আমার সাইকেল শেখা

আকাশী নীল রংএর হীরো সাইকেল।আমার পক্ষীরাজ।সাত বছর বয়স থেকে সাইকেল চালাতাম আমি।প্রথম সাইকেলটি ছিল আকারে ছোট, বেশ কম উচ্চতার।ওতেই আমার সাইকেল শেখার হাতেখড়ি। বাবার সাথে খুব ভোরে বের হতাম সাইকেল চালানো শিখতে।বেশ শিখে গেলাম বেশ অল্প সময়ে।সেই সাইকেলে চড়েই ঘুরতাম,আর্ট স্কুলে যেতাম।বয়স আর উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে প্রমাণ মাপের সাইকেলের দরকার পড়ল।অবশ্য সেই দরকারটা আমার চেয়ে বাবা আগে বুঝেছিলেন। আমার কোনকালেই খুব বেশি চাহিদা ছিলো না। সেই ছোট বেলায়ও না। বাবাকে কোনদিন বলিনি, আমায় বড় সাইকেল কিনে দাও। না চাইতেই পেয়েছিলাম,যেটা কেনার কিছুদিনের মধ্যেই চুরি হয়ে গেলো এক ঝড় বৃষ্টির রাতে। চোর এসে গ্রীল ভেঙে আমার নতুন সাইকেল,ছাতা,একজোড়া নতুন জুতো নিয়ে চম্পট। না,মানে এতটাও খারাপ নয়,যাবার সময় নিজের পুরোনো ছেঁড়া জুতোজোড়া রেখে গিয়েছিলো।

যাই হোক, যেটার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম,সেই আকাশী নীল হীরো সাইকেলটা আমার তিন নম্বর সাইকেল।অনেক ঝড়ঝাপটা সহ্য করেছে বেচারা। আগেই বলেছি,খুব ছোট থেকে সাইকেল চালাই আমি।
এবার যখন বড় সাইকেল এল, প্রথম সমস্যা হল সাইকেলে ওঠা ও নামা।চালাতে তো পারি।কিন্তু উঠতেও পারি না, নামতেও না।রোজ সকালে ওঠা নামা শেখা,সে আরেক যুদ্ধ। বাবা সিটের পেছনটা চেপে ধরে থাকতো। আমি উঠে চালিয়ে আবার বাবার কাছে ফিরে আসতাম।বাবা সাইকেল ধরলে তবে নামতে পারতাম। একদিনের ঘটনা বলি। সকালে সাইকেল প্র‍্যাক্টিস করতে বেরিয়েছি। সেদিন বাবা কোন কারনে ছিলো না।মা এসেছিলো সাথে। তা মা তো সাইকেল ধরলো। আমিও উঠে চালিয়ে এগোচ্ছি।মা আবার না ধরলে নামতে পারবো না। মা তো আর আমার সাইকেলের সাথে ছুটতে পারবে না। আমায় মায়ের কাছে ফিরে আসতে হবে নামার জন্যে। তো হয়েছে কি,কিছুটা এগোনোর পর গলিতে একটা কুকুর দাড়িয়ে। আর তখন আমি কুকুর ভীষণ ভয় পেতাম।আর না পারছি এগোতে,না পিছোতে। মা পেছন থেকে চিৎকার করছে,পাশ কাটিয়ে বেড়িয়ে যা,কিচ্ছু করবে না। আরে কিচ্ছু করবেনা সেটা তো তুমি জানো,কুকুর কি জানে? ভয়ের চোটে হড়বড় করে ধরাম্।পড়বি তো পড় সাইকেল শুদ্ধু কুকুরের ঘাড়ে। কোনরকমে উঠে সাইকেল ফেলে দৌড়।বেচারা কুকুরটার কি হোলো ফিরে দেখার অবস্থা ছিলনা। স্বভাবতই সেই ঘটনার পর থেকে মা আমার সাইকেল ট্রেইনিং এ ইস্তফা দিয়েছিলো।

সাইকেল শুদ্ধ ড্রেনে পড়ার রেকর্ড আছে আমার। হাই ড্রেইন,কাঁচা নর্দমা কোনটা ছাড়িনি। সাইকেল শুদ্ধ পড়েছি ড্রেইনে।আর কাঁচা নর্দমার অভিজ্ঞতাটা তো আরও চমকপ্রদ। আমি বেশ সকালে সাইকেল প্র‍্যাকটিস করতে বেরতাম। সেদিনও বেড়িয়েছিলাম রোজকার মত।ভোরের ফুরফুরে মনোরম হাওয়া, কি যে ভাবছিলাম কে জানে। কুচবিহারের রাস্তা এমনিতে যথেষ্ট চওড়া। আর ভোরের ফাঁকা রাস্তায় চেষ্টা করলেও ড্রেইনে পড়া অসম্ভব। কিন্তু, মানুষটা যে আমি। আর আমার শব্দকোষে অসম্ভব শব্দটাই নেই। আমি শুকনো মেঝেতে আঁছাড় খেতে পারি,ফাঁকা রাস্তায় ড্রেইনে পরতে পারি,পরীক্ষা দিতে গিয়ে অর্ধেক প্রশ্নপত্রের উত্তর করে অর্ধেক চোখেই না দেখে বাড়ি চলে আসতে পারি,এরকম আরও অনেক কিছু পারি, যেগুলো আর কেউ ভাবতেও পারে না। সে যাক,নিজমুখে নিজ গুণকীর্তন করতে একটু একটু লজ্জা করছে।

হ্যাঁ তা যা বলছিলাম। দিব্যি সাইকেল চালিয়ে আসছি। ততদিনে উঠতে নামতেও শিখে গিয়েছি। মা বাবার দরকার পড়ে না আর।একাই সকালে সাইকেল নিয়ে প্রাতঃভ্রমণে বেরোই রোজ। বাড়ি আর মিনিট দশেকের রাস্তা। হঠাৎ সম্মুখে শমন। আবার কুকুর।এবার কুকুর একা নয়,সাথে কুকুরের মালিকও আছে। চেইনে বাঁধা বিশালাকার অ্যালসেশিয়ান,আমায় দেখে খুব একটা পছন্দ হল না বোধ হয়। তারস্বরে মাতৃভাষায় অভিযোগ জানাতে শুরু করল। আমি চেষ্টা করেছিলাম পাশ কাটানোর,সত্যি বলছি।কিন্তু ওই। কপাল। ল্যাগব্যাগ করতে করতে সোজা পাশের কাঁচা নর্দমায়।

সে এক দৃশ্য। কোমর অব্দি নর্দমার কালো পাঁকে ডুবে আছি। এমন সময় ত্রাতা মধুসূদনের বেশে মঞ্চে আবির্ভূত হলেন কুকুরের মালিক। এতক্ষন কুকুরের ভয়ে তার দিকে চোখ যায়নি। এবার দেখলাম। বেশ সুদর্শন, অল্পবয়সী একটি ছেলে। আমার চেয়ে কিছু বড় হবে। হে ভগবান,এই ছিলো তোমার মনে? এরকম কারো সাথে যদি দেখা হওয়ারই ছিল,একটু ভালো আবহ মাথায় এল না? কুকুরটিকে রাস্তার খুঁটে বেঁধে এগিয়ে এল। একে একে সাইকেল ও আমায় উদ্ধার করলো নর্দমা থেকে। ততক্ষনে সেও কাঁদায় মাখামাখি। তারপর রাস্তা পাশের টিউবকল চেপে আমার ও সাইকেলের স্নানের ব্যাবস্থা করল। কিছুটা ভদ্রস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম কোনরকমে। ঠিকমত ধন্যবাদ জানানোর মত মনের অবস্থা ছিলনা।এরপরও ওই রাস্তা দিয়ে অনেক যাতায়াত করেছি। কোনদিন আর দেখা হয় নি।

আমার সেই সাইকেলটা আজ আর নেই।আমি বাড়ি ছাড়ার পর ওটাও চুরি হয়ে গেছে। ভোর থেকে রাত,কুচবিহারের রাস্তায় টো টো করে চড়ে বেরিয়েছি ওই সাইকেলকে সঙ্গী করে। আমার অনেক সুখ দুঃখ হাসি কান্নার সাক্ষী ছিল সে। আমার কৈশোরের সাথে সাথে সেও হারিয়ে গেল। ইচ্ছে করে,খুব ইচ্ছে করে,যদি একবার সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম,যদি একবার আমার আমার আকাশী নীল হীরোটা নিয়ে কুচবিহারের রাস্তায় ঘুরতে পারতাম সেই আগের মত। জানি সব ইচ্ছে সবসময় পূরণ হয় না।তবু তারা থাকে মনের গভীরে।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত