আর্টিস্ট


চোখ মুদে থাকতে থাকতে আমি পাহাড় হয়ে গেছি। শিশুকে বলেছি, বলো, আমি পাহাড়। শিশু এখনো আমাকে অপার বিশ্বাসে দেখে, তাই সে ওই কথাই বলে। আমি বলি, বলো, আমি ফুল, এখন ফুটেছি। আমি নীল আকাশ, আমার শেষ নেই। আমি এক টলটলে দীঘি।

শিশুর সঙ্গে এইভাবে পাহাড়, ফুল, অনন্ত আর স্বচ্ছ জল হতে আমার ভালো লাগে। মেঘের মত ঘুম নামে। সেই ঘুমের কাছে থাকে একটা লেবু রঙের প্রজাপতির দুই দণ্ড মধু।


অনেক আগে কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসে যেতে যেতে মাটিতে, জলে আর ধান ক্ষেতে মেঘের ছায়া দেখতে পেতাম। যখন আমার কাছ থেকে কপোতাক্ষর কালো জল হারিয়ে গেল, তখন বয়ে যেতে যেতে মেঘলোকে বর্ষীয়ান ছায়াপথের হাসির কাছে এসেছিলাম। তাঁর স্বর ছিল আমার বাবার মতন। পৃথিবীর ওপর তাঁর হাঁটা ছিল কুসুম ছড়ানো। তাঁর সামনে ছিল এক মাঠ প্যালেস্তিন আর ইজ্রাইলের ভাঙা মানুষ। আরো, এক হাজার শিশু হত্যাকারী। তারা দয়া খুঁজছিল। নিজেদের কাছে পাহাড়ের মত নত আর উজাড় হয়ে তাঁরা চোখ মুদে কাঁদছিল। আমিও কিছু না বুঝে কাঁদি।


খুব ভালো করে লক্ষ না করেও আমরা চোখ লক্ষ করি। একজন আর্টিস্ট আছেন তিনি ছবি আঁকেন না। সমস্ত জীবনকে বর্ণীল ক্যানভাস করেছেন। তার জান তিনি আলম্ব পেতে দিলেন গ্যালারিতে ঘুমের মতন। কেউ এসে স্পর্শ করল, কেউ অবাক বিস্ময়ে ছুঁয়ে দেখল। কেউ ঠেলা দিল। কেউ জামা খুলে নিল। কেউ ছুরি দিয়ে কাটল। এই আর্টিস্ট মানুষের গহীন বেদনাকে শরীরের ক্যানভাসে একত্র করলেন। তাই কুসুমের মত ফুটে উঠল সেই মানবিক ক্ষত তাঁর অংগ জুড়ে।

এই আর্টিস্ট আমাদের শেখালেন চোখের গহনে তাকাতে। অচিন পাখির চোখের দিকে তাকাতে গিয়ে আমি টের পেলাম সে অচিন নয়। চোখ দিয়ে রক্ত পড়ে অশ্রুর মত। আমি তো তার শিশুকে নিরালম্ব সরল ঘাসের আড়ালে খেলতে দেখলাম। আড়ালপ্রিয় গাছের শয্যা। আমি টের পেলাম চোখ দরজা, চোখ মন্দির, চোখ মসজিদ। এই আর্টিস্ট দেখতে এসেছেন। দেখা আমাদের দরজা খুলে দেয়। শিশু যতদিন আমাদের সমান লম্বা না হয়, আমরা হাঁটু মুড়ে বসি। চোখে চোখ রাখার জন্য। যে কান্নায় সে অশান্ত হয় সেই কান্নার দিকে দরজা খুলে দিলে সে দেখে ছায়াপথের হাসি। সে জানে আমার ধূলিকণা আমার চোখের ভিতর সে পায়। জিজ্ঞেস করে, তোমাকে কখন আসি বলব? দরজায়, নাকি হাত ছেড়ে চলে যাবার সময়।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত