কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও স্বাধীনতা ঘোষণা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিনগত রাতে চট্টগ্রামের তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর পরিবারে আসা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার মেসেজ অবলম্বনে পরদিন ২৬ মার্চ দুপুর প্রায় ২.১০ টায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম. এ. হান্নান কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠের মধ্য দিয়ে এই বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করে। এম. এ. হান্নান কর্তৃক এই স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠের পূর্বে ছাত্রকর্মী রাখাল চন্দ্র বণিককে অনুষ্ঠান ঘোষণার দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি ঘোষণা করেছিলেন-

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র। একটি বিশেষ ঘোষণা। একটু পরেই জাতির উদ্দেশ্যে- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক জনাব এম. এ. হান্নান। আপনারা যাঁরা রেডিও খুলে বসে আছেন তাঁরা রেডিও বন্ধ করবেন না।

তিনি প্রথমে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র বললেও পরে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র ঘোষণা করেছিলেন। এভাবে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র হিসেবেও সেসময় আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীন বাংলা বিপ্ল¬বী বেতার কেন্দ্র নাম দেয়া হয় রেডিও ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহানের পরামর্শক্রমে। দুপুর প্রায় ২.১০ টায় এম. এ. হান্নান কর্তৃক কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র বা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রচারের পর আঞ্চলিক প্রকৌশলী মীর্জা নাসিরউদ্দিন দেশদ্রোহিতার দায়ে অভিযুক্ত হন।
এদিকে বেতারের মাধ্যমে ঘোষণাটি প্রচারিত হওয়ার পর পর তা আবারও প্রচার করার চিন্তা করেন বেতারকর্মী বেলাল মোহাম্মদ (অনিয়মিত বেতারকর্মী), সুলতান উল আলম, মাহবুব হাসান, আবুল কাসেম স›দ্বীপ, কবি আব্দুস সালাম, হোসনে আরা, আবদুল্লাহ আল ফারুক ও ডা. আনোয়ার আলী প্রমুখ। এখানে একটি তথ্য দেয়া প্রয়োজন যে, ২৬ মার্চ সকালে বেতারকর্মীদের মধ্য থেকে বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম স›দ্বীপ ও আবদুল্লাহ-আল ফারুক স্টেশন রোডে অবস্থিত রেস্ট হাউসে গমন করেন। শহর আওয়ামী লীগের অফিস ও চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোল রুম হিসেবে পরিচিত এই রেস্ট হাউসে তাঁদের গমনের উদ্দেশ্য ছিল, শহর আওয়ামী লীগ ও চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদের সম্মতি ও সহায়তায় বেতার চালু করা। এরপর তাঁরা ক্যাপ্টেন রফিকের সাথে সাক্ষাৎ করে বেতারের নিরাপত্তার রক্ষা করার জন্য অনুরোধ করেন। রেস্ট হাউসে নাট্যকার ও অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন বেতার চালুতে ভূমিকা রাখার মানসে তাঁদের সাথে যোগদান করেন।
সন্ধ্যায় বেতারকর্মীরা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের একটি কক্ষে মিলিত হয়ে এই কেন্দ্রের নামকরণ নিয়ে আলোচনা করেন অনেক। সভায় সাব্যস্ত হয় দুপুরে প্রদত্ত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রই উপযুুক্ত নাম। এরপর সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খান সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে ১০ কিলোওয়াট বিশিষ্ট ট্রান্সমিটারটি চালু করলে শুরু হয় দ্বিতীয় অধিবেশন। অনুষ্ঠান ঘোষক হিসেবে বেতারকর্মী সুলতান উল আলম স্টুডিওতে প্রবেশ করে প্রথম মাইক্রোফোনে উচ্চারণ করেন: স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারকেন্দ্র থেকে বলছি। উল্লেখ্য, এই অধিবেশনে আবদুল্ল¬াহ আল ফারুক এবং আবুল কাসেম স›দ্বীপের কণ্ঠেও এই ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছিল।
এম. এ. হান্নান এই অধিবেশনেও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেন। ডা. সৈয়দ আনোয়ার আলীর কাছ থেকে পাওয়া বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার একটি হ্যান্ডবিলও, যা তাঁর স্ত্রী ডা. মনজুলা আনোয়ার কর্তৃক বাংলায় রূপান্তরিত, প্রচারিত হয়। রাত প্রায় ৯ টা থেকে ১০ টার মধ্যে লন্ডন প্রবাসী হোটেল আগ্রাবাদের তৎকালীন অস্থায়ী বোর্ডার মাহমুদ হোসেন ইংরেজি ভাষায় সারা বিশ্বের কাছে সহায়তা কামনা করে একটি চমৎকার ভাষণ প্রদান করেন। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা প্রচারের খবর। (২৬ মার্চ) রাত ৮.২১ মিনিটে ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া সংবাদ দেয় : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। রাত ৯টা ৭ মিনিটে বি বি সি, এন ডি পি ও পিটি আই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সংবাদ প্রচার করে। একই রাতে

The Press Trust of India প্রকাশ করে: Sheikh Mujibur Rahman tonight proclaimed East Pakistan the Sovereign independent people’s Republic of Bangladesh, according to a clandestine radio report monitored near the East Pakistan|

২৭ মার্চ The Daily Times প্রকাশ করে: Sheikh Mujibur Rahman, the Acknowledged leader of Bengali nationalism responded heroically to the Pakistan Army’s Intervention with a call for resistance and Declaration of Independence. There is a good evidence that most members of the Bengali regiments will accept his orders. Shortly before his arrest Mujib had issued a proclamation to his people, which informed them : You are citizens of a free country. Today the West Pakistan’s Military is engaged in genocide in Bangladesh. Our struggle is most rewarding certain is victory. Allah is with us. The world public opinion is with us. Joy Bangla (victory of Bengal)|

২৭ মার্চ The New York Times প্রকাশ করে: The Pakistan radio announced today that Sheikh Mujibur Rahman, the nationalist Leader of East Pakistan, had been arrested only hours after he had proclaimed his region independent and after open rebellion was reported in several cities in the East […]

The 51-years-old leader of the Awami League, the dominant party in the East, was arrested as the West Pakistan-dominated army sought to reassert control in the East.

২৭ মার্চ The Guardian প্রকাশ করে: Shortly before his arrest, Mujib had issued a proclamation to his people, which informed them : you are citizens of a free country.

২৭ মার্চ The Los Angeles Times প্রকাশ করে: Sheikh Mujibur Rahman declared independence for East Pakistan Friday as the long smoldering feud between the two wings of the Islamic nation flamed into open civil war.

A clandestine radio broadcast monitored here from a station identifying itself as “The Voice of Independent Bangla Desh (Bengali homeland),” said, “The sheik has declared the 75 million people of East Pakistan as citizens of the sovereign independent Bangla Desh.”

২৭ মার্চ কলকাতার The Statesman নিন্মোক্তরূপে প্রকাশ করে আগের দিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ পাওয়া বঙ্গবন্ধুর দু’টি বার্তা। এতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র বা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা করার বার্তাও রয়েছে।

Mr. Rahman, in a message to the world broadcast by an unidentified wireless station monitored in Calcutta this morning declared that the enemy had struck and that the people were fighting gallantly.

In a subsequent broadcast over a radio station, describing itself as “Swadhin Bangla Betar Kendra” (Free Bengal Wireless Station) monitored in Shillong, Mr. Rahman proclaimed Bangla Desh an independent republic

২৭ মার্চ নয়াদিল্লির The Statesman প্রকাশ করে উক্ত দু’টি বার্তার ব্যাখ্যা:

Sheikh Mujibur Rahman made two broadcasts on Friday following the Pakistani troops move to crush his movement, says UNI.

In a message to the world broadcast by an unidentified wireless station monitored in Calcutta, the Awami League leader declared that “the enemy” had struck and that the people were fighting gallantly.

In a subsequent broadcast over a radio station, describing itself as “Swadhin Bangla Betar Kendra” (Free Bengal Wireless Station), monitored in Shillong, he proclaimed Bangla Desh an independent republic.

২৭ মার্চ মুম্বাইয়ের The Times of India বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা বার্তার বিষয়বস্তু নিন্মোক্তরূপে প্রকাশ করে:

Sheikh Mujibur Rahman said in a message to the world today that the people of Bangla Desh were fighting gallantly for their freedom.

The message, broadcast by an unidentified wireless station, was picked up here.

It was believed that the station was located at Chittagong or Chalna in East Pakistan.

Mr. Rahman said in the message: “Pakistani armed forces suddenly attacked the East Pakistan Rifles base at Bilkhana and Rajarbagh near here at zero hours today, killing a lot of [unarmed people].

“Stern fighting is going on with the EPR in Dacca and the police force. The people are fighting the enemy gallantly for the cause of the freedom of Bangla Desh.

“Every section of the people of Bangla Desh must resist the enemy forces at all costs in every corner of Bangla Desh.

“May Allah bless you and help you in the struggle for freedom from the enemy. Jai Bangla.”

২৭ মার্চ নয়াদিল্লির The Statesman– বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা বার্তার বিষয়বস্তু নিন্মোক্তরূপে প্রকাশ করে:

Mr. Rahman said: “Pakistan armed forces suddenly attacked the East Pakistan Rifle base at Pielkhana and Rajabag police station in Dacca at zero hours on March 26, killing a number of unarmed people. Fierce fighting is going on with East Pakistan Rifles at Dacca.

“People are fighting gallantly with the enemy for the cause of freedom of Bangla Desh. Every section of the people of Bangla Desh are asked to resist the enemy forces at any cost in every corner of Bangla Desh. May Allah bless you and help in your struggle for freedom from the enemy. Jai Bangla.”

২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনটি অধিবেশন প্রচারিত হয়। সেদিন সকাল প্রায় সাড়ে ১০ টায় ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল হারুন, ইঞ্জিনিয়ার আজিজ, ডা. আবু ইউসুফ চৌধুরী, মাইনুল আহসান, শাহ-ই-জাহান চৌধুরী, ডা. বেলায়ত হোসেন, শাহাবুদ্দিন মাহমুদ, ডা. মাহফুজুর রহমান, পলিটেকনিক কলেজের ভিপি আবদুল্লাহ আল হারুন, খোরশেদ ও আজিজরা সকালের অধিবেশন প্রচার করেন। এই অধিবেশনে ডা. এম এ মান্নান এমপিএ যোগদান করে একটি ভাষণ পাঠ করেন। তাঁর সাথে আনা ক্যাসেটের মাধ্যমে তিনি এই ভাষণটি প্রচার করেন বলেও মতান্তর রয়েছে।
এই অধিবেশনে টিক্কা খানের মৃত্যুসংবাদও প্রচার করা হয়। ডা. আবু ইউসুফ চৌধুরী প্রতিবেদন পাঠ, ডা. মাহফুজুর রহমান ও শাহ-ই-জাহান চৌধুরী সংবাদ পাঠ এবং ভিপি আবদুল্লাহ আল হারুণ ভাষণ প্রদান করেন। ডা. বেলায়েত হোসেন ও ডা. মাহফুজুর রহমান ইংরেজিতে সংবাদ বুলেটিনও পাঠ করেন। এছাড়া দেশাত্মবোধক গানও প্রচার করা হয়। বেতার টেকনিশিয়ান সৈয়দ আব্দুস শুক্কুর এই অধিবেশনে উপস্থিত থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেন।
২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় শুরু হওয়া অধিবেশনে ৭.৪০ টায় মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একটি ঘোষণা পাঠ করেন। তিনি সেদিন রাত প্রায় ৯.৩০ টায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে পুনরায় এসে নিজেকে ’’Provisional Head of the Swadhin Bangla Liberation Government’’ ঘোষণা করে আরেকটি ভাষণ প্রদান করলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ ও রাজনীতি সচেতন জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যহীন এ ঘোষণা শুনে মনে হচ্ছিল, দেশে যা চলছে তা মুক্তিযুদ্ধ নয়, বরং সামরিক অভ্যুত্থান। তাছাড়া নিজেকে ’Provisional Head’ঘোষণা করার অধিকার তাঁর ছিল না। ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হওয়ার একমাত্র অধিকার ছিল বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। যেহেতু,

এক. সত্তরের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে।

দুই. বাংলাদেশের জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তিন. স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার অধিকার ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের এবং তিনি পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষণাও দেন।

চার. ২৬ মার্চ দুপুর ২.১০ টায় এবং সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে এম. এ. হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তাঁর পরবর্তী বা মনোনীত রাজনৈতিক নেতারই ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বভার গ্রহণ এবং ‘Provisional Head ’ হওয়ার অধিকার।
মেজর জিয়ার নিজেকে ‘ Provisional Head’ ঘোষণা করে প্রদত্ত ভাষণ শুনতে পান পাকিস্তান আমলের একসময়ের মন্ত্রী ও মুসলিম লীগ নেতা এ কে খান। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকীর শ্বশুর ও চট্টগ্রামের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। তিনি ঘোষণাটি শুনে আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান কায়সারকে ফোন করে ‘অচেনা-অজানা কে এই জিয়া?’ জিজ্ঞেস করে বলেন, অবিলম্বে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে এই ঘোষণার সংশোধনী প্রচার করতে হবে। কায়সার এ কে খানকে অনুরোধ করেন, সংশোধনী যেন তিনি লিখে দেন। এ কে খান এতে সম্মত হয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোন নেতা যেন তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন। ফলে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মির্জা আবু মনসুর এ কে খানের সাথে সাক্ষাত করার জন্য ফটিকছড়ি উপজেলার দৌলতপুরে তাঁর শ্বশুর আবদুল বারি চৌধুরীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। এ কে খান তখন শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মির্জা আবু মনসুরের ফক্সওয়াগন গাড়িতে, যার নম্বর ৬০০, করে তিনি এবং ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দৌলতপুরে এ কে খানের শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছেন। এ কে খান তাঁদেরকে সংশোধনী লিখে দিলে তাঁরা সেই সংশোধনী নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসেন।
এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক মেজর জিয়ার নিজেকে ‘চৎড়ারংরড়হধষ ঐবধফ’ ঘোষণা করে প্রদত্ত ভাষণটি প্রচারের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. হান্নানকে ফোন করে ভাষণটি সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে ভাষণটির কথাগুলো বদলানোর পরামর্শ দেন। তৎক্ষণাৎ এম. এ. হান্নানের নির্দেশে তৎকালীন জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাবের আহমদ আজগরী কালুরঘাটের পরে মেজর জিয়ার সাথে সাক্ষাত করে তাঁকে বলেন, আপনার ভাষণটি বদলাতে হবে। আপনি সম্মত না হলে আমরা অন্য সেনা কর্মকর্তা দিয়ে নতুন করে ঘোষণা করাবো।
২৮ মার্চ একাধিকবার, মেজর জিয়ার নিজেকে ‘Provisional Head ’ ঘোষণা করে প্রদত্ত ভাষণটি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়। এছাড়া সেদিন সামরিক ও বেসামরিক জনগণকে চট্টগ্রাম শহরের লালদিঘি ময়দানে অস্ত্র নিয়ে দুপুর বারোটার মধ্যে জমায়েত হওয়ার ঘোষণাও সেখান থেকে প্রচারিত হয়। অবশ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক ও আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার নির্দেশে বেতারে মাধ্যমে সেই ঘোষণা আবার বাতিলও করা হয়। সেদিন বেলাল মোহাম্মদের কথিকাও প্রচার করা হয়।
সেদিন (২৮ মার্চ) মেজর জিয়ার নির্দেশে ও লে. শমসের মুবিন চৌধুরীর প্রস্তাব অনুসারে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বিপ্লবী শব্দটি বাদ দিয়ে নতুনভাবে তার নামকরণ করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
৩০ মার্চ সকালের অধিবেশনে মেজর জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা অর্থাৎ এ কে খান কর্তৃক তৈরিকৃত সংশোধনী পাঠ করতে শোনা যায়। তিনি ‘Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army’ যুক্ত করে সংশোধনীটি নিন্মোক্তরূপে পাঠ করেন:

Declaration of independence-

I Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army, hereby proclaims, on behalf of  Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh.

I also declare, we have already formed a sovereign, legal Government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution. The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations, it will seek friendship with all nations and strive for international peace. I appeal to all Government to mobilise public opinion in their respective countries against the brutal genocide in Bangladesh. The Government under Sheikh Mujibur Rahman is sovereign legal Government of Bangladesh and is entitled to recognition from all democratic nations of the world.

৩১ মার্চ নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত The Statesman- এর ৯ পৃষ্ঠায় এই ঘোষণা সম্পর্কে নিন্মোক্তরূপে সংবাদ প্রকাশিত হয়:

Calcutta, Mar 30 – The Government under Sheikh Mujibur Rahman is the sovereign legal Government of Bangla Desh and is entitled to recognition by all democratic countries of the world, Maj Jia Khan, provisional Commander-in-Chief of the Liberation Army, declared this morning, reports UNI.

In a broadcast over Free Bangla Radio on behalf of the Sheikh, Maj Jia Khan said: “The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace.

“We have already formed a sovereign legal Government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution.

“We therefore appeal to all democratic and peace-loving countries of the world to immediately recognize the legal democratic Government of Bangla Desh.” He appealed to all Governments to mobilize public opinion in their respective countries against the “brutal genocide” in Bangla Desh.

Maj Jia Khan said the Pakistan Government was trying to confuse and deceive the people of the world through contradictory statements.

“But nobody will be deceived by Yahya Khan and his followers,” he said.

৩১ মার্চ মুম্বাই থেকে প্রকাশিত The Times of India- এর ১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় এই ঘোষণা সম্পর্কে নিন্মোক্তরূপে সংবাদ প্রকাশিত হয়:

Calcutta, March 30. The Government under Sheikh Mujibur Rahman is the sovereign, legal Government of Bangla Desh and is entitled to “recognition from all democratic countries of the world.” Major Zia Khan, Provisional Commander-in-Chief of the Liberation Army, declared this morning.

In a broadcast over Free Bangla Radio on behalf of the Sheikh, Maj. Zia Khan said: “The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace.”

Maj. Zia Khan began the broadcast with these words: “I, Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangla Liberation Army, hereby proclaim on behalf of Sheikh Mujibur Rahman the independence of Bangla Desh.

“I also declare,” he continued, “we have already formed a sovereign legal government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the Constitution.”

সংবাদ দু’টোতে মেজর জিয়াকে বলা হয় ‘মেজর জিয়া খান’।
৩০ মার্চ সকাল ও দুপুরের অধিবেশন সমাপ্ত হওয়ার পর কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র পাকিস্তানি যুদ্ধ-বিমানের হামলার শিকার হয় এবং এর পর থেকে সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনুষ্ঠান প্রচারণা বন্ধ হয় । উল্লেখ্য, ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মোট ১৪ টি অধিবেশন সম্প্রচারিত হয়।
৩১ মার্চ, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে রক্ষিত ১ কিলোওয়াট শক্তির ট্রান্সমিটার ডিসমেন্টাল করে ব্যাঙ্কার সৈয়দুর রহমানের ট্রাকে করে সেনা প্রহরায় পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসায় নিয়ে আসা হয়। পরে সেখান থেকে ট্রান্সমিটারটি দোহাজারী, বান্দরবান ও রামগড় হয়ে বিলুনিয়ার নিকটস্থ একটি পাহাড়ে গিয়ে সংস্থাপিত হয়।
১২ এপ্রিল, ১ কিলোওয়াট শক্তির এই ট্রান্সমিটার থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার আবার শুরু হয়।
সংক্ষেপে বর্ণিত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের এই ঘটনাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা প্রচারের ক্ষেত্রে এই বেতার কেন্দ্রের অবদান অনেক। তাই এই বেতার কেন্দ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।

ঋণ স্বীকার
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড, সম্পাদক: হাসান হাফিজুর রহমান, ১ম প্রকাশ: নভেম্বর ১৯৮২, অগ্রহায়ণ
১৩৮৯; পুনর্মুদ্রণ: ডিসেম্বর ২০১০, পৌষ ১৪১৭; প্রকাশক: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে গোলাম মোস্তফা, হাক্কানী পাবলিশার্স-ঢাকা।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, পঞ্চম খন্ড, সম্পাদক: হাসান হাফিজুর রহমান, ১ম প্রকাশ: নভেম্বর ১৯৮২, অগ্রহায়ণ
১৩৮৯; পুনর্মুদ্রণ: ডিসেম্বর ২০১০, পৌষ ১৪১৭; প্রকাশক: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে গোলাম মোস্তফা, হাক্কানী পাবলিশার্স-ঢাকা।
৩. মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহর, জামাল উদ্দিন, বলাকা-চট্টগ্রাম, মার্চ ২০১৩।
৪. মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম জেলা ইউনিট কমান্ড, প্রকাশক- মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন, আগস্ট ২০১৩।
৫. স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র, সম্পাদনা: প্রফেসর ডা. এম সুলতান উল আলম, আবির প্রকাশন-চট্টগ্রাম, মার্চ ২০১১।
৬. আমিনুর রহমানের বক্তব্য। প্রাগুক্ত।
৭. বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দুর্লভ দলিল, শামসুল আরেফীন, বলাকা-চট্টগ্রাম, অমর একুশে বইমেলা ২০১৬।
৮. এম এ হালিমের বক্তব্য। প্রাগুক্ত।
৯. বেতার ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খানের বক্তব্য। প্রাগুক্ত।
১০. বেতারকর্মী এম সুলতান উল আলমের বক্তব্য। প্রাগুক্ত।
১১. মাহবুব হাসানের বক্তব্য। প্রাগুক্ত।
১২. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বেলাল মোহাম্মদ, অনুপম প্রকাশনী-ঢাকা, জুলাই ২০১৫।
১৩. রাশিদুল হোসেনের বক্তব্য। প্রাগুক্ত
১৪. Swadhin Bangla Betar Kendro and Bangladesh’s Declaration of Independence, cÖeÜ,        Mashuqur Rahman and    Mahbubur Rahman Jalal; FORUM-A monthly publication of       The Daily Star, Volume 3 Issue 3 March        2008. . স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কিত কয়েকটি বিদেশি সংবাদ এই প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত।
১৫. স্বাধীনতার ঘোষণা: ধানমন্ডি থেকে বাংলাদেশ, ডা. মাহফুজুর রহমান, বলাকা-চট্টগ্রাম, ২০১৩।
১৬. কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা, প্রবন্ধ, মোহাম্মদ মাহবুবুল হক, প্রথম আলো, ২৬ মার্চ ২০১২।
১৭. রবিউল ইসলাম খান, পিতা-মৃত কাজি ওয়ারেশ খান, দোহাজারী, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম। প্রাক্তন উপ-সচিব, বাংলাদেশ সরকার।
১৮. ড. এ আর মল্লিকের বক্তব্য। সংগৃহীত।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত