| 19 জুলাই 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-৩৭) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে। নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


 

 

সে বলেছিল এত দামি শাল সে নিতে পারবে না।

তুমি বলেছিলে সেটা শাল নয়,গলাবন্ধ আর দামটা কত সে তো জানে না ,কীভাবে দামি বলে ভাবল।

সে বলেছিল এটা ছোটোখাটো শালই আর দেখলেই বুঝতে পারা যায় খুব দামি–সে যে জিনিস একেবারেই চেনে না তা কিন্তু নয়। 

তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে দামি বলে নিতে চাইছে না নাকি তুমি দিয়েছ বলে নিতে চাইছে না।

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।তোমার মুখে একটা আহত ভাব ফুটে উঠেছিল।মেয়েটির চোখ থেকে কথাটা এড়িয়ে যায়নি।

  কিছু সময় চুপ করে থাকার পরে সে বলেছিল যে প্রতিটি  জিনিসই স্মৃতির কিছু না কিছু বোঝা। তার আর স্মৃতির বোঝা বহন করার ইচ্ছা নেই ।

তুমি বলেছিলে যে তুমি দিতে চাওয়ার জন্যই সে এটাকে বোঝা বলে ভাবছে।তুমি তার কথা বুঝতে পেরেছিলে যদিও না বোঝার ভান করেছিলে। কোমল লাল স্কার্ফটা তোমার নিজের দুহাতে তুমি প্রায় পাকিয়ে ফেলেছিলে।

 সে বলেছিল যে তোমাকে সে বিন্দুমাত্র আঘাত দিতে চায়নি।

  তুমি মুখের এরকম একটা ভাব করেছিলে যে তুমি তার আসল উদ্দেশ্য যে বুঝতে পারনি তা নয়।

সে হাতটা এগিয়ে দিয়ে লাল স্কার্ফটা তোমার হাতের মুঠো থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং ছোটো গলা বন্ধের মতো স্কার্ফটা দিয়ে ঘোমটার মতো সামনের দিকটা গলায় পেঁচিয়ে নিয়েছিল। 

পেছনে ছিল উঁচু ধৌলাধার পাহাড়ের বুকে দেবদারু বনের গাঢ় সবুজ  অরুণ্য, মুগা বর্ণের উঁচু পর্বত শৃঙ্গ এবং গভীর নীল আকাশ। সেই পশ্চাৎপদে লাল স্কার্ফটায় তাকে তুমি যেরকম দেখতে  চেয়েছিলে সেরকমই  দেখাচ্ছিল।এক লহমার জন্য তোমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তোমার মুখে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল আনন্দ এবং সন্তুষ্টির হাসি।তোমরা দুজনেই ভাড়া করা একটা মোটরসাইকেল নিয়ে অনেক দূরে বেড়াতে গিয়েছিলে। তুমি তার সঙ্গে আগের দিন দেখা করেছিলে। সামান্য ইতস্তত করে সে রাজি হয়েছিল।– ঠিক ইতস্তত নয়, তার স্বচ্ছ চোখের মনিটায় ভেসে উঠেছিল সামান্য দ্বিধার ছায়া. এক লহমার জন্য। তুমি তাকে মোটরসাইকেলে মেয়েদের মতো না বসে ছেলেদের মতো বসতে বলেছিলে এবং সেও সেভাবেই বসেছিল।

স্কার্ফটা নেবার পরে তার মনটা যেন হঠাৎ অনেক দূরে চলে গিয়েছিল, তোমার কাছে থেকেও সে যেন অনেক দূরে ছিল. লাল শালটার সামনের দিকটা সে হাতের আঙ্গুল দিয়ে ধীরে ধীরে মোচড়াচ্ছিল।। আবার কাছে নিয়ে আসার জন্য তুমি তাকে তিব্বতিদের কথা বলতে শুরু করেছিলে। পেমার,গ্যাটশ্বর কাহিনি বলছিলে তিব্বতিদের সংগ্রামের কথা বলছিলে।

সে জিজ্ঞেস করেছিল পেমার দাদা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে কিনা।

 তুমি বলেছিলে চাকরি ছাড়ার কথাটা কিছুদিনের জন্য চাপা পড়েছে বোধ হয়। কারণ পেমা আজ বেশ কিছুদিন কথাটা উত্থাপন করে নাই। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত সে চাকরি ছাড়া না ছাড়ার স্বপক্ষে এবং বিপক্ষে উঠা যুক্তিগুলি তোমার সামনে বিভিন্ন ধরনে  শুনিয়েছিল।

  সে জিজ্ঞেস করেছিল গ্যাটশ্ব চাকরি করেনা নাকি।

তুমি বলেছিলে তার এসবে আগ্রহ নেই। তার কেবল বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন। কানাডায় যাবে নাকি সে। তার জন্যই সে পয়সা জমাচ্ছে। তার দূর সম্পর্কীয় কোনো একজন কানাডাতে থাকে। যাওয়ার খরচটা যোগাড় হলে সে সাহায্য করবে বলে দিয়েছে।

মেয়েটি অনেকক্ষণ চুপ করেছিল। তারপর সে বলেছিল মানুষের চাওয়ার শেষ নেই, তাই দুঃখেরও শেষ নেই।

  তুমি বলেছিলে চাওয়াটা মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম।

  সে বলেছিল স্বাভাবিক বলে আমরা ভেবে নিয়েছি, কী চাওয়া হয়, কেন চাওয়া হয় সেই কথাগুলো তো দেখতে হবে এবং দেখতে হবে কার জন্য চাওয়া হচ্ছে.

  তুমি চুপ করে ছিলে, কারণ বিমুর্ত তর্কে তুমি যে ভালো নও সে কথা তুমি নিজেই জান। 

তোমরা কয়েকটি শিলাখণ্ডের পাশে একটা ছোটো  ঘাসের আচ্ছাদনের উপর বসে ছিলে। তুমি বাড়ির মালিককে বলে বানিয়ে নেওয়া স্যান্ডউইচ কফি বের করেছিলে।

 সে বলেছিল সে তুমি নেওয়া ভুজিয়া ডালমুটগুলি খাবে। স্যান্ডউইচ খাবেনা ।আমেরিকায় পিকনিক মানেই স্যান্ডউইচ থাকে –বোর। এখানে এত সুন্দর ভুজিয়া ডাল মুট পাওয়া যায়।

তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে।সেখানে পাওয়া যায় না নাকি? 

  সে উত্তর দিয়েছিল পাওয়া যায় বোধ হয়, কিন্তু সব জায়গায় পাওয়া যায় না। সে একবার মাত্র দোকানে ডালমুট,ভুজিয়া দেখতে পেয়েছিল।

তোমরা কফি, স্যান্ডউইচ ,ডালমুট খেতে খেতে কথা বলছিলে। 

তোমাদের সামনে পাহাড়ের রূপ, আকাশের রং, বাতাসের ওজন, পরিবর্তিত হয়েছিল মুহূর্তে মুহূর্তে। মেয়েটি আবার উদাস হয়ে  পড়তে পারে ভেবে তুমি বিভিন্ন কথা বলার চেষ্টা করছিলে। সে হঠাৎ এবার তোমাকে নিজের বিষয়ে কিছু বলার জন্য বলছিল।

তুমি বলেছিলে তুমি ইতিমধ্যে তোমার কথা তাকে বলেছ।

  সে তোমাকে আরও কিছু কথা বলতে বলেছিল।

  তুমি বলেছিলে তুমি একটি  কাহিনি বলবে। একজন মানুষের কাহিনী।

  সে জিজ্ঞেস করেছিল দুঃখের কাহিনি নাকি?

তুমি বলেছিলে লাগতে পারে।

দুঃখের কাহিনি মনকে দুঃখী করে তোলে সে বলেছিল।

  তুমি বলেছিলে তুমি তাকে ডাইনি বুড়ির কাহিনি বলবে ।তার চোখ দুটি বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছিল। 

তুমি বলেছিলে কাহিনিটা চা বাগানের পাশের কাহিনি— ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পারের। প্রায় অসম অরুণাচলের সীমার কাছের। চা বাগানটা  থেকে উত্তরের হিমালয় পাহাড়ের সারি সুন্দরভাবে দেখতে পাওয়া যায়,আকাশ পরিষ্কার থাকার দিনগুলিতে হিমালয়ের বরফে ঘিরে থাকা শৃঙ্গগুলি স্পষ্ট দেখা যায় এবং বিকেলে রোদ স্থিমিত হয়ে আসার সময় শৃঙ্গগুলি সোনালি রঙে ঝলমল করে উঠে।

সে জিজ্ঞেস করেছিল তুমি সেই বাগানটাতে গিয়েছ নাকি, 

তুমি বলেছিলে, গিয়েছ।তোমার মাসি এবং মেসো সেখানে থাকে। মেসো বাগানের ডাক্তার। তারা গুয়াহাটিতে এলে তোমাদের বাড়িতেই সব সময় থাকে। মেসোকে তখন তুমি তোমার বিছানা ছেড়ে দিয়ে ছোটো ভাই বাইরের বৈঠকখানায় শোয়া ডিভানে  ঘুমোও।মাসি মেসো সব সময় তোমাকে বাগানে গিয়ে থাকার জন্য বলে। তোমার মেট্রিক পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরে মা তোমাকে দীর্ঘদিনের জন্য মাসির বাড়িতে থাকার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিল। তুমি সেবার সেখানে গিয়ে এক মাসের মতো ছিলে।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-৩৬) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


  তুমি বলেছিলে এমনিতেই খেয়েদেয়ে গল্পের বই পড়ে মহা ফুর্তিতে সময় কাটিয়েছিলে। মাসি নানা ধরনের রান্না করত। মাসির ছোটো মেয়ে জোঁকের মতো তোমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াত।না তুমি বিরক্ত হতে না— খুশি হয়েছিলে। মাসির ছেলেটি পাবলিক স্কুলে পড়ে। সে বাড়িতে থাকে না। 

তুমি বলেছিলে ললুয়া নামে মাসির বাড়ির কাজের ছেলেটির সঙ্গে তুমি টোটো করে বাগান এবং আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে। ললুয়া ভালো শিকারি ছিল। সে গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করতে পারত।তুমি তার কাছ থেকে পাখি শিকার করা শিখেছিলে।

সে জিজ্ঞেস করেছিল তোমরা পাখি মেরে ছিলে নাকি। তার কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠেছিল।

  তুমি তার কেঁপে উঠা কণ্ঠস্বর ধরতে পার নি।তুমি বলেছিলে ছোটো ছোটো পাখি মেরে তোমরা মেসো মাসির অজান্তে বাইরে বাইরে পুড়িয়ে খেতে। ললুয়ার কাছ থেকে তুমি বিড়ি খেতেও শিখেছিলে।

সে ইস বলে মুখটা কুঁচকে নিয়েছিল এবং তুমি তাতে মজা পেয়েছিলে।

 বাগানটা বিদেশি কোম্পানির বড়ো ভালো বাগান ছিল। মেসোদের বাংলোটাও বড়ো ছিল,অবশ্য ম্যানেজার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের বাংলোর চেয়ে ছোটো, সেগুলো থেকে কিছুটা দূরেও। বাগানের বাবু লাইনের কাছে ছিল ডাক্তারের বাংলোটা ।পাশেই ছিল ডিসপেন্সারি।

মেয়েটি জিজ্ঞেস করেছিল তারপরে ।তুমি বলেছিলে বাগানের বাইরে কাছেই বড়ো গ্রাম ছিল। তখন সেই সব জায়গায় কোনো ধরনের অশান্তি ছিল না। কিন্তু বড়োদের বিষয়ে তোমরা বিশেষ কিছু জানতে না। তোমরা তাদের কছারি এবং গ্রামটিকে কছারি গ্রাম বলতে।কেন জানি বলতে পারিনা, কিন্তু তোমাদের সেই বড়ো মানুষগুলিকে এবং গ্রামটিকে বড়ো রহস্যময় বলে মনে হত ।

বাগান থেকে বেরিয়ে এসে বড়ো গ্রামটি পাওয়ার আগে রাস্তা থেকে একটা আঁকাবাঁকা পথ বেরিয়ে গিয়েছিল।সেদিকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেলে একটা বস্তি অঞ্চল পাওয়া যেত। বাগানে কাজ করা মানুষের সঙ্গে একই গোষ্ঠীর মানুষের গোষ্ঠী কিন্তু এই বস্তির মানুষগুলি বাগানে কাজ করে না।তারা বাগানের স্থায়ী শ্রমিক নয়। তাই শ্রমিকরা বাগানের কুলি লাইনের কোয়ার্টারে থাকে। বাগানের পাতা তোলার আবহাওয়া অথবা অতিরিক্ত কামলার প্রয়োজন হলে এই মানুষগুলি বাগানে অস্থায়ীভাবে কাজ করে।

 সে জিজ্ঞাসা করেছিল বস্তির মানুষগুলি অন্য সময় কী করে।

 তুমি বলেছিলে কী আর করে, একটু চাষবাস করে। নিজের তো মাটি নেই.,জঙ্গল হোলা এই সবগুলিতে একটু একটু জমি দখল করে চাষবাস করে। একটু ধান একটু ভুট্টা— এটা ওটা ।দুজন মুরগি পোষে। কারও হয়তো একটি শুয়োরও রয়েছে।মানুষগুলি খুব দুঃখী, তুমি বেশ জোর দিয়ে বলেছিলে, খুব দুঃখী মানুষগুলি। বেশিরভাগই আশেপাশের বড়ো এবং অসমিয়া গ্রামগুলিতে চাষবাসের কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে— হাজিরার খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। 

সে জিজ্ঞেস করেছিল আর কী করে।

তুমি বলেছিলে কয়েক ঘর মদ তৈরি করে। বাড়িতে তৈরি করা মদ। চাল থেকে বানায় এবং সেই মদ বিক্রি করে।

 তুমি  বস্তিতে কী করতে গিয়েছিলে বলে সে জিজ্ঞেস করেছিল।

  তুমি বলেছিলে ললুয়ার এক বন্ধু একটা বস্তিতে ছিল।ললুয়ার সঙ্গে দেখা না করে মাসি তোমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দিচ্ছিল না। বের হওয়ার পরে ললুয়ার নেতৃত্বে তুমি এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়িয়েছিলে— সেই তোমাকে জায়গা গুলি দেখিয়েছিল।

  মেয়েটি বলেছিল ডাইনির কথা বল আর নিজের অজান্তে তোমার কাছে চেপে এসেছিল।

  তুমি বলেছিলে ললুয়া এবং তার বন্ধুটি প্রথমে দূর থেকে দেখিয়েছিল।জঙ্গলের মাঝখান থেকে।বস্তিটার পাশে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর ছিল। পাশেই ছিল একটা বড়ো গাছ।গাছের নিচে তুমি দেখার সময় ডাইনি বুড়ি বসে ছিল এবং খুব ধীরে ধীরে একটি শতচ্ছিন্ন পুরোনো কাঁথা সেলাই করছিল।

সে জিজ্ঞেস করেছিল বুড়ির কেউ ছিল না নাকি?

তুমি বলেছিলে বুড়ির একটি ছেলে ছিল।  ললুয়ারা বলেছিল সে নাকি ভয়ঙ্কর দুষ্টু ছিল। বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে সে খড়ি এবং বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করত। কখনও হাজিরা করার জন্য গিয়েছিল, পেলে বাগানেও অস্থায়ীভাবে কাজ করত। ছেলেটি যতদিন ছিল বুড়ি বেশ মেজাজে ছিল। তিনিও তখন কাজকর্ম করতেন ।

সে জিজ্ঞেস করেছিল তারপরে কী হল।

তুমি বলেছিলে, একদিন বুড়ির ছেলে জঙ্গলের দিকে গিয়ে আর ফিরে এল না।

  ফিরে এল না— তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠেছিল। সে তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কী হল তার।

তুমি বলেছিলে বুড়ির ছেলের কী হল সেটা নাকি কেউ বলতে পারেনা ।ললুয়াদের বুড়ির ছেলেকে দেখার কথা মনেই পড়ে না। ওরাও  বুড়ির ছেলের কথা  শুনেছে মাত্র। সেই একদিন জঙ্গলে যাই বলে বেরিয়ে যাওয়া ছেলেটি আর ফিরে এল না। লোকে বলে গভীর জঙ্গলের মধ্যে তাকে নিশ্চয় বন্য জন্তু জানোয়ার মেরে ফেলেছে— বাঘে খেয়েছে বোধ হয়।

 মেয়েটি বলল না না ,তাকে জন্তু-জানোয়ার মারেনি বাঘে খায়নি। সে নিশ্চয় বাড়ি থেকে দূরে কোথাও পালিয়ে গিয়েছিল।সেই দারিদ্র সেই জীবনের একঘেয়েমি তার নিশ্চয় অসহ্য হয়ে উঠেছিল। এখন সে নিশ্চয় কোনো শহরে আছে। কাজ করছে। সে ধনী হয় নাই নিশ্চয় কিন্তু সে শহরে ভালোভাবেই জীবন যাপন করছে।

  তুমি বলেছিলে এ সমস্তই তার কল্পনা মাত্র।

 সে বলেছিল না কল্পনা নয় ।সে যে পালিয়ে গিয়েছিল তা সত্য। শহরে গিয়ে থাকাটাও সত্য।

  তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে, সে কীভাবে জানল।

মেয়েটি বলেছিল সে জানে, ভালোভাবে জানে, সে শহরে আছে।

  তুমি  চুপ করে ছিলে। তুমি বুঝতে পেরেছিলে যে মেয়েটি বুড়ির ছেলেটি সম্ভাব্য হিংসাত্মক মৃত্যুর ছবিটা— বাঘ তাকে আচঁড়ে কামড়ে, রক্তাক্ত করে মারার বিভক্ত ছবিটা, তার মরণ কাতর আর্তনাদের ছবিটা দূর করে মনের মধ্যে আসতে দিতে চাইছে না।

    সে জিজ্ঞেস করেছিল তারপরে বুড়িমার কী হল।

তুমি বলেছিলে ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পরে মাকে একা একা থাকতে হলঅনেকদিন নাকি তিনি সারাদিন জঙ্গলের কাছে একটা গাছের নিচে বসে, ছেলের জন্য পথ চেয়ে থাকতেন। সন্ধ্যেবেলা বস্তির কেউ গিয়ে বুড়িকে জঙ্গলের কাছ থেকে নিয়ে আসত। 

তুমি বলেছিলে তুমি দেখার সময় বুড়ি একেবারে বুড়ো হয়ে পড়েছিল সেদিন সে বাড়ির সামনে গাছের নিচে বসে ছেঁড়া কাঁথা সেলাই করছিল এবং  বিড়বিড় করছিল।তুমি বলেছিলে প্রথম দিন বুড়িকে দেখে তোমার ভয় লাগেনি, তুমি আশ্চর্য হয়ে ছিলে।বুড়িকে কেন ডাইনি বলা হচ্ছে সেই প্রশ্ন ললুয়াদের করেও তুমি খুব ভালো উত্তর পাওনি। ওরা বলেছিল বুড়ি জঙ্গলের পাতা শিকড় ইত্যাদি দিয়ে অসুখ-বিসুখ হলে  বনজ ঔষধ তৈরি করে দিতে পারে।জন্তু জানোয়ারের  অসুখ হলেও ঔষধ বানিয়ে দিতে পারে। ওরা আরও বলেছিল বুড়ি অনেক মন্ত্র জানে এবং মানুষকে বাণ মেরে অপকার করতে পারে। 

মেয়েটি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল সেগুলি কি সত্যি ।তুমি বিশ্বাস করেছিলে কি। 

তুমি বলেছিলে সেই সব মিথ্যা কথা।বুড়ি বোধ হয় কিছু বনজ ঔষধ জানাটা সত্যি,কিন্তু মন্ত্র পড়া বাণ মারা এসব মিথ্যা কথা।।মানুষের অজ্ঞতা এবং  অন্ধ বিশ্বাস, একা থাকা দরিদ্র একজন বুড়ির উপরে এই সমস্ত রহস্য চাপিয়ে দিয়েছিল।

সে জিজ্ঞেস করেছিল এর পরে কী হল।

তুমি বলেছিলে তারপরে তুমি বাগানে থাকা সময়ে আশ্চর্য ঘটনা কিছু ঘটতে শুরু হল।পাশের গ্রাম বস্তি এবং বাগানের কুলি লাইনে মানুষের ভুল বকা জ্বর শুরু হল।।সেই সময়ই দুটো দুধ দেওয়া গাভীর মৃত্যু হল। তারপরে এক বেলার জ্বরে তরতাজা একটি ছেলের মৃত্যু হল।

 মেয়েটির চোখ দুটি বিষ্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে গিয়েছিল।একদৃষ্টে সে তোমার দিকে তাকিয়েছিল।

তুমি তাকে বুড়ির কাহিনিটা বলে যাচ্ছিলে।বলেছিলে বাগান,বস্তি,গ্রাম সমস্ত জায়গায় এক ধরনের ভয় ছড়িয়ে পড়েছিল।এসবের কোনোটা খারাপ আত্মা,অপদেবতার কাজ বলে মানুষ বিশ্বাস করেছিল।তোমাকে এইসব খবর ললুয়া এবং তার বন্ধুটি এনে দিয়েছিল।ওরা ভয়ে কেউ বেরিয়ে যেতে চাইছিল না।ওরা বলেছিল সাহেবের বাংলোর কাছে এইসব অপদেবতা নেই নাকি।তোমরা সেই কয়েকদিন ঘরের সামনের উঠোনে গাছের নিচে বসে গল্প করছিলে বা ক্যারম খেলছিলে।মেসো তোমার অপদেবতার কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।বলেছিল ভাইরাল ফিভার-এবার বেশি হয়েছে।

নানা ধরনের উড়ো খবর বাতাসে ভাসছিল।তুমি লক্ষ্য করেছিলে বাংলোয় কাজ করার জন্য আগত মানুষগুলি লাল সুতোর ডোলে নতুন তাবিজ লাগিয়ে গলায় বা বাহুতে পরেছিল।মাসি তোমাকে নিমপাতা ভেজানো জল দিয়ে গা ধুইয়ে মাথায় বিভূতি ঘষে গঙ্গাজল খাইয়ে দিয়েছিল।তুমি কথাটায় খুব মজা পেয়েছিলে।ললুয়া এর মধ্যে এসে বলেছিল যে কাল-সন্ধ্যাবেলা বস্তির একজন মহিলা নাকি বুড়িকে একটা গাভীর দুধের বাঁটে মুখ দিয়ে দুধ খেতে দেখেছিল।আর মানুষ বুড়িকে জঙ্গলের মধ্যে শৌ্চ করে আসার পরে একটা গাছের ডাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মন্ত্র বলতে দেখেছিল।ললুয়ার কথা শুনে তোমার শরীরের লোম শিউরে উঠার কথা তোমার এখনও মনে আছে।

সে জিজ্ঞেস করেছিল তারপরে কী হল।

তুমি বলেছিলে তারপরেই কুলি লাইনে আগেরদিন পর্যন্ত সুস্থ থাকা একটা শিশুর মৃত্যু হল।

তারপরে?সে অধীরভাবে জিজ্ঞেস করল।

তুমি বলেছিলে যে তার একদিন কী দুদিন পরে ,হ্যাঁ ঠিক একদিন কী দুদিন পরে একদিন সকালবেলা ললুয়া উত্তেজিত হয়ে দৌড়ে এসে তোমাকে হাতের ইশারা করে দূর থেকে ডেকেছিলে।তুমি কাছাকাছি চলে আসায় সে ফুঁপিয়ে ফুপিঁয়ে বলেছিল বল,বল ,ডাইনি বুড়ি মারা গেল।সে বলেছিল তারপরে।সে লাল শালটা দুই হাতে বুকের মধ্যে খামচে ধরেছিল।তার হাতের আঙুলের গাঁটগুলি দুধ সাদা শালের মধ্যে বিবর্ণ হয়ে পড়েছিল।

তুমি বলেছিলে ললুয়ার কথা শুনে তুমি সঙ্গে সঙ্গে মাসিকে কিছু না বলে বাড়ি ছেড়ে দৌড় মেরেছিলে। তোমরা দুজনেই দৌড়েছিলে দ্রুত দৌড়েছিলে। বাগানের মাঝখানের পথ দিয়ে সংক্ষিপ্ত রাস্তায় বস্তির দিকে দৌড়েছিলে। এভাবে কেন হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করেছিলে তুমি বলতে পার না। এখনও তুমি বলতে পার না কেন দৌড়েছিলে। হাঁপাতে হাঁপাতে তোমরা বস্তিতে পৌঁছেছিলে। বস্তি পেয়ে তুমি আশ্চর্য হয়েছিলে কারণ তোমরা সেখানে কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলে না, একটাও জনপ্রাণী ছিল না। ঘরটা খোলা হয়ে পড়েছিল। একলহমা তুমি ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছিলে। ললুয়া কিন্তু দাঁড়ায়নি।সে বাড়িটার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে জঙ্গলের দিকে দৌড়েছিল। দৌড়ে ছোটো নদীটার দিকে গিয়েছিল। একটা ঝর্ণার মতো ছোটো নদীটি উত্তরের পাহাড় থেকে বাগানের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। বাগান থেকে বেরিয়ে নদীটা ছোটো ছোটো বন্য গাছের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলছিল। পাহাড়িয়া নদী বলে নদীর জল ছিল ঠান্ডা। নদীর পারের  ছোটো ছোটো জঙ্গলি গাছ দিয়ে ঘেরা চর অঞ্চলটায় তোমরা গিয়ে পৌঁছেছিলে— আর তখনই, তখনই তোমরা বুড়ি ডাইনিকে দেখতে পেয়েছিলে।

 সে চমকে উঠেছিল। টেনে নেওয়া নিশ্বাস মাঝপথে থেমে গিয়েছিল আর তুমি তোমার কাহিনি বলে যাচ্ছিলে ।

  ডাইনি বুড়ি মাটিতে শুয়েছিল। তোমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো নীরবে  একটু কাছে চলে গিয়েছিলে। তোমরা  দেখেছিলে ডাইনি বুড়ির  মাথাটা কেটে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল।মুন্ডহীন শরীরটার পাশে কাটা মাথাটা পড়েছিল। বুড়ির শনের মতো  সাদা হয়ে যাওয়া চুলগুলি জমাট বাধা রক্ত লেগে কালো হয়ে গিয়েছিল।

 মেয়েটি এবার জোরে জোরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল। তার শরীরটা কান্নায় দুলে দুলে উঠছিল। তুমি তোমার হাতটা এগিয়ে দিয়ে তার হাতের উপর রেখেছিলে। তার কান্না বন্ধ হয়নি। কাঁদতে কাঁদতে সে বলেছিল পৃথিবীটা এত নির্মম হয় কেন, কেন। সেই মানুষটা– সেই মানুষটা– ইস, সে বেঁচে থাকতেও কষ্ট পেল, মৃত্যুতেও কষ্ট পেল। ইস সেই বীভৎস  মৃত্যু, সেই বীভৎস মৃত্যু।

 তুমি তাকে বলেছিলে আশ্চর্যের কথা যে ডাইনি বুড়ির মৃত্যুর পরদিন থেকে সেই এলাকায় আর জ্বর হচ্ছিল না। কোনো মানুষের আর মৃত্যু হচ্ছিল না।

  তোমার কথা তার কানে ঢুকছিল না। সে  বলে চলেছিল আসলে কোনো ঈশ্বর নেই। ঈশ্বর থাকতে পারে না। সে বলেছিল  তোমার কথা শোনার পরে  সে একেবারে নিশ্চিত হয়েছে যে ঈশ্বর বলে কোনো জিনিস আসলে থাকতে পারে না।

 তুমি কিছুটা ভেবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলে।

 তুমি তাকে বলেছিলে ঈশ্বর আছে না নাই তুমি জান না কিন্তু একটা কথা তুমি জান যে প্রেম আছে। ভালোবাসা আছে। সেগুলো শেষ হয়ে যায়নি।

  সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিল তারপরে খোলাখুলি ভাবে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল— আছে কি?

 তুমি দৃঢ়ভাবে বলেছিলে আছে। বলেছিলে আগুনে পুড়ে ভষ্ম করে আনা এই পৃথিবীতে ,দুঃখে পুড়ে অঙ্গার হওয়া মানুষের মনে, জড়ায় পীড়িত বিকল করে তোলা মানুষের দেহে প্রেমই একমাত্র মুক্তি এবং নবজন্মের উন্মেষ ঘটাতে পারে।

 তুমি বলেছিলে একমাত্র ইয়েই থাকে— ইয়েই মানুষকে পুনরায় জন্ম দেয়।

 সে বলেছিল তোমার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রেম নবজন্মের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সুখ নতুন নতুন বিষাদ আর ক্লেশও বহন করে আনে। 

তুমি তাকে ধরে থাকা হাতটা এবার সে নিজের দুই হাতের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। সে তখনও নীরবে কাঁদছিল। তোমার খুব ইচ্ছে করছিল তার গালের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চোখের জলের  দাগটাতে  চুমু খেতে, কিন্তু তার মনটা এত দূরে চলে গিয়েছিল যে তোমার সাহস হয়নি।

 তোমরা দুজনে অনেক সময় গায়ে গা লাগিয়ে হাতে হাত ধরে সেই জায়গায় বসেছিলে।

 ছায়াগুলি দীর্ঘ হয়ে উঠছিল। বাতাস হয়ে পড়ছিল ঠান্ডা এবং ভারী। স্নায়বিক  চেতনা ক্রমে  ভোঁতা হয়ে আসছিল। কিন্তু তোমরা একসাথে বসেছিলে। একটা সময় তুমি তার বাহুটা জড়িয়ে ধরে বলেছিলে তোমাদের ফিরে যাওয়া উচিত। সে না বোঝার মতো জিজ্ঞেস করেছিল ফিরে যেতে হবে। তুমি বলেছিলে হ্যাঁ তোমাদের ফিরতে হবে। ফিরে তো যেতেই হবে… 

      



 

 



error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত