আমার প্রথম বই । নবনীতা দেবসেন

আমি, অনুপম
আমার কবিতা লেখার অর্ধশতক পূর্ণ হওয়া উপলক্ষ করে দে’জ থেকে আমার প্রথম কবিতার বই-এর দ্বিতীয় মুদ্রণ বেরুল ২০০৯-তে। আমার তো গায়ে কাঁটা দিল, ঈশ! পঞ্চাশ বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি কবিতার পথে? আমি তো ভাবি আমার পৃথিবীতে আসাই হয়নি অত দিন। সময়টা ছিল ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯। আমার কবিবন্ধুদের সকলেরই কবিতাগুলি একে একে সেই প্রথম মলাটবন্দি হতে শুরু করেছে। ‘প্রথম প্রত্যয়’ বেরুল এম সি সরকার থেকে, ১৯৫৯-এ। বই সাজিয়ে দিলেন বন্ধুরাই, আমি শুধু তার উৎসাহী মলাটশিল্পী। ‘প্রথম প্রত্যয়’ তাই আমার ‘প্রথম বই লেখার অভিজ্ঞতা’ নয়, প্রথম কবিতা সংকলন তৈরি করার গল্প। জীবনে প্রথম বই লেখার উদ্বেগ, উত্তেজনা, বুক ধড়ফড়ানি, বারবার নতুন করে প্লট পরিকল্পনা, বারবার বানচাল, আগাপাশতলা অদলবদল করেও মন খুঁত-খুঁত এ সব কাণ্ডকারখানা প্রতিটি একক কবিতা লেখার সময়ে অনুভব করলেও কবিতার বই বেরুনোর সময় কিন্তু অনুভব করিনি। কবিতাগুলো তো সবই পাঠকদের চেনা। নতুন করে উদ্বেগের কী আছে? বিক্রি তো হবেই না।
কিন্তু সম্পাদকের অনুরোধে সম্পূর্ণ নতুন একটা গোটা বই লিখতে বসা, পাঠকের যা নিয়ে কোনও ধারণাই নেই, লেখকের নিজেরও না, তার মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ আছে। ব্যাপারটা একেবারে আলাদা। সে উত্তেজনার স্বাদ আমি পেয়েছি প্রথম উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে। সেই গল্পই বলবার মতন। ‘প্রথম বই’-এর গল্প।
১৯৭৬-এর আনন্দবাজার পুজো সংখ্যায় উপন্যাস লেখার আমন্ত্রণ পেলুম। রমাপদ চৌধুরীর চিঠিটি পেয়েও বিশ্বাস করতে পারিনি। তিনি আমাকে জীবনেও চোখে দেখেননি, আমি তো যাই না দেশ-আনন্দবাজারের আড্ডায়, ডাকে কবিতা পাঠাই। আমি তো গদ্যকারই নই। কেমন করে আমার কথা ওঁরা ভাবলেন? কোন দুঃসাহসে? ‘শারদীয় আনন্দবাজার’ বলে কথা! রাজারাজড়ার ব্যাপার! উপন্যাস দূরের কথা, আমি তো গল্প লিখতেই জানি না। পারি শুধু প্রবন্ধ আর কবিতা।
আমি যেমন আহ্লাদিত (কিঞ্চিৎ গর্বিতও), তেমনি ভীত, এবং মহা উত্তেজিত। এত বড় সম্মান? এ যেন লেখার আগেই জ্ঞানপীঠ পেয়ে যাওয়া। হ্যাঁ, এক কালে এমনটাই ছিল বটে শারদীয় দেশ-আনন্দবাজারে লেখা বেরুনোর মান-সম্ভ্রম! কাদের সব লেখা বেরুত সেখানে? তাঁদের সঙ্গে তাঁদের পাশে আমার উপন্যাস থাকবে! সে উপন্যাস তো যেমন-তেমন হলে চলবে না? উঃ, খারাপ হলে খুব লজ্জার হবে! মন দিয়ে, এক নিশ্বাসে, একখানা গোটা বই লিখে ফেলতে হবে আমাকে, ভদ্দরলোকের পাতে দেবার মতন, গ্রহণযোগ্য মানের গ্রন্থ। যে বইটি আগে কেউ লেখেনি।
কিন্তু আমি কি পারব সেটা? পারব কি নতুন, ঝকঝকে, কোনও উপন্যাস লিখতে? সাহিত্যে সব চেয়ে আধুনিক, সব চেয়ে কঠিন ফর্ম উপন্যাস। আর কবিতা ছেড়ে গদ্য যদি লিখতেই হয়, তবে এমন করে লেখা উচিত, যেমন ভাবে আর কেউ আগে কখনও লেখেননি। আমাদের প্রতি নীরেনদার সেই অত্যন্ত জরুরি উপদেশটি তখনও লিখিত হয়েছিল কি না মনে নেই, বোধ হয় না ‘কবি, তুমি গদ্যের সভায় যাবে? যাও, তবে পা যেন টলে না!’ (আমার কিন্তু আপনা থেকেই খেয়াল ছিল ব্যাপারটা।)
আমার মাথায় অনেক অস্থির অনুভূতি তোলপাড় করত তখন, অনেক ক্রোধ, অনেক অসহায় শোক। সময়টা উত্তাল, নকশাল ছেলেদের নানা ভাবে তত্ত্ব জ্ঞান দিয়ে মরণপণ আদর্শে উৎসাহিত করে, অনায়াসে প্রাণ নিতে আর প্রাণ দিতে শিখিয়ে দিয়ে, নিজেরা পিছু হটে হিল্লিদিল্লি পালিয়ে যাচ্ছেন আমাদের বন্ধুগণ। বাঙালি বুদ্ধিজীবী, তাত্ত্বিক গুরুদেবেরা। নিজেদের মুখনিঃসৃত বাক্যের দায়িত্ব তাঁরা নেননি। আমার ধরনের কবিতায় আমি এই সব অনেক কিছুই বলতে পারি না, তার জন্য গদ্য চাই। তরবারির মতো গদ্য। কবিতা গদ্যগন্ধী হলে চলে, গদ্য কিন্তু কাব্যিক হলে চলবে না। গদ্যের মধ্যে কবিতাকে ঢোকাতে হলে অনেক কলকাঠি নাড়া চাই, অনেক সূক্ষ্ম মন্তর চাই। (খবরদার যেন লোকে পড়তে পড়তে টের না পায়, তারা গদ্য ভেবে আসলে কবিতা পড়ে ফেলছে!)
অঙ্ক কষে যে যাই বলুন, আমার মতে, আমার জীবনের ‘প্রথম বইটি’ আমি লিখেছি ‘প্রথম প্রত্যয়’ প্রকাশের সতেরো বছর পরে, ১৯৭৬-এ। তখন আমার জীবন উলটেপালটে আমি একটা আস্ত মানুষ হয়ে গিয়েছি। তখন ভারতবর্ষে চলেছে জরুরি অবস্থা, আর আমার জীবনেও। কোর্টে আমাদের বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। কলকাতার শিরা-ধমনিও শোণিতস্রোতে ভেসে যাচ্ছে। আমার প্রথম উপন্যাসে আমি কী লিখতে চাই, তা জানি। কী ভাবে লিখব, মোটামুটি তা-ও ভেবে পেয়েছি। মূল চরিত্রগুলির পরিকল্পনাও করতে পেরে গিয়েছি। তাদের মধ্যে দিয়েই তো ঘটনা সাজানো হবে। একদিন গাড়িতে বসে বন্ধু ধৃতিকান্ত লাহিড়ি চৌধুরীকে পরিকল্পনাটা বলেছিলুম, তিনি প্রবল উৎসাহ দিলেন। এ বারে বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে জিগেস করলুম, ‘শুরু করি কেমন ভাবে?’
সুনীল বললেন, ‘সর্বদা একটা কোনও অ্যাকশনের মাঝখানে, কিংবা কোনও ডায়ালগের মাঝখানে উপন্যাস শুরু করবে।’ সুনীলের উপদেশ মেনেই ‘আমি, অনুপম’ উপন্যাস লেখা শুরু। জীবনে যা দেখেছি, তাই নিয়েই গল্প। সেই সময়ে চারি দিকে আদর্শের আর বিশ্বাসঘাতকতার ছবি, প্রতি দিন অল্পবয়সি ছাত্রদের মৃত্যু ঘটছে, কখনও পুলিশের হাতে, কখনও দলের ছেলেদের, তাদের তাত্ত্বিক পথপ্রদর্শকরাও তাদের হাত ধরে বনের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ঘন শ্বাপদসংকুল অরণ্যে তাদের পরিত্যাগ করছেন। চিন্তক পুরুষের আত্মকেন্দ্রিক বুদ্ধির অহংকার মৃত্যুভয়ের সামনে এসে লুটিয়ে পড়ে, নানান স্তরে বিশ্বাসহানি ঘটে যায় পদে পদে। বুদ্ধির সেই অসহায় স্খলনের ছবি আছে ওখানে।
আছে নারীর গভীর বোধ-এর, আর নিবেদিত ভালবাসার উজ্জীবনী শক্তির গল্প। এই উপন্যাসে নায়িকার সঙ্গে আমাদের কখনও দেখা হয় না। গল্পটা রাজনীতির, আর সফল পুরুষের অন্তরমহলের হার-জিতের কাহিনিও বটে। নাম ‘আমি, অনুপম’ হলেও বইটি লেখা তৃতীয় পুরুষে। ওটাই আমার একমাত্র পুরুষ-কেন্দ্রিক বই। আমার চোখে দেখা জীবন, নানা বয়সের স্ত্রী-পুরুষ চরিত্রগুলির মধ্যে মিশে আছেন। অনুপম একাই নায়ক ও প্রতিনায়কও, তাঁর পতনের কাহিনিতে দায়িত্বহীন, নির্বাক বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমি নিজেকেও প্রতিফলিত দেখেছি। বিপ্লবী সমীরের মধ্যে তো আর নিজের ঠাঁই ছিল না!
কিন্তু ওই উপন্যাস প্রকাশের ফল রীতিমতো বিপজ্জনক হল! না, ইমার্জেন্সির মধ্যে নকশাল নিয়ে লেখা প্রথম বাংলা উপন্যাস বলে নয়। সেটা তো অনেক পরে নজরে এসেছে। কিন্তু এক জন নন, দু’জন বুদ্ধিজীবী গুরুজন, চরিত্রায়ণে নিজেদের ছায়া কল্পনা করে অভিমানবশত আমার সঙ্গে কথাই বন্ধ করে দিলেন। অনেক বছরের চেষ্টা লেগেছিল আগের মতো স্নেহে তাঁদের কাছে ফিরে যেতে। ‘প্রথম বই’-এর ফল কিন্তু শুভ হয়নি আমার জীবনে। গোপনে বলি, আনন্দবাজারের পুজোসংখ্যার সব উপন্যাসই তো বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ পাবলিশার্স ছাপে? ‘আমি, অনুপম’ কিন্তু আনন্দ ছাপেনি। দু’বছর বাদে, জেলখাটা নকশাল ছেলে দীপঙ্কর চক্রবর্তী বইটি বের করেছিলেন ‘ঈশান’ থেকে। প্রথম বই মানে তো চিরকালের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। নিরবধি কাল আর বিপুলা পৃথ্বীর সামনে নতজানু হয়ে লেখকের আত্মনিবেদন। ‘এই নাও। আমি তোমার। তুমি রাখলে, আছি। না রাখলে, নেই।’

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত