বন্ধু হে আমার(পর্ব-১)

বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাই তার সৃষ্টির মাধ্যমে । বন্ধু তিনি যার হাত ধরে দুঃখ –সুখ ,আনন্দ –শোকের বৈতরণী পার হওয়া যায় । বন্ধুর হাত ধরে বরিষণ শেষের দিনে গাছের ডালের ঝিলমিলি রোদের সাথে উল্লাসে পাখির মতো নেচে মাঝবয়সেও ফিরে যাওয়া যায় শৈশবে ।চলার পথে জটিলতায় চেনা পথ যখন অচেনা হয়ে যায় ,বন্ধুর কাছেই বলা যায় ‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’ ।বন্ধুর পথে আলোর দিশা খুঁজতেও তাকে স্মরণ করা। চারপাশের আঘাতে বিকল মনকে স্বাভাবিক রাখতে গেয়ে উঠি ‘এই করেছ ভালো নিঠুর হে ‘।কারণ সংসারে নিরাসক্ত থাকার সাধনাই শ্রেষ্ঠ সাধনা । সুখ-দুঃখের উরধে যে সুরের –ছবির জগত আছে তাতে পৌঁছই বন্ধুর হাত ধরে [ আমি চঞ্চল হে / আমি সুদূরের পিয়াসী ] । মাঝে মাখে মনে হয় আমরা শুধু এই বিশ্বের সন্তান নই , আমরা এই সৌরজগতেরও ।তাতে হয়ত আমরা পরমাণুর সমান বা তার থেকেও ছোট ।কিন্তু পরমাণু ত তুচ্ছ নয় !তুচ্ছ নই আমরাও ।

 


সেদিন ভোরে দেখি উঠে / বৃষ্টিবাদল গেছে ছুটে / রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে / বাঁশের ডালে ডালে ।
সহজপাঠের এই কবিতাটি কেমন হুট করে ছোট্টবেলায় নিয়ে যায় ! যখন বরিষণশ্রান্ত ঘন কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয় , অনেক ত হল বরষার জলে কাগজের নৌকো ভাসানো , মাটির দাওয়ার নিচের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির জলের ওঠানামা দেখা , এবার একটু আকাশটা হাসুক ।একটু রোদ উঠুক,কাদা উঠোনে পাতা ইটের সরণি বেয়ে বাইরে থেকে ঘুরে দেখে আসি ঝকঝকে নীল আকাশটা , দেখি বৃষ্টিধোয়া পাতারা আরও কতটা ঘন সবুজ রঙের হয়েছে , ঝিলিমিলি রোদ্দুরে শালিক কেমন বাগান থেকে খাবার খুঁজছে , কাকগুলোও পায়ে পায়ে এগোচ্ছে উঠোনে ছড়ানো খাবার খাবে বলে ।
হারানো শৈশব ফিরিয়ে দেয় ,’আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা ‘ গানটিও । ঘনঘোর বরষায় গৃহবন্দী বালক –বালিকারা , বরষন শেষের আকাশে খুঁজে পেয়েছে মুক্তির উল্লাস । সাদা মেঘের ভেলার আলোর মায়ায় যেন ভ্রমর ও ভুলেছে মধুপান, শুধুই উড়ে বেড়ায় সে ,নদীর চরে আনন্দরত চখা-চখির দল, জোয়ারের জলের ফেনারাশি ,বাতাসের হাসি সব কিছু থেকেই রস নিংরে নেবে তারা । টানা বেশ কদিন ঘরে থাকার শোধ নেবে তারা অফুরান আনন্দে মেতে ,হেসে –খেলে , গান গেয়ে , বাঁশি বাজিয়ে ।
সহজপাঠ প্রথম ভাগে , ‘রেগে বলে মুরধ ন , যাব নাত কক্ষনো ‘ লেখাটির সঙ্গে নন্দলালের রেখায় একটি অনিচ্ছুক গরুকে কেমন হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে রাখাল বালক ছবিটিতেও কেমন ছোটবেলায় অনিচ্ছায় অভিভাবকদের হুকুমে কিছু করার ছবি চোখে ভাসে ।

 


‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি’ কবির এই গানটি দিয়েও আমি বিশ্বকে দেখতে পাই ।গানের বাণীতেই ধরা পরেছে প্রকৃতির অসীম রূপ ,মানবের সুখ –দুঃখ , হাসি –গান ,আশা – আকাঙ্খা, হতাশা-বেদনা , লোভ- ঈর্ষা ,আকুতি ।
ভারত উপমহাদেশে ঋতুর কত বৈচিত্র্য ; কখনও গ্রীষ্মের দাবদাহ , আবার বর্ষায় সজল – শ্যামল , শরতের স্বর্গীয় রোদ্দুর , হেমন্তে শিশিরের আনাগোনা , শীতের পাকা ফসল ,বসন্ত তার রূপ রস গন্ধ সব নিয়ে হাজির ।কত শব্দের রঙে বন্ধু এসব ঋতুকে রাঙিয়ে দিয়েছেন ।
গ্রীষ্মের দাবদাহের আগুন রং , তৃষ্ণার্ত ধরা , নিদ্রাহীন রাত ,দীর্ঘ দগ্ধ দিন সবই এসেছে শব্দের হাত ধরে ঃ – দারুন অগ্নিবানে হৃদয় তৃষ্ণায় হানে ।/রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন / আরাম নাহি সে জানে ।
বন্ধুর চোখে বর্ষার সজল –শ্যামল – সুন্দর আসে নেচে নেচে । গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপের স্মৃতি ভুলিয়ে শুষ্ক ধরণীকে সিক্ত করে ঃ এসো শ্যামল সুন্দর , / আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা।/ … আনো সাথে তোমার মন্দিরা / চঞ্চল নৃত্যের বাজিবে ছন্দে সে- /বাজিবে কঙ্কন বাজিবে কিঙ্কিনী /ঝংকারিবে মঞ্জীর রুনুরুনু । কখনও বর্ষা বিরহীর মন কেমনের আবহ আনে – আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে /জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগেনা ।

 


বর্ষার মতো শরত ও কবির প্রিয় ঋতু । সোনালী রোদ্দুর , মেঘমুক্ত আকাশ ,শিশির বিছানো পথ , কাশফুলের গুচ্ছ ,মাটিতে শিউলি ফুলের আলপনা এ সবের রূপই এসেছে তার গানের বাণীর হাত ধরে । ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে ‘ গানটিতে ছোটদের দলের সঙ্গে যেন কবি বেরিয়ে পড়েছেন খোলা আকাশের নিচে , সঙ্গী পাঠক / শ্রোতা আমরাও । শরতের অরুন আলোর রূপ এসেছে এই গানটিতেঃ শরত তোমার অরুন আলোর অঞ্জলি ,/ … শরত তোমার শিশির ধোয়া কুন্তলে /বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে, / … শিউলি বনের বুক যে ওঠে আন্দোলি ।
কবি জীবনানন্দের প্রিয় ঋতু হেমন্ত হলেও রবীন্দ্রনাথের অপছন্দের ঋতু হেমন্ত ; মাত্র পাঁচটি গান লিখেছেন তাকে নিয়ে । গানেও তার অপছন্দের সুরটি প্রবলঃ হিমের রাতের ওই গগনের দীপগুলিরে /… শূণ্য এখন ফুলের বাগান , দোয়েল কোকিল গাহে না গান ,/… যাক অবসাদবিষাদ কালো , দীপালিকায় জ্বালাও আলো – / …জয় করো এই তামসীরে ।
শীত ঋতু নিয়ে কবির মিশ্র প্রতিক্রিয়া । শীতের নতুন ওঠা ফসল নিয়ে তিনি যেমন আনন্দে মেতে ওঠেন ; পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে , চলে আয় আয় আয় ।/ ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে মরি হায় হায় হায় । / হাওয়ার নেশায় উঠল মেতে দ্বিগবধূরা ধানের ক্ষেতে -/ড়োদের গোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে মরি হায় হায় হায় ।
আবার অন্যদিকে প্রবল শীতে উত্তাপের অভাবে প্রকৃতি ও জীবেরাও কুঁকড়ে থাকে সেটাও আঁকেন তিনি গানের বাণীতেঃ শীতের বনে সে কোন কঠিন আসবে বলে / শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে । / আমলকী ডাল সজল কাঙাল ,খসিয়ে দিয়ে পল্লবজাল / কাশের হাসি হাওয়ায় ভাসি যায় যে চলে ।
কবির প্রিয় ঋতু ঋতুরাজ বসন্ত ; আমারও । তীব্র গরম নয় , বাতাসে অল্প হিমেল আমেজ , পর্ণমোচী গাছেরা আবার নতুন পল্লবে সজ্জিত , বাতাসে লেবুফুলের মিষ্টি গন্ধ , আমের গাছে মুকুল , শীতে কুঁকড়ে থাকা পাখিদের ঠোঁটে গানের সুর সব মিলিয়ে আমূল পরিবর্তিত ধরা । এই বসন্তে আমার বন্ধু কবি শুধুমাত্র প্রকৃতির রূপ-রস – গন্ধসুধা পাণ করেন নি , সৃষ্টির দেবতাকেও তিনি এদের মধ্যে প্রত্যক্ষ করে তার অনুসন্ধান করেন ঃ ফাগুন হাওয়ার রঙে রঙে পাগল ঝোরা লুকিয়ে ঝরে / গোলাপ জবা পারিজাতের বুকের পরে । /… বাহির হলেম ব্যাকুল হাওয়ায় উতল পথের চিহ্ন ধরে -/ ওগো তুমি রঙের পাগল , ধরব তোমায় কেমন করে।
প্রকৃতির যে কত রহস্য! বন্ধু কবিকে সঙ্গী করে সে সব রহস্যের দ্বার যেন এক এক করে খুলতে পারি।

 

ক্রমশ…

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত