের মত আমরাও একদিন বুঝলাম একটি দেশ কেমন করে চূড়ান্তভাবে স্বাধীন হয়, আর তার জন্যে কী ভায়বহ মূল্য দিতে হয়! ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাইলট অনিতার প্রেমিক প্রদীপ মারা গেছে ঢাকার আকাশযুদ্ধে। বাংলাদেশে তাই অনিতার আসা নিজের অস্তিত্বের খোঁজেই যেন। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে অনিতা বলে ;

“বাংলাদেশ যখন জয়ের আনন্দে মত্ত তখন আমি নিজেকে ঘৃণা করেছি, বাংলাদেশকে ঘৃণা করেছি। আমার চোখেও ঘুম ছিল না। থাকতে না পেরে সোজা চলে এসেছি এখানে। দেখতে, বুঝতে, বাংলাদেশ কী এমন জিনিস, যার জন্যে চিরকাল এমনি দগ্ধে দগ্ধে মরতে হবে। আজ মেঘনার বুকে ভাসতে ভাসতে যেন আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম এমন দেশের মুক্তির জন্যে যে কোনো মূল্য দেয়া যায়। মেঘনা আমায় নতুন করে বাঁচতে শেখাল সুমিতদা”।

স্টিমারের ডেকে অনিতার ‘কী-ভাবছ-মানুদা’ এই প্রশ্নের জবাবে মানবেন্দ্র বলেছিল;

“ভাবছি এই মেঘনার কথা। নদী তো নয় যেন কালের ইতিহাস। (নদীর বিভিন্ন লং শট)।… .. শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদেশী দস্যুর দল এর মোহনা দিয়ে ঢুকে লুটতরাজ, হত্যা, নির্যাতন চালিয়েছে দু’কূল ধরে। কিন্তু পারেনি এর দুর্বার গতিকে রোধ করতে, পারেনি এর জনপদকে নিশ্চিহ্ন করতে। নিজেরাই হারিয়ে গেছে কোথায় ! দুর্জয় বাংলার মাটির মতই মেঘনা রয়েছে চির অপরাজিতা। জান, বিদেশীরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না― এত দুঃখ, এত দারিদ্র্য, তবু বাঙালীরা এত সংগ্রামী শক্তি পায় কোথায়? বুঝলে অনিতা এই-ই হচ্ছে সেই শক্তির উৎস।”

নেপথ্যে সঙ্গীত রাখেন আলমগীর কবির;

কত যে ধীরে বহে মেঘনা

শান্ত তবু সুপ্ত সে নয়…

মেঘনা! যদি এ দেশের কোনো ছবির নাম তার বিষয়বস্তুর সঙ্গে এমন যৌক্তিকভাবে গেঁথে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে “ধীরে বহে মেঘনা”।

কবিরের ছবিগুলি স্মরণ করুন― “ধীরে বহে মেঘনা”, “মোহনা”, “রূপালী সৈকতে”, “সীমানা পেরিয়ে”- নদী নিয়ে একটা দ্যোতক অর্থ, একটা দর্শন মত বলার চেষ্টা  যেন ছিল তাঁর। বাংলার নদীগুলি! এবং পরিশেষে নিজেরও যমুনায় ডুবে ওরকম মৃত্যু— বড়ই প্রতীকী যেন তাঁর এই শেষ বিদায়।

“ধীরে বহে মেঘনা” ছবিটির দর্শকগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে আলমগীর কবিরের নিজের বক্তব্য ছিল;

“যা আমার কাছে সবচেয়ে পীড়াদায়ক তা হচ্ছে তথাকথিত উচ্চশ্রেণীভুক্ত লোকের মনোভাব। বাংলাদেশের ছবি এখনও অবিভক্ত বাংলার ছবির যুগেই থেকে গেছে। যতক্ষণ না অত্যন্ত সরলভাবে শরৎচন্দ্রের গপ্পোকেন্দ্রিক ধরনের ছবির কাঠামো হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এই আপাতশিক্ষিত দর্শকসমাজ অত্যন্ত অনুৎসাহিত বোধ করে। তার পরিবর্তে আমি কল্পমূর্তির মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশের আহত ক্ষতকে, আর শত বাঁধা সত্ত্বেও তার বাঁচার শক্তিকে। অম্লমিষ্টি স্মৃতির মধ্যে স্বাধীনতা পরবর্তী অধ্যায়ে নতুন দেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, এবং ভারত-বাংলার গণমানুষের বন্ধুত্বের টুকরো অনুক্রম নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই চিত্রনাট্য। চরিত্রগুলোকে হিন্দু-মুসলমান তৈরী না করে যতখানি সম্ভব মানবিক ধর্মনিরপেক্ষ করা হয়েছিল”।

আমার মতে, “ধীরে বহে মেঘনা” যে এদেশের এলিটশ্রেণীটি তেমন পছন্দ করেনি, তার কারণ শুধুই এদেশের উচ্চবিত্তদের সাধারণ ফিলিস্টিনিজম এবং চলচ্চিত্রবোধ তথা সংস্কৃতিবোধের অভাব নয়, আরো গভীর একটি সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কারণও এর পেছনে কাজ করেছে। তা’ হচ্ছে― সাম্প্রদায়িকতা। যে সহজ সাবলীলতায় আলমগীর কবির হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষদের সম্পর্ক গড়েছেন, তা এই এলিট শ্রেণীর প্রিয় ছিল কি?  সাম্প্রদায়িকতার কল্যাণে ’৪৭-য়ের দেশভাগ, যার কল্যাণে আজ তাদের বাড়ি-গাড়ি-বিদেশভ্রমণ-বিলাস-ব্যসন, ফলে পরিপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতার বোধ প্রসার করবে যে চলচ্চিত্র, সাম্প্রদায়িক মানসিকতার গোড়ায় আঘাত হানতে চাইবে যে শিল্পকর্ম, তা তাদের প্রিয় না হওয়ারই কথা। শুধুমাত্র চলচ্চিত্রিক ফর্মাটটাই হয়তো এক্ষেত্রে একমাত্র অন্তরায় ছিল না।

এ দেশের রাজনীতি যারা জানেন তারা জানেন যে, বাংলাদেশে সস্তা ভারতবিরোধিতা করে যে কিছু দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল, পত্রিকা ও সামাজিক গ্রুপ বেশ “করে খাচ্ছে”, সেই ভারতবিরোধিতা, অনেক ক্ষেত্রেই এক সম্প্রসারিত সাম্প্রদায়িকাতাবোধ মাত্র এবং এর সঙ্গে দেশপ্রেমের যোগ সামান্যই। শুধু কোন বড় রাষ্ট্রের পাশের ছোট রাষ্ট্রের অধিবাসীদের সহজাত হীনমন্যতাবোধও তা নয়। পরিপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ একজন শিল্পী আলমগীর কবিরের মানস এধরণের সকল হীনমন্যতাবোধ থেকেই ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত এবং একজন রাজনীতি-সচেতন চলচ্চিত্রকার বলেই, ভারতের সহায়তায় সদ্য-স্বধীনতা প্রাপ্ত এই দেশটির একটি সদাবিতর্কিত বিষয়, সেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে তিনি একটি যুক্তিসম্মত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েই বুঝতে চেয়েছেন। আর সিনেমা ভেরিতে-তে কোনো তাৎক্ষণিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার সুযোগটাও রয়ে গেছে। যদিও অবশ্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধুমাত্র সেই ১৯৭৩ সালেই নয়, আজকে, এবং আগামীতেও, এ দেশের রাজনীতি ও সমাজজীবনে একটা গুরুত্ববহ বিষয় হয়ে রইবে। যা হোক, সুমিতের পত্রিকার সাব-এডিটর রহিমুল্লাহ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত যে দূর্বল বাংলাদেশ কি ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে ! সুমিতের কাছে তার প্রশ্ন ছিল;

“রহিমুল্লাহ : ভারতকে ভাল না বাসলে কি দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না ?

সুমিত : দেখুন, দেশপ্রেম শব্দটি বড় গোলমেলে। এরই নামে ইয়াহিয়া খান এদেশের ত্রিশ লক্ষ পুরুষ, মহিলা আর শিশুকে হত্যা করেছে। আবার এরই জন্য লক্ষ লক্ষ বীর বাঙালী অস্ত্র তুলে নিয়েছে এবং জীবন দিয়ে দেশকে মুক্ত করেছে। … … ভারত-বাংলাদেশ ব্যাপারটা আমার কাছে অত্যন্ত সোজা। যেভাবে কয়েকটি বৃহৎ শক্তি বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল, তাতে ভারতের সাহায্য ছাড়া এই মুহূর্তে দেশ স্বাধীন করা হয়তো অসম্ভব ছিল। এটা স্বীকার করতে লজ্জার কিছু নেই বরং আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দেয়।

রহিমুল্লাহ : কিন্তু এর মানে কি এই নয় যে, বাংরাদেশকে চিরকাল একটা দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্র হয়ে থাকতে হবে?

সুমিত : হবে। যদি বাঙালী তার স্বকীয়তা রাখতে না জানে। একটা কথা মনে রাখা ভাল। বাঙ্গালীর মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস কেবলমাত্র দু’এক বছর বা দু’এক দশকের ইতিহাস নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার নিরীহ, শান্তিপ্রিয় মানুষ, বিদেশী এবং দেশী শোষকদের অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে শোষণের বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সত্যি কথা বলতে কি, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ সত্যিকারের জয়ের পথে প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। এর পরে লক্ষ্য একটি শোষণহীন সমাজব্যবস্থা। এরই মধ্য দিয়ে বাঙালীকে অনুপ্রেরণা যোগাতে হবে বিশ্বের লক্ষ কোটি নিপীড়িত মানুষের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, বর্ণবৈষম্যবিরোধী এবং শোষণবিরোধী সংগ্রামে। অত ভাবার কিছু নেই। ভারতের সাথে যারা হাজার বছরের যুদ্ধ করতে চায় তারা করুক গিয়ে। আমাদের দরকার নেই।”

মিড লং শটে কিছুটা বক্তৃতার ঢংয়ে ও কিছুটা দীর্ঘ হলেও, সুমিতের এই উদ্ধৃতিটি তুলে ধরা হো’ল ধীরে বহে মেঘনা ছবিটির সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটাকে এবং কবিরের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে আরো সঠিকভাবে বুঝতে।

অনিতার প্রেমিক ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাইলট প্রদীপ যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহত হয়েছিল তেমনি এদেশের হাজার হাজার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রক্তের সাথে মিশে আছে ভারতীয় বাহিনীরও বহু জোয়ান ও অফিসারের রক্ত ও ঘাম। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি না হলে নিশ্চয়ই এই আত্মত্যাগের কথা ভুলব না। রক্তের বন্ধনেই ঘটেছে দুই দেশের সম্পর্কের রাখীবন্ধন। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকের সেই সংলাপ যেন; “বুলেট দিয়ে গেঁথে দিয়েছেন। ইচ্ছা করলেও আলাদা হওয়া যায় না।” সাম্প্রদায়িকতার সকল বেনোজলের ঊর্ধ্বে, জিন্নাহ সাহেবের দ্বি-জাতিতত্ত্বকে কবর দিয়েই, গড়ে ওঠা মৈত্রীর এই রাখীবন্ধন।

একটি সিকোয়েন্সে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বিপর্যস্ত মূল্যবোধ ও অপচয়িত তারুণ্যের প্রতীক দু’জন হাইজ্যাকারকে দেখি আমরা; “হালায় জীবনের ঝক্কি লইয়া দ্যাশ স্বাধীন কইরা অহনে অইলাম কি না ডাকাইত ! হাইজ্যাকার ! যুদ্ধটা বড় হাড়াতাড়ি শ্যাষ হইয়া গেছে। ”

আবার পরক্ষণেই বিবেকবোধের উপলব্ধি, “…. হইছি বেশ করছি। দ্যাশের লাইগা অ্যাতো করলাম। দ্যাশ আমারে কি দিছে? (একটু হেসে) দূর ! দ্যাশ আবার কি দিবো? পুরস্কার? মায়ের বাঁচাবর লাইগা পরস্কার চামু? হালায় কুত্তা নাকি !”

পরে লোভ ও বিবেকবোধের দ্বন্দ্বে দুই হাইজ্যাকার পরস্পর গুলিবিদ্ধ। মন্তাজে বৈদ্যুতিক তারে ঝোলনো মৃত বাদুর। হতিহাসের বৈরী সময়ের বলি এক প্রজন্ম যেন, আন্দ্রে ভাইদার “আ্যসেজ এন্ড ডায়মন্ডস”-য়ের মতই।

শেষ দৃশ্যে এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে সুমিত অনিতাকে ড্রাইভ করে নিয়ে চলেছে। ভিন্ন সম্প্রদায়ের, ভিন্ন রাষ্ট্রের দুটি তরুণ-তরুণীর মধ্যে একটা সম্ভাবনাময় সম্পর্ক হতে পারত। কিন্তু জোলো প্রেমে বিশ্বাসী নন আলমগীর কবির। বরং এই দুই নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রতীকে গভীর এক রাষ্ট্রনৈতিক সত্যের অন্বেষাতেই যেন তাঁর আগ্রহ। অভিমানে সুমিত কথা বলছে না। অনিতার অফ ভয়েসে শোনা যাবে ওর মনের কথা;

“অনিতা : (অফ ভয়েস) রাগ কোর না বন্ধু। এত বড় কঠিন পরীক্ষা উৎরে বন্ধুত্বের যে সূত্র আমরা খুঁজে পেলাম তা চিরকাল অটুট থাক এই কামনাই করি।

সব মিলনইতো সত্যিকারের মিলন নয়।

আবার সব বিচ্ছেদই চূড়ান্ত বিচ্ছেদ নয়।

তুমি, আমি, তোমরা, আমরা নতুন করে বুঝতে শিখেছি যে সত্যিকারের বন্ধুত্ব হয় মানুষে মানুষে। প্রাসাদে প্রাসাদে নয়।

ভ্রান্তির কুয়াশা পেরিয়ে আবার যখন একে অপরের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি তখন আর ভয় নেই। ভয় নেই বন্ধু।”

গোটা চলচ্চিত্রটির শরীরে গাঁথা ক্ষুদ্র অনুক্রমগুলিতে বেদনা ও বিষাদময়তার তীব্র কিছু চিত্রকল্প ছড়িয়ে রেখেও, জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ একজন শিল্পী হিসেবে, শেষ দৃশ্যে, আলমগীর কবির― আশাবাদীই।

“ধীরে বহে মেঘনা” ছবিটির আরেকটি দিক নিঃসন্দেহে কাব্যে উপেক্ষিতা আমাদের এই ঢাকা নগরী, তার গলি-ঘুপচি, রিক্সা, বৃষ্টিভেজা পথসহ প্রায় ভৌগোলিক এক উপস্থিতি, যা কবিরের অন্য কিছু ছবিতেও, বিশেষ করে “সূর্যকন্যা” ও “রূপালী সৈকতে”-ও আমরা দেখেছি। এ শহরকে কবির ভালবাসতেন। “ধীরে বহে মেঘনা”-র অন্তিম শট্গুলি স্মরণ করুন। শেষ দৃশ্যে লং শটে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং বিমানটি অনিতাকে নিয়ে আকাশে উড়ল। ঢাকার বুকে সন্ধ্যা নেমে আসার প্রস্তুতি চলছে। বুড়িগঙ্গার ওপারে সূর্যাস্তের আভা। ঘিঞ্জি পুরনো ঢাকার এক ফালি আকাশ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। রাস্তার ধারে হাপরে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। আর বুড়িগঙ্গার জলে অস্তমিত সুর্যের প্রতিবিম্ব জ্বলছে ঝিক্মিক। চমৎকার কয়েকটি চিত্রকল্প। আশাবাদেরও। জন্ম নিয়েছে নতুন এক দেশ !

সূর্যকন্যা নারীমুক্তির বন্দনা

অসহায় পথচারীর উপর শক্তিশালী ছিনতাইকারীর হামলা দেখে কল্পনাপ্রবণ এক যুবক প্রতিবাদে রুখে উঠে, শূন্য স্টেডিয়ামে বায়বীয় বলে ব্যাট হাঁকিয়ে মারে বেশুমার বাউন্ডারি- ওভারবাউন্ডরি, ইন্দিরা মঞ্চে টোকাইদের সামনে হাত-পা ছুঁড়ে গণনেতার বক্তৃতা দেয়। শুরু থেকেই দর্শকদের এই স্বপ্নপ্রিয় প্রটাগনিস্টটিকে ভালো লাগবে, বাংলা চলচ্চিত্রে যাকে সাধারণত নায়ক বলা হয়। নাম তার লেনিন। আমরা দেখব অন্যত্রও এই নামটি আলমগীর কবির ব্যবহার করেছেন। ওঁর মানসলোকের নায়ক যেন― লেনিন, একটা আর্কিটাইপ। তবে এ লেনিন কোন বিপ্লবী নয়, একজন সংবেদনশীল শিল্পী মাত্র, যে কল্পনাপ্রবণ, কখনো কখনো হয়তো ভোগে কিছুটা সিজোফ্রেনিয়াতেই। সময় ও স্পেস যার কাছে কখনো কখনো থমকে দাঁড়ায়, আগে পিছে হয়। তবে বস্তুসর্বস্ব মধ্যবিত্ত গেরস্থ জীবনের বিপরীতে, ছোট ভাই বুলুর হিসেবী বাস্তবতাবোধ যার প্রতীক, তার রয়েছে অনুভূতিময় এক রোমান্টিক মন। “রূপালী সৈকতে”-র লেনিন উঁচু মাচায় বসে শ্যামের বাঁশির মত মাউথঅর্গ্যান বাজালেও প্রেম তার কাছে- গৌণ। মুখ্য- মানুষের মুক্তি। কিন্তু ‘সূর্যকন্যা’র লেনিন চিরন্তন প্রেমিক পুরুষ। ইলিউশন আর রিয়ালিটি, স্বপ্ন ও  বাস্তবের ঘোর লাগা, চিরকালের শিল্পী পুরুষ সে।

আসলে লেনিনের যে সিজোফ্রেনিয়া তা শিল্পীর চিরকালের সৌন্দর্যতৃষ্ণা মাত্র যা সে শিল্পের মাঝে খুঁজে পেতে চায়, পেতে চায় নারীর কাছেও। কলেজের সেই সে মেয়েটি (আজ তার নামও মনে পড়ে না ঠিকমত!) নিশ্চয়ই এত দিনে কোনো আমলা-টামলার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। বাচ্চাকাচ্চা হয়ে বোধ হয় মুটিয়েও গেছে ! দুই বন্ধুর স্মৃতিচারণ। এ ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত ভাগ্যবান রাসেলের প্রশ্ন; “কী রে! এখনও ভার্জিন রয়ে গেছিস নাকি!” এবং “এরকম ধোপদুরস্ত চরিত্র নিয়ে কি করবি বলতে”-র জবাবে আমাদের লেনিনের সখেদ উত্তর; “চরিত্র মানেই তো সুযোগের অভাব”। বোঝাই যায়, আর দশটা বাঙালী মধ্যবিত্ত যুবকের মতই নারীসঙ্গবঞ্চিত বেচারা লেনিন। আর তার এই সকল বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ সে অবচেতন মনে করে নেয় স্বপ্নলোকের এক মানসসুন্দরী সৃষ্টি করে, দোকানের ডিসপ্লের ম্যানেকিন মুর্তিটি একদিন জীবন্ত হয়ে যে মানবীর রূপ নিয়ে তার জীবনে এসে উপস্থিত হয়। এই নারী শিল্পীর চিরন্তন― সৌন্দর্যসুষমা, অর্ধেক কল্পনা অর্ধেক বাস্তবের পুরুষমনের চিরন্তন প্রেয়সী— কখনো লাবণ্য, কখনো ইউরিডিস, কখনো তানিয়া, কখনো বা ভেনাস। এত রূপ, এত গল্প! রবীন্দ্রনাথের কাছে সে ছিল দুরে-বহুদূরে-স্বপ্নলোকে-উজ্জয়িনীপুরের-প্রথম-জনমের-প্রথমা-প্রিয়া, আলমগীর কবিরের কাছে সে যেন ছেলেবেলার টিনের ছাদে কুল গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের টিপ টিপ শব্দ কিম্বা শৈশব স্মৃতির সেই মন-সুদূরে-টানা-স্টিমারের-বাঁশির নস্টালজিক হাতছানি। লেনিন তার এই মানবীকে বলেছিল;

            “…..অপেক্ষা করে যাব অনন্তকাল ধরে। কিচ্ছু করব না। কিচ্ছু বলব না। কেবল ভালবেসে যাব। নীল যেমন ভালবাসে শরতের মেঘকে, সবুজ যেমন বসন্তকে, তেমনই নিবিড় করে বিলীন হয়ে ভালবেসে যাব তোমায়, কেবলই তোমায়।” চমৎকার কাব্যিক এই সংলাপের মাঝে শুধু শিল্পী লেনিন নয়, তার স্রষ্টার রোমান্টিক মনের আবেগটাও যেন চাপা থাকে না।

‘তুমি কে?’ লেনিনের সেই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তরে স্বপ্নলোকের মানবী বলে চলে নারীর বন্দিনী হওয়ার সেই নির্মম ইতিহাস। কি ভাবে যাদেরকে শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণু দিয়ে তিল তিল করে সৃষ্টি করেছে, হৃদয়ে দিয়েছে ভালবাসা, মুখে দিয়েছে ভাষা, সেই শক্তিতে মত্ত পুরুষ একদিন বন্দী করেছে নারীকে। এ পর্যায়ে এক প্রাচীন প্রাসাদের অলিন্দে মানবী সূর্যকন্যার শট্গুলির ভিস্যুয়াল ভারী চমৎকার।

            ভোর চারটে পর্যন্ত আয়ু ম্যানেকিন মানবীর। সূর্যের আলো দেখার অধিকার নেই তার। এও তো প্রতীকী। অসূর্যস্পর্শার যুগ আর নেই। কিন্তু নারী কি আজো বন্দিনী নয় ? আঁধারে ?

লেনিনের ইতিহাসের অধ্যাপক মামা বলে চলেন কী ভাবে কৃষিসভ্যতার স্রষ্টা নারীজাতির বন্দীদশা ঘটল পুরুষের হাতে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের উত্তরাধিকার নির্ণয়ে নিশ্চিত হতে পুরুষ বন্দী করল নারীকে। তথাকথিত সতীত্ব সম্পর্কে নানা মূল্যবোধ চাপিয়ে দিল নারীর উপর। নারী হয়ে উঠল আরেকটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি মাত্র। এই পর্যায়ে অ্যানিমেশন চিত্রের মাঝ দিয়ে প্রকাশিত সকল ব্যাখ্যার সঙ্গে এ যুগের নারীবাদীরা হয়তো পুরোটা এক মত হবেন না। তবে ছবির অ্যানিমেশন চিত্রের ব্যবহার, আমার জানা মতে, এপার বাংলার কাহিনীচিত্রে এটাই প্রথম প্রয়োগ। এ ব্যাপারেও আলমগীর কবির পাইওনিয়ার।

            অর্ফিউস হারিয়েছিল তার ইউরিডিসকে। পুরুষপুঙ্গব লেনিনও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভোর চারটের আগে পৌঁছতে পারেনি তার মানবীর কাছে।

তবে এক উজ্জ্বল জীবনবোধ ও কৌতুকবোধের পরিচয় দিয়ে পরিচালক লেনিনের সেই ক্ষতিপূরণের ব্যাপারটি ছবিতে রেখেছেন। বোন ক্লিওর বান্ধবী সুজলা— মিষ্টি স্নিগ্ধ বাঙ্গালী মেয়ে, চিরকালের সেই-পাশের-বাড়ির মেয়েটির মাঝেই তো খুঁজে পেতে হবে স্বপ্নের মানবীকে। লেনিন তা পায়ও। শেষ দৃশ্যে যেভাবে সুজলার চোখের ক্লোজআপে পরিচালক ছবিটি শেষ করেন তা একজন অতঁর পরিচালক হিসেবে ওঁর আত্মবিশ্বাসেরই পরিচায়ক, এই আত্মবিশ্বাস যে, এতক্ষণ যে কাহিনী তিনি শোনালেন তা একটা উপভোগ্য পরিণতিতে পৌঁছেছে। তাই শুধুমাত্র দুটি চোখের ক্লোজআপেই ছবির সমাপ্তি টানবার সাহস পান।

লেনিন-মানবীর রোমান্টিক বিমূর্ত প্রেমের সমান্তরাল রাসেল-মনিকার জাগতিক প্রেমের যে উপকাহিনীটি চলচ্চিত্রকার রেখেছেন, তা নারী-পুরুষের সম্পর্ককে আরেকটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবার সুযোগ করে দিয়েছে। রাসেলের মধ্যে আমরা উন্মুললক্ষণাক্রান্ত বুর্জোয়ার একাকীত্ব দেখতে পাই― নারী সম্পর্কে যার দৃষ্টিভঙ্গি একান্তই ভোগবাদী, যে হোটেলের ডবল ডিলাক্স রুমে তার দোকানের কর্মচারী মনিকাকে নিয়ে শারীরিক প্রেম করে, বিয়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। ফেমিনিস্টদের ভাষায় এই রাসেল যথার্থই একজন ‘এমসিপি’। তবে নারীর প্রতি এই শুধুই ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ছবির শেষে সত্যিকারের প্রেমবোধ ও মনিকাকে শ্রদ্ধা করতে পারার রাসেলের যে উত্তরণ, তা নিঃসন্দেহে পরিচালকের প্রাগ্রসর দৃষ্টিভঙ্গীরই প্রতিফলন। তবে নির্জন হোটেলকক্ষে রাসেল মনিকাকে একদিন তৃতীয় রিচার্ড থেকে অভিনয় করে দেখিয়েছিল। রাসেলের একটা সংবেদনশীল মনের পরিচয় পরিচালক আগেই রাখেন, ফলে শেষের দিকে মনিকার কাছে তার প্রত্যাবর্তন খুব একটা অবাস্তব ঠেকে না।

ছবিটিতে ভাঙনমুখী মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতার কিছু দিকও এসেছে; বাংলা চলচ্চিত্রের সেই পরিচিত milieu, যেমনটি পরবর্তীতে আমরা কিছুটা দেখব শেখ নিয়ামত আলীর ‘দহন’-য়েও। “কলেজের চাকুরীটার কি হোল” বাবার এই প্রশ্নে বেকার যবকপুত্রের উত্তর; “মিনিস্টার-ফিনিস্টার না ধরলে চাকুরী আজকাল হয় না”। এ ঘটনা মধ্যবিত্তের জীবনে ১৯৭৪-য়ে যেমন সত্য, আজও সত্য।

আর দশটি শিল্পমাধ্যমের চেয়ে চলচ্চিত্রের একটি বাড়তি সুবিধা রয়েছে যে, তা সময়কে একটা প্লাস্টিক উপাদান হিসেবে ভাঙ্গতে পারে, এগোতে পারে, পিছাতে পারে, থমকে দাঁড় করাতেও পারে। লেনিনের মনোজগতে মানবীর আগমনের cut away শট্গুলির মন্তাজের মাধ্যমে পরিচালক সময় ও স্পেসকে যে রকম প্রয়োজনানুযায়ী ভেঙ্গেছেন, তাও সিনেমা ভেরিতের পরিচালকদের এক প্রায়শ: ব্যবহৃত পদ্ধতি।

রাসেলের স্বপ্নে মনিকা আসে নেগেটিভ ইমেজে। ‘রূপালী সৈকতে’-ও নেগেটিভ ইমেজ নিয়ে কিছু কাজ করেছেন আলমগীর কবির। আসলে দুর্বল রসায়ণাগারের এই দেশে অপটিক্যালে বৈচিত্র্য আনতে নেগেটিভ ইমেজ, অ্যানিমেশন, প্রামাণ্য চিত্রাংশ কিম্বা ফ্রীজ, এ জাতীয় কয়েকটি মাত্র আঙ্গিকের উপরই পরিচালককে নির্ভর করতে হয়। আরো মনে রাখার ব্যাপার, আলমগীর কবিরের ছবিগুলি খবই স্বল্প বাজেটের ছবি। ব্যয়বহুল কোনো অপটিক্যাল নিরীক্ষার সুযোগ ওঁর তেমন ছিল না।

বাংলাদেশের বায়োস্কোপ জাতীয় চলচ্চিত্রে কৌতুকরস বলতে যেখানে বোঝায় শুধুই স্থুল ভাঁড়ামি, সেখানে ‘ধীরে বহে মেঘনা’-য় নবরসের এই রসটিকেও আলমগীর কবির তুলে ধরেছেন এক নির্মল রুচিশীলতায়। দোকানের ম্যানেজার রবিন গোমেজের ভূমিকায় অজয় ব্যানার্জীর অভিনয়ের কথা স্মরণ করুন কিম্বা অন্য ছবিগুলিতে বরিশালী টোনে আশীষ কুমার লোহের কথা।

লেনিন যেদিন চাকুরী পায় সেদিন বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির মাঝে মানবী আসে তার জীবনে। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে লেনিন প্রেমাবেগের জোয়ার অনুভব করে দেহেমনে। বৃষ্টি নিয়ে একটা বক্তব্য যেন ছিল আলমগীর কবিরের। বাংলার বৃষ্টি, একটি পুনরুজ্জীবক শক্তি যেন। স্মরণ করুন ‘রূপালী সৈকতে’ বৃষ্টির মাঝে পশ্চিম পাকিস্তানী মেয়েটির শট্টির কথা। এই বৃষ্টিতে যেন কিছুটা বেমানান সে; বাংলার বৃষ্টি যেন তাকে প্রত্যাখ্যান করল― লেনিনের মতই। এবং “রূপালী সৈকতে”-ই, সেতারে যুগলবন্দীতে মেঘমল্লার রাগে বৃষ্টি আনে লেনিন ও শরমিন। পর্দায় ইমেজে দেখি বৃষ্টিভেজা কাক, লংশটে আজিমপুরের আকাশ, পথে রিক্সা, ভেজা রাস্তা, ছাতা মাথায় রমণী— হাজার বছরের বাংলার বর্ষা। একান্তই বাঙালীর নিজস্ব।

জ্বলোচ্ছ্বাস শ্রেণীর সীমানা পেরিয়ে

“সীমানা পেরিয়ে’ (১৯৭৭) ছবিটি সম্পর্কে আলমগীর কবিরের নিজের বক্তব্য; “১৯৭৩-র ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলার প্রায় তিন মাস পর এক জোড়া মানব-মানবীকে বরিশালের দক্ষিণের একটি সামুদ্রিক চরে আদিম পরিস্থিতিতে কোনো রকম বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিল। ঢাকার তৎকালীন সংবাদপত্রে ঘটনাটির বিবরণ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে ছবিটির treatment ইচ্ছাকৃতভাবে contrived । যৌন আকর্ষণ বা ভায়োলেন্স ছাড়াও সমাজের ওপর এবং নীচতলার দুটি মানুষের মধ্যে, শ্রেণীগত পর্যায়ে নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো আন্তরিক সম্পর্ক সম্ভব কিনা এটা পর্যালোচনা করাই এই কার্যত fantasy চলচ্চিত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল। আমার মতে এই সম্পর্ক সম্ভব, তবে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শ্রেণীটি তা সহ্য করতে চাইবে না। ব্যবসায়ী পুঁজির চাপে ছবিটির বক্তব্য এবং গতি কিঞ্চিৎ ছিন্নভিন্ন।”

দার্জিলিঙে ছয় বছর, লন্ডনে রয়েল একাডেমী অফ ড্রামাটিক আর্টসে বৃত্তি, ছবিটির নায়িকা টিনার যে সামাজিক আবহ তা পুরোপুরিই এক বুর্জোয়া-আবহ যেখানে তরুণী মেয়েরা পিতার বয়সী ধনী কোনো ব্যক্তিকেও সহজেই বিয়ে করে, হিসেব কষে। বিয়েটাও তাদের কাছে একটা ক্যারিয়ার মাত্র। বাংলা চলচ্চিত্রে ক্লাব-পার্টি-ড্রিঙ্কসের এই বুর্জোয়া শ্রেণীটিকে সর্বদাই দেখানো হয় এক উদ্ভট অবাস্তবতায়। আসলে অধিকাংশ পরিচালকের ব্যক্তিগত গ্রাম্যতা ও মফস্বলীয়তা এই শ্রেণীটিকে কাছ থেকে চেনা-জানার ব্যাপারে একটা দূরত্ব তৈরি করে রেখেছে। তবে তৃতীয় বিশ্বের উপরমহলের এই যে এলিট শ্রেণীটি, আলমগীর কবির এই শ্রেণীটিকে চিনতেন, জানতেন, ফলে তাদের চিত্রায়ন, সংলাপ ও আচরণ, তাঁর হাতে সর্বদাই বাস্তবানুগ থেকেছে, যদিও বিশেষ অভিনেত্রীটির ম্যানারিজম বুর্জোয়া তরুণীটির চরিত্রে পূর্ণতা আনতে কিছুটা কৃত্রিমতা সৃষ্টি করেছে।

স্টিমার এই ছবিতেও রয়েছে। মেঘনারই বুকে। টিনা ওর মায়ের সঙ্গে গ্রামে চলেছে। “সূর্যকন্যা”-র লেনিনের ছেলেবেলার স্মৃতিতেও মিশে ছিল স্টিমার, স্টিমারের হুইসেল। আলমগীর কবির শৈশবে বরিশালের বাসিন্দা ছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা হয়তো আত্মজৈবনিকই। ছবিতে ফিরে ফিরে শৈশব-কৈশোরের আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতাসমূহ তুলে ধরতে চাওয়া অতঁর চলচ্চিত্রকারদের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

অহংসর্বস্ব পিতা ব্যারিস্টার চৌধুরীর ম্রিয়মান স্ত্রী টিনার মা। একটি শটে ক্ষয়িষ্ণু জমিদারবাড়ির ক্ষয়িষ্ণু ঘাটে মা ও মেয়ে বসে। পাশে ফ্রেমে দীঘিতে কচুরিপানা। কচুরীপানা-বন্ধ্যাত্ব ও ডেকাডেন্ট ক্ষয়িষ্ণুতার খুবই কার্যকর এক দৃশ্যগত প্রতীক হয়ে উঠেছে।

            মায়ের প্রাক্তন প্রেমিক, বামপন্থী-রাজনীতি-করা রতন মাস্টার, টিনার; ÒI hate politics”-য়ের জবাবে সাগরপারে হাঁটতে হাঁটতে বলেছিলেন;

“কেবল ঘৃণা করলেই কি রাজনীতির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় ? যাদের সব কিছু আছে আর যাদের কিছুই নেই-সমাজের এই দুই অংশের মধ্যে যে সংঘাত নিরন্তর চলছে তা থেকে তুমি চাও আর নাই-ই চাও, নিস্তার পাবে না। হ্যাঁ, কিছুদিন এড়িয়ে থাকতে পারবে। কিন্তু believe me, একদিন না একদিন তোমাকে সংগ্রামের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে।” দু’দিন পরেই সমুদ্রের এক জনমানবশূন্য দ্বীপে টিনাকে সেই অভিজ্ঞতারই মুখোমুখি দাঁড় করালেন পরিচালক।

মুক্তিযুদ্ধের আগের বছর ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর এদেশের উপকূলীয় জেলাগুলিতে যে প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাস ঘটে গিয়েছিল, যাতে প্রাণ হারিয়েছিল কয়েক লক্ষ মানুষ, সে দূর্ঘটনা এই প্রজন্মের মানুষ তো প্রায় ভুলেই যেতে বসেছে। জাতি হিসেবে আমাদের স্মৃতিশক্তি কতই না ক্ষীণ! পর পর কয়েকটি মন্তাজ শটে সেই জলোচ্ছ্বাসের দৃশ্যাবলী এবং নেপথ্যে ভূপেন হাজারিকার চমৎকার সঙ্গীতটির মাধ্যমে আলমগীর কবির সেই গভীর ট্রাজেডির রূপকটিকে তুলে ধরে রেখে ওঁর শৈল্পিক দায়বদ্ধতাই পালন করে গেছেন।

এই জলোচ্ছ্বাসে এক জনমানবহীন দ্বীপে ভেসে আসে টিনা এবং কালু। কালু পেশায় মাঝি, টিনার দাদা জমিদার বুড়ো চৌধুরী এক দূর্ভিক্ষের বছর খাজনা দিতে না পারায় এই কালুর দাদা ও বাপকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিল। এই জনহীন দ্বীপে নিজেদেরকে আবিষ্কার করে দুজনের প্রতিক্রিয়া দু’রকম। টিনা তার গার্লস গাইড ট্রেনিং নিয়ে রেসকিউ পার্টি কল করার কথা ভাবে, বোতলে এসওএস পাঠাতে চায়, বাঁশের ডগায় নিশান ওড়ায়, যা মূলত প্রকৃতির বুকে ওঁর নাগরিক অসহায়তাকেই তুলে ধরে। আর অন্যদিকে, দু’জনের জীবনধারণের নানা টুকিটাকি কাজের মাঝে কালুর সংশয় “ … পোড়া কপাল আর কারে কয়! কোনো দিন যদি দ্যাশে ফিরি- যে জমিদারের নাতনী! সত্য-মিথ্যা দশখান বানাইয়া কওন খুবই সম্ভব। বড় লোকের মাইয়া। নালিশ করলে আমার মত গরীব মাঝির কতা কেডা বিশ্বাস করবে” !

তবে রতন মাস্টরের গোপন রাজনৈতিক দলের কর্মী কালু রতন মাস্টারের কাছ থেকে বৃথা শিক্ষা পায়নি। তার রয়েছে পরিশ্রমী মানুষের সহজাত মানবিকতাবোধ ও একটি সংবেদনশীল মন। দুজনের পাহাড়ে ওঠার প্রতীকী দৃশ্যটির কথা স্মরণ করুন। কালু দড়ির উপরে। যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত শ্রেণীর একজন হয়েও সে টিনার চেয়ে এগিয়ে আছে, উপরে আছে। এমন কী তার পূর্ব পুরুষদের প্রতি টিনার শ্রেণীর এত অত্যাচারকে ক্ষমা করেই সে নীচে টিনার দিকে বাড়িয়ে দেয় সহমর্মিতার হাত। সে যেন টিনার উত্তরণ চায় তার সামাজিক সীমাবদ্ধতাগুলি থেকে। পরিশ্রমকাতর টিনার প্রশ্নও যেন প্রতীকী অর্থেই; “আর কতদূর”? আর প্রতীকী অর্থেই কালুর আশ্বাস; ‘আর একটু’। এবং পাহাড়ে ওঠার পর যখন সাউন্ডট্রাকে পল রবসনের হিউম্যান ব্রাদারহুড সঙ্গীতটি ভূপেন হাজারিকার কন্ঠে হামিং হয়ে ভেসে আসে তখন পাহাড়ে ওঠার এই গোটা সিকোয়েন্সটিতে পরিচালকের রূপক বক্তব্যটি বলার প্রয়াসটা পূর্ণতা পায়।

কালু পাহাড়ের ওপর দুটি ঘর বানিয়েছিলো। ওর ভাষায়; “ঐডা অইলো আপনার ঘর। এইডা অইলো আমর ঘর (দা দিয়ে উঠোনের মাঝামাঝি দাগ কেটে)। আর এইডা অইলো সীমানা। এই পারে আপনে থাকবেন। আমি যামু না। রাইতে দাওডা আপনেই রাইখেন।”

এ পর্যন্ত কাহিনী বেশ তরতরিয়ে এগিয়ে যায়। তবে চরিত্রদের পোশাক, চুলের ধরণ এসব ডিটেল্সের কাজে অবহেলা বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়; কালুকে জেলে নৌকার অশিক্ষিত মাঝি হিসেবে কখনোই মনে হয় না। আর সাম্পানের জিনিসপত্র দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল এবং ফরেস্ট অফিসারের বউয়ের জন্য দেয়া শাড়ি, ব্লাউজ ও অন্যান্য জিনিস বয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ছবির কাহিনীতে আগে বলে রাখলেও এত বড় প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাসের পরও কালু ও টিনার পোশাক-আশাক ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রায় সব জিনিসপত্রের উপস্থিতির ফলে তাদের জীবনধারণ মোটেই বানে-ভেসে-আসা মানুষের মত মনে হয়নি। চলচ্চিত্রে চোখে দেখার ভিস্যুয়াল সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। তা বাস্তবে দৃঢ়বদ্ধ না হলে দর্শকের মন বক্তব্যের গভীরে ঢুকতে চায় না। এই ডিটেল্সের অভাব “সীমানা পেরিয়ে” ছবিটির এক বড় সীমাবদ্ধতা।

যা হোক, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই দুই নারী-পুরুষ একদিন কাছে আসে। যদিও বৈরী শ্রেণীগত অবস্থান এই দু’জন মানব-মানবীর মনে দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের প্রতি সংশয় আর অবিশ্বাসটাকে জাগিয়ে রেখেছিল। সুসজ্জিতা টিনা এক সন্ধ্যায় মাঝের সীমানার বাঁশটি তুলে ফেলে কালুর হাত ধরে নিয়ে আসে উঠোনের মাঝামাঝি। নিয়মভাঙ্গার এই নিয়মে শ্রেণী-সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এই দুই ব্যক্তিমানুষের মিলন ঘটে, দুই নর-নারীর মিলন ঘটে মালাবদলের বিয়ের মাধ্যমে।

তবে কালু যেমন তার শ্রমজীবী অবস্থানের তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে জানে যে সমাজ তাদের এই দু’দিনের খেলাঘরকে স্বীকৃতি দেবে না, তেমনি টিনারও উপলব্ধি ঘটে;

“আমরা যদি ফিরে যাই তাহলে ওই সমাজ কি আমাদের এই বিয়ে মেনে নেবে? ভেঙে চুরমার করে দেবে না? আমাদের এই দ্বীপের অস্তিত্ব নিশ্চয়ই কেউ জানে না। আমরা এখানেই থাকব। চাষাবাস করব। ঘুণে ধরা সমাজের চোখ রাঙানী এখানে থাকবে না। থাকবে না কোনো শ্রেণী বিভেদ”।

একটি শ্রেণী-ঊর্ধ্ব ‘ঘেরটোপ’- য়ের ইউটোপীয় স্বপ্ন যেন তা। তার তাইতেই উদ্ধারকারী জাহাজটি দেখে ওরা দৌড়ে পালাতে চায়। পালাতে চায় মানুষের সমাজ থেকে যা শ্রেণী বিভেদে কলুষিত।

আর পরিশেষে, ওরা যখন ফেলে আসা সমাজে ফিরে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিল, তখনই টিনার বাবার স্বরূপে সামাজিক এস্টব্লিশমেন্ট কালুকে গুলি করে হত্যা করল/কাট্ /টিনার ফ্রীজ শট। এবং সাউন্ডট্রাকে, টিনার “না” বলে আর্তচীৎকারটি, ফিরে আসতে থাকে বার বার। দু’টি নরনারীর শ্রেণী-ঊর্ধ্ব জীবনের স্বপ্ন বাস্তবতার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কালুর স্থানীয় প্রেমিকা মাথিনের চরিত্রে টিনা এবং সমুর চরিত্রে কালুকে দিয়েই অভিনয় করিয়ে পরিচালক হয়তো এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন যে টিনা তার নিজের শ্রেণীতে যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছিল সে দেখতে হুবহু কালুর মত হলেও নিম্ন শ্রেণীর হওয়াতে কালুর প্রতি টিনার কোনো প্রেমাবেগ বোধ করা সম্ভব ছিল না। একই ভাবে, হুবহু টিনার মত দেখতে একটি মেয়েকে অতীতে ভালবাসলেও টিনাকে সেই চোখে দেখার কথাও কালু প্রথমে ভাবতে পারেনি। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে তথাকথিত প্রেমবোধও – শ্রেণীনির্ভর।

ওদের মুক্তমঞ্চে নাগরিক টিনার আয়োজিত প্রতি সন্ধ্যায় একটি করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ওদের রবীন্দ্রনাথ, মায় শেক্সপীয়র থেকে আবৃত্তির ব্যাপারটিতে বিশ্বাসযোগ্যতার কিছুটা ঘাটতি রইলেও তা হলিউডের ‘ব্লু ল্যাগুন’- য়ের মত দুই তরুণ-তরুণীর শুধুই পরস্পরের শরীর-আবিষ্কারসর্বস্বতার ঊর্ধ্বে উঠেছে নিশ্চয়ই। আর কালুর জবানীতে চাকর নীলমনি কর্তৃক খাটের পায়া ধরে ‘দাদাবাবু, ‘দাদাবাবু’ জাতীয় যে নাটকীয় সংলাপ, বাংলা-বায়োস্কোপের এই অতিনাটকীয় ধারাটির বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিনের সংগ্রাম আলমগীর কবিরের। সুযোগ বুঝে কিছুটা লাগসই ঠাট্টা করে নিয়েছেন আর কি!

অস্থির ষাট দশক অস্তিত্বের রূপালী সৈকতে

  প্রবাল সৈকতের স্থিরচিত্র তুলে বেড়ায় এক তরুণ সাংবাদিক। নাম, হ্যাঁ― লেনিন চৌধুরী। প্রবাল পাথরের শটগুলি ও কম্পোজিশন খুবই সিনেমাটিক; কিম্বা সূর্যোদয়ের প্রথম দৃশ্যটি। সাদা-কালো ফটোগ্রাফির শিল্পিত সব ইমেজ। এই সৈকতেই একটি ভিন্নধর্মী গেস্ট হাউস। আর্ট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক ম্যানুয়েল ওর্তিসের বিধবা স্ত্রী ও তরুণী কন্যার গেস্ট হাউস, যে ম্যানুয়েল ওর্তিস একদিন দুর্বৃত্তদের হাত থেকে স্ত্রী-কন্যার সম্ভ্রম রক্ষা করতে যেয়ে নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনাটি দেখানো হয় নেগেটিভে; যে রকম নেগেটিভ ইমেজ চলচ্চিত্রকার অন্যত্রও ব্যবহার করেছেন, দক্ষতার সাথে।

তবে এ ছবির মূল যা বিষয় তা ১৯৬৬-৭০-য়ের ঝঞ্ঝাময় রাজনৈতিক সময়কাল। সময়ই যেন নায়ক। একজন সংবেদনশীল বাঙালী সাংবাদিক হিসেবে লেনিন চৌধুরী সক্রিয় অংশ নিচ্ছে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সেই জটিল ঘটনাবর্তে। এক দিকে পূর্ববাংলার জনগণের বিভিন্ন অংশের ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে, অন্য দিকে চলছে নানা রকম চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের জাল। অস্থির সেই ষাট দশক। বৈচিত্র্যময়ও! “কী যে হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না, কিন্তু একটা কিছু হচ্ছে”, এবং পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রযন্ত্রটি পূর্ববাংলায় আর টিঁকে থাকতে পারবে না, জেলবাসী লেনিনের এই ধারণার বিপক্ষে পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের অফিসার সাইদ রিজভী অজান্তে বলেই ফেলে; “হ্যাঁ পারবে। পাকিস্তান আর্মি পারবে। There is a master plan”! লেনিন তার রাজনৈতিক বোধ দিয়ে উপলব্ধি করে যে, যদি সত্যি সত্যিই ওরা আঘাত হানে তবে নরম বা গরম কোনো বাঙালীকেই ওরা ছাড়বে না। এবং জানে যে; “ল্যাজা বল্লম দিয়ে গুপ্ত-হত্যা করা যায়, কিন্তু পাক-আর্মিকে হারানো যাবে না।” তার বিবেচনায় রাজনীতিবিদেরা এই মহাবিপদের অবস্থা সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। বামপন্থীরাও ততটা সংগঠিত নয়। এক পক্ষ অবশ্য জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে থাকছে, কিন্তু আরেক পক্ষ ছয় দফাকে “সিআইএ-র দলিল” আখ্যা দিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখেছে এবং নিজেদের অজান্তেই হয়তো পরোক্ষে পাকিস্তানী এস্টাব্লিশমেন্টের পক্ষে কাজ করে ফেলছে। এদেশের রাজনীতিকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রয়োজন ষাট দশকটাকে যথার্থভাবে বুঝতে পারা। একজন রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে আলমগীর কবিরের গুরুত্ব এই সত্যে নিহিত যে, অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই তিনি ষাট দশকের অস্থির সময়ের নাড়ীটিকে ছুঁতে পেরেছেন। আর এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল তার কারণ এ ছবির অনেক ঘটনাই ওঁর নিজেরই জীবনের অভিজ্ঞতা, আত্মজৈবনিক।

সাংবাদিক লেনিনের মত আলমগীর কবিরও এক সময় বৃটেনের বামপন্থী পত্রিকায় কাজ করেছেন, কাজ করেছেন লন্ডনের ইস্ট পাকিস্তান হাউস সংগঠনে। আর ষাট দশকে ঢাকার রাজনীতিবিদ ও সংবাদপত্র জগতের মানুষদের তো তিনি খুব কাছ থেকেই দেখেছেন। আর তাই তো এই ছবিটিতে প্রামাণ্যতার অংশগুলি একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়েই বিদ্যমান, কারণ লেনিনের উপলব্ধিজাত ও ব্যক্ত সকল অভিজ্ঞতাই, জাতি হিসেবে, আমাদের― যৌথ অভিজ্ঞতা। সিনেমা ভেরিতের এক চমৎকার সুযোগ নেন পরিচালক ১৬ মিঃমিঃ-য়ে জহির রায়হানকে ওঁর জীবন থেকে নেয়া ছবির সেটে ধারণ করে, পেছনে আবহসঙ্গীত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, বাঙালী মাত্রকেই আপ্লুত করবে এ সিকোয়েন্সটি। কিম্বা মোনায়েম খানের ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী এনএসএফ-য়ের হাতে প্রহৃত ডঃ আবু মাহমুদের সাক্ষাৎকারটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্লানিং কমিশনের সদস্য এই বাঙালী অর্থনীতিবিদের পূর্ববাংলার সপক্ষে বক্তব্য প্রিয় ছিল না আইয়ুব সরকারের। আইয়ুব-মোনায়েমী আমলে মানুষের রাজনৈতিক শুধু নয়, সামাজিক নিরাপত্তাও যে কতখানি বিপন্ন হয়েছিল তা সাদু নামক মোনায়েমী ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীর এক প্রতিপত্তিশালী মস্তান কর্তৃক সরকারেরই সমর্থক জনৈক অধ্যাপক মিজানের স্ত্রীকে অপহরণের অধ্যায়টি তুলে ধরে। দেশের সকল নাগরিকের অসহায়তার প্রতীক হিসেবে অধ্যাপক মিজান যখন স্ত্রীকে উদ্ধার করতে একটির পর একটি টেলিফোন নম্বরে ডায়াল করতে থাকেন, এবং পরিশেষে, গভর্নর হাউস থেকেও প্রত্যাখ্যাত হন, তখন এক ফিল্ড মার্শালের রাজত্বের শ্বেত-সন্ত্রাসের স্বরূপটি, আপাত আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়েই, যথার্থভাবে ফুটে উঠে।

আইয়ুবের এক বড় সাফল্য ছিল যে সে এদেশের বুদ্ধিজীবীদের এক অংশকে কিনে ফেলতে পেরেছিল, তাদেরকে করে তুলতে পেরেছিল মেরুদন্ডহীন। ৫২-র ভাষা আন্দোলনের সাহসী লেখকও আজ রাওয়ালপিন্ডির চাপের কাছে এক শিরদাঁড়াহীন সম্পাদক মাত্র। আর এই সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক সন্ত্রাসের প্রেক্ষাপটেই জেলের ভিতরে গোয়েন্দা অফিসারের “আপনি ঠিক কি চান, বলেন তো” এ প্রশ্নের জবাবে লেনিন যখন বলে; ÒMy right to dissent, to say ‘NO’Ó -তখন তা একটা গভীর প্রতিবাদী তাৎপর্য পেয়ে যায়। রাজনীতির এই সামগ্রিক প্রেক্ষিতেই লেনিনের “পূর্ব বাংলা লিবারেশন ফ্রন্ট” সংগঠন করা। ওর ভাষায় লিবারেশন ফ্রন্ট সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করে না। যা করতে চায় জনগণকে সাথে নিয়েই করতে চায়। তবে বৃহত্তর জনগণের সঙ্গে এই সংগঠনের কোন যোগসূত্র তেমন চোখে পড়ে না। বেঝাই যায় এর সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে যতটা রোমান্টিক ভাবপ্রবণতা, ততটা কোনো দৃঢ় সাংগঠনিক বাস্তবতা নয়। ফলে প্রকৃতিগতভাবেই সংগঠনটি রয়ে যায়— জনবিচ্ছিন্ন। জেলবাসী লেনিনকে স্নেহময়ী বোনটির ভাষায়; “তোর দলের লোকজন সব কৈ ? কাউকেই তো কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না !”

বস্তুত আমাদের প্রটাগনস্টিটি, লেনিন, যে গ্রাম-বাংলার পথে প্রকৃতির অনবদ্য দৃশ্যাবলী দেখে মাউথ অর্গানে বাজায় “এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি”, তার মাঝে স্বদেশের প্রতি ভালবাসা ও কমিটমেন্টের যে সুগভীর আগ্রহ, তা’ যেন ব্যক্তির এককই। সংগঠন ভিত্তি কখনোই পায় না তা’। লেনিনের প্রিয় লেখক দেখছি হেমিংওয়ে, এবং – জ্যাঁ পল সার্ত্রে। গোয়েন্দা অফিসারটিকে তার প্রশ্ন; “আপনি জ্যাঁ পল সার্ত্রের নাম শুনেছেন?” পাক-আর্মির ইন্টেলিজেন্সের লোক আর যাই হোক, ইন্টেলেকচুয়াল, এই অপবাদ তাদেরকে কেউ দিতে পারবে না। ফলে গোয়েন্দা-অফিসারের পাল্টা প্রশ্ন; ÔIs he a film starÕ?! ষাট দশকে সার্ত্রের মত অস্তিত্ববাদী হওয়া যুগের হাওয়া ছিল। লেনিন তার থেকে ব্যতিক্রম নয়, তার সংগঠনও তাই রয়ে যায় “ওয়ান-ম্যান-পার্টি” মাত্র। জনবিচ্ছিন্ন।

লেনিনের এই যে একাকীত্ব, এই এক ধরনের আত্মসর্বস্বতা, তা সবচে বেশি বাজে তার প্রাক্তন প্রেমিকা, বাঙালী পুঁজিপতির মেয়ে, শরমিনকে। শরমিনের ভাষায়; “বোধ হয় নিজেকে ছাড়া তুমি আর কাউকে ভালবাস না।” কিম্বা “তুমি এতই আত্মকেন্দ্রিক যে কারো ভালোবাসার মর্যাদা দেয়ার মত ব্যাপ্তিও তোমার নেই।” তবে আমরা ক্রমান্বয়ে দেখব যে লেনিনের এই আত্মপরতা নিছক স্বার্থপরতা নয়। নিজ দেশের দুর্ভাগা জনগণ, তথা ষাট দশকের ভিয়েতনাম, প্যালেস্টাইন, আলজেরিয়া, লেবানন, তথা গোটা তৃতীয় বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের প্রতিই দেখি তার ভালোবাসা। তার মনোজগত ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে উন্মাদ অস্ত্র-প্রতিযোগিতার বিপদসীমা পর্যন্ত। শুধুমাত্র এক নারীর সঙ্গে সাংসারিক জোট বাঁধার মাঝে এ ধরণের মানুষের ভালবাসা কি তৃপ্ত হতে পারে? তবে একাকীত্ব সম্পর্কে আলমগীর কবির যেন আরো একটু গভীরে যেতে চেয়েছিলেন। আনোয়ার চরিত্রটি বলেছিল; “সাগরের ঢেউ দেখলেই সিসিফাসের কথা মনে পড়ে। আমরা যা করি তা সবই যেন অর্থহীন।” এবং বলা হয়; “আমরা একা। হয় তো আমরা সবাই একা।” সন্দেহ কি, এই লেনিনের প্রিয় লেখক- অস্তিত্ববাদী জ্যাঁ পল সার্ত্র।

শেষ দৃশ্যে আনাকেও পেল না লেনিন। তাকে একাই যেতে হোল। তবে এ যাওয়া কোনো পরাজিতের ফিরে যাওয়া নয়, দুর্গম পদযাত্রার পরিব্রাজকের যাওয়া, যার পথ চলাতেই আনন্দ , যাকে পার হতে হবে এক অনন্ত দুর্গম পথ। শেষ শটটিতে দুরে দিগন্তে এক পর্বতশৃঙ্গ। লেনিন একাকী সে দিকেই হেঁটে চলেছে, নেপথ্যে আবৃত্তি;

“এগিয়ে চলেছি নিরন্তর অন্তহীন

……………………..

সম্মুখে এক উদ্যত পথশৃঙ্গ।”

“রূপালী সৈকতে” ছবিতে বেশ কয়েকটি চমৎকার mise-en-scene রয়েছে। আর কয়েকটি একক শট্ তো বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। যেভাবে গ্রাম-বাংলার আখমাড়াইয়ের কলটিও ক্ষণিকে ক্ষেপণাস্ত্রের ইমেজ সৃষ্টি করে, তা অস্ত্র-প্রতিযোগিতায় আকীর্ণ বর্তমান বিশ্বের আতঙ্কের আবহটাকে চমৎকার তুলে ধরে। কিম্বা জেলখানায় পাকিস্তান সেনাবহিনীর গোয়েন্দা অফিসারের সঙ্গে (যে চরিত্রটি একটি চমৎকার টাইপেজের উদাহরণ) লেনিনের সাক্ষাৎকারের গোটা দৃশ্যটি। পাশে ফ্রেমে ধরা  ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ‘Friends Not Masters’ বইটি। গোয়েন্দা-অফিসার লেনিনের উপর নির্যাতনের কারণে সমবেদনা জানায়; “পিন্ডিতে হলে এ রকম হোত না-র,” জবাবে লেনিনের উত্তর; “হাসান নাসিরকে মেরে লাহোর ফোর্টে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।” মুহূর্তে ভেসে ওঠে পাকিস্তানের গোটা আমলটাতে প্রগতিশীলদের উপর প্রশাসনের মধ্যযুগীয় নিপীড়ন-নির্যাতনের সমগ্র চিত্রটি। সংলাপও বুদ্ধিদীপ্ত। যেমন পি, আই, ডি-র ওই সরকারী আমলা বলছে; “যখন এই দেশটি (পাকিস্তান) আর থাকবে না, তখনও আমরা থাকব।” আমলাতন্ত্রে জর্জরিত আজকের বাংলাদেশে কতই না সত্য এ কথাটি!!

তবে কিছু ছাড় আলমগীর কবির দিয়েছেন এ ছবিতে। যেমন, ভিন্ন কারো কন্ঠস্বরে গান, কিম্বা অঞ্জনার নাচ। তবে বরিশালী টোনে দুলাভাই আশীষ কুমারের কৌতুক আনন্দ দেয় যিনি মার্কস-লেনিন-সার্ত্র পড়া শ্যালকপ্রবরকে বিবাহ সম্পর্কে তার গেরস্ত জীবনের অভিজ্ঞতার সার কথাটি গভীর রাত্রিতে শুনিয়ে দিয়ে যান; “বিয়ে করে পাঠায় !”

বোন সেতার বাজায়। বোনের স্বামী তবলা। তানপুরা হতে তরুণী। সঙ্গে যুবক ধরে গান। যুগলবন্দী। একান্তই বাঙালীর সন্ধ্যা এ। একটির পর একটি শটে বৃষ্টির ইমেজ। মধ্যবিত্ত শক্তি পায় সংস্কৃতি থেকে। “মোহনা”-র স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো এক বৃষ্টির দিনে গান ধরেছিল ডঃ ইলিয়াসও। রবীন্দ্রসঙ্গীত।

“আমি যখন ছিলেম মগন ঘুমের ঘোরে

যখন বৃষ্টি নামলো

তিমির নিবিড় রাতে যখন বৃষ্টি নামলো।”

            বৃষ্টি ও বৃষ্টির গান, একটা leit motif– য়ের মতই ঘুরে ঘুরে আসে আলমগীর কবিরের ছবিগুলিতে। সংস্কৃতি যোগায় শক্তি। এই সঙ্গীত, এই সংস্কৃতি যতদিন আছে, বাঙালীকে কেউই পদানত রাখতে পারবে না।

মোহনা আবর্ত সংস্কারবাদের সীমানা

“মোহনা”-র ছবির কাহিনী সম্পর্কে আলমগীর কবিরের বক্তব্য;

“মোহনা”-র আখ্যান কিছুটা ঢাকার সন্নিকস্থ নয়ারহাট গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মীদের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা নির্ভর”।

এনজিও-দের নিয়ে এদেশের রাজনৈতিক মহলে কিছু বিতর্ক আছে। একটি এনজিও হিসেবে সাভার “গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র”-ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে, আলমগীর কবির গোটা ব্যাপারটি কোন্ দৃষ্টিতে দেখেছেন।

একজন রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে এ ব্যাপারে আলমগীর কবিরের দৃষ্টিভঙ্গীটি দ্বান্দ্বিক। প্রথম পর্যায়ে মনে হতে পারে ছবিটি এনজিও-দের বক্তব্যের সপক্ষে নির্মিত। যেমন টাইটেল কার্ডের পরে ধারাবিবরণীতে বলা হচ্ছে;

“স্বাধীনতার কিছু কাল পর কিছু সংখ্যক আদর্শবাদী ডাক্তার, নার্স, সমাজকর্মী গ্রামে যান কাজ করতে। তাদের মূল উদ্দেশ্য গ্রামবাংলার মানুষকে বুঝিয়ে দেয়া যে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কেবল শাসক বদল নয়। সাধারণ মানুষ তা বোঝে। কিন্তু প্রভাবশালীরা বুঝতে চায় না।”

গ্রামের জোতদার-চেয়ারম্যান-দুর্নীতিবাজআইনবিদ, এলিট শ্রেণীর এই কায়েমী শক্তিকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেই, দাঁড়াতে থাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। চিকিৎসার সাথে সাথে তা গ্রামীণ জনগণ, বিশেষ করে নারীদের সচেতনায়নের লক্ষ্যে কাজ করে চলে। দু:স্থ নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির অন্বেষা সামাজিক বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করেই বেড়ে ওঠে। ময়না জিজ্ঞেস করেছিল কুলসুমকে;

“ময়না          : স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কাম করলে মাইন্ষে বদনাম দিব না?

 কুলসুম : গেরামের মাইন্ষে খাইতে দিব? ইজ্জত লইয়া কাম করতে দিব! থোও ফেলাইয়া।”

কিছুটা বিবেকবান গফুর মাস্টার তার দীর্ঘ গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতায় জানে যে; “গাঙ্গে মাছ অনেক, কিন্তু রাজত্ব করে গোটা চাইরেক কুম্ভীর।” স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারকে সে গ্রামের কায়েমী স্বার্থবাদীদের সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে চায়; “তা কথা কি ডাক্তার সাহেব নদীতে যখন নামছেন- সাবধানে সাঁতরাইয়েন।”

আর গাঁয়ের উঠতি তরুণ মজিদের কথা; “আপনারা বিপ্লব করতাছেন ভালা। কিন্তু বড় স্লো। আমার অত সময় নাই। আমার অনেক ট্যাকার দরকার, অহনি।”

গাঁয়ের নিস্তরঙ্গ জীবনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির আবির্ভাব বিভিন্ন শ্রেণীর মাঝে কি কি অভিঘাত সৃষ্টি করে, সে পর্যায়ে আলমগীর কবিরের চিত্রনাট্য বুদ্ধিদীপ্ত। সোলেমান উকিল চিন্তাগ্রস্ত যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারটি পাছে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ইলেকশনে দাঁড়িয়ে তাকে হারিয়ে দেয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিরুদ্ধে কি করা যায় সে ব্যাপারে নির্বাচনসচেতন উকিল চেয়ারম্যানকে বলে;

“যাই-ই করেন সাত গেরামের মাইনষেরে লইয়া করতে অইব। খেয়াল করছেন তো এরা গেরামের বাড়িতে বাড়িতে যায়, চিকিৎসা করে! আপনে আমি কি করি?”

আর চেয়ারম্যান আতঙ্কিত পাছে তার শক্তিকাঠামোতে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র চিড় ধরায়। গ্রামের কায়েমী স্বার্থবাদীদের কাছে তাই এই এনজিও কর্মীরা “কম্যুনিস্ট”, “নকশাল” ইত্যাদি আখ্যা পায়। তাদের বিরুদ্ধে চলতে থাকে নানা প্রকার অপপ্রচার। ভাড়াটে ডাকাতদল দিয়ে এনজিও কর্মীদের ক্যাম্পে আক্রমণ চালানো হয় এবং এক পর্যায়ে চেয়ারম্যানের ভাড়াটে খুনীদের দ্বারা ক্যাম্পের তরুণ ডাক্তার ইলিয়াস নিহত হয়, যে ধরনের একটি ঘটনা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ইতিহাসে বাস্তবেও ঘটেছিল বলে জানা যায়, এবং একটি সিনেমা ভেরিতে চলচ্চিত্র হিসেবে, মোহনা ছবিতে পরিচালক কাহিনীর সঙ্গে এইসব বাস্তব ঘটনাগুলিকে মেলাতে চেয়েছেন। আর এই সব কিছুর ব্যাপারে থানার দারোগা, যিনি একাত্তরের পঁচিশে মার্চের রাতে রাজারবাগ পুলিশ প্রতিরোধ লড়েছিলেন, তিনিও ড: মুস্তফাকে শুধুমাত্র সতর্ক করে দেওয়ার বেশি কিছু করতে পারেন না ! কারণ এক রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেও গ্রামসমাজের শক্তিকাঠামোটা তো রয়েই গেছে আগের মতই।

গ্রামের এলিটদের সভায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জন্য ড: মুস্তফা আরো কিছু জমি চান;

“চেয়ারম্যান সাহেব। আমাদের ক্যাম্পের দক্ষিণে আপনার যে অনাবাদী জমিটুকু পড়ে আছে, ওটা পেলে এখনই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওয়ার্কশপ তৈরীর কাজে হাত দিতে পারি”।

পরবর্তীতে বাস্তবে পত্রিকায় আমরা দেখব যে এই জমি প্রশ্নে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সঙ্গে এলাকাবাসীদের বিরোধের একটি সত্য ঘটনার বিবরণ। বস্তুত: এনজিও বিষয়ে ও তাদের উন্নয়নের মডেল বিষয়ে যেসব বিতর্ক আজ আমদের সমাজে চলছে, তার অনেক কিছুর প্রতিই সেই ১৯৮২ সালেই আলমগীর কবির ইঙ্গিত করে গেছেন, যেমন এদের বিদেশ-নির্ভরতা ;

“চেয়ারম্যান : এতসব দালানকোঠা বানাইয়া যন্ত্রপাতি বওয়াইতে তো অনেক টাকা লাগনের কতা-

            মুস্তফা                         : হ্যাঁ, ৫০/৬০ লাখতো লাগবেই।

            এ্যাডভোকেট             : ওরে বাবা! এতো টাকা দেবে কে? গভমেন্ট ?

            মুস্তফা             : গভর্নমেন্ট এক জমি ছাড়া আর কিছু দেবে না। কয়েকটা বিদেশী সাহায্য সংস্থার সঙ্গে কথা চলছে।”

বস্তুতঃ  স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির দর্শন ও কর্মপদ্ধতির যা সীমাবদ্ধতা তা সকল সংস্কারবাদী কার্যক্রমেরই সীমাবদ্ধতা। এবং আগেই বলেছি এ ব্যাপারে আলমগীর কবিরের দৃষ্টিভঙ্গীটি— দ্বান্দ্বিক। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ইতিবাচক দিকগুলি যেমন দেখিয়েছেন তেমনি এর নেতিবাচক কিছু দিক দেখাতেও ভোলেননি। যেমন ড: মুস্তফাকে বলতে শুনি; “মেয়েকে দেখতে আমাকে একটু ইংল্যান্ডে যেতে হবে”- মুহূর্তেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে ডাক্তারের নিজস্ব শ্রেণীঅবস্থানটি। গ্রাম-বাংলার নারীদের মুক্তির জন্যে যিনি কাতর তিনি তার নিজের পরিবারকে কিন্তু সুখে স্বাচ্ছন্দ্যেই রেখেছেন― বিলাতে। এই স্ববিরোধিতা, এনজিওতে কর্মরত প্রায় সকল এলিটদেরই স্ববিরোধিতা। শেষের দিকে ময়না-মজিদদের অনুরোধ উপেক্ষা করে ডাক্তার পলায়নরত। এ পর্যায়ে একটি চমৎকার টপ শট্ ব্যবহার করেছেন আলমগীর কবির। ডাক্তার ও মুকুন্দ নৌকায়। ডাক্তারের চোখে মুখে পরাজয় ও পলায়নের ছাপ সুস্পষ্ট। ক্যামেরা নদীর পার থেকে ডাক্তারকে ধরে জলের বিপরীতে। চমৎকার সিনেমাটিক একটি শট। আমার বিবেচনায়, কবিরের সৃষ্টি-সম্ভারে অন্যতম সেরা একক অর্থবহ শট্ এটি।

আর সচেতনায়নের দিক দিয়ে একজন সরলা গ্রাম্য তরুণী ময়নার একজন আত্মনর্ভরশীল নারীতে পরিণত হওয়া, ময়নার এই হয়ে-ওঠা, নিঃসন্দেহে ছবিটির এক ইতিবাচক দিক। অবশ্য ময়নার একটি সংবেদনশীল মনের পরিচয় পরিচালক আমাদের আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। যে গ্রাম্য মেয়েটি একা একা তার খাতায় লিখেছিল; “যাহার কাছে খাদ্যই স্বর্গ তাহার কাছে ক্ষুধাই নরক” কিম্বা; “শিশু তার খেলনা খেলিয়া বেড়ায়, বয়স্ক তার খেলনা গোপন করে”, তার পরিণতমনস্কতা সম্পর্কে সন্দেহ থাকে না, এবং তার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সম্পর্কেও।

আর ময়নার বোকা হাবা স্বামী মজনুর কুসংস্কারের তাবিজটা নদীতে ছুঁড়ে ফেলে সারল্য থেকে অভিজ্ঞতার স্তরে উত্তরণের যে সচেতনায়ন— তাও তো খুব ইতিবাচকই।

গোটা “মোহনা” ছবিটির বিষয়বস্তুর একটি বড় দিক আবর্র্তিত হয়েছে সমাজে নারীর অবস্থান বিষয়ে, যার অন্যতম বাহ্যিক রূপটি হচ্ছে- যৌতুক। ধনী চেয়ারম্যান পুত্রের যৌতুক হিসেবে কন্যাদায়গ্রস্ত অসহায় গ্রাম্য মাস্টারের কাছে কিছুই চায় না !

“ময়নারে আপনাগো কিছুই দেওন লাগবে না। আমাগো ঘরের বউ আমরাই সাজাইয়া লইয়া যামু। আপনে শুধু আমার মজনুরে একখানা মোটর সাইকেল, একটা সিকো ঘড়ি আর একটা স্যুট পীস্  দিয়া সমাজে আমার মুখখান রক্ষা কইরেন”!!

হিন্দুঘরের চিরদুঃখী মেয়ে সবিতা। অসহায় পিতা পণের টাকা যোগাতে পারেনি বলে হবু বর বিয়ের আসর থেকে উঠে চলে গিয়েছিল। অনেক দুঃখেই বলেছিল সবিতা ;

            “নিজের পছন্দ-অপছন্দ করার অধিকার কুকুর বিড়ালেরও আছে। কিন্তু আমার ছিল না।”

সবিতা ময়নাকে আরো বলে যে শুধু গ্রামে নয়, শহরেও (এবং শিক্ষিত হলেও) নারীর সমস্যার অন্ত নেই ;

            “পুরুষ মানুষ চাকুরী পাইল, সকাল থিইক্যা আট ঘন্টা ঠিক মত কাম করলো তো অইলো। মাইয়া মানুষরে চাকরী দিলো তো ঘাড়ে চইড়া বইলো। অফিসের কামতো করবাই। তারপর বড় সাহেবের গেস্ট আইলো তো চা-কফি বানাইয়া খাওয়াও। অফিসের পর সাহেবের লগে সাইজা গুইজা রেস্টুরেন্টে খাইতে যাও। আর তা না অইলে চাকরী নাই।”

বোনের যৌতুকের টাকা উপার্জনের উদ্দেশ্যে ভাইয়ের মধ্যপ্রাচ্য যাবার প্রচেষ্টা। মধ্যপ্রাচ্য― আজকের গ্রামবাংলায় এও এক বাস্তবতা। একে রয়েছে পেট্রো-ডলারের হাতছানি, তার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে মিলেছে দুম্বা-উটের পবিত্র ধর্মের ভিয়েন। মানিকগঞ্জের এন্তাজ মিয়ার মত আড়কাঠিরা তাই আজ বেশ সফলভাবেই ঘুরছে গ্রাম বাংলার আনাচেকানাচে। আরবীয় পোশাকের ছদ্মবেশে “আবু ধাবী কনস্ট্রাকশন কোম্পানী”র এদেশীয় আদমব্যাপারী ও দেশী টাউটেরা মিলে যেভাবে সর্বস্বান্ত করল সরল মজিদকে, সে সিকোয়েন্সের একটা সামাজিক তাৎপর্য রয়েছৈ বৈ কি।

ময়নার সখী সিনেমা-আক্রান্ত সকিনা যেন প্রতীকে চলচ্চিত্র নামক এই চকমকে মাধ্যমটি, ও তারও চেয়ে চকমকে তারকাদের প্রতি, সাধারণ মানুষের বিকারগ্রস্ত মোহের চিত্রায়ন। কিনার ভাষায়; “আমার কাছে ববিতারে যা ভালা লাগে না! খালি ইচ্ছা করে হের মত কতা কই। হের মত শাড়ী বেলাউজ পরি। জানস, এইবার না চাইরডা বেলাউজ বানাইছি ববিতার ডিজাইন দেইখ্যা”! তার প্রিয় ঠাট্টার বিষয়, বাংলা-বায়োস্কোপকে সুযোগ বুঝে আবারও একহাত ঠাট্টা করে নিলেন আলমগীর কবির!

পরিপূর্ণভাবে একটি অতঁর (Auteur) চলচ্চিত্র নির্মাণের আকাঙ্খায় এ ছবির চিত্রগ্রহণের কাজও আলমগীর কবির নিজেই করেছেন। এ সম্পর্কে ওঁর বক্তব্য;

            “…..এইসব তথ্য মনে রেখেই মোহনা নির্মিত হয়। ক্যামেরার কাজ নিজেই করেছি। সম্পাদনাও। গতানুগতিক সকল ক্যামেরা মুভমেন্ট, যেমন pan, tilt, trolley প্রভৃতি ইচ্ছাকৃতভাবেই বর্জন করা হয়েছে। কেবল ব্যবহৃত হয়েছে space । ক্যামেরা কখনো মাটিতে, কখনো গাছের ডগায়। ফলাফল মিশ্র। এই টেকনিকে কম্পোজিশনের সীমাহীন সৃজনী সুযোগ পূর্বে অনাবিষ্কৃত দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আবার কোনো কোনো সময় অনেক সাধারণ সোজা শট যা হয়তো সামান্য একটি tilt বা pan -য়ে সম্পন্ন করা যেত সেটি অনড় ক্যামেরায় নিতে গিয়ে ঘর্মাক্ত হতে হয়েছে।”

নিরীক্ষার এই উদ্যোগী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বলব যে চিত্রগ্রহণ এই ছবির সবল কোনো দিক নেয়। চলচ্চিত্র আলোকচিত্রিক মাধ্যমে। চিত্রগ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়ে গেলে তা শিল্পকর্ম হিসেবেও দূর্বল হতে বাধ্য। ছবিটির আরেকটি দূর্বল দিক নি:সন্দেহে পোশাক-আশাক-চুলের স্টাইল এবং অন্যান্য বিবিধ ডিটেল্স, যা চরিত্রদেরকে গ্রামীণ ভাবতে বাঁধার সৃষ্টি করেছে। ছবিটি রঙীন হওয়ায়, রঙের ঔজ্জ্বল্য হেতু বিশ্বাসযোগ্যতার বাঁধাটি আরো বেড়েছে।

স্বল্পদৈর্ঘ্যে ব্যাপ্তি অন্যান্য প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের ছবিকে বায়োস্কোপের যুগ থেকে আধুনিক চলচ্চিত্রে আনার ক্ষেত্রে সাদেক খানের ‘নদী ও নারী’ও শাকের-নিয়ামতের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’-র ব্যতিক্রম দু’টি বাদে, জহির রায়হানের পর যাঁর সবচে বড় অবদান, তিনি নিঃসন্দেহে― আলমগীর কবির। এদেশে চলচ্চিত্রের নিজেস্ব ভাষা প্রতিষ্ঠায় ওঁর সংগ্রাম বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ওঁর স্থানকে সুনিশ্চিত করেছে , যদিও শেষ পর্যায়ে বাণিজ্যপুঁজির ঘাটে সাময়িকভাবে ঠেকে যেয়ে ‘পরিণীতা’-র মত সরল-গল্প-বলাটা ওঁর পক্ষে কাক্সিক্ষত ছিল না। তবে এই ছবিটি ব্যতিক্রম, কবিরের মূল স্রোত তা নয়।

চলচ্চিত্র শুধু দৃশ্যগত নয়, শ্রাব্যমাধ্যমও বটে। সেক্ষেত্রে এই গ্রাম্যতার দেশে আলমগীর কবিরের ছবিগুলির রুচিশলি ও বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ নিঃসন্দেহে এক বড় প্রাপ্তি। সাউন্ডট্রাকে আবহসঙ্গীতের আকারে কখনো ভূপেন হাজারিকা, কখনো হেমন্ত বা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে পাওয়াও এক প্রাপ্তি। সিনেমা ভেরিতে ধারার একজন পরিচালকের ছবিতে অন্যের কন্ঠে সঙ্গীত কাঙ্খিত নয় তেমন। তবে আলমগীর কবিরের পক্ষে যুক্তি এটুকু যে এদেশের চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের ব্যবহারের ঐতিহ্যকে মনে রেখে যে কয়েকবার তিনি সঙ্গীতকে ব্যবহার করেছেন, তা করেছেন মুলত রুচিশীলতার মানটি বজায় রেখেই।

চলচ্চিত্রের অন্য যে মাধ্যম, প্রামাণ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য, সেখানে আলমগীর কবিরের পদচারণা বলিষ্ঠ। স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘লিবারেশন ফাইটার্স’, ‘পগ্রম ইন বাংলাদেশ’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ বা ‘মণিকাঞ্চন’― কবির সর্বদাই তীক্ষèভাবে রাজনৈতিক। আর তাই আমাদের এখানে নির্মিত এযাবৎ কালের অন্যতম সেরা প্রামাণ্য ছবিটি, জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ -য়ে ওঁর সম্পৃক্তি, যেন স্বতঃসিদ্ধই। ওঁর সর্বশেষ স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিটি ‘মণিকাঞ্চন’-য়ের কথাই ধরা যাক। প্রথম শটেই দুর্নীতিবাজ আমলাটিকে যেভাবে ফ্রেমে ধরা হয়, তা মুহূর্তে তার শ্রেণীঅবস্থানকে ফুটিয়ে তোলে। এবং নদী থেকে দেখা যায় নগরীর ফ্লাটবাড়িসমূহ― ঢাকার ক্রমঅপসৃয়মান আকাশ সীমানা (আবারও তাঁর প্রিয় ঢাকা নগর!)। এবং এদেশের নব্যধনী ও পরশ্রমজীবী বুর্জোয়া নারী-পুরুষদের নানা দুর্নীতি ও নষ্টামির মাঝে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষদের রহংবৎঃ শট্গুলি, এসবই ওঁর তীক্ষè সমাজবোধেরই প্রকাশ। এবং তাই-ই যেন সামরিক সরকারের মন্ত্রী টাউট রাজনীতিবিদটি যখন ছাত্র আন্দোলন বন্ধ করার ব্যাপারে বলে; ÒThey can join army and capture power” তখন সেই প্রশ্নকর্তা বিদেশী সাংবাদিকটি হয়ে যান আলমগীর কবির নিজেই, আমাদের বিবেকেরই প্রতিনিধি যেন।

শিল্প সৃষ্টি ছাড়াও একজন শিল্পীর কিছু সামাজিক দায়ভাগ থাকে। সাংগঠনিক। আলমগীর কবিরের চেয়ে ক’জন চলচ্চিত্রকারই বা সে দায়িত্ব বেশি পালন করতে পেরেছেন? চলচ্চিত্রের নামে এদেশের ফিলিস্টাইন বাণিজ্যিক বায়োস্কোপের অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরতে শক্ত হাতে কলম ধরে তিনি এদেশের চলচ্চিত্র সমালোচনাকে একটা শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করে গেছেন। লিখেছেন একাধিক পুস্তক। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে সংগঠিত করতে ঘুরেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বগুড়া থেকে সেই কাজেই ফেরার পথে যমুনায় ডুবে দুঃখজনক মৃত্যু ঘটল ওঁর। আজীবন প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ প্রদান করে গেছেন নবপ্রজন্মের একঝাঁক তরুণকে আধুনিক চলচ্চিত্রের ভাষা প্রয়োগে। এসবই কম কী !

এবং রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের সেই দিনগুলিতে, আমাদের সবচে গৌরবের, সবচে যন্ত্রণার সেই দিনগুলিতে, দেখি ক্যামেরা হাতে ওঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা। এবং কণ্ঠে ÒThis is Radio Bangladesh” কে ভুলতে পারে! মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন মুক্তিযুদ্ধ আজো শেষ হয়নি। মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, তার কী শেষ আছে? সেই সংগ্রামে ছিলেন আজীবন। এক নোংরা বাণিজ্য পুঁজির চক্রের বিরুদ্ধে, ফিলিস্টাইন দর্শক-সমালোচকদের বিরুদ্ধে, এবং নিজের বিরুদ্ধেও, নিয়ত সংগ্রামরত এক অবরুদ্ধ হারকিউলিস যেন ছিলেন আলমগীর কবির। ঈজিয়নের আস্তাবল পরিষ্কার করার কঠিন কাজটি মাঝপথে অসম্পূর্ণ রেখেই যাঁকে চলে যেতে হোল।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত