বল্লরী সেনের কবিতাগুচ্ছ

আজ ২২ নভেম্বর কবি,অধ্যাপক বল্লরী সেনের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

শব্দকোষ
 
তবুও অনিবার্য এহেন শব্দরোগ
মূর্ধা ভেসে ওঠে তার লোহিত
সাগরে, অবলুপ্ত নীল তিমির
পাশে সেও যেন পাথর হয়ে গেল
টিশার্টের ঢাকা বারান্দায়
খোলাচুল রোদ খেলাচ্ছলে
ডায়াল করছে কত বছর আগের
সময়, ঘৃণা ভরে ফোন তুলে না তুমি
অক্ষরের অবাধ্য মৃত্যুর মধ্যে পাতা
আমার উনুন
তবুও যেন ধিকিধিকি
উঁকি মারে জিভের লালায়।
 
আরো একবার বলি, ‘ এসো –
 
যতটাই রুক্ষ আর কর্কশ দু’যুগের
পরেও কাপাসগাছের তলা যেভাবে
তার অশ্রু বুনে দুই পা ধবধবে স্বচ্ছ করে
রাখে, কান্না মুছিয়ে বলো এবারেও
 
নদী হয়ে যেতে ।

ভেজা জুতো ও তার কৈফিয়ত

কী যে হল কানের দো বুঁদ খুলে রাখলাম পকেটে। ডান পকেটে তখনো বৃষ্টির ছাট এলো হয়ে মণ্ড পাকিয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে, কী মনে হল, লাইন পাল্টে জুতোর মধ্যে পা গলিয়ে কান্না নম্বর এক কে অন্ করি, নাহ্, হেভি ওয়েট কষ্ট চলবে না
বরং স্প্যাগেটি ছায়াদের ডাকযোগে ছেড়ে আমি জুতো জোড়া না হয় হাতে তুলে দৌড় দিই, অথবা সাইট্রাস একধরণের না-পারা ইচ্ছে এরপর আইবুড়ো গাছের পাতাদের শিরায় আমাকে জড়িয়ে রাখলো সার দেওয়া রোদের মুসুরিতে, পাল্টে যাচ্ছিলাম…জারানো বেগনি ফুলের ডানায় তার চাহনি লুকিয়ে রাখলে আর হলদে বাগানের বুনো সুখের লবঙ্গে আমাৱ সর্বাঙ্গ ভিজে যেতে লাগলো, মায় জুতো পর্যন্ত

 

খাম্বাজ

ক্রমশ আওয়াজসঙ্কুল হল পাখি

হাঁড়িচাচা গাছের ছালের ভারে চুপ থাকে না, তার কানে মৌমাছি অন্যায় গুঞ্জন করে চললো দিনরাত

পার্থিব সমস্তের ভারে এখন নিশুত গাছেরা ও পাতার বাতাসে গলা তোলে। গান এসে শ্বাস টেনে নেয় ঘাসের থেকে কুশ

কেবল তোমার কাছে সময় এসে চাপরাসির মতো

একা একা ফিরে

চলে

যায়

পূর্ণিমার ঘোর লাগে মন্ত্রসিক্ত ভোরের বাগানে

গুলমোহরের কাছে গোলাপের কিচ্ছুটি আর

বলবার রইল না। আলো নেই বলে রা নেই কুঁড়ির

ফুল ফুটলে ঠিক কেউ তোমার মতো করে বুঝে নেয়

কথা নেই, গন্ধটুকু রয়ে  গেছে

সুরের শৌহর

এক.
একটা বিস্ফারিত মাফলার মোড়ানো
দিন জানালার লাল টালি চুঁইয়ে গড়িয়ে দাও
মরাল উপত্যকায়, উঁচু সাদা বাকলে অবাক
কথারা নিভে যায়, স্বর আর শোনা যায় না
কিছুতেই

তীব্র গোলাপ বর্ণ পাতারা এখানে ফুলের মতো
পসরা সাজানো লাল ঢালু বাড়ির ছাদ
চিমনিতে ভাতের গন্ধ, অতিথিকে বিনা কারণে
কাছে এনে বসায়, কথা বলে। ফিরোজা নদীর
ডান বাঁকে বাতাসেরা ফেরার কথা বলতে চায়
কষ্ট হয়, অন্য ভাষায় শব্দ বেঁকে যায় তার।

সমস্ত যোগাযোগ ফেলে আসার পর
এখন শব্দেরা নৌকার মতো পাতার দেহে
ভেসে যাচ্ছে, প্রবাহের সঙ্গে একা চলে
যাবে বলে

 

দুই.
মনে-রাখা রোদ্দুর এখন বারখলোমিউ-এর ছাতিম
পাতায়
—তুই একা সব পোড়ানো মাছের ছালটুকু বসে
খেয়ে নিলি?
—একটাই খাবার প্যালেট, রঙ লাগছে দানায়
দানায়, মাছের ঘিলুর মতো অসমাপ্ত আকাশ
একটু করে সূর্যকে টেনে রাখতে চাইছে
—তোর গলা ওই বুঝি শুনলাম। বুঝি ভিড়ের
মধ্যে তোর ঘ্রাণ। জলে তোর নিস্তরঙ্গতা, কেবল
আসে আর চলে যায়
—ফর্কের পিনে তোকে কাঁটা ফুটিয়ে ছুঁয়ে দেবে
ছেলেবেলা, তখন আমরা ২২ বছর পর রুমাল
চুরির খেলা খেলবো
—তুই কেবল হাঁটুতে বল নিয়ে লোফালুফি করবি
আর হুস্ করে কফির মতো আমি উড়ে যাচ্ছি
পাহাড় রঙের একটা তুষারপাতে।

এখন এটাই আমাদের শীত শীত খেলা।

 

তিন.
কিছু কথা কোনোদিন বিনিময় হবে না। কিছু কথা
সুরের শৌহরকে ভুলে থাকে, ভুলে থাকে তারও
চোখে চোখ পড়েছিল—ট্রেন যখন ৩ মিনিট
দাঁড়িয়েছিল জংশনে। অগোছালো চোখের মনি,
আম্রপল্লবের তলায় সব জমা খরচ ফেলে ঠাঁ
ছুটলো, একটিবার চোখের দেখা দেখতে পাবে
বলে। হলুদ ধানের ক্যানভাসে পূর্বরাগ এইরকম
খোলা তোরঙ্গের মুখে এক লহমা আগল খুলে
চায়।

ভয় পেও না। উদাসীন বৃষ্টির ছাটে এবারের
মতো আর কিচ্ছু চাইবো না।

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত