অনুবাদ কবিতা: কিশোর মনজিৎ বরা’র অসমিয়া কবিতা । বাসুদেব দাস
১৯৮৫ সনের ২৩ আগস্ট অসমের শিবসাগরে কিশোর মনজিৎ বরার জন্ম হয়।শিবসাগর কলেজ থেকে স্নাতক এবং ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত শ্রী বরার প্রথম উপন্যাস ‘হৃদয় এখন মহাকাব্য’। শ্রী বরার সম্পাদনায় অসমের বিভিন্ন কবির নির্বাচিত প্রেমের কবিতার সঙ্কলন ‘আঙ্গুলিবোরর মাজতে ঘাঁহনি এখন পালোঁ’২০০৯ সনে প্রকাশিত হয়। কবির একমাত্র কাব্যসঙ্কলন ‘মাটি গোসাঁনী’প্রকাশিত হয়।
কলকাতা কবিতাগুচ্ছ
( পত্নী ভাগ্যশ্রী নেওগের হাতে)
১) দীঘা স্মৃতি
দীঘার সমুদ্র তীরে আমরা
একজোড়া মানুষ বসে আছি
আদিম এক জোড়া মানুষ
আমাদের কাছে মোবাইল নেই
চোখে নেই চশমা
হঠাৎ কিছু একটা স্মৃতি হয়ে যাওয়াটা
আধুনিক মানুষের অসুখ
পদাতিক সৈন্যের মতো ঢেউগুলির বেষ্টনী
সন্ধ্যাবেলা। শঙ্খ বিক্রি করা মহিলাটির হাতের শূন্যতায়
জীবনের ধূসর মিনতি
২) হাওড়া ব্রিজ
জলকে নিয়ে মানুষের সভ্যতার উৎকণ্ঠার শেষ নেই
জল জীবনের নন্দনতাত্ত্বিক নির্মাণ– সেতু
বাবুঘাট থেকে হাওড়া ব্রিজ পর্যন্ত দুজোড়া চোখ মেলে
আমরা লঞ্চের ওপরে ভাবলাম
হৃদয় খুঁড়ে
ব্রিজের বড় একটি খুঁটিতে বেঁধে রাখার ইচ্ছে
হাওড়া ব্রিজ জীবনের বিশাল উদঘাটন
ঘামের কাব্য
৩) পদাতিক চাঁদনী মার্কেটে
সারি সারি প্রলোভন
আমাকে কেনো
আমাকে কেনো
পদাতিক আসে
পদাতিক যায়
দামি জিনিস গুলির সস্তা সংস্করণ
জীবনের চেয়ে দামি কী
মায়ার চেয়ে দূরতিক্রম
পদক্ষেপে ভারী বাতাস
পিঠে ভারী জিনিসপত্র
খোলস না ছাড়িয়ে আসা পথে
ফিরে আসা কী বিমল আনন্দ
এই আনন্দের অংশীদার
আমি তোমাকে করতে চাই
জীবন
আরো পড়ুন: অনুবাদ কবিতা: জীবন নরহ’র অসমিয়া কবিতা । বাসুদেব দাস
৪) ভিক্টোরিয়ার পেছন দিক
মাটির চা…’ তন্দুরি চা’
ঘাসের থালায় ভাত খাওয়া
রাজপুত বীরদের কথা
মাঝেমধ্যে ভাবি
সেদিন কলকাতায়
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে
মাটিরস মিশ্রিত এক কাপ চায়ে চুমুক দেবার সময়
আমার হঠাৎ মনে পড়ল
আরাধ্য স্বদেশকে
জলে ঘেরা
একটা বেলুনের ওপরে আমরা ভেসে আছি
তবু পায়ের নিচের
মাটির কথা ভাবি না
ঘামই রক্ত
রক্তই মাটি
মাটিই প্রার্থনা
বিদ্রোহী সিপাহি
কৃষক বিদ্রোহ
রণহুঙ্কার
পদাতিক সবসময়
খেটে খাওয়া জনতাই
বলির পাঠা এবং
স্ফুলিঙ্গের সামনের
ঘামে স্নাত মানুষই
তবু
ইতিহাস ছাড়ে না
পক্ষপাতিত্বের অভ্যাস
ক্ষুধার্ত দেহোপজীবিনী
রক্তের ধমনীতে বেয়ে থাকা কার্শলা
মেড ইন ইন্ডিয়া এবং
একটা হঠাৎ জ্বলে নিভে যাওয়া
দিয়াশলাইয়ের কাঠি
ইতিহাস এখন একটা
কানা ঘোড়া
একপাশে দেখতে পায়
অন্যপাশে দেখতে পায়না
–——-
টীকাঃ
কার্শলা– এক ধরনের ছোট ক্ষীণ সাপ।
৫) রবীন্দ্র সদনের বাতাস
সুরঙ্গ দিয়ে বয়ে আসা বাতাস
বাতাসে পাহাড়ের সৃজন–গন্ধমালা
একটি গাছ একজন মানুষ
সিগারেট টানতে থাকা যুবতি কয়েকজন
অন্য একটি জীবনকে স্বাগতম জানাচ্ছে বলে ভাবলাম
তাদের ঠোঁটের লাল মিশ্রিত ধোঁয়াগুলি
হয়তো ‘চন্দ্রযান-৩ ‘এ চাঁদে উড়িয়ে নেবে
ধোঁয়ায় আগুন থাকে
আগুনে কি সমস্ত ধ্বংস?
নাকি
আগুন
সভ্যতার প্রসূতি ঘরের রক্ষাকর্তা
৬) হাওড়া স্টেশনের কুকুরটা
তার দীর্ঘ ধনুকের মতো লাফটা
হরতালে ব্যস্ত শোভাযাত্রাটা
বোবা মানুষটার অস্থির নীরবতাটুকু
নানা ধরনের টুকরো স্মৃতি এসে ভিড় করে
কুকুর এবং ঘোড়ার লাফের মধ্যের অমিল
বীরত্ব- বীর্য এবং প্রভুভক্তি
কুকুরটার লাফটা
মানুষটিকে জাগিয়ে রেখে গেল
আর্মস্ট্রং চন্দ্রে লাফ মেরেছিল কি
অথবা মহাকাশের লাইকা
এটা কি ধর্মরাজের কুকুরটা
যে
লাফ মেরে মুক্তির হেলানো সীমানায় নিয়ে যেতে পারে সভ্যতাকে

অনুবাদক