অন্নদাশঙ্কর রায় ও লীলা রায়

১. লীলার লীলাময়

সংগীত ভবনের অডিটোরিয়ামে অন্নদাশঙ্কর রায়ের বক্তৃতা: Some Aspects of Literature. শুনতে যেতে হবে। বিশেষ করে বলে দিয়েছিলেন আমাদের উপাচার্য হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। আগ্রহ ছিল না আমার। অন্নদাশঙ্কর মোটেই আমার পছন্দের লেখক নন । তাঁর ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘অজ্ঞাতবাস’, রত্ন ও শ্রীমতী’ এসব উপন্যাস পড়ে একদম ভালো লাগেনি। তবে তাঁর ভ্রমণ কাহিনি বিশেয করে ‘পথে প্রবাসে’ আর ‘জাপানে’ মন্দ লাগে নি । ভালো লেগেছিল তাঁর ছড়া। সেসব ছড়া আছে তাঁর ‘উড়কি ধানের মুড়কি’, ‘রাঙা ধানের খই’, ‘ডালিম গাছে মউ’, ‘শালিধানের চিড়ে’, ‘আতা গাছে তোতা’ বইতে। ছড়া লেখার প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে।

একবার তিনি রেলপথে ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেন, ‘এখন আমি ছড়া লিখছি। তুমিও লেখ না কেন ?’ অন্নদাশঙ্কর মনস্থির করতে পারেন নি। তারপর রবীন্দ্রনাথ তাঁকে তাঁর ‘সে’ বইটি উপহার দেন। তারপরে যুদ্ধের মাঝখানে বুদ্ধদেব বসুর অনুরোধে কবিতা লিখতে গিয়ে তাঁর ছড়ার হাত খুলে যায়।

অনিচ্ছা সত্বেও গেলাম অন্নদাশঙ্করের বক্তৃতা শুনতে কিন্তু রাগ হয়ে গেল যখন তিনি বললেন সাহিত্যিকের আলাদা ধর্ম থাকবে। আমি তখন কমিউনিজমের আদর্শ দীক্ষা নিয়েছি। সেটাই আমার কাছে ধর্ম-অর্থ-মোক্ষ। আমাদের অরবিন্দ দাসের ভাষায় নতুন কাকের গু খেলে এভাবেই চিন্তার অন্ধতা আসে।

সেদিন বিকেলের দিকে কি একটা ব্যাপারে হিরন্ময়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তাঁর হাতে কাজ ছিল না। তিনি তাঁর বন্ধু অন্নদাশঙ্করের গল্প বলেছিলেন। স্বপ্ন আর সত্যের টানাপোড়েনে গড়ে উঠেছে অন্নদাশঙ্করের জীবন। ১৯০৪ সালে তাঁর জন্ম ওড়িশার জঙ্গল-পাহাড়ঘেরা ঢেঙ্কানলে। তাঁর বাল্য ও কৈশোর লালিত হয়েছে মধ্য ও আধুনিক যুগের বিমিশ্র ভাবধারায়। প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ আর রবীন্দ্রনাথের ‘সবুজের আহ্বান’ তাই সাড়া জাগায় প্রাণে। বয়ঃসন্ধি উদ্বেলিত হয় গান্ধীজির অসহযোগের আহ্বানে। কিন্তু জীবনের ছক পাল্টে ভর্তি হতে হয় ইংরেজের স্কুলে। ১৯২৩-এ আই এ ও ১৯২৫-এ ইংরেজি অনার্সসহ বি এ পরীক্ষায় প্রথম হন। ১৯২৭-এ আই সি এস পরীক্ষায় প্রথম হয়ে লন্ডনে যান।

হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি থাকতেন লন্ডনের বেলসাইজ পার্ক পাড়ায়। পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন অধ্যাপক সরোজকুমার দাস ও তটিনী দাস। খাওয়া-দাওয়া হত সরোজবাবুর ঘরে। এখানে ছিল একটা ব্রাহ্ম আবহাওয়া। অতুলপ্রসাদ সেনের বোন কিরণ বসু আসতেন, অতুলপ্রসাদের গান শোনাতেন। হিরন্ময়বাবু বলেন, ‘ জানো, একবার সরোজদার পরামর্শে আমরা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রিডিংরুমে গিয়েছিলাম। সেই রিডিংরুমে পড়তেন কার্ল মার্কস। রিডিংরুমের পাশে একটা গুপ্তকক্ষ ছিল। সেখানে থাকত নিষিদ্ধ বই। বছরখানেক আমরা ছিলাম সেই ফ্ল্যাটে। তারপর সরোজবাবুরা দেশে ফিরে গেলেন আর আমাদের দুই বন্ধুকে চলে যেতে হল অন্যত্র।’

আমি এম এ পাশ করার পরে ঘটনাচক্রে অন্নদাশঙ্করের যোধপুরের বাড়িতে যেতে হল আমাকে। শিবরাম চক্রবর্তীর সঙ্গে অসুস্থ শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে দেখতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে শিবরামদা সরকারি খরচে শৈলজানন্দের চিকিৎসার কথা ভাবেন। এ ব্যাপারে একটি চিঠির খসড়া তৈরি করে আনন্দবাজারে সন্তোষ ঘোষের কাছে যেতে বলেন শিবরামদা। সন্তোষ ঘোষ চিঠিতে বিশিষ্ট জনের স্বাক্ষরের কথা বলে দেন। এ কথাও তিনি বলে দেন যে প্রথম সই হবে অন্নদাশঙ্করের। আমি একদিন সকালবেলায় অন্নদাশঙ্করের বাড়ি যাই এবং তাঁর সই করিয়ে আনি।

এরপরে আমার নিজের প্রয়োজনে অন্নদাশঙ্করের কাছে যেতে হল। আমি জেনেছিলাম সোমেন চন্দের মৃত্যুর পরে ‘সংকেত ও অন্যান্য গল্প’ নামে যে সংকলনটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় তার এক অসাধারণ সমালোচনা লিখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর । তাঁর স্ত্রী লীলা রায় ‘সংকেত’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেন।
সেদিন লীলা রায় বাড়িতে ছিলেন না। অন্নদাশঙ্কর জানতে চাইলেন সোমেনের কোন কোন রচনা আমি সংগ্রহ করেছি, প্রকাশক পেয়েছি কিনা। তারপর তিনি বললেন তখনকার ‘প্রতিরোধ’ পত্রিকায় তাঁর লেখাটি প্রকাশিত হয়। সম্ভবত ১৯৪৩ সালে। ‘প্রতিরোধ’ পত্রিকার ফাইল তাঁর কাছে নেই, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্তের কাছে থাকতে পারে। আর বললেন খাজা আহমেদ আব্বাস ইংরেজি ভাষায় যে ভারতীয় গল্প সংকলন করেছিলেন তাতে লীলা রায় অনূদিত ‘সংকেত’ আছে।

অন্নদাশঙ্করের সমালোচনাটি এরকম :

“মসীজীদের ডানহাতের লেখা পড়তে পড়তে যাঁদের বাংলা গল্পে অরুচি ধরেছে, যাঁরা প্রতিজ্ঞা করেছেন বাংলা গল্পের বই কিনবেন না, অসীজীবীর বাঁ হাতের লেখা এই গল্পগুলি তাঁদের প্রলুব্ধ করবে। ইনি ফ্যাসিস্ট কি কমিউনিস্ট, ন্যাশনালিস্ট কি কমিউনালিস্ট, সে কথা অবান্তর। ইনি লিখতে ভালোবাসতেন, কিন্তু বাঁচতে ভালোবাসতেন তার আগে। কী করে বাঁচতে হয়, কাদের নিয়ে বাঁচতে হয়, এসব বিষয়ে এঁর মনে এধটুকুও সংশয় ছিল না। প্রাণ ভরে বেঁচে সেই প্রাণের উচ্ছলতায় এই গল্পগুলি লিখে গেছেন নিতান্তই গল্প বলার কৌতুকে। গল্পচ্ছলে মতপ্রচার বা গল্প করতে বসে পায়রার মতো বকম বকম, দুটির কোনটি এঁকে বকায় নি। কিংবা একপোয়া অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনপোয়া কল্পনা মিশিয়ে খাঁটি দুধের ব্যবসা করা এঁর কাজ নয়। ইনি ছিলেন সৈনিক। এঁর দৈনিক কর্তব্য সাহিত্যক্ষেত্রে নয়, রণক্ষেত্রে। সেই কর্তব্য সেরে ইনি আমোদ করতেন গল্প বলে।

“এই গল্পগুলি সম্বন্ধে প্রথম কথা এগুলি ফুর্তি করে বলা। ফুর্তির চিহ্ন পাতায় পাতায়। ‘রাত্রিশেষ’ ও ‘ স্বপ্ন’ তো দস্তুরমতো রোমান্টিক। তা বলে কেউ মনে করবেন না তা অবাস্তব । রোমান্স এ জগতের পরতে পরতে। যার চোখ আছে সেই দেখতে পায়, যার নেই সে পায় না। এইসব অন্ধদের জন্য রোমান্স বানাবার ভার নিয়েছেন আর একদল অন্ধ, তাঁদের গাঁজাখুরির দাপটে রোমান্স শব্দটার এত বদনাম। রোমান্টিক বললে আজকাল গালাগালি বোঝায়। কিন্তু সত্যিকার রোমান্টিকের মতো রিয়াল কিছু নেই। সব রিয়াল অভিজ্ঞতাই বর্ণনার গুণে রোমান্টিক লাগতে পারে। ‘একটি রাত’ও রোমান্সরঞ্জিত। এর পরের গল্পগুলিতে অন্য রস। ‘সংকেত’ গল্পটিতে একরাশ লোকের দেখা মেলে। ভারী মজার মানুষ। এটি একটি উঁচুদরের গণগল্প হতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষ হল ব্যক্তিবিশেষের হৃদয়দৌর্বল্যে। নায়ক না হলে গল্প হয় না, এই কুসংস্কার বোধহয় তখনও সোমেনের ছিল। পরে সংস্কার শিথিল হয়ে এসেছে। ‘দাঙ্গা’য় তেমন কোন নায়ক-স্থানীয় নেই। ওটিতে দাঙ্গা-হাঙ্গামার উত্তেজনা ও অধঃপতন ধরে রাখা হয়েছে। মূর্ত হয়েছে লোকের জীবন দর্শন । এই সংগ্রহের সেরা গল্প ‘ইঁদুর’। এটির গড়ন একটু এলোমেলো। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। এটিতে তিনি আবিষ্কার করেছেন নিজের নিয়তি। শ্লেষ আর করুণা, মানবতা ও সংকল্প বহুবর্ণ করেছে এটিকে । গল্পটির পরিণতি symbolic…।

এরপরে একদিন লীলা রায়ের সঙ্গে দেখা করি। আমেরিকান এই নারী আলাপে-প্রলাপে, বাগ-ব্যবহারে নির্ভেজাল বাঙালি। শুনেছি এঁর সন্তানরাও বাংলাভাষাতেই পাঠ নিয়েছেন। অন্নদাশঙ্করের মধ্যে যে কাটখোট্টা ব্যাপারটা প্রথমে ধাক্কা দেয়, লীলা রায়ের মধ্যে তা বিন্দুমাত্র নেই। তাঁর ‘এসো এসো’ সম্বোধন প্রথমেই মনকে ছুঁয়ে যায়। তিনি আমাকে ‘সংকেত’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদের সঙ্গে ‘ইঁদুর’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদও দেন। তাঁর লেখা Challenging Decade : Bengali Literature in the Forties বইটিও দেন।

অমরনাথ করণ ছিলেন নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের কলকাতা শাখার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তিনি ও সরোজ মৌলিক আমাকে নিয়ে দিয়েছিলেন গোয়ালিয়রের বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে। করণের মাথায় ঘুরছিল একটা ভাবনা। আমাদের পর্ণশ্রীতে এরকম একটা সাহিত্য সম্মেলন করা যায় কিনা। সেই উদ্দেশ্যে আমার বাড়িতে একটা সভা হয় ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে। সেখানে ঠিক হয় আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি একটা সাহিত্য সম্মেলন করব। করণ যেহেতু পর্ণশ্রী বিদ্যামন্দিরের শিক্ষক, তাই সেখানকার প্রশস্ত মাঠটা পাওয়া যাবে। আমরা গায়ত্রী চক্রবর্তী, মনীষা ব্যানার্জী, অরূপ চৌধুরী, রবিন দাস প্রভৃতিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি করি। সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে অন্নদাশঙ্কর রায়ের নাম প্রস্তাব করেন করণ। অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, ড. অজিতকুমার ঘোষ, ড. বিপ্লবকুমার চক্রবর্তী, সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়, শুদ্ধসত্ব বসু, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত।

একুশে ফেব্রুয়ারির উপর আমরা কোন অনুষ্ঠান রাখিনি বলে অন্নদাশঙ্কর রুষ্ট হন। এটা আমাদের অনিচ্ছাকৃত ভুল। আমাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। অন্নদাশঙ্কর তাঁদেরও বকাবকি শুরু করে দেন। তখন অনুষ্ঠান সঞ্চালক বিপ্লব দাস অন্নদাশঙ্করের কাছে গিয়ে বলেন যে আমরা পরের বছর থেকে আলাদা করে ২১ শে ফেব্রুয়ারি পালন করব। তখন শান্ত হন তিনি। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর ছিল নাড়ির টান। তাঁর স্ত্রী ছিলেন আমেরিকান। কিন্তু বিয়ের পরে তিনি তাঁর স্ত্রীকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন কয়েকটি কথা:

১. তিনি আই সি এসের চাকরি ছাড়বেন এবং সাহিত্যে মনোনিবেশ করবেন। স্বল্প আয়ের উপর নির্ভর করে তাঁকে সংসার চালাতে হবে।

২. তাঁদের ছেলে-মেয়ে আ্যংলো ইন্ডিয়ান হবে না, বাঙালিই হবে।

৩. স্ত্রীকেও বাংলা শিখতে হবে এবং বাংলায় কথা বলতে হবে।
অন্নদাশঙ্করের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ২০০১ সালে, তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে।
দেবাশিস সেনগুপ্ত স্কুলে আমার প্রিয় ছাত্র । বড় হয়ে সে দূরদর্শনে চাকরি নেয়। সে একদিন আমাকে জানাল দূরদর্শন অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাক্ষাৎকার নেবার পরিকল্পনা করেছেন। সাক্ষাৎকারটা আমাকেই নিতে অনুরোধ করল দেবাশিস। অন্নদাশঙ্কর তখন পার্ক সার্কাসের একটি বাড়িতে থাকতেন। তিনি তখনও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আ্যাকাডেমির সভাপতি বলে তাঁর দেখাশোনোর ভার সেই সংগঠনই নিয়েছিল। প্রবীর সামন্তকে নিয়ে যথাসময়ে আমি তাঁর বাড়িতে হাজির হলাম। যন্ত্রপাতি নিয়ে দেবাশিসরা আগেই হাজির। সেই সাক্ষাৎকারের পুরো বিবরণ দেবার দরকার নেই। দু-একটি মজার অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরব।
তাঁর সাহিত্যক্ষেত্র আসার প্রেরণা কি এ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম।

তিনি বলেছিলেন : “আমি যখন জন্মগ্রহণ করি তখন আমার ঠাকুরমা বলেছিলেন এই কটা হাড় ও একটি মাথা-এইরকম দুর্বল শিশুকে কি করে মানুষ করব? আমার মা ৩৫ বছরে মারা যান। আমিও ভেবেছিলাম আমার আয়ুও ৩৫ বছর। তাই জীবনে একটা পরিকল্পনা নিয়ে সাহিত্য রচনা করতে শুরু করেছিলাম। বিলেতে যাবার সময় ‘পথে প্রবাসে’ লিখতে লিখতে মনে হল আমার ভেতরে লেখার শক্তি আছে।
“মানুষের আসল চিন্তা জীবনকে নিয়ে কি করা যায়। এ চিন্তা আমার ছেলেবেলা থেকেই। কোন অবস্থাতেই আমি সাহিত্যিক ছাড়া আর কিছু নই। কোন অবস্থাতেই আমি প্রেমিক ছাড়া কিছু নই।

“মৈত্রেয়ীর প্রশ্ন ছিল আমাকে যা অমৃত দেবে না তা নিয়ে আমি কি করব? ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস আমাকে স্যার বসন্তকুমার মল্লিকের মতো হাইকোর্টের জজ করতে পারে কিংবা স্যার অতুলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো ইংল্যান্ডে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার। কিন্তু আমার মৃত্যুর পরে আমাকে কেউ মনে রাখবে না। অপর পক্ষে আমি যদি শেলি কিটসের মতো রোমান্টিক কবিতা লিখে যেতে পারি কিংবা বিদ্যাপতি চণ্ডীদাসের মতো রাধাকৃষ্ণ পদাবলি, যার নায়ক নায়িকা আমি ও আমার প্রিয়া তবে আমাকে সহজে কেউ ভুলতে পারবে ?”

এবার আমি তাঁর প্রেমিক সত্তার কথা জানতে চাই। এতে প্রবীর, দেবাশিসরা খুব মজা পাচ্ছিল। একজন বৃদ্ধের মুখে তাঁর প্রেম কাহিনি শোনার অভিজ্ঞতা সুলভ নয়।

গম্ভীরমুখে অন্নদাশঙ্কর বলে যান :
“পাঁচ বছর বয়স থেকেই আমি প্রেমে পড়ে আসছি। সমবয়সিনীদের প্রত্যেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে অল্প বয়েসে। আমি ক্রমে উপলব্ধি করে যে প্রেম মানেই হতাশা। আমি শৈশব থেকে প্রেমে পড়তে অভ্যস্ত হলেও প্রেমের পাত্রীরা কেউ আমাকে উৎসাহ দেয় নি। আমিও কারো জন্য একটির বেশি পদ্য লিখিনি। তবে সরলার মন পাবার জন্য অনেকগুলি পদ্য লিখেছিলাম। বিশ্বনাথ কর।

সেগুলি ‘উৎকল সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
“বিলেতে গিয়ে আমি আবার প্রেমে পড়ি। তার নাম জয়স। সে আমার চেয়ে বয়সে অনেকটা বড়। তার উপর সে চিত্রশিল্পী। তার সঙ্গে বিয়ে সম্ভব ছিল না। ভারতে এসে আমার সঙ্গে ঘর করা তার পক্ষে কষ্টকর হত। সবাই তো আর আ্যলিস ভার্জিনিয়া নয়।”
এই আ্যালিস ভার্জিনিয়াই হলেন লীলা রায়। অন্নদাশঙ্কর তাঁর এই নামকরণ করেন। আর তিনি নিজে হলেন লীলার লীলাময়। লীলা বাঙালি বধূ হয়ে বাষট্টি বছর অন্নদাশঙ্করের ঘর করেন, পাঁচটি সন্তানের মা হন। সরলা বা জয়স কেউ তাঁর জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করতে পারতেন বলে তিনি মনে করেন না।

২. লীলাময়ের লীলা
দশমীর রাত। চারদিকে উদ্দাম ঢাক-ঢোলের শব্দ। উন্মত্ত ভক্তদের উল্লাস কোলাহল। বিরক্ত হয়ে বারান্দা থেকে ঘরে এলাম। দূরদর্শনে তখন পরিবেশিত হচ্ছিল সংবাদ। হঠাৎ শুনাল জীবনাবসান হয়েছে লীলা রায়ের। অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী লীলা রায় । মনে পড়ে গেল শ্রীমতী রায়ের লেখা একটি কবিতার কথা :

When to be asleep in the deep night
Is the starlit end of a sunlit life
And death is adventure to me
I will seek these stars

লীলা রায় আমার আত্মীয় ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ও গাঢ় ছিল না। তবু স্বল্পকালের মধ্যে তাঁর যে সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, সেই স্নিগ্ধ স্মৃতি বেদনা বয়ে আনল। দূরদর্শনের সংবাদ শুনে আমার আনমনাভাব দেখে আমার মেয়ে জানতে চাইল লীলা রায়ের পরিচয়। শুনে বলে ফেলল, ‘ঠিক যেন ভগিনী নিবেদিতা।’ আমার মনে হল কথাটা বেঠিক নয়। শুধু স্বামী হিসেবে একজন ভারতীয়কে বরণ করে নেন নি তিনি, বরণ করে নিয়েছিলেন স্বামীর দেশকেও। নিবেদিতার মতো ভারতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল সক্রিয়।

সক্রিয় ভালোবাসা আত্মত্যাগে ও দুঃখবরণে উদ্বুদ্ধ করে। ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের আকর্ষণে সুদূর আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছিলেন যে আ্যালিস ভার্জিনিয়া ওরনডোরফ, তিনিই অনতিবিলম্বে রূপান্তরিত হলেন লীলা রায়ে। এবং রূপান্তরটি নিছক বিবাহগত নয়। বহু বিদেশিনি ভারতীয়কে বিয়ে করেছেন, ভারতে সংসার পেতেছেন, রপ্ত করেছেন এদেশের ভাষা ; কিন্তু তাঁরা লীলা রায় হতে পারেন নি। স্বামী ও স্বামীর দেশ, স্বামী ও স্বামীর মাতৃভাষা একাত্ম হবে যায় নি তাঁদের কাছে।

লীলা রায়ের বিস্তৃত জীবনী নেই। নেট ঘাঁটলে হতাশ হতে হয়। সুরজিৎ দাশগুপ্ত বাংলায় তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন। পশ্চিম বঙ্গ বাংলা আ্যাকাডেমি তা প্রকাশ করেছে। ‘পরবাস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। লীলা রায়ের পুত্র আনন্দরূপ রায়ের ইংরেজিতে লেখা একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী। কিন্তু লীলা রায়ের লেখা প্রবন্ধ ও বইএর মাধ্যমে ফুটে ওঠে এদেশের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসার ছবি। আকুল আগ্রহে তিনি এদেশের মাটি-জলকে চেনার চেষ্টা করছেন, দেশজ সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধানে নিযুক্ত হয়েছেন, সুখ-দুঃখতরঙ্গিত ভারতীয় সমাজজীবনের ছন্দকে আবিষ্কার করার সাধনা করছেন। বাউলগীতি, তারাশঙ্করের গণদেবতা, জরাসন্ধের জেলের গল্প, পথের পাঁচালির চিত্রনাট্য, কালিন্দীচরণ পাণিগ্রাহী ও নরেন্দ্রনাথ মিত্রের উপন্যাস প্রভৃতির অনুবাদ তার প্রমাণ। অনুবাদ করছেন অকালে নিহত সোমেন চন্দের গল্প। আমার মতো অভাজনের জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছেন।

তাঁর Challenging Decade বইটি পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। একজন পদস্থ সরকারি কর্মচারীর স্ত্রী হয়েও তিনি এদেশের প্রগতি লেখক আন্দোলনের মৌল চরিত্র অনুধাবনের চেষ্টা করেন নি শুধু, সেই আন্দোলনের ইতিবাচক ভূমিকাকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা করেন নি :

“ The leftist movement deeply affected the works of writers not directly associated with it and brought into Bengali literature many milieus hitherto untouched by pen .”

আমি যোধপুর পার্কে গিয়ে কোন গাউনপরা মেমসাহেবকে দেখিনি, শাড়িপরা এক ভারতীয় নারীকে দেখেছি। আত্মবিলোপ না করেও প্রেম যে এমন আত্মবিলোপী হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত লীলা রায়। তাঁর বিবাহ, তাঁর ঘরকন্না, তাঁর জীবনাচরণ, তাঁর লেখাজোকা প্রমাণ করে যে বর্ণ-ধর্ম-ভাষা-দেশের বিভেদ বড় কৃত্রিম, তাই বড় অশ্রদ্ধেয় ।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত