অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-৬) । নিরুপমা বরগোহাঞি
‘অভিযাত্রী’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি বিজেতা নিরুপমা বরগোহাঞি ১৯৩২ সনে গুয়াহাটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন।১৯৫৪ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ এবং ১৯৬৫ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ পাশ করেন। লেখিকার প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে ‘সেই নদী নিরবধি’, ‘এজন বুড়া মানুষ’, ‘এপারর ঘর সিপারর ঘর’ সহ মোট একুশটি উপন্যাস এবং ‘সতী’, ‘নিরুপমা বরগোহাঞির শ্রেষ্ঠ গল্প’ইত্যাদি দশটি গল্প সংকলন রয়েছে।
(ছয়)
‘ এই ,তুমি কে, কী চাই এখানে?’ কণ্ঠস্বরটা যতটা সম্ভব রূঢ় করে বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে তিনি বলে উঠে ছিলেন, মনের মধ্যে জেগে ওঠা কিঞ্চিৎ ভয়ের ভাবটা ঢাকার জন্যই যেন তার কন্ঠস্বর সেইটুকু রূঢ়তার জন্ম নিয়েছিল ।
মানুষটা কিন্তু নির্বিকার ।
আমি হলধর বলে বলেছি না গোঁসাই মা , আমার ছেলেটিকে আজ থেকে গোঁসাই হাকিমের অফিসে পাখা টানার কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছি ।তারপর ভাবলাম যে আপনার সঙ্গে একবার দেখা করে যাই।’
‘ কিন্তু এই কলাগুলি কেন এনেছ? আমরা ঘুষ খাই বলে ভেবেছ নাকি?’
হলধর নামের মানুষটা কালী মায়ের মতো জিভ বের করে কামড়ে দিল–’ এধরনের কথা কেন বলছেন গোঁসাই মা? আপনারা হলেন গোঁসাই মানুষ, এই ধরনের পাপ কাজ আপনারা কেন করতে যাবেন মা? এগুলি আমাদের বাগানের মালভোগ কলা, আজ আপনাদের বাড়িতে প্রথম এসেছি, বাড়িতে একটি ছোট ছেলে আছে– বাবা সোনার সঙ্গে আমি খালি হাতে কীভাবে দেখা করি?’
কী মুশকিল! শ্রীমতী গোস্বামী দোটানায় পড়লেন। দুর্নীতিতে জড়িত হওয়ার প্রচুর সুযোগ থাকা এই চাকরিতে তারা স্বামী-স্ত্রী খুব কড়া নীতি মেনে চলে আসছেন। তিনি এখন এই অপরিচিত মানুষটির কলাগুলি কীভাবে গ্রহণ করেন ?
দেখ, আমরা অন্য কারও জিনিস এভাবে গ্রহণ করি না।ঠিক আছে তোমার কলাগুলি রাখলাম, কিন্তু তোমাকে তার দাম রাখতে হবে।’ অনেক ভেবেচিন্তে শেষে তিনি সহজ উপায়টা বের করেছিলেন। ইতিমধ্যে তিনি হরিনাথকে বলে হলধরকে বসার জন্য একটা মোড়া দিয়েছিলেন, সামনেই অফিস থেকে গোস্বামী দুপুরবেলা এসে খাবার জন্য বানানো চা মালপোয়া তাকেও খেতে দিয়েছিল। মালপোয়া হলেও চায়ের মধ্যে বিস্কুটের মতো ডুবিয়ে সেই মালপোয়া খেতে থাকা মানুষটা পুনরায় কালী মায়ের মতো জিভ বের করে কামড়ে ধরে বলে উঠেছিল (পরে শ্রীমতী গোস্বামী বুঝতে পেরেছিলেন যে হলধরের জিভ বের করাটা এক প্রকারের মুদ্রাদোষের মতোই, মানুষটা অনবরত তামোল পান খেতে থাকে, তাই তাকে প্রায়ই তার কালী মায়ের মতো এই লাল জিভটা দেখতে হত–’ এই ধরনের কথা কখনও বলবেন না মা, বাগানের একটা জিনিস এনেছি, বাড়িতে একটা ছোট ছেলে আছে বলে এনেছি, আমি তো ঘরের মানুষের মতোই, দেখুন তো আপনি আমাকে কীভাবে ঘরের মানুষের মতো আদর যত্ন করে খাওয়াচ্ছেন, আমি কি আর আপনার কাছে বাগানের জিনিস বিক্রি করতে পারি?’
আরো পড়ুন: অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-৫) । নিরুপমা বরগোহাঞি
এরপরে তিনি মহাসংকটে পড়েছিলেন। এবং সেই বিব্রতভাব বাড়িয়ে দিয়েছিল তার দু বছরের পুত্র অপু। সে ঘুম থেকে উঠে এসেছিল এবং হলধরের ‘এসো বাবা এসো ছোট গোঁসাই এসো’ এই আহ্বানে সম্পূর্ণ সায় দিয়ে একেবারে হলধরের কোলে উঠে বসেছিল । ছোট থেকে অপু এই ধরনের – পরিচিত অপরিচিত নেই, সবার কোলেই যখন তখন উঠে হযায়।
সেদিন শেষ পর্যন্ত হলধরের মালভোগ কলা রাখতে হয়েছিল এবং তারপর থেকে মানুষটার গোঁসাই হাকিমের বাড়ির সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে মানুষটা গোঁসাই মায়ের কোমল হৃদয়েও একটা জায়গা করে নিয়েছিল এবং অর্ধেক পথ অতিক্রম করা মানুষটার নানা হাস্যকর কাণ্ডকারখানা তার প্রতি শ্রীমতী গোস্বামীর মনে একটা গভীর বাৎসল্য রসের জন্ম দিয়েছিল।
তারপর সে একদিন রজব আলীকে নিয়ে এসেছিল। কাঁধে নানা শাকসবজি ভরা একটা ভার, একগুচ্ছ ঘন দাড়ি, পরনে একটি মলিন লুঙ্গি এবং সেরকমই জামার লম্বা মানুষটাকে তার সামনে নিয়ে এসে হলধর একপ্রকার আদেশ জারি করেছিল–’ গোঁসাই মা, আপনি আজ থেকে এর শাকসবজি রাখবেন, এই মুসলমানটার জিনিসগুলি খুব ভালো, এর সংসার নেই , তাই ও দিন রাত বাগান এবং ক্ষেতের কাজে লেগে থাকে .…. এই রজব, ভার রেখে গোঁসাই ম়াঁকে প্রণাম কর। ইনি কেবলমাত্র নামেই গোঁসাই মা নন, দয়া-মায়াতেও গোঁসাই মা, আমার এই বাড়িতে এসে গোঁসাইর থানে এসেছি বলে মনে হয়। হ্যাঁ, এই ভাবে দুই হাত গোঁসাইমায়ের পায়ের কাছে রেখে সেবা করে বল–’ গোঁসাই মা, আজ থেকে জিনিসপত্র আমার কাছ থেকে রেখে দয়া দেখাতে হবে আর আমি আপনাকে ভালো ভালো জিনিস দিয়ে যাব, কখনও ঠকাব না’–
সেদিন হতভম্ব শ্রীমতী গোস্বামী কিছু বলার আগেই, কোনো রকম বাধা দেবার আগেই রজব আলী নামের সেই জীর্ণশীর্ণ মানুষটা প্রথমদিনের হলধরের মতো তার পায়ের সামনে প্রায় সাষ্টাঙ্গে পড়ে হাত জোড় করে বলে উঠেছিল–’ গোঁসাই মা, আমাদের দয়া কর।’
সেই আরম্ভ, অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্বের শুরু। প্রথম পর্ব হলধরের পরে দ্বিতীয় পর্ব রজব আলী। সেদিন রজব আলীর প্রণাম পর্ব শেষ হওয়ার পরে হতবাক শ্রীমতী গোস্বামীর সামনে বারান্দায় লেপ্টে বসে পড়ল এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত চেহারার , আলাদা আলাদা ধর্মের অথচ দরিদ্র কৃষকের অভিন্ন জীবনযাপনের শক্তিশালী বন্ধনে বাধা পড়ে থাকা দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু।আর একজন গোঁসাই মা এবং দুটি বুড়ো শিশুর এই মানবীয় নাটকটির প্রথম দৃশ্যেই এসে প্রবেশ করল শিল্পী ছোট গোঁসাই।
ভেতর থেকে টুকটুক করে দৌড়ে বেরিয়ে আসা অপুকে তুলে নিয়ে হলধর বলেছিল–’এ হল ছোট গোঁসাই, বুঝেছিস রজব, একে ভালো খাবার খাইয়ে গোঁসাই হাকিমের মতো বড়মানুষ করে তুলতে হবে। সেজন্য তুই সব সময় ভালো ভালো জিনিস এনে দিবি, পচা বা শুকনো জিনিস দিয়ে ঠকাবি না।’
হলধরের এই ধরনের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রজবের জোড়া হাত দুটি কাণের কাছে উঠে গিয়েছিল–’ তোবা তোবা, তুই কী বলছিস হলধর, ছোট গোঁসাইকে খারাপ জিনিস খাওয়ালে আল্লাহ আমাকে অভিশাপ দেবে না?’ তারপরে সে কালো দাড়ির জঙ্গল ভেদ করা দুপাটি দাঁত বের করে হাসি দেখিয়ে তার ভার থেকে একটা মোটাসোটা গাজর বের করে অপুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল–’ এটা চিবিয়ে খেয়ে নাও তো ছোট গোঁসাই, আজকেই আমি মাটির নিচ থেকে তুলে এনেছি, কাঁচা খেলে শরীরে খুব রক্ত হবে।’
সেই কথার উত্তরে অপু হঠাৎ হলধরের কোল থেকে নেমে রজব আলীর দিকে সোজা দৌড়ে গিয়ে কেবল বলেছিল–’ তোমার মুখের চুলগুলি আমি টানতে থাকব’ আর অপুর এই কথায় সেখানে উপস্থিত থাকা তার মা সহ বাকি দুটি প্রাণী যে বিমল ফুর্তির হাসি হেসেছিল তার রেশ যেন দুপুরের রোদে ঝলমল করতে থাকা ক্ষীণ স্রোতা নদীটির তীরে ছোট বাংলোটির একটা ছোট পরিবারের সুখের সংসারের সঙ্গে এক কঠিন ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা পড়েছিল।
হরিনাথ পরে দুইজনকেই শ্রীমতী গোস্বামীর নির্দেশে চা জলপান এনে দিয়েছিল। রজব আলীর সংকোচের সঙ্গে খেতে থাকা মূর্তি টার দিকে তাকিয়ে হলধর মুখে সুজি গুজে দিয়ে বলেছিল–’ খা,খা, গোঁসাই মায়ের প্রসাদ খা। বাপের জন্মে এই জিনিস খেতে পেয়েছিলি কি?

অনুবাদক