অপু ট্রিলজী: জীবনের বহমানতার এক মহাকাব্যিক চিত্র

অপু ট্রিলজীর আলোচনায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসটির সঙ্গে ছবিগুলির তুলনা করার অপেক্ষাকৃত সহজ কাজটি থেকে আমি বিরত রইব। আমি বরং চেষ্টা করব যে চলচ্চিত্র তিনটি সত্যজিৎ রায় বানিয়েছেন তার মাঝেই ওঁর শিল্পরূপ ও বিভূতিভূষণেরও শিল্পসুষমাকে খুঁজে পেতে। কোনো চরিত্রকে ধরে নির্মিত চলচ্চিত্র-ট্রিলজী নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যম্ভাবিভাবেই এসে পড়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অপর এক মহৎ সৃষ্টি দনস্কয়ের গোর্কি ট্রিলজীর ছবিগুলির কথা। তবে মনে রাখতে হবে কোনো ট্রিলজী নির্মাণের পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে কিন্তু অপু ট্রিলজী নির্মিত হয়নি। প্রথমে ‘পথের পাঁচালী’ একটি একক চলচ্চিত্র হিসেবেই নির্মিত হয়েছিল। ট্রিলজীর পরের দু’টি ছবি পরিচালকের পরের চিন্তার ফসল। এ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ভাষ্য হচ্ছে;

“পথের পাঁচালী’র সমালোচক প্রশংসা ও বক্স অফিস সাফল্যের ফলে ‘অপরাজিত’-র সৃষ্টি। কিন্তু ‘অপরাজিত’ ফ্লপ করলে আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম যে এবার কী করা। আমি ভিন্ন স্বাদের দু’টি ছবি তৈরি করলাম ‘পরশ পাথর’ ও ‘জলসাঘর’। এর মধ্যে ‘অপরাজিত’ ভেনিসের চলচ্চিত্র উৎসবে সবচেয়ে বড় পুরস্কারটা পেয়ে গেল। ভেনিসের সাংবাদিক সম্মেলনে আমাকে জিজ্ঞেস করা হোল যে কোনো ট্রিলজী করার পরিকল্পনা আমার আছে কী না? আমি বলে ফেললাম, হ্যাঁ। তখনও আমি জানি না বিভূতিভূষণের উপন্যাসটিতে তৃতীয় আরেকটি চলচ্চিত্রের সুযোগ রয়েছে কী-না। দেশে ফিরে আমি ‘অপরাজিত’ আবার পড়লাম এবং ‘অপুর সংসার’-কে খুঁজে পেলাম।”

পথের পাঁচালী”— ভিটের টান পথের আহ্বান

সিগনেট প্রেসের জন্যে ‘আম আঁটির ভেঁপু’-র ছবি আঁকা বা ‘ঘরে বাইরে’-র চিত্রনাট্যটি প্রযোজকদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়া এসব ঘটনাকে ছাপিয়েই যেন বাঙালী সংস্কৃতির নিয়তিই ছিল যে এই অসামান্য বাংলা উপন্যাসটি শ্রেষ্ঠ বাঙালী পরিচালকটির দ্বারাই নির্মিত হবে। সত্যজিৎ রায় বলেন; “আমি কখনও ‘পথের পাঁচালী’র পুরো চিত্রনাট্য লিখিনি, কিন্তু পুরোটা এঁকেছি।” হ্যাঁ, প্রতিটি ফ্রেমই তিনি এঁকেছেন। কাগজে। তার চেয়েও বড় কথা- ওঁর মানসপটে। এ ছবির প্রতিটা ফ্রেমের নেপথ্যে রয়েছে একজন সংবেদনশীল শিল্পীর প্রথম-প্রেমের-মতই-প্রথম-সৃষ্টির গভীর মমত্ববোধ, আন্তরিকতা ও অঙ্গীকারের ছাপ। তেমন কোনো বড় ঘটনা নেই এ ছবিতে। এক সংবেদনশীল বালকের ক্রম বেড়ে ওঠা উপলব্ধির জগত ও তার পরিবারের কাহিনী। তবে নেপথ্যে অন্তঃসলিলে এক তীব্র দ্বন্দ্ব ছবিটিকে টান্টান্ করে ধরে রেখেছে, আর সে দ্বন্দ্ব হচ্ছে, হরিহর পরিবারের ভিটের টান ও পথের আহ্বান। মনে রাখতে হবে চলচ্চিত্রটির নাম ‘পথের পাঁচালী’, সত্যজিৎ রায় ইংরেজি করেছেন ‘Song of the Road’।

নিন্ম মধ্যবিত্তের সেই প্রান্তিক দারিদ্রসীমায় হরিহর পরিবারের অবস্থান, যেখানে এই অবচেতন অনুভূতি সতত ক্রিয়াশীল যে, পাছে কেউ তাদের চোর মনে মনে করে। তবে সর্বজয়ার এই সার্বক্ষণিক উৎকন্ঠাকে ছাপিয়েও যা চলচ্চিত্রটির মূল কাঠামোটিকে ধরে রাখে, তা— ভিটে-সমাচার। ভিটে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল হরিহর-সর্বজয়ার। বেতনের চব্বিশ টাকা পেয়ে আত্মপ্রসাদের সঙ্গে হরিহর বলেছিল; “ও রান্নঘর হবে, গোয়ালঘর হবে, বাড়ীর পাঁচিল সারানো হবে, সব হবে”। হয়নি। দীর্ঘ নিরুদ্দেশের পর হরিহর বাড়ি ফিরেছিল লক্ষ্মীর পট কাঁচ দিয়ে বাঁধিয়ে এনে। লাভ হয়নি। দুর্গা ততদিনে মৃত। ভিটে ছেড়ে পরিবারটিকে পথেই বেরিয়ে পড়তে হোল। অনেক বেদনাতেই তাই হরিহরের উপলব্ধি; “মাঝে মাঝে ভিটের মায়াও ছাড়তে হয়।” তবে শুধু প্রটাগনিস্ট হরিহর রায় নয়, ধনী, গরবিনী ও ঝগড়াটে স্বভাবের মুখরা সেজবৌও এক সময় উপলব্ধি করে; “এই এক জায়গায় পড়ে থাকা, এ কোনো কাজের  কথা নয় নতুন বৌ। এ মানুষকে বড় ছোট করে দেয়। আমাকে নিজেকে দিয়েই দেখছি।”

নিষ্ঠুরতা লেপ্টে আছে নিশ্চিন্দিপুরের আম-জাম-বৈঁচির শ্যামল ছায়াতে। যখন প্রাণোচ্ছল দুই বালক-বালিকা শুভ্র কাশবনে খুঁজে ফেরে রেলগাড়ি, জীবনের অপার আনন্দ সম্ভার, তখন বাড়িতে রান্নাঘরের দাওয়ায় অনুষ্ঠিত হয়ে যায় এক নির্মম নাটক। মৃত্যুর পূর্বক্ষণেও অসহায় ইন্দির ঠাকরুণের ভিটেয় আশ্রয় প্রার্থনা নামঞ্জুর হয়ে যায়। এ দৃশ্যে বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক অনন্য ক্লোজআপ ধরেছেন রায়, মৃত্যুই যেন ছায়া হয়ে নেমে এল ইন্দির ঠাকরুণের বেদনাহত কালোছায়া মুখে। তবে পথে বেরিয়ে পড়লেও ভিটের স্মৃতিমেদুরতা পরিবারটিকে এক নিয়তির মতই যেন আজন্ম তাড়া করে ফেরে। ‘অপরাজিত’-য় অপেক্ষাকৃত বাস্তববাদী মনের সর্বজয়াও বলে অপুকে; “ক’টা বছর পার করে দে, তারপরে যদি কপাল ভাল থাকে তো নিশ্চিন্দিপুরের ভিটেয় না হয়..”! আর কোমলমনের হরিহরের বেদনা তো আরো গভীর। কাশীতে বসে অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী হরিহর বলে অপুকে; “এখানকার বাজী নিশ্চিন্দপুরের মত ভাল না, নারে?”

অসামান্য কিছু টু-শট্ কম্পোজিশন আছে ‘পথের পাঁচালী’ তে। দুর্গা ও ইন্দিরা ঠাকরুণের। ইঙ্গিতে মূর্ত। এ দু’টি চরিত্রই ছবির শেষে মারা যাবে।

ত্রিভুজ কম্পোজিশনেরও কিছু অসামান্য নান্দনিক ব্যবহার রয়েছে ছবিটিতে। অপু পাঠশালায় যবে। মা সাজিয়ে দিচ্ছে। দিদি চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। কিছুটা লাজুক মুখে অপু। এ তিনজনের এক অনন্য ত্রিভুজ কম্পোজিশন সৃষ্টি করেছেন রায়— মানব পরিবারের ¯েœহ-ভালোবাসার চিরন্তন এক ত্রিভুজ-হার্মনি তা’।

আবার চলচ্চিত্রে ত্রিভুজ কম্পোজিশনের যে বিশেষ রূপ— দ্বন্দ্ব, তারও চমৎকার ব্যবহার রয়েছে ছবিটিতে। দুর্গা পেয়ারা চুরি করে এনে ইন্দির ঠাকরুণকে দিয়েছে। দাওয়ায় বসে এক আনন্দিতা বৃদ্ধা ও এক বালিকা। এমন সময় ত্রিভুজের তৃতীয় কোণ হিসেবে কলসী কাঁখে রাগী মুখে এসে দাঁড়ায় সর্বজয়া। অসাধারণ এক ত্রিভুজ কম্পোজিশন— চলচ্চিত্রিক ও অব্যর্থ।

অপরাজিত’-অপরাজেয় বালক পৃথিবীর হাতছানি

সত্যজিৎ নিজে “পথের পাঁচালী” নিয়ে অতটা তুষ্ট ছিলেন না। ওঁর ভাষায়, ছবিটাতে কিছু ‘ত্রুটি’ রয়ে গেছে। সেদিক থেকে অনেক নিটোল ‘অপরাজিত’।

               

বিভুতিভুষণের ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের এক গুরুত্বপর্ণ উপাদান সেই লীলা অংশটি সত্যজিৎ পুরোপুরিই বাদ দিয়েছেন। জনশ্রুতি যে লীলা চরিত্রের জন্য উপযুক্ত অভিনেত্রী তিনি খুঁজে পাননি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, কারণটি আরো গভীর। মা ও ছেলের ভালবাসার টানাপোড়েনের দ্বন্দ্বে ত্রিভুজের তৃতীয় কোণ হিসেবে আরেক নারী এলে, তা’ হোত বড়ই গতানুগতিক। ছবিটির গভীরতাও হয়তো খর্ব হোত। সত্যজিৎ ত্রিভুজের তৃতীয় কোণ হিসেবে এনেছেন আরো মহত্তর কিছু, শিক্ষার প্রতি অপুর অদম্য আগ্রহ ও বৃহৎ পৃথিবীর হাতছানিকে।

“তোমার পয়সা নেই মা, পয়সা নেই তোমার”- স্কুলে যাওয়ার অদম্য আগ্রহ এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বালকের, মাথায় টিকি রেখে যজমানি করাই যার প্রায় নিয়তি হয়ে উঠেছিল। সে বালক শেষমেষ স্কুলে যেতে পারল এবং অবশেষে কৃতিত্বের সঙ্গে গোটা জেলায় দ্বিতীয় হয়ে একদিন স্কুলের গন্ডীও পার হো’ল। এবার আরও এগিয়ে যাওয়া; “এর নাম গ্লোব, আমাদের পৃথিবী।…… এই দাগগুলো দেখছ না, এগুলো হচ্ছে দেশ। এই নীলগুলো হচ্ছে সমুদ্র।…..কলকাতা কোথায় জান মা?” সিটি কলেজের ফর্টি সেভেন রোল নম্বরের নবীন ছাত্র অপূর্বকুমার রায় এখন তার কলেজজীবন, নতুন শহুরে বন্ধু, জ্ঞানবিজ্ঞানের নতুন জগতের হাতছানির সঙ্গে নিয়ত দ্বন্দ্বে ভোগে মনসাপোতায় ডোবার ধারে এক কুটিরে সদা প্রতীক্ষারতা মায়ের ডাকের। অপু ছুটিতে বাড়ি এলে যে মায়ের গর্বিত কৌতুক; “তুই কী আরো লম্বা হয়েছিস্ রে?” এবং অপুদের কলকাতার ঠাকুর ভাল রাঁধে শুনে যার কিছুটা ঈর্ষামিশ্রিত শঙ্কা; “….আমার চেয়েও ভাল”! বিধবা এক প্রৌঢ়া মা তার কিশোর পুত্রের সঙ্গে সম্পর্কে যেন নিজেও এক কিশোরী হয়ে যায়। অপুর; “চিঠি পেয়েছিলে?” প্রশ্নের উত্তরে তার কিশোরীসুলভ অভিমান; “তোর সঙ্গে কথা বলব না তো!………..বল্ যে মার কাছে আসতে ইচ্ছে করে না।” এ অভিমানের পরে সর্বজয়ার মুখে প্রায় কিশোরীর হাসি। যেভাবে সর্বজয়া অপুকে কলকাতার ট্রেন ধরতে সকালে তুলে দেয় না, অপরাধীর মত অপুর কাছ থেকে ফিরে আসে, পরে অপুও টিকিট কেটেও ট্রেনে না চেপে বাড়ি ফিরে আসে শুধুমাত্র মাকে খুশি করতে, এসবই দেখায় মা ও ছেলে যেন দুই কৈশোরের প্রেমিক-প্রেমিকাই। লরেন্সের ‘সান্স এন্ড লাভার্স-য়ের, অন্তত শিরোনামটি মনে পড়বে চকিতে। কিম্বা বিধবা মায়ের একমাত্র পুত্রসন্তান হিসেবে সত্যজিতের নিজের আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার ছাপও এ দু’জনের সম্পর্কে লক্ষ্য করতে পারেন কোনো সমালোচক। 

তবে মায়ের এই সর্বগ্রাসী ভালবাসা (ও নির্ভরতাও) অপুর বিকাশমান জীবনের জন্যে যেন এক বন্ধন। ও বিলেতে যেতে চায় কী না কলেজের বন্ধু পুলুর এ প্রশ্নের জবাবে অপুর ক্ষুদ্ধ স্বীকারোক্তি, মা যেতে দেবে না; “তিনঘন্টার রাস্তা কলকাতা, তাই আসতে দিতে চায় না, আর বিলেত”!

অসুস্থ মায়ের কাছে যাওয়ার চেয়ে অপুর কাছে এখন পরীক্ষার প্রস্তুতিটাই বেশি জরুরী। তোর-মা-রাগ-করবে-না পুলুর এ প্রশ্নে অপুর আত্মপ্রসাদী জবাব; “ওটা ম্যানেজ করেছি। আজ মানি অর্ডারে দু’টো টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।” অপু শহুরে হয়ে উঠছে। অভ্যস্ত হয়ে উঠছে নাগরিক কেতায়। তবে হয়তো পুরোটাই নয়। গ্রামীণ সারল্য এখনও রয়েছে কিছু। দেখি বন্ধুর সিগারেটের অফার সে প্রত্যাখ্যান করছে লাজুক সারল্যে।

শৈশবে খেলার সাথী দিদি, বাল্যে স্নেহময় পিতা ও যৌবনের প্রারম্ভে অপু হারাল তার সর্বশেষ আপনজন— মাকে। সর্বজয়ার মৃত্যু অপুর জীবনের এক মোড়নির্দেশক। এ বিশ্বে অপু হয়ে পড়ল যথার্থই এক একক সত্তা। তরুণ অপু বিদায় নেয় আত্মীয় বৃদ্ধ পুরোহিতের কাছ থেকে। বৃদ্ধ ভবতারণ হাত তুলে আশীর্বাদ করেন। এ এক বৈদিক দৃশ্যই যেন। অপু বেরিয়ে যায়। ক্যামেরা কিছুটা ট্রাক করে। বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে রয়েছেন শূন্য প্রাঙ্গণে/কাট্/ অপুর পায়ের ক্লোজ আপ। লংশটে অপু এগিয়ে চলেছে। অজানা জীবনের পথে— চরৈবেতি! দনস্কয়ের বালক গোর্কিও শেষ শটে বেরিয়ে পড়েছিল পৃথিবীর পথে। মার্টিন নেক্সোর দিনেমার উপন্যাসের অপরাজিত বালক পেলেও বিল আগস্টের “পেলে দি কনকোয়ার” ছবিতে এভাবেই শেষ দৃশ্যে এগিয়ে গিয়েছিল সমুদ্রের দিকে। আর সত্যজিতের ‘অপরাজিত’-য় আমরা পেলাম গ্রামবাংলার এক সংবেদনশীল কিশোর অপুর অনিকেত যাত্রা। তবে এ যাত্রা চিরন্তন। এ যাত্রা মানবতার যাত্রা।

অপুর সংসার’— প্রেম শিল্পের টানাপোড়েন

“একটি ছেলে……. গ্রামের ছেলে। দরিদ্র, কিন্তু sensitive। বাপ পুরুত, মারা গেল, ছেলেটি শহরে এল, সে পুরুতগিরি করবে না…..পড়বে, ambitious……শিক্ষার ভিতর দিয়ে, struggle -য়ের ভিতর দিয়ে, তার কুসংস্কার গোঁড়ামি সমস্ত কেটে যাচ্ছে, বুদ্ধি দিয়ে ছাড়া সে কোনো কিছু মানতে চায় না, কিন্তু তার কল্পনাশক্তি আছে, তার অনুভূতি আছে, তার ভেতরে মহৎ একটা কিছু করার ক্ষমতা আছে, সম্ভাবনা আছে……সে মহৎ কিছু করছে না, তার দারিদ্র যাচ্ছে না, তার অভাব থাকছে, কিন্তু সে পালাচ্ছে না, escape করছে না, সে বাঁচতে চায়……. he wants to live” দুই বন্ধুর সেই সুখী সন্ধ্যায় অপু পুলুকে তার উপন্যাসের এই বিষয়বস্তু শুনিয়েছিল। সঙ্গতকারণেই পুলু বলেছিল, এ তো উপন্যাস নয়, আত্মজীবনী! হ্যাঁ, ‘অপুর সংসার’-য়ের কাহিনী যেন অপুরই আত্মজৈবনিক উপন্যাস।

ব্যক্তিগতভাবে আমার ‘অপুর সংসার’-কে অপুত্রয়ীর মণিহারের অনুজ্জ্বল মুক্তাটি মনে হয়। কিছু কিছু সিকোয়েন্সে গতানুগতিক বাংলা ছবির আবহই যেন প্রতিফলিত। চলচ্চিত্রটির এই আপেক্ষিক দুর্বলতার একটি কারণ হতে পারে কাঠামোগত। বিভূতিভুষণের উপন্যাসে তৃতীয় আরেকটি চলচ্চিত্রের উপাদান কতখানি ছিল, তা’ ভাববার বিষয়। আরেক সমস্যা, চিত্রনাট্যকে টানটান ধরে রাখার মতো কোনো তীব্র দ্বন্দ্বর অনুপস্থিতি। শিল্পী অপু ও প্রেমিক অপুর দ্বন্দ্বে প্রেমিক অপু এতই শক্তিশালী যে এ দ্বন্দ্ব কখনোই তীব্রতা পায় না যেমনটি পেয়েছিল ‘অপরাজিত’-য় মায়ের পজেসিভ ভালবাসা ও শিক্ষার অন্বেষারত অপুর দ্বন্দ্বে।

অপুকে দেখে পুলুর মাসীমা বলেছিল; “এ মুখ কোথায় দেখেছি! এ আমার খুব পরিচিত। হ্যাঁ, হ্যাঁ দেখেছি …..পটে আঁকা ঠাকুর দেবতার মুখ”- পাশে দাঁড়ানো পুলু ফোঁড়ন কাটে; “একেবারে সাক্ষাৎ কেষ্টঠাকুর। হাতে বাঁশীটিও আছে”। তবে সারা দিন চাকুরী খুঁজে অপু সন্ধ্যায় নিজের ঘরে ফিরলে, পাশের বাড়ির মেয়েটি জানালায় এসে যখন দাঁড়ায়, অপু জানালাটা বন্ধ করে দেয়, হাতের বাঁশীটি দিয়েই! এটা কলিযুগ। এ যুগের শ্রীকৃষ্ণদের চাকুরি না হলে প্রেম-ট্রেম করা চলে না।

তবে আমাদের এই উদীয়মান লেখক, যে দীর্ঘদিন পর পেট ভরে খেয়ে আনন্দে মা মৃন্ময়ীর সঙ্গে একাত্ম হতে চায়; “আমি হিমাদ্রিপুত্র মৈনাক, পাখার জ্বালায় জলে ডুবে রইছি বাবা, পাখার জ্বালায়,” সে কেরানীগিরি করবে না কারণ ডিকেন্স, কীট্স, লরেন্স, দস্তয়েভস্কি এঁরা কেউই চাকরি করেননি। যদিও ভাগ্যের ফেরে বিয়ের পর তাকে সেই কেরানীগিরিই করতে হোল! কারণ, কোনো এক সুন্দর সকালে সে বন্ধুর সঙ্গে খুলনার গ্রামে যাত্রা করেছিল। এবং ঘটনাচক্রে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। একটা অনবদ্য ট্রাকিং শট্ আছে এ ছবিতে। চলচ্চিত্র ব্যকরণের ব্যাকগ্রাউন্ড ও ফোরগ্রাউন্ডের ব্যবহারের ধ্রুপদী উদাহরণ যেন। নদীর পারে বিয়ের বাজনা বাজিয়ে আসছে পাগলা বরের বরযাত্রীদল। ক্যামেরা সমান্তরালভাবে ট্রাক করে। ক্যামেরা এগিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ দেখি গাছতলায় ঘুমিয়ে আছে এ বিয়ের অজানা বর— অপু। তার সদ্যযৌবনা, প্রায় কিশোরী বধূ, ‘অনুশোচনা’, ‘উৎসর্গ’ এসব শক্ত শক্ত কথার অর্থ না জানলেও ভালবাসতে জানত। বাঙালী নারীর সুগভীর কোমল পতিপ্রেম। রাষ্ট্রনেতাদের মত একুশ বা উনিশবার তোপধ্বনি না হলেও অপর্ণার কাগজের ঠোঙ্গার একটা ছোট তোপধ্বনিই ঘোষণা করে যে অপু তার নিজের ঘরে ভালোবাসার সম্রাট ছিল। যে অপু বাসে-ট্রামে তার ‘মাটির মানুষ’ গল্প ছাপাবার চিঠিটা বার বার বের করে পড়ত, এখন সে তার বদলে পড়ে অপর্ণার চিঠি। তার মনে একটা ইচ্ছা যে অপর্ণা বাড়ি গেলে; “…….উপন্যাসটা এগোবে, বিয়ের পরে এক লাইনও লিখিনি”। তবে অপর্ণার অনুপস্থিতিতে, এবং তার মৃত্যুতে, অপুর সব মানসিক শক্তিই যেন বিপর্যস্ত হয়ে গেল। রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে অপু আত্মহত্যারও চেষ্টা করে। পারে না যে সে শুধু ওই যে অপু পুলুকে বলেছিল, সে বাঁচতে চায়। সে হার মানে না!

‘পথের পাঁচালী’তে দুর্গার মৃত্যুতে অপুর সব দুঃখ যেমন জমাট বেঁধে রূপ পেয়েছে দাঁত মাজতে মাজতে অপুর থমকে যাওয়ার শট্টিতে, একটা ছোট্ট সূক্ষ¥ রে-টাচে, “অপুর সংসার”-য়ে অপর্ণার মৃত্যুতে অপুর শোক দেখাতে সত্যজিৎ দেখছি সেখানে সমুদ্র, বন, পাহাড়, এসব বড় বড় জিনিষের আশ্রয় নিয়েছেন। হয়তো শোকটাও ছিল বড়। নাগপুরের কোনো কয়লাখনির পথে এক বিষণ্ন সন্ধ্যায় বিপর্যস্ত অপু বলেছিল পুলুকে; “একটা জিনিস আমি কিছুতে ভুলতে পারি না, কাজল আছে বলেই অপর্ণা নেই”। নেপথ্যে আদিবাসীদের বিষণ্ন সঙ্গীত। পিতৃত্বের স্নেহ-ভালবাসার দায়ভার এড়াতে চাওয়া সেই অপুরই সকল অবরুদ্ধ ভালবাসা আবার উথলে ওঠে যখন সে দেখে অপর্ণার সেই ফুলশয্যার খাটটিতে ফুলের মতই ঘুমিয়ে আছে শিশু কাজল। নেপথ্যে কাছের নদীটি থেকে ভেসে আসে ফুলশয্যার রাতেরই সেই ভাটিয়ালী সঙ্গীতটি; “বন্ধুরে, কেউ যাইও না জলের ঘাটে ”।

অবশেষে শিশু কাজলের ভালবাসা পায় অপু। “আমায় ফেলে চলে যাবে না”?- কাজলের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন। “তুমি কে?” “তোমার বন্ধু”- অপুর উত্তর। পিতৃত্বের দাবি নয়, রক্তের সম্পর্কের দাবি নয়, তার চেয়ে আলাদা কিছু, হয়তো মহত্তর কিছুই— বন্ধুত্বের দাবি। কাজল লাফিয়ে ওঠে অপুর কাঁধে। শুরু হয় পিতা-পুত্রের যাত্রা। জীবন এগিয়ে চলে, বংশ পরম্পরায়— চরৈবেতি।

ট্রিলজির চরিত্রগুলি

নিশ্চিন্দিপুর-কাশী-মনসাপোতা-কলকাতা এক বালকের ক্রমশ বেড়া ওঠা শৈশব, কৈশোর, যৌবন, অপুত্রয়ীকে একটা মহাকাব্যিক বৈশিষ্ট্য এনে দিয়েছে। নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারের এক সংবেদনশীল বালক, যাত্রা দেখে দিদির পুতুলের বাক্স থেকে রাংতা চুরি করে যে রাজপুত্র সাজতে চেয়েছিল। গোঁফটা পড়ে যায়, কিন্তু মাথার মুকুটটা রয়েই যায়। সব বালকের কল্পনায় রাজপুত্র হতে চাওয়ারই চিরন্তন প্রতীকী রূপ যেন হয়ে ওঠে— অপু।

  

দুর্গার মৃত্যুর পর অপুর নিজের চুল নিজে আঁচড়ানোর চেষ্টা, আগে দিদি আঁচড়ে দিত, তেলের শিশি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘ দেখে ফের ঘরে ঢুকে ছাতা নিয়ে বের হওয়া এবং দুই ইঁটে দুই পা দিয়ে দাঁড়ানোর পরিণত ভঙ্গীটাই তুলে ধরে যে অপু স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। জীবনে সরাল্যের স্তর থেকে অপু অভিজ্ঞতার স্তরে প্রবেশ করছে।

দুর্গার মৃত্যুসংবাদ শুনে হরিহর ঈষৎ দাঁড়িয়ে উঠে করুণ স্বরে ‘দুর্গা মা’ বলে আর্তনাদ করে ওঠে। ক্যামেরা দেখায় অপু বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছে বাবার এই বুকফাটা কান্না। ক্যামেরা অপুর কাছেই ফিরে আসে। কারণ অপুই ট্রিলজীর কেন্দ্রবিন্দু।

‘অপরাজিত’ ছবির প্রথম সংলাপটিই হচ্ছে, সর্বজয়া বলছে হরিহরকে; “বাঁদরটাকে দেখেছ?”  হরিহর কাশীর বানর প্রজাতি সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে সর্বজয়ার কাটা উত্তর; “তোমার গুণধর ছেলে গো।” এ ছবিতে অপুকে প্রথম দেখি আমরা সমবয়সী বালকদের সঙ্গে প্রচন্ড হুল্লোড়ে লুকোচুরি খেলছে। গলি আটকে জুড়ে থাকা এক ষাঁড়ের শরীরের তলা দিয়ে চার হাত পায়ে দিব্যি পথ পার হয় সে। পরে দেখি পয়সা পেলেই বাঁদরদের কিছু খাওয়ায়। তবে ডারউইনীয় কিছুর প্রতি ইঙ্গিতের চাইতে বরং এক প্রাণবন্ত বালকের জীবনতৃষা তুলে ধরারই যেন এ সত্যজিৎসুলভ কৌতুকপ্রিয়তা।

তবে ট্রিলজীতে অপু চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য আধুনিক শিক্ষার প্রতি ওঁর অদম্য স্পৃহা। আড়বোয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক যিনি অপুকে লিভিংস্টোনের আফ্রিকার ভ্রমণকাহিনী, উত্তর মেরু অভিযান, আর্কিমিডিস, নিউটন, ফ্যারাডের জীবনী বা Aurora Borealis সম্পর্কে শিখিয়েছিলেন, কিম্বা কলেজে শিক্ষকদের ব্যক্তিত্বপূর্ণ চেহারা, কন্ঠস্বর এবং ব্লাকবোর্ডে লেখা Metonymy বা Synecdoche -র মত শব্দাবলী বোঝায় যে অপুর শিক্ষামান যথেষ্ট উন্নতই হয়েছিল। তবে অপুর এ শিক্ষা ওর মনকে আলোকিত করলেও মায়ের সঙ্গে অপুর মানসিক দূরত্বটা ক্রমশ: বাড়তেই থাকে। মানবিক স্নিগ্ধতার প্রশ্নে এবং গণেশ-পুজায়-কলেজ-ছুটি-দেয়-কি-না জাতীয় মায়ের আকুতির জবাবে অপু যা লেখে তাতে সত্যজিৎ যেন এই ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে কিছুটা প্রশ্নায়িতই করেছেন। যেটি আমরা আরো অনুভব করি যখন ‘অপুর সংসার’ -য়ে ঔষধ কারখানায় লেবেলিং-য়ের কাজ দেখে, লোয়ার ডেপথ্সে, অপুর ওই ক্ষণিক দৃষ্টিপাত ও শ্রমিকদের দেখে ওর প্রতিক্রিয়াতেই বোঝা গেল, এ শিক্ষাব্যবস্থা অপুকে কায়িক শ্রমে অপারগ এক যথার্থ বাঙালী মধ্যবিত্তই বানিয়েছে।

তবে অপু চরিত্রের যে চিহ্নিত বৈশিষ্ট্য, তা’ তার— শিল্পীমন। ছেলেবেলায় এক দুরন্ত বালক তার চোখের সামনে লাট্টু ঘুরিয়ে বলেছিল; “অপু এলেবেলে”। অন্য শিশুদের মত অপু খেলার হৈ-হট্টগোলের মধ্যে তেমন যেন মিশে যেতে পারে না। জীবননাট্যে ওর সংবেদনশীল মন ওকে যেন কিছুটা দর্শকের ভূমিকাই দেয়। একটা আত্মজৈবনিক উপন্যাসও লিখেছিল সে। কিন্তু অপু ট্রিলজীতে তার শিল্পীসত্তা তেমন পরিণতি পায় না। অপর্ণার মৃত্যুর পর উপন্যাসের কাগজগুলি বরং সে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল! তবে ‘অপুর সংসার’-য়েই কখনো কখনো, যেমন ছাতে বৃষ্টিতে ভিজে অপু যে অপার আনন্দ পায় দেহেমনে, তাতে বোঝা যায় যে সে কলকাতার বাসিন্দা হলেও নিশ্চিন্দপুরেরই ছেলে।

“এবার জ্বর ছাড়লে রেলগাড়ি দেখতে যাব। আগে থাকতে যাব, তা হলে ঠিক দেখতে পাব”; রোগশয্যায় অপুকে বলেছিল দুর্গা। আমরা জানি দুর্গার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। যেমন হয়নি তার বিয়ের লাজুক ইচ্ছাও। রানুদির বিয়ের পর পাড়াবেড়ানি উস্কোখুস্কো চুল মেয়েটিও চোখে কাজল, কপালে টিপ দিয়েছিল। পুণ্যিপুকুর ব্রতও করেছিল। তবে এতই চঞ্চলা অস্থির এক প্রকৃতিকন্যা সে যে মন্ত্রটি পুরো ধীরভাবে বলার ধৈর্য্যও তার নেই। যাকে বলে নমঃ নমঃ করে পুজো সারা ! তবে চুল ঝাঁকিয়ে র্ঝর্ঝ বৃষ্টির মাঝে দুর্গা যখন বৃষ্টিতে অবগাহন করে, বৃষ্টিকে তার মুখে, চুলে ও শরীরে ধারণ করে কৌম নৃত্যের ভঙ্গীমায়, তখন এ চরিত্রটি যেন একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়ে যায়। এক শটে দেখি দুর্গা দেয়ালের খিলান থেকে নেমে আসছে। মাথার উপরে খিলান, মেয়েটির নাম দুর্গা— বাঙালী দর্শক কি কোনো ইঙ্গিত খুঁজে পান!

নানা নতুন পালা লেখবার শখ যার সেই হরিহর রায় খুব অসহায় পিতাই। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে ফেলে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি দায়িত্বহীনতার চাইতে বরং তার অসহায়ত্বকেই যেন তুলে ধরে। অনেক মূল্য দিয়েই এই সংসার অনভিজ্ঞ মানুষটির উপলব্ধি ঘটে যে, নিশ্চিন্দপুরের ভিটের মায়াটি তাকে ত্যাগ করতে হবে। পাঁচজনকে দেখায়; “লেখাপড়ার চর্চা ছিল, সব উঁইয়ে ধরেছে”। তবে কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটে তার গুরুগম্ভীর স্তোত্র পাঠ শ্রদ্ধা জাগায় যে পিতা-পিতামহের ব্রাহ্মণ্য জ্ঞানচর্চার উন্নত ধারা শত দারিদ্র্যের মাঝেও হরিহর ঠিকই বজায় রাখতে পেরেছিল।

তবে সর্বজয়া বাস্তববাদী বাঙালী গৃহিণী। স্বামী ও সন্তানদের মঙ্গলকামনাই যার পরম মূল্যবোধ। এবং যে মূল্যবোধের কারণে পরিবারে আরেকটি বাড়তি খাবারের মুখ, ইন্দির ঠাকরুণকে, ভিটের আশ্রয় থেকে নিষ্করুণভাবে উচ্ছেদে তার বাঁধে না। তার এই আপাত নির্মম ভূমিকার নেপথ্যে রয়েছে তার পরিবার, সন্তানদের, বিশেষ করে পুত্র অপুর প্রতি সীমাহীন ভালবাসা যা ‘অপরাজিত’-য় চরম পজেসিভ এক ভালবাসায় রূপান্তরিত। একদিন সর্বজয়া ইন্দির ঠাকরুণকে অবহেলায় ফিরিয়ে দিয়েছিল, নিয়তির পরিহাসে এক দিন অন্যত্র ব্যস্ত অপুর কাছ থেকে তারও জুটল প্রায় একই রকম অবহেলা, এবং অবশেষে— মৃত্যু। এ এক poetic justice – ই যেন!

‘পথের পাঁচালী’ ছবির যে চরিত্রটি মনে চিরস্থায়ী একটা বিষণ্ন বেদনার ছাপ রেখে যায়, তা’ ইন্দির ঠাকরুণ। হরিহরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া এই বৃদ্ধাকে সর্বজয়া তার অভাবী সংসারে এক বাড়তি উৎপাত বলেই মনে করে। জীবনকে বড্ড ভালবাসে ইন্দির ঠাকরুণ। তাই এর ওর কাছে একটা নতুন চাদর চাইতে কিম্বা ছোটখাটো ছিঁচকে চুরিতে তার অনীহা নেই। দুর্গার পুঁতির মালা চুরি সংক্রান্ত উঠোনের বহু চরিত্রের সমাবেশের সেই mise-en-scene -টাতে একটা নারকেলের পাতা টানতে টানতে ইন্দির ঠাকরুণ যখন উঠোনে ঢুকে একে ওকে জিজ্ঞেস করে “কী হোল”? এবং কেউ জবাব দেবার প্রয়োজনটাও অনুভব করে না, তখনই ইন্দিরের হীন পরাশ্রিত সামাজিক অবস্থানটা আমরা মর্মে মর্মে অনুভব করি, কিম্বা করি দুর্গার পিসীকে খুঁজতে যাওয়ার প্রস্তাবে সর্বজয়ার কাটা উত্তরে; “থাক, পিসীকে খুঁজতে হবে না, বাছুরটা খুঁজে আন”!

বড় দয়ালু মন ইন্দিরের। সর্বজয়া এত কড়া কড়া কথা শোনালেও সর্বজয়া হোঁচট খেয়ে পড়লে সেই-ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ভিটে থেকে বিদায় নেবার আগের মুহূর্তেও তুলসী গাছটায় জল ঢেলে যায়। চিরকালের জন্যে বিদায় নেওয়ার শট্টিতে ইন্দির থমকে দাঁড়িয়ে দেখে তার দাওয়ায় দাঁড়ানো নেড়ী কুকুরটিকে। একটা গভীর অর্থবহ টু শট্ কম্পোজিশন রেখেছেন রায়, ইন্দির ও নেড়ী কুকুরটি, ইঙ্গিতে মূর্ত, এ দু’জনই পরান্নজীবী পরাশ্রিত জীব। অথচ কতই না স্বল্পে তুষ্ট ছিল এই বৃদ্ধার জীবনতৃষা। ওপাড়ার রাজুর দেওয়া সাড়ে নয় আনার চাদরে গা ঢেকে আনন্দে আপ্লুত ইন্দিরের জীবনে সেই দিনেই কী ভাবে নেমে আসে রূঢ় বাস্তবের আঘাত, একটি মোক্ষম শটে সত্যজিৎ তা’ দেখান। পুকুরের পাড়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে বিষণ্ন ইন্দির ঠাকরুণ। পাশে একটা মরা গাছ। লুকোচুরি খেলার উত্তেজনায় প্রাণবন্ত শিশুরা সে গাছ টপকে পাড়ি দিয়ে যায়। জীবনই যেন ইন্দিরকে টপকে এগিয়ে যায়। নেপথ্যে সেই আবহসঙ্গীতটি “হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হোল”,  যে আবহসঙ্গীতটি আবারও সত্যজিৎ ফিরিয়ে আনেন অত্যন্ত শিল্পিতভাবে ইন্দিরের শ্মশান যাত্রার দৃশ্যে।

ইন্দির প্রশ্নে একটা অসামান্য শট আছে ‘পথের পাঁচালী’-তে। সর্বজয়া তাড়িয়ে দিয়েছে ইন্দিরকে। আশ্রয়ের খোঁজে ইন্দির গেছে  দূর সম্পর্কের রাজুর বাসায়। মিড লং শটে ইন্দির এগিয়ে আসে ক্যামেরার দিকে, এবং আসতেই থাকে। মুখে তার প্রশ্ন; “এই বুড়ো বয়সে আর কোথায় যাই বল্?………….বাবা, তোরা না দেখলে আর কে দেখবে বল্?” এ প্রশ্ন যেন ক্যামেরার লেন্সকে, সেই সুবাদে আমাদের সকলের বিবেকের দিকেই ছুঁড়ে মারে এই বৃদ্ধা। এবং গ্রামবাংলার এরকম লক্ষ লক্ষ দরিদ্র অসহায়া বৃদ্ধাদের ব্যাপারে আমাদের বিবেক দংশনকে তা’ তাড়িত করতেই থাকে। কে দেখবে এই সব অসহায় বৃদ্ধাদের ! যে কোনো মহৎ শিল্পে একটা নতুন কিছু থাকতে হয়। আশি বছরের একজন বৃদ্ধাকে দিয়ে অভিনয় করানো, এ বড় নতুন জিনিস এ উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে। আর কী অনন্য অভিনয়ই না করেছেন ইন্দিররূপী চুনীবালা।

কাগজে পেন্সিলের কয়েক টানে স্কেচ আঁকার মতই মাত্র কয়েকটি শটে এক একটি বিশেষ চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার রায়ের দক্ষতা প্রায়— শেক্সপীয়ারীয়। এ ধরনের প্রচুর চরিত্র রয়েছে অপুত্রয়ীতে যারা ছবির পর্দায় খুব স্বল্পক্ষণ স্থায়ী হলেও আমাদের মনের পর্দায় স্থান করে নেয় প্রায় চিরকালের জন্যে। কেই বা ভুলতে পারে অপুর পাঠশালার সেই বাচাল বৃদ্ধ বদ্যি মজুমদারকে যে যাত্রা পার্টির গালগল্প শুনিয়ে মুদী পন্ডিতের পূজোর চাঁদটা না ধরে তার বদলে বিনে পয়সায় তার তেলটা নুনটা হাতিয়ে নেয়! কিম্বা গোলাকার অসাধারণ expressive মুখমন্ডলের, বেত, ব্যস্ত হাত ও সেই অনন্য শ্রুতিলিখনের মুদীপন্ডিত প্রসন্ন গুরুমহাশয়কে, যে চরিত্রটিতে তুলসী চক্রবর্তীর অনবদ্য অভিনয় আমাদেরকে আবিষ্ট করে রাখে। কিম্বা আড়বোয়াল স্কুলের সেই হেডমাস্টার, যিনি অপুকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বই দিতে দিতে বলেন; “আমরা বাংলাদেশের এক remote corner – য়ে পড়ে আছি বলে আমাদের মনটাকেও যে কোণঠাসা করে রেখে দিতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই।” কিম্বা নীলমনির দয়ালু ‘নওয়া বৌ’। অথবা ‘অপুর সংসার’- য়ে অপুর সেই ‘সিধে কথা’-র উত্তর কলকাতার বাড়িওয়ালা কিম্বা নিচের তলার সেই প্রৌঢ় ভাড়াটেটি যে অপুকে চিঠিটা দিয়ে জিজ্ঞেস করে; “গার্ল ফ্রেন্ড-ট্রেন্ড নেই” তারপরে যোগ করে অযাচিত উপদেশ; “matrimonial complication -য়ে যাবেন না মশাই, আমি নিজেই ভুক্তভোগী।” কিম্বা সাতক্ষীরার কালীচরণ বন্দোপাধ্যায় যে কাশীর ঘাটে চাদরের খুঁটে চায়ের পাতা নিয়ে ঘোরে এবং ঘাটে বিগতযৌবনা  বৃদ্ধাদের শ্রীকৃষ্ণের কেচ্ছাকাহিনী শুনিয়ে এ পর্যন্ত চারশ টাকা জমিয়েছে বলে শোনায় এবং যার পরিকল্পনা আর শ’খানেক হলেই শ্রোত্রিয় বংশের ভাল একটা বউ যোগাড় করার! যার উপলব্ধি; “সংসার না হলে কী জীবনে সুখ আছে, মশাই”? ‘অপুর সংসার’ -য়ে অপুর অফিসে প্রথমে দেখি ক্লোজ আপে টাইপ রাইটারে লেখা হচ্ছে Yours faithfully, তারপর মিডশটে এক কেরানীবাবুকে বসে থাকতে দেখি আমরা ফাইলের সামনে। পেছনে ফ্যান ঘুরছে। এই কেরানী বাবুটিও বিবাহিত জীবন সম্পর্কে অপুকে কিছু সার কথা শুনিয়েছিল ! এরকম মাত্র একজন টাইপ কেরানী চরিত্র দিয়েই সত্যজিৎ বাংলার তাবৎ কেরানীকুলকেই যেন তুলে ধরেন সার্থকতার সঙ্গে। এরকম পর্দায় স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু বেশ কিছু চরিত্র, মূলত কৌতুকরসে আঁকা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অপুত্রয়ীতে যা ট্রিলজিটিতে সূক্ষ¥ কৌতুকরস যুগিয়েছে, তাকে আরো প্রামাণ্যবাস্তব করেছে, এবং করেছে— বৈচিত্র্যময়।

তবে শুধু মানবচরিত্রই নয়, যেভাবে ইন্দিরের চাদরের থলিটা বিড়াল ছানাটার উপরেই পড়ে, যেভাবে বৃষ্টিতে ভিজে কুকুরটি দাওয়ায় গা ঝাড়ে, সাপটি ঢোকে পরিত্যক্ত বাস্তুভিটার ঘরে, কিম্বা সর্বজয়ার দিকে তেড়ে আসে কাশীর হনুমান, এসব প্রাণীরাও ট্রিলজীকে আরো মাটির কাছাকাছি দাঁড় করিয়েছে, বাড়িয়েছে এর বাস্তব গ্রহণযোগ্যতা। ট্রিলজীটিতে যথার্থ প্রতীক সৃষ্টি ও চলচিত্র তিনটির প্রামাণ্যবাস্তবতা বাড়াতে এসব প্রাণীকুলের ভূমিকাও কিছু কম নয়।

অপু ট্রিলজী — চিত্রভাষা সাদাকালো আলোকচিত্রের ধ্রুপদ রূপ

ট্রিলজীতে মূলত: বাউন্স লাইটের ব্যবহারে সাদাকালো আলোকচিত্রেরর অসামান্য কাজ করেছেন সুব্রত মিত্র। আর রোদ ও মেঘের আলোছায়াকে এ রকম সার্থকতায় ব্যবহার বিশ্ব চলচ্চিত্রেই কম। তবে ইন্দিরের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ক্লোজ আপটি আবার নেন দুপুরের harsh লাইটে, সূর্য যখন মাথার উপর। কিন্তু অপু-দুর্গার মৃত্যু দৃশ্যে ইনডোর সেটেই চমৎকার সৃষ্টি করেন ঝড়বৃষ্টির রাতের আবহ। আলোছায়ার ওঠানামায় মনে হয় মৃত্যুই যেন দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়তে চাইছে ঘরে ! লো-কী লাইটিং-য়ে বিদ্যুতের চকিত ঝলকে গৃহদেবতা গণেশই যেন হয়ে উঠে অশুভের প্রতীক।

সাদা কালোর আলোকচিত্রের যে এক বিশেষ দিক সেই টোনের ব্যবহার সত্যজিৎ নানাভাবেই করেছেন। বিশেষভাবে স্মরণ করুন সাদা কাশবন, তার ওপর কালো ট্রেন, তারও ওপরে নিকষ কালো রেলের ধোঁয়ার শট্টির কথা। চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্বের কম্পোজিশনের যে অন্যতম দিক, ফ্রেমের বাঁকা অ্যাঙ্গলকে ব্যাবহার করা, ‘পথের পাঁচালী’-র প্রথম শটেই তার প্রকাশ। “দেখেছ, দেখেছ, গাছে একটা ফল থাকবার যো নেই”; সেজবৌ ছাদের ধার ধরে দ্রুত এগিয়ে আসে, ক্যামেরার বাঁকা অ্যাঙ্গেলে ধরা হয় কার্নিশের কিনার। মুহূর্তে পরিবেশটির উত্তেজনা মূর্ত হয়ে ওঠে। কিম্বা কয়েক শট পরেই সর্বজয়ার উদ্দেশে সেজবৌ যখন নানা কটুবাক্য বর্ষণ করে তখন দেখি আইজেনস্টাইনীয় সূত্র মেনেই যেন ইঁদারার দড়িটি কোণাকুণি টান্টান্, বৈরিতার প্রতীকে। এবং তার পরের শটেই ফ্রেমের মাঝে পিলার বা খুঁটির যে চলচ্চিত্রিক গ্রাফিক রূপ— সাপোর্ট বা আশ্রয় দেয়া, সর্বজয়া তা পাচ্ছে দয়ালু নওয়া বৌয়ের কাছে। দু’জনের মাঝে একটা চওড়া খুঁটি। নওয়া বৌ বলে; “কলসীটা দিয়ে আসব?” আমরা জানব যে সর্বজয়া গর্ভবতী এবং আমরা পরে এটাও জানব যে ¯েœহশীলা নওয়া বৌ সর্বজয়ার বিভিন্ন দুর্দিনে তাকে কী ভাবে সাহায্য সমর্থন যুগিয়ে এসেছে। এভাবে শটের পর শট্ ধরে এগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু তার বোধ হয় প্রয়োজন নেই। আমরা মূলত: কয়েকটি বিভিন্ন ধরণের উদাহরণের মাধ্যমে দেখব ক্যামেরাকোণ, ক্যামেরা মুভমেন্ট, মূলত প্যান, ট্র্যাকিং, ক্লোজ আপ, ডীপ ফোকাস এসব চিত্রভাষার অন্যান্য বিভিন্ন উপাদানকে কত নান্দনিক ব্যবহারই না সত্যজিৎ রায় করেছেন অপু ট্রিলজীতে।

রানুর বিয়ের দৃশ্যে একটা ট্রলি শট আছে ‘পথের পাঁচালী’তে। বারান্দায় মাছ কাটা হচ্ছে, আনাজ কাটা হচ্ছে, কাটা হচ্ছে বেগুন। ক্যামেরা ট্রলি করে একটার পর একটা থাম অতিক্রম করে এবং কিছু আনাজ, একটা বড় মাছ, ও কিছু বেগুন দেখিয়ে অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে তুলে ধরা হো’ল গোটা বিয়ের বিশাল কর্মকান্ডের আবহটিকেই, একটা মাত্র সফল ট্রলি শটের মাধ্যমে। নৌকার ওপর থেকে একটা ট্রাকিং শট আছে ‘অপরাজিত’য়, ক্যামেরা কিছুটা প্যানও করে, যা বিশাল ক্যানভাসে তুলে ধরে কাশীর দশাশ্বমেধ বা মণিকার্নিকা ঘাটের নানা মানুষের হাজারো কর্মব্যস্ততাকে। সর্বজয়া-ইন্দির ঝগড়া দৃশ্যে সর্বজয়া যখন ইন্দিরের; “বুড়ো মানুষের শখ হয় না বুঝি”-র জবাবে রূঢ়ভাবে বলে; “ শখ করতে হয়তো অন্য ব্যবস্থা দেখ” আমরা দেখি ক্যামেরা দ্রুত, অতিদ্রুত, প্যান করে ইন্দিরকে ধরে। চরিত্রদের মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যেন এক রুদ্ধশ্বাস গতির প্যান।

শুধুমাত্র ক্যামেরাকে এক যথার্থ অবস্থানে বসিয়ে ও চরিত্রদের ফ্রেমের যথার্থ জায়গায় মুভমেন্ট করিয়ে সত্যজিৎ বহুবারই চরিত্র বা চরিত্রের মানসিক রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন। সর্বজয়া প্রসবঘরে। ভাঙ্গা বারান্দায় হাঁটছে হরিহর। মাথার উপর খিলানের কাজ। ক্যামেরা কিছুটা লো-অ্যাঙ্গেলে। ওই খিলানের ব্যাকগ্রাউন্ডে হরিহরকে মনে হয় যেন নিজ ভাঙ্গা ঘরে সম্রাট সে। ‘সুখে থাকো’ থালা বন্ধক দিয়ে সর্বজয়া ভোরবেলা গোপনে চাল নিয়ে ফেরে। শুধুমাত্র ক্যামেরার কোণের যথার্থ ব্যবহারেই মূর্ত হয়ে ওঠে সংলাপবিহীন দৃশ্যটা। সর্বজয়ার চাদরটা ঈষৎ টেনে ধরায়, কুয়াশাভোরে চাল নিয়ে আসার ওর অপরাধী ভঙ্গীটা, যথাযথ ক্যামেরা অবস্থানের কারণেই হয়ে ওঠে বাক্সময়।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ক্লোজ আপ ইন্দিরের ক্লোজ আপটির কথা আগেই আলোচনা করেছি। একেবারে ভিন্ন ধরণের একটা ক্লোজ আপের কথা এখন বলি। কাশীর নন্দনবাবু অসৎ উদ্দেশ্যে এগোচ্ছে সর্বজয়ার দিকে। সত্যজিতের ক্যামেরা নন্দবাবুর মুখ দেখায় না, দেহাবয়বও তেমন দেখায় না, বিগ ক্লোজ আপে দেখি শুধু তার হাত, আঙ্গুলগুলি কাঁপছে। তার অশুভ উদ্দেশ্য ও সকল উত্তেজনা একটি ক্লোজ আপেই মূর্ত।

হরিহর ও সর্বজয়া রান্নাঘরে সাংসারিক সুখ-দুঃখের আলাপ করছে। দূরে পেছনে বারান্দায় দেখি ইন্দির শিশু অপুকে দোলাচ্ছে। রেনোয়ার প্রিয় আঙ্গিক ডীপ ফোকাসের এক বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার।

অপুর প্রতীক্ষারত সর্বজয়া অসুস্থতার বিকারে অবচেতনে অপুর কন্ঠে ডাক শোনে “মা”। অসুস্থ সর্বজয়া দরজার কাছে এগিয়ে যায়। নেপথ্যে শেয়ালের ডাক। সন্ধ্যার শূন্য পুকুরপারটা ধীরে ধীরে ভরে ওঠে জোনাকীর আলোয়। রাত হয়ে এল। অপু এল না! ওই যে ফ্রেম জুড়ে জোনাকীর আলো ভরিয়ে দেয়া, এটাও ক্যামেরায় বড় কম এক কাজ নয়।

সর্বজয়ার মৃত্যুর পর শূন্য বাড়িতে ঢোকে অপু। উঠোনে ডেকে বেড়ায়; “মা!, মা”! খিড়কীর দরজা দিয়ে অপু বাইরে আসে। হঠাৎ দেখে বৃদ্ধ ঠাকুরমশাই। বৃদ্ধের দাঁড়ানোর ভঙ্গীটাই অপুকে জানান দেয় — মা আর নেই। অপু থমকে মাটিতে বসে পড়ে। পেছনে গাছের শেকড়। ‘পথের পাঁচালী’-তেও ইন্দিরের মৃত্যুর পর, পুকুরপারে হরিহরের বসে থাকা ও সর্বজয়ার শুধুমাত্র দাঁড়াবার ভঙ্গীমাতেই ইন্দিরের মৃত্যুর বেদনাটা ছিল সুপরিস্ফুট।

একটা টপ শট্ আছে ‘অপরাজিত’-য়। হরিহর গঙ্গাপারের ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। সিঁড়ির সারি সারি ধাপ। পেছনে গঙ্গা। অসুস্থ শরীরে হরিহরের কষ্ট করে উঠে আসার ভঙ্গীটাই ইঙ্গিত দেয় ওঁর আসন্ন মৃত্যুর কথা। অত্যন্ত সফল অর্থবহ একটি টপ শট্।

তবে ‘অপুর সংসার’-য়ে বিয়ে ভাঙ্গার পরবর্তী দৃশ্যটি হয়তো রাতেই তুলতে চেয়েছিলেন রায়। তবে তাঁর Day-for-Night -য়ের চেষ্টাটি তেমন সফল হয়নি।

সম্পাদনায় ছন্দ গতির প্রশ্নে

মূলত mise-en-scene -য়ের আঙ্গিকে অপুত্রয়ী গড়া। শট্ ডিভিশনগুলো সেভাবেই করা। যে mise-en-scene -য়ের একটি অত্যন্ত সার্থক উদাহরণ হতে পারে দুর্গার পুঁতির মালা চুরির পরের উঠোনের দৃশ্যটি। উঠোনে নাড়তে দেয়া কাপড়গুলির সুকৌশলী অবস্থান প্রায় মঞ্চসেটের কায়দাতেই সৃষ্টি  করেছিল শট্ ডিভিশনের চমৎকার সুযোগ।

সেজবৌয়ের; “বেড়া দাও, বেড়া দাও” বলে কাপড়ে মোচড় কিম্বা হরিহরের; “ভেবেছিলাম অন্নপ্রাশনটা একটু জাঁক করে করব” বলে হুঁকায় মোচড়, চিত্রনাট্যের এই বাক্যাংশগুলি শুধুমাত্র অভিনেতার অভিব্যক্তি প্রকাশেই নয়, সম্পাদনাতেও গতি আনতে সাহায্য করেছে।

“একখানা চাদর দিবি তো? দিবি তো”? ইন্দিরের বাড়ানো হাত/কাট্/ “একটু আগুন দেবে?” হরিহরের বাড়ানো হাত সর্বজয়ার দিকে। এই মন্তাজ অব অ্যাট্রাকশনটি ইঙ্গিতে মূর্ত— এ সংসারের আসল কর্ত্রী কে!

‘অপরাজিত’-য় হরিহরের মৃত্যুর মুহূর্তে সর্বজয়ার তীক্ষè আর্তনাদ; “কী হোল”? কাট্/ঝাঁক ঝাঁক কালো পায়রা উড়ছে আকাশে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র দৃশ্যগত নয়, শব্দগত সম্পাদনাতেও একটা দ্যোতনা এনেছেন রায়।

প্রচুর ডিজল্ভের ব্যবহার করেছেন রায় গোটা ট্রিলজী জুড়ে। মাঝে মাঝে মনে হয় একটু বেশিই। বিশেষ করে যখন জানি প্রায় সমসাময়িক সময়েই গদার বানিয়েছেন ‘ব্রেথলেস’ (১৯৫৯)- ডিজলভ, ফেড ইন, ফেড আউটকে প্রায় বাতিল করে কাট্ আর জাম্পকাটের এক মহাসমারোহ!

“তোমার পয়সা নেই মা, পয়সা নেই তোমার?” বলে অপু। ক্যামেরা tilt up করে। সর্বজয়ার চিন্তিত মুখ/কাট্/ইস্কুলের শট্। অপু ইস্কুলে। মাঝের অনাবশ্যক অংশটুকু ছেঁটে ফেলেছেন রায়। এ হচ্ছে সম্পাদনার গতি। তবে আমরা রায়ের ছবিতে সম্পাদনার গতির কথা যখন বলি তার মানে মূলত: বলি দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাওয়ার ওঁর মিতব্যয়িতার কথা। তবে সম্পাদনায় গতির নামে একই দৃশ্যে ওঁর তাড়াহুড়ো নেই। বাঙালী জীবনের ধীরলয় গতির সঙ্গে মিলিয়েই সৃষ্টি সত্যজিতের ছবির ধীরলয় গতির ছন্দ। এবং একটু মনোযোগ দিলে সংবেদনশীল দর্শক অনুভব করবেন এই ছান্দিক স্পন্দনটির মধ্যে একটি সাঙ্গীতিক কাঠামোও যেন ক্রিয়াশীল।

অপুত্রয়ী – আবহসঙ্গীতে ও আবহশব্দে

চলচ্চিত্র যে শুধু দেখার নয়, শোনারও জিনিস, রায়ের যে কোনো ছবিই তার প্রমাণ। অপু ট্রিলজী তো বটেই। এক ঋদ্ধ সাঙ্গীতিকতা জুড়ে রয়েছে ট্রিলজীর তিনটি ছবিরই শরীরে।

ট্রিলজীর সঙ্গীত প্রসঙ্গে সত্যজিতের ভাষ্য হচ্ছে; “ট্রিলজীর তিনটি ছবিতেই দীর্ঘ নিঃশব্দের জায়গা রয়েছে যা আবহসঙ্গীতের সাধারণ ব্যবহারের বেশ সুযোগ রেখেছিল। ‘পথের পাঁচালী’-র দু’টি গোটা দৃশ্যই প্রায় সংলাপহীন এবং আবহসঙ্গীতের প্রেক্ষিতেই দৃশ্য দুটি কল্পনা করা হয়েছিল। একটি হচ্ছে বৃষ্টির দৃশ্যটি, আরেকটি দুর্গার মৃত্যুর পর অপুর দৃশ্যাবলী। প্রথম দৃশ্যটির জন্যে রবিশঙ্কর একক সেতারে ‘দেশ’ রাগের তিন মিনিটের একটি আবহসঙ্গীত তৈরি করেছিলেন। দুর্গার মৃত্যুর পরবর্তী করুণ দৃশ্যগুলির জন্যে পছন্দ করা হয়েছিল রাগ ‘তোড়ি”।”

হরিহরকে দুর্গার মৃত্যুসংবাদ দেবার পর সর্বজয়ার কান্নার বদলে পটদীপ রাগে তারসানাইয়ের আর্তনাদ, রায়ের সঙ্গীত প্রসঙ্গে আজ বহুল উদ্ধৃত। তবে জলপোকাদের নাচের আবহসঙ্গীতাংশ কিম্বা ‘অপরাজিত’-য় হরিহরের মৃত্যুর পর এক তীব্র নিনাদে যেভাবে ঝংকার দিয়ে ওঠে রাগ যোগ, যে সাঙ্গীতিক মোটিফটি ছবির শেষাংশে সর্বজয়ার একাকীত্বের সময়ও ফিরে আসে, কিম্বা অপু যখন সর্বজয়াকে বলে কেওড়াতলায় আছে “burning ghat”, আছে শ্মশান, তখন সাউন্ডট্রাকে আবহসঙ্গীতের ওই ঈষৎ ভয়ার্ত ব্যবহার – মর্মভেদী।

‘অপুর সংসার’-য়েরও একটা গোটা দৃশ্যই ধারণ করা হয়েছে আবহসঙ্গীতের দৃষ্টিকোণ থেকে। আর তা’ হচ্ছে অপর্ণার মৃত্যুর পর অপু যখন উদেশ্যহীনভাবে ঘুরছে, হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল তার অনেক সাধের উপন্যাসের পাতাগুলি, বাঁশী ও সেতারের সংমিশ্রণে এ সময়ের সঙ্গীত যেন বৈদিক কোনো মন্ত্রোচ্চরণের মতই গভীর ও নির্মেদ।

তবে অপুত্রয়ীর আবহসঙ্গীত প্রসঙ্গে আলোচনায় ব্যাপক জায়গা জুড়ে রইবে অবশ্যই ‘পথের পাঁচালী’র বাঁশের বাঁশীর স্মৃতিমেদুর সেই বিষণ্ন মূল থীম মিউজিকটি, যা চিরকালই বাঙালীকে আবেগময় করবে। গোটা ট্রিলজীর বিশেষ বিশেষ ক্ষণে সত্যজিৎ বারে বারেই leit-motif – য়ে ফিরিয়ে আনেন ওই থীম মিউজিকটি, বা তার অংশ বিশেষ। যখনই নিশ্চিন্দিপুরের কথা আসে, পরিবারটির স্বপ্নের কথা আসে, অপুর জীবনে ঘটে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, নেপথ্যে বেজে ওঠে ‘পথের পাঁচালী’র বিষণ্ন ও শ্রুতিনন্দন সেই থীম মিউজিকটি। অনবদ্য এবং অব্যর্থ। এবং অনেক ভিন্ন প্রেক্ষিতেও, আড়বোয়াল স্কুলে অপু যখন স্কুল ইনস্পেকটরের সামনে আবৃত্তি করছিল;

                               

                “কোন্ দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল

                                কোন্ দেশেতে চলতে গেলে ডলতে হয় রে দূর্বা কোমল

                                কোথায় ফলে সোনার ফসল, সোনার ফসল ফোটেরে

                                সে আমাদেরি বাংলাদেশ, আমাদেরি বাংলারে

                                কোন্ ভাষা মরমে পশি আকুল করে তোলে প্রাণ

                                কোথায় গেলে শুনতে পাব বাউল সুরের মধুর তান”

                — তখনই সাউন্ডট্রাকে ভেসে আসে, প্রথমে অস্পষ্ট ও পরে তীব্র, নিশ্চিন্দিপুরের সেই থীম মিউজিকটি। এ থীম মিউজিক তখন শুধুমাত্র নিশ্চিন্দিপুরের নয়, গোটা বাংলারই বেদনা ও স্বপ্নের প্রতীক হয়ে ওঠে যেন। এই যে একটি বিশেষ সঙ্গীতপীস হয়ে উঠছে একটা দেশের প্রতীকে, তার আরেক বড় প্রমাণ দেখি সর্বজয়া যখন ট্রেনে কাশী থেকে বাংলায় ফিরছে। কাশীর ব্রীজ, বিহারের শুষ্কভূমি, পাহাড় পেরিয়ে ট্রেন যখন ঢুকল বাংলার শ্যামলিমায় কাট্ / একটি ছেলে নৌকা বাইছে/ ক্যামেরা tilt up করে দেখায় গরুর গাড়িতে পরিবারটি গ্রামে ফিরছে। নেপথ্যে তখন আবারও বেজে ওঠে সেই থীম মিউজিকটি, বাঙালীর মনে আবেগের অনুরণন তুলে।

অন্যত্রও। ‘অপরাজিত’-য় অপু কলেজে পড়তে কলকাতায় যাচ্ছে। কপালে মাঙ্গলিক চিহ্ন এঁকে দেয় মা। অপু বেরিয়ে পড়ে। তখনই আবার বেজে ওঠে ‘পথের পাঁচালী’-র থীম মিউজিকের সেই সুরটি, কিম্বা সন্ধ্যায় মনসাপোতার নতুন বাড়ির তুলসীতলায় সর্বজয়া যখন প্রণাম করে, নেপথ্যে আবারও ভেসে আসে নিশ্চিন্দিপুরের থীম মিউজিকটি। নিশ্চিন্দিপুরের নস্টালজিক স্মৃতি বয়ে এনে, কিম্বা বয়ে এনে নতুন বাড়ির এক স্বপ্নকে।

ইন্দির ঠাকরুণকে ঘিরে একটা বিশেষ মিউজিক পীস, আরেকটা leit motif -য়ের মতই সাউন্ডট্রাকে ফিরে আসে বারে বারেই। পীসটি হচ্ছে সরল পল্লীসুরে গাওয়া লালনের বন্ধু কাঙাল হরিনাথের গান; “হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হোল, পার কর আমারে”। ইন্দিরকে প্রথম ফ্রেমে দেখানোর সময় থেকেই ওই আবহসঙ্গীতটির ব্যবহার, যে সঙ্গীতটি পূর্ণতা পেল ইন্দিরের শ্মশানযাত্রায়।

বিভিন্ন আবহশব্দের ক্ষেত্রে চারপাশের বাস্তবলভ্য বিভিন্ন শব্দেরও অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার করেছেন সত্যজিৎ রায়। যে দৃশ্যে দুর্গাকে চুরির জন্যে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, আমরা শুনতে পাই পাখীর তীক্ষè আওয়াজ। কিম্বা দুর্গাকে প্রহারের দৃশ্যে, টক্ক সাপের ডাক।

আর গোটা ট্রিলজী জুড়ে রেলগাড়ির বিভিন্ন শব্দের অত্যন্ত শিল্পোচিত ব্যবহারের তো তুলনা নেই। ‘পথের পাঁচালী’-তে রাতে বারান্দায় অপু পড়ছে বাবার কাছে, সর্বজয়া বেঁধে দিচ্ছে দুর্গার চুল, এমন সময় নেপথ্যে বহুদূরে ভেসে আসে ট্রেনের আওয়াজ -ঝিক্ঝিক্ ঝিক্ঝিক্। ক্যামেরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে অপুর মুখের উপর ধরে। বড় বড় চোখে বিস্ময়াবিষ্ট এক বালক বহু দূরের কোনো হাতছানির এক ডাক যেন শোনে। তারপর দিদিকে প্রশ্ন; “দিদি, তুই রেলগাড়ি দেখেছিস?” এরপর অপু-দূর্গার রেলগাড়ি দেখার অ্যাডভেঞ্চারটি থেকে শুরু করে গোটা ট্রিলজী জুড়েই রেলগাড়ির উপস্থিতি ট্রেনকে যেন ট্রিলজীটির একটা চরিত্রেই পরিণত করে দেয়, কখনো দৃশ্যগতভাবে, এবং প্রায়শই— সাউন্ডট্রাকে। দুর্গার মৃত্যুর পর হরিহর যখন রাতে শুয়ে নিশ্চিন্দপুর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা শুনি, রাতের অন্ধকার চিরে দূর নেপথ্যে রেলগাড়ির হাতছানি — ঝিক্ঝিক-ঝিক্ঝিক্ !

‘অপরাজিত’-য় মনসাপোতার নতুন বাড়িতে যেয়ে অপু প্রথমেই যা দেখে তা— দীর্ঘ লং শটে রেলগাড়ি। অপু যখন মাকে বলে সে জলপানি পাবে, কলকাতায় পড়তে যাবে, মাকে দেখায় গ্লোবটি, তখনও সাউন্ডট্রাকে ভেসে আসে দুরের হাতছানি হিসেবে রেলগাড়ির ওই ঝিক্ঝিক্ আওয়াজ।

‘অপুর সংসার’-য়েও টাইটেল কার্ডের পরে প্রথম শটেই আমরা দেখি অপুর জানালা। বৃষ্টিভেজা। অপু ঘুমিয়ে আছে। সাউন্ডট্রাকে ট্রেনের হুইসেল। অপুর ঘুম ভাঙ্গে। অপুর বসতই এখন রেলইয়ার্ডের ধারে!

                               

উদাহরণ আর বাড়িয়ে লাভ নেই। গোটা ট্রিলজী জুড়েই রেলগাড়ির আবহশব্দের যে বৈচিত্র্যময় ব্যবহার সত্যজিৎ করেছেন তা’ যেমন বুদ্ধিদীপ্ত, তেমনই চলচ্চিত্রে আবহশব্দের ব্যবহারে উদাহরণস্থানীয় হয়ে রয়েছে।

চিত্রনাট্য, প্রামাণ্যবাস্তবতা কয়েকটি পর্যবেক্ষণ

সত্যজিতের আর সব ছবির মতই নির্মেদ ঋজু চিত্রনাট্য অপু ট্রিলজিরও। বাড়তি নেই কিছু। মাত্র অল্প কয়েকটি শটে, যেভাবে ‘অপরাজিত’-য় অপুর কলকাতায় আসা, প্রেসে চাকুরী ও থাকার ব্যবস্থা, কলেজের শিক্ষা ও বন্ধুপ্রাপ্তি, মাত্র কয়েকটি শটেই যে সাবলীলতায় ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সত্যজিৎ প্রতিষ্ঠা করলেন, তা’ চিত্রনাট্যের বিস্ময়।

সর্বজয়া যখন নিজ গৃহের গৃহিণী, তখন তার বসার এক ভঙ্গী। কিন্তু যখন অন্য বাড়িতে পরিচারিকা, তখন তার বসার ভঙ্গীটাও পাল্টে যায়। শুধুমাত্র বসার ভঙ্গীটাই তুলে ধরে তার শ্রেণীগত অবস্থান।

কিম্বা ধনী পরিবারটির সঙ্গে রাঁধুনী হিসেবে সর্বজয়া দেওয়ানপুর যাবে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর আমরা দেখি সর্বজয়া সিঁড়ি দিয়ে নামছে, মুখে স্মিত হাসি। সর্বজয়ার PV -তে ফ্রেমের মাঝ দিয়ে দেখি অপু হুঁকো সাজছে। আমরা শুধুমাত্র অপুর দাঁড়ানোর ভঙ্গীটা দেখি, অপু কার জন্যে হুঁকো সাজছে তা নিশ্চিত নয়, তবে তার দাঁড়ানোর ভঙ্গীটাই নিশ্চিত করছে যে সে আগামী দিনে এক গৃহভৃত্য হতে যাচ্ছে। পরের শটেই আমরা দেখলাম সর্বজয়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। মিডশট্ থেকে ক্লোজ আপ/কাট্/ট্রেনের আওয়াজ— সর্বজায়া, অপু আর ঠাকুরমশাই বাংলায় ফিরছে। সর্বজয়া তার সিদ্ধান্ত পাল্টেছে। সে অপুকে গৃহভৃত্য হতে দেবে না। এসবই এক অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত গতিশীল চিত্রনাট্যের প্রমাণ কিম্বা যেভাবে গরবিনী মুখরা সেজবৌয়ের পাড়দেওয়া শাড়ি যা পরে আরেক শটে সাদা শাড়ি হয়ে যায় তাতে বাঙালী দর্শক সহজেই এই তথ্যটি জেনে যায় যে ইতিমধ্যে সেজবৌ বিধবা হয়েছে।

প্যারালাল আকশনের এক ভিন্ন মাত্রার একটা দৃশ্য আছে ‘পথের পাঁচালী’-তে। অপু-দুর্গা যখন বিশাল প্রকৃতির মাঝে সাদা কাশবনে জীবনের নানা বৈচিত্র্য দেখছে, অপু শৈশবের অপার সারল্য নিয়ে দেখছে রেলগাড়ি,  বাড়িতে বয়স্কদের মাঝে তখন ঘটে চলেছে এক নির্মম নাটক। সর্বজয়া ইন্দিরকে আর ভিটেয় আশ্রয় দিচ্ছে না, নিশ্চিত হচ্ছে বাঁশঝাড়ে ইন্দিরের অসহায় মৃত্যু।

ট্রিলজীর অপর এক বৈশিষ্ট্য ডকুমেন্টেশন বা প্রামাণ্যচিত্রের আবহ। ১৯২০ সালের কাশী, কাশীর মন্দিরগুলি, মানুষের ভীড়, কিম্বা দশাশ্বমেধ বা মণিকনির্কা ঘাটগুলির দৃশ্যগত প্রামাণ্যতা অনন্য। কিম্বা হ্যারিসন রোড বা সে সময়ের কলকাতার রাস্তাঘাট, গঙ্গার পার ও পথচারী মানুষদের যে প্রামাণ্যাবহ “অপরাজিত”-য় রায় সৃষ্টি করেছেন তাও তো বাস্তবতায় দৃঢ় এবং সে প্রামাণ্যতার প্রশংসা করেছেন স্বয়ং ফ্লাহার্টিও, ডকুমেন্টারি ফিল্মের যিনি আদি এক পুরোধা।

ট্রিলজীর দর্শন রায়ের জীবনদৃষ্টি

এই যে মহাকাব্যিক এক ট্রিলজী রায় সৃষ্টি করলেন এ কী শুধুই এক বালকের বেড়ে ওঠার কাহিনী? এর পেছনে কোনো জীবনদৃষ্টি, কোনো জীবনদর্শনই কি কাজ করেনি?

প্রথমেই বলে নিতে চাই, বিভূতিভূষণের কিছুটা রোমান্টিক অপুকাহিনীকে রায় যেভাবে সমাজবাস্তবতায় প্রোথিত করেছেন, তা ওঁর আধুনিক বাস্তববাদী মননেরই প্রকাশ।

দুর্গা, ইন্দির, হরিহর, সর্বজয়া ও অপর্ণা— অপুর এই পাঁচজন প্রিয় মানুষ ট্রিলজীতে একে একে মারা যাবে। পাঁচ পাঁচটি মৃত্যু, কিন্তু ট্রিলজীটিকে মোটেই মরবিড বলা যাবে না। বরং মৃত্যুর বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার এক ধরণের আত্মিক শক্তি যে রায় ট্রিলজীটিতে ছড়িয়ে রাখতে পেরেছেন, সেটা জীবনের ইতিবাচকতায় ওঁর দৃঢ় বিশ্বাসেরই স্বাক্ষর। মৃত্যু নিয়ে কোনো জোলো আবেগ রায় সৃষ্টি করতে চাননি এই অবিজ্ঞানের দেশে। আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মনন সত্যজিতের। তাই দেখি, যে গৃহদেবতা গণেশকে প্রণাম করে হরিহর বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, দুর্গার মৃত্যুদৃশ্যে সেই গৃহদেবতাই আলোছায়ার মাঝে হয়ে উঠেছে অশুভ আতঙ্কজনক কিছু। ‘অপরাজিত’-য় কাশীর সাধুদের যে বিশালবপু, দাড়িসর্বস্ব, স্থূল ও রূঢ় physiognomy রায় দেখিয়েছেন, তাতে এরাও শুভশক্তির চেয়ে যেন কোনো অশুভ শক্তিরই প্রতীক হয়ে ওঠে।

প্রটাগনিস্টদের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী রায় ট্রিলজীতে দাঁড় করান না। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী একটা আছে, তা’ হচ্ছে- দারিদ্র্য, যা ধীরে ধীরে কুরে কুরে মানবিক মুল্যবোধসমুহকে খুইয়ে দেয়। দারিদ্র্যের কারণে সর্বজয়া ইন্দিরকে ভিটে থেকে উচ্ছেদের নির্মম সিদ্ধান্ত নিতে পারে, দারিদ্র্যের কারণেই, যে সর্বজয়া অপরের জিনিষ চুরির কারণে একদিন দুর্গাকে নিষ্ঠুর প্রহার করেছিল, সেই সর্বজয়াই এক বর্ষণমুখর দিনে প্রতিবেশীর একটা নারকেল আঁচলের তলে লুকিয়ে ঘরে তুলে আনে। তার তাকানোর ভঙ্গীটাই বলে দেয় যে সে চুরি করছে !

তবে জীবনে দুঃখ আছে, দারিদ্র্য আছে, আছে করাল মৃত্যুও। তবুও জীবনকে আশাবাদী ও হাসি আনন্দের চোখে দেখতে ও দেখাতে পারা ট্রিলজীর এক সবিশেষ বৈশিষ্ট্য। আর এক্ষেত্রে রায় যা ব্যাবহার করেছেন, তা তাঁর অনন্য কৌতুকবোধ।

অপুর পাঠশালায়, কলেজরুমে, বিভিন্ন স্বল্পস্থায়ী চরিত্রদের মাধ্যমে কৌতুক ছড়িয়ে আছে গোটা ট্রিলজীর শরীর জুড়ে। ‘অপরাজিত’-য় অপুদের আড়বোয়াল স্কুলে ইনস্পেকটর এলে গরুটি ফ্রেম জুড়ে থাকে। ইঙ্গিতটি বড়ই দ্যোতক! কিম্বা দুষ্ট ছেলেরা দেয়ালে হেডমাস্টারের ব্যঙ্গচিত্রটি কেমন এঁকেছিল সত্যজিতের ক্যামেরা খুব সকৌতুকেই তা দেখায় ক্লোজ আপে।

‘অপুর সংসার’-য়ে খুলনার পথে নৌকায় আবেগে অপু আবৃত্তি করছিল; “আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে সুন্দরী/ কোন্ ঘাটে নিয়ে ভিড়াবে তোমার সোনার তরী।” কাট্/ দেখানো হোল, না নৌকার দাঁড়ে কোনো তন্বী সুন্দরী নয়, এক মুখ দাড়ি নিয়ে রোদেজলে পোড়া এক বুড়ো মাঝির স্মিত মুখ!

নানা প্রতীকও ব্যবহার করেছেন রায়। ‘অপরজিত’-য় বিষণ্ন সর্বজয়া যখন দাওয়ায় বসে ওষুধ খাচ্ছে তখন ফ্রেমে দেখি একটা কুকুর উঠোনে ঘুরছে। সর্বজয়ার একাকীত্বেরই প্রতীক যেন। তবে এ ধরণের প্রতীক খুব গভীর বা মৌলিক কিছু হয় তো নয়। ট্রিলজীতে যেগুলি গভীরতর প্রতীক সেগুলি নিয়েই আলোচনা করা যাক্। গোটা ট্রিলজীতে জলকে আমার গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতীক বলে মনে হয়েছে। ‘পথের পাঁচালী’-তে জলে ভিজে দুর্গার মৃত্যু, জলের কিনারে দাঁড়িয়ে অপুর সে শোককে সইয়ে নেওয়া, জল চেয়ে ইন্দিরের প্রত্যাখ্যাত হওয়া ও ওর মৃত্যুর পরে জলের কিনারে সর্বজয়া ও হরিহরের দাঁড়িয়ে থাকা, ‘অপরাজিত’-য গঙ্গার ঘাটে হরিহরের অসুস্থ হওয়া ও মৃত্যুশয্যায় জলের আকুতি ও জল মুখে দিয়ে মৃত্যু, ‘অপুর সংসার’-য়ের শেষ শটে নদীর কিনার ধরে কাঁধে কাজলকে নিয়ে অপুর হেঁটে যাওয়া, এসবই আমার কাছে দ্যোতক ও প্রতীকী মনে হয়েছে।

আরেকটি প্রতীক অবশ্যই গোলাকৃতি বা রাউন্ড মোটিফ। দুর্গা গোল ফুটো দিয়ে দেখে বিড়ালছানাদের, গোল ফুটো দিয়ে দেখে মিষ্টিওয়ালাকে, চাদরের গোল ছেঁড়ার মাঝ দিয়ে হরিহরকে দেখে ইন্দির, এক গোল ছিঁদ্র দিয়ে নবজাত শিশু অপুকে দেখে দুর্গা-ইন্দির, পাঠশালায় যাবার দিনে কাঁথার গোল ছিদ্র দিয়ে দুর্গা দেখেছিল অপুর চোখ, অপুর দরিদ্র ঘরে নতুন বউ হয়ে এসে ক্রন্দনরত অপর্ণা যখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় সেটাও ছিল পর্দার গোল ছিদ্রের মধ্য দিয়ে। ট্রিলজীতে রাউন্ডমোটিফের এই বারংবার ব্যবহার চোখ এড়াতে পারে না।

তবে সামগ্রিকভাবে ট্রিলজীতে রায়ের কী জীবনদর্শন প্রতিফলিত হয়েছে এ প্রশ্ন যদি আমাকে কেউ করেন তা হলে বলব, তা চরৈবেতির দর্শন। এগিয়ে চলার দর্শন। ভিটের টান ও  বৃহৎ পৃথিবীর হাতছানিতে সর্বদা দ্বিতীয়টাই শক্তিশালী থেকেছে। বৃহৎ পৃথিবীর হাতছানি, ‘অপরাজিত’-য় অপুর হাতে ধরা গ্লোব যার প্রতীক হয়ে ওঠে, তার প্রভাব ছড়িয়ে থাকে অপুর গোটা জীবনপর্বেই।

সে কারণেই দেখি ট্রিলজীর তিনটি ছবিই শেষ হয়েছে এগিয়ে চলার শটে। ‘পথের পাঁচালী’ শেষ হয়েছে গরুর গাড়ির চাকায়, ‘অপরাজিত’-য় মায়ের মৃত্যুর পর একা অপুর হেঁটে যাওয়ায় লং শটে এবং ‘অপুর সংসার’-য়ে নদীর কিনার ধরে অপুর এগিয়ে চলায়, কাঁধে তার উত্তরপুরুষ। এই যে এগিয়ে চলা, চরৈবেতি, এ গোটা ট্রিলজীটিকেই এক দার্শনিক বাঁধনে জড়িয়ে রেখেছে এবং এই এগিয়ে চলার দর্শনই সত্যজিৎকে আমাদের কালের সর্বাপেক্ষা প্রাগ্রসর ও আধুনিক মননের চলচ্চিত্রকারে পরিণত করেছে। আছে মৃত্যু, আছে দুঃখ, তবুও জীবন এগিয়েই চলে- অপুর জীবনের মতই।

পরিশেষে বলতে চাই, শরতের শুভ্র কাশবনের উপর ট্রেনের কালো ধোঁয়া, পাশে মাথায় মুকুট জড়ানো এক বিস্মিত বালক অপু, বাঙ্গালী জাতির যুগ পরিবর্তনের অভিজ্ঞতায় জারিত এই গভীর প্রতীকী সিকোয়েন্সটি বাংলা চলচ্চিত্রে জুড়ে রইবে চিরকালই, জুড়ে রইবে এই রকম আরো অসংখ্য অগণন শিল্পিত ও গভীর সব ইমেজ, যার নাম- ‘অপু ট্রিলজী’। স্রষ্টা- সত্যজিৎ রায়।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত