অর্ঘ্য দত্ত’র কবিতাগুচ্ছ

আজ ৩০ নভেম্বর কবি,কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক অর্ঘ্য দত্ত’র শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

বাবা

 

তুমি নাকি আমাকেই বেশি ভালোবাসতে
পাতে তুলে দিতে কই’য়ের ডিম, গলদার মাথা

অথচ অসময়ে চলে যাওয়ার পর
বিঘে ক’য়েক ধানি জমি আর
শহরে দু’কাটার পাকা বাড়িটাই
ভাগ হল চুলচেরা করে

সত্তরের ঐ দুঃসময়েও, মাঝরাতে
কোথাও গোপন মিটিং সেরে, সাইকেলে
খুনি মাঠ চিরে একা আসার দুঃসাহসটা
ভাই নিয়ে নিল

রোজ সকালে কোল ঘেষে বসে
আদরে আঙুল মটকাতে মটকাতে
কবে যেন বোন দখল করে নিয়েছিল
তোমার বুদ্ধি ও মেধা

দু’টাকার রাবড়ি নিয়ে প্রতি রবিবার
ঠাম্মার কাছে যাওয়ার দায়িত্বটুকু
হাসতে হাসতে দিদি নিয়ে নিল
বড় মেয়ে বলে

তোমার মাত্র একান্ন বছরে
কোনো এক শুক্রবার রাতে, কানে বন্দুক গুঁজে
ওরা যখন গুলি ঠেলে দিয়ে গেল
যে আপসহীন আদর্শের জোরে
এক পাও নড়লে না
আওয়াজ করলে না
দয়া ভিক্ষা করলে না
সেটা এখন মা রোজ বালিশের তলায় নিয়ে শুয়ে থাকে
রাত ঘন হলে- নিজের দু’হাতের পাতায় বিছিয়ে
একা একা দ্যাখে, হাসে -বিড়বিড় করে

এখন আমি একান্ন পেরিয়েও
শুধু তোমার স্হাবর-অস্হাবরেরই ঠিক এক চতুর্থাংশের মালিক
অথচ, তুমি নাকি আমাকেই বেশি ভালোবাসতে।

 

 

 

বিভীষণ চোখ

ইচ্ছে করে গোড়ালিতে পিষে ফেলি তোকে

নষ্টপুজোর রক্ত ও পুঁজ মেখে এ চোখ দেখেছিল
পীতাভ সিঁড়ির নিচে প্রিয় মাস্টারমশাই
ঠিকে ঝি’র আদুড় বুকে খুঁজছে মেদুর সৌরভ

আজানুলম্বিত এলো চুল নিয়ে
বেগুনি সুড়ঙ্গে নেমে যাওয়ার আগে
এই চোখে খুকুপিসি মেরেছিল অক্ষয় বাণ

এই চোখে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে
কেরানি বাবার মধ্যরাতে থুতু দিয়ে গোনা
নিরুপায় শ্যামবর্ণ অবৈধ সাজশ

সমস্ত ঈশ্বরের পিঠে ছুরি মেরেছিস তুই…
আয়, আজ তোকে খুন করি, বিভীষণ চোখ।

.

কোজাগরী

অন্ধকার ঘন হলে সঙ্গী খোঁজে জাতীয় সড়ক
বন্ধ্যা এ দিগন্ত ফুঁড়ে উঠে আসে কেলো-কুষ্টি চাঁদ

গোলাপি পলিয়েস্টার, ক্ষয়া মাই, খড়িওঠা ঠোঁট
রাহুগ্রস্ত হাড়মাসে দাউ দাউ পূর্ণিমার খিদে

লক্ষ্মীর বাহন কিছু নিশাচর ট্রাক আসে যায়
সড়ক যোজনা হাসে প্লাস্টিকের ফুল গুঁজে চুলে

নৈবেদ্য দু’হাতে নিয়ে ছড়িয়ে দেয় কানা কিছু কড়ি
দিনে আধপেটা আর রাত্রে আসে নিত্য কোজাগরী।

 

 

গ্লোবাল উষ্ণতা 

আজকাল টের পাই কাকে বলে গ্লোবাল উষ্ণতা

ঋতুর ঠিকুজি খায় বারো মাস তিরিক্ষি বাতাস

কখন যে বৃষ্টি আসে কখন যে খেলে যায় রোদ!

বুকের জোয়ার ছোঁয় কদাচিৎ বসন্ত কোঁদন

দৈবাৎ কালবৈশাখি আসে, হাসে, ছিটকিনি উজাড়

দৃষ্টি তার জরজর চেনা লতা লজ্জাবতী সাজ

ক্লোরোফিল কমে গেছে অশথের ডালপালা জানে

তবুও বুকেতে টানে, খুলে ফেলে সবুজ ব্লেজার

এলোচুল মদিরাক্ষী, বাহুমূল সুগন্ধী মেদুর

শঙ্খ লাগে, লতা-চূড়া বেজে ওঠে বেহাগের সুরে

বাতাস ঝাপটায় খুব বজ্রপাত বিজলি চমকায়

আকর্ষ মুঠিতে ধরে, ঠোঁটে নেয়, তিরিতিরি কাঁপা

কোমরে জড়িয়ে লতা, শক্ত গুঁড়ি সমূলে চেতায়

মেয়েও বোলায় জিভ, হাসে কাঁদে শুষে নেয় ব্যথা

আবহাওয়া ঘেঁটে ঘ, চারিদিকে উদাসী উষ্ণতা

 

মাঝে মাঝে ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, খসে মরা পাতা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত