গ্রিক উপকথার নারী যোদ্ধা ‘এ্যামাজন’

এ্যামাজন নারীযোদ্ধা। সুদূর অতীতের কোথাও কি গড়ে উঠেছিল একটি নারীরাজ্য? যে নারীরাজ্যটিতে কেবল বাস করত নারীরা-যে নারীরাজ্যটি তে পুরুষের কোনওই অস্তিত্ব ছিল না। কী এর কারণ? যা আজও বিস্ময় ও কৌতূহলের সৃষ্টি করে চলেছে এবং অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। কেন তারা গড়ে তুলেছিল পুরুষবিহীন রাষ্ট্র? সুন্দরী রক্তপিপাসু নারী যোদ্ধাদের কথা ইউরোপীয় উপকথায় রয়েছে। কেমন ছিল এ্যামাজন যোদ্ধা নারীরা ? ইউরোপীয় মননে এ্যামাজন নারীদের প্রভাব এতই গভীর যে স্পেনিশ অভিযাত্রী ফ্রানসিসকো দে ওরেলানা দক্ষিণ আমেরিকার সবচে বড় নদীটির নাম দিয়েছেন এ্যামাজন । কেন? কারণ সেই নদীর পাড়ে যুদ্ধংদেহী নারী যোদ্ধাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন…
‘এ্যামাজন’ নারীরা যোদ্ধাদের কথা গ্রিক উপকথায় উল্লেখ আছে। গ্রিক উপকথামতে যুদ্ধের দেবতা আরেস ও সমুদ্রশঙ্খিনী (সি নিম্ফ) হারমোনিয়া থেকে ‘এ্যামাজন’ নারী যোদ্ধারা উদ্ভূত । তারা উপাসনা করত দেবী আর্তেমিসের।

কেবল উপকথা নয়, ঐতিহাসিক হিরোডোটাসও ‘এ্যামাজন’ নারীদের কথা উল্লেখ করেছেন। হিরোডোটাস এর মতে ‘এ্যামাজন’ নারী যোদ্ধারা পুরুষ খুনি! তারা বিরতিহীন ভাবে যুদ্ধ করেই যেত গ্রিক এবং অন্য জাতির বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধকে গ্রিক ভাষায় বলা হয় Amazonomachy বা এ্যামাজন যুদ্ধ। ‘এ্যামাজন’ নারী যোদ্ধারা এমন কী ট্রয়যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তারা ট্রয়ের পক্ষেই ছিল। ‘এ্যামাজন’ রানী কে হত্যা করেছিলেন গ্রিকবীর অ্যাকিলিস।
কিন্তু কোথায় ছিল ‘এ্যামাজন’ নারী যোদ্ধাদের রাজ্য?
এশিয়া মাইনরে অবস্থিত কৃষ্ণসাগর। গ্রিকরা মনে করত ‘এ্যামাজন’ নারী যোদ্ধাদের রাজ্যটি ছিল এই কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে।

এবার Amazon শব্দটির উদ্ভব বিষয়ে আলোচনা করা যাক।
এ্যামাজন নারীরা ছিল মূলত যোদ্ধা। সে কালে তীরধনুক ছিল অন্যতম যুদ্ধাস্ত্র। এ্যামাজন সমাজে মেয়েদের বালিকা বয়েস থেকেই হতে হত দক্ষ তীরন্দাজ । ধনুক বাঁকাতে বুকে ডান দিকে চাপ পড়ে; যে কারণে বালিকার ডান স্তনটি নাকি তার মা পুড়িয়ে ফেলত। গ্রিক ভাষায় স্তনশূন্যতাকে বলে: এ্যামাজন। a মানে, ছাড়া; আর mazos মানে স্তন। এটি অবশ্য লোকভাষ্য। এর কোনও ভিত্তি নেই। কেননা, বর্তমান কালে নারী তীরন্দাজের শরীর অন্তরায় নয়। তা ছাড়া এ্যামাজন বালিকাদের স্তন পোড়ানোর বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞ অবশ্য অস্বীকার করেন। তারা বলেন যে এতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হত সেটির চিকিৎসাকৌশল সেকালে আয়ত্ম সম্ভব ছিল না!
গ্রিক ভাষ্যমতে এ্যামাজন নারীদের সমাজ পুরুষশূন্য মাতৃতান্ত্রিক সমাজ । পরিশ্রমের কাজ করত দাসীরা। বছরে একবার প্রতিবেশী রাজ্যে যেত। উদ্দেশ্য যৌন মিলন। পুত্রসন্তান জন্মালে মেরে ফেলত কিংবা বাবার কাছে রেখে আসত। প্রথম তারাই ঘোড়াকে বশ মানিয়েছিল। তীরধনুক ছাড়াও যুদ্ধে ব্যবহার করত বর্শা ও কুঠার।
গ্রিক ভাষ্যমতে এ্যামাজন নারীদের সমাজ শাসিত হত একজন রানীর মাধ্যমে। রানী হিপ্পোলিটা ছিলেন একজন বিখ্যাত নারীশাসক। আমি বারবার গ্রিক ভাষ্যমতে বলছি । কেননা, উল্লিখিত তথ্যগুলির উৎস গ্রিক উপকথা ও ঐতিহাসিক হিরোডোটাস। পরে আমরা এ্যামাজন নারীদের বিষয়ে আধুনিককালের ঐতিহাসিকদের বক্তব্য উল্লেখ করব। যা হোক। এ্যামাজন রানী হিপ্পোলিটার বাবা ছিলেন যুদ্ধের দেবতা আরেস। আরেস কন্যাকে একটি যাদুময় কোমারবন্ধনী (গার্ডেল) উপহার দিয়েছিলেন। যা হোক। আমরা উপকথায় প্রবেশ করি। …থেসিয়াস ছিলেন পুরাকালের এথেন্স নগরীর একজন রাজা। তিনি গ্রিক উপকথার স্বর্গীয় বীর হেরাক্লেস কে এ্যামাজনদের বিরুদ্ধে সমরাভিযানে প্রেরণ করেছিলেন। সেই অভিযানে রাজা থেসিয়াস নিজেও অংশ গ্রহন ছিলেন। আসলে সেই অভিযানের পিছনে ছিল রানী হিপ্পোলিটার যাদুময় কোমারবন্ধনীর লোভ। যা হোক। এশিয়া মাইনরের কূলে রাজা থেসিয়াস এর জাহাজ ভিড়ল । ধরা যাক আজকের তুরস্কের উপকূলে। রাজা থেসিয়াস প্রথমেই আক্রমনাত্মক ভূমিকা অবলম্বন করলেন না । রানী হিপ্পোলিটা সন্তুষ্ট হয়ে হাজারো উপঢৌকন নিয়ে স্বয়ং গ্রিক জাহাজে এলেন। রানী হিপ্পোলিটা সম্ভত রূপবতী ছিলেন। কিংবা রাজা থেসিয়াস ছিলেন পুরুষ! জাহাজে উঠতেই জোর করে রানী হিপ্পোলিটা কে বিয়ে করে বসলেন রাজা থেসিয়াস । যাক বিয়ে করলেন! না করলেও পারতেন। জাহাজ ভেসে চলেছে পশ্চিমমূখি। জাহাজ যখন এথেন্স বন্দরে ভিড়ল ততদিনে রানী হিপ্পোলিটা গর্ভবতী। ওদিকে রাজা থেসিয়াস-এর এই জঘন্য অপকর্ম আরও একটি Amazonomachy-এর জন্ম দিল।
রানী হিপ্পোলিটা যথা সময়ে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। সেই পুত্র সন্তানের নাম রাখা হল হিপপোলিটাস। রাজার মোহভঙ্গ হল। রাজা হিপ্পোলিটা কে বললেন, ‘এবার তুমি নরকে যাও।’ হিপ্পোলিটা মনে আঘাত পেলেন। ফিরে গেলেন এশিয়া মাইনরে এ্যামাজনদের রাজ্যে ।
এখানেই শেষ নয়।
রাজা থেসিয়াস বিয়ে করলেন ফেড্রাকে। কে ফেড্রা ? ফেড্রা ছিলেন ক্রিট দ্বীপের রাজা মিনোস এর কন্যা। এই মিনোসের নামেই ক্রিট দ্বীপের সভ্যতাকে বলা হয় মিনিয় সভ্যতা। যাক হোক। ঘটনা মোড় নিল অন্যদিকে। হিপপোলিটাস তখন কিশোর। কিশোর হিপপোলিটাস এর প্রেমে পড়লেন ফেড্রা । (উপকথা কেন এত লোকপ্রিয় তা নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে!) হিপপোলিটাস -ফেড্রার ভালোবাসা নিয়ে গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদেস নাটক লিখেছেন । দু-বার সে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন এথেন্সের নাট্যশালায়। এমন কী শেকসপীয়ারের ‘আ মিডসামার নাইটস ড্রিম’ নাটকে আমরা রাজা থেসিয়াস আর রানী হিপ্পোলিটা দেখতে পাই।
গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস যাদের ‘পুরুষ খুনি’ বলেছেন, তারা আসলে কারা? গ্রিক উপকথার সেই ‘এ্যামাজন’ নারী যোদ্ধারা আসলে কারা? তারা কি সম্পূর্নতই উপকথারজাত? না, তাদের বাস্তবিক কোনও অস্তিত্ব ছিল?
বর্তমানকালের ঐতিহাসিকগন এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেস্টা করেছেন। এশিয়া মাইনরে অবস্থিত কৃষ্ণসাগরের আশেপাশে গড়ে উঠেছিল সাইদিয় সভ্যতা। ৮০০ খ্রিস্টপূর্বে এদের অবস্থান সম্পর্কে গ্রিকরা সচেতন হয়। Scythians দের বাংলায় বলা হয় শক।
গ্রিক উপকথার সেই ‘এ্যামাজন’ নারী যোদ্ধারা আসলে শক নারী!
শক সভ্যতায় যে সক্রিয় নারীযোদ্ধা ছিল, তার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমান মিলেছে। শকদের সভ্যতার কেন্দ্র ছিল বর্তমানকালের ক্রিমিয়া। শক সমাধিক্ষেত্রে খনন কার্য চালিয়ে সশস্ত্র নারীর অস্তিত্ব মিলেছে। দেখেশুনে মনে হয় শকদের সৈন্যবাহিনীতে অন্তত ২৫% নারী যোদ্ধা ছিল। আর সেসব শক নারী যোদ্ধাদের ধনুকসহ সমাধিস্থ করা হত।
ক্রিমিয়ার অন্ঞ্চল; ৮০০ খ্রিস্টপূর্বে এখানেই উদ্ভব হয়েছিল সাইদিয় বা শক সভ্যতার। যাদের নারীযোদ্ধা ছিল। এদেরই গ্রিকরা নানা ভাবে বনর্না করেছে। যাদের কথা ইউরিপিদেস থেকে শেকসপীয়ার অবধি রচনায় উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু কেন শকরা নারীরা যুদ্ধবিদ্যাকে অত সিরিয়াসলি গ্রহন করেছিল?
রুশ প্রত্নতাত্ত্বিক ভেরা কোভালেভস্কায়া এর উত্তর দিয়েছেন। কোভালেভস্কায়া মনে করেন শক পুরুষরা যুদ্ধ কিংবা শিকারের জন্য দূরবর্তী স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করত। যে কারণে যাযাবর শক নারীরা তাদের পশু ও চারণভূমি প্রতিরক্ষার্থে হাতে যুদ্ধাস্ত্র তুলে নেয়। সে সময়টায়, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ শতকের দিকে শকরা এশিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ভেরা কোভালেভস্কায়া গবেষনা করে দেখেছেন এই প্রক্রিয়ায় একাধারে ২৮ বছর অবধি শক নারীদের একা পুরুষবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হত!
পুরুষশূন্য সেই সব শক নারীদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিরি সব কল্পকাহিনী ছড়িয়েছে গ্রিস। (এখনও বাংলাদেশি সমাজে নারী একা থাকলে কত কথা ওঠে!) শকদের পুরুষবিহীন সমাজটি গ্রিকদের নারীরাজ্য মনে হতেই পারে। আর নারীদের নিয়ে মুখরোচক আলোচনার তো শেষ নেই। ‘এ্যামাজন’ বালিকাদের তীরধনুক ছোঁড়া শিখতে হত। ধনুক বাঁকাতে বুকে ডান দিকে চাপ পড়ে; যে কারণে বালিকার ডান স্তনটি তার মা পুড়িয়ে ফেলত। গ্রিক ভাষায় স্তনশূন্যতাকে বলে: এ্যামাজন। ইত্যাদি …ইত্যাদি …
পরিবারের প্রধান পুরুষ জীবিকার তাগিদে দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থাকলে সেই পরিবারের বিপদশঙ্কুল পরিবেশে আত্মরক্ষার অধিকার তো আছে …কি বলেন …

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত