| 15 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ইরাবতী গল্প: বর্গী । মাহমুদুল হক আরিফ

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
এক. 
ঘুম পাড়ানি গানে, চাঁদের সাথে মা যেমন দূরত্ব ঘুচিয়ে দেন— সকাল-বিকাল। বলেন, ‘চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা’। টিপ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে চাঁদকে তিনি কল্পনায় বিছানার শিয়রে নামিয়ে আনেন, বা দোলনার দোলে— ‘খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়োল বর্গী এল দেশে’ বলতে বলতে জানিয়ে দেন আমাদের দেশে এক সময় বর্গীরা এসেছিল। ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে’। মায়ের মুখে ছাড়া শুনতে শুনতে আমরা বড় হয়ে যাই। গান শুনিয়ে মা হয়ত তাঁর অজান্তেই বর্গীদের মুখোমুখি করে দেন আমাদের, বাস্তবতার নিরিখে দেখতে পাই বাস্তব জীবন। বর্গীরা তো এখন আর সরাসরি খাজনা নিতে আসে না, কিন্তু বর্গীদের কাছে আমাদের মাথা পিছু ঋণ বাড়ে! ওরা নেই— তারপরও কিভাবে ঋণ বাড়ে? ফরহাদ ভাই কথা বলতে বলতে মঈনের পায়ের শব্দে কথা থামিয়ে পেছন দিকে ফেরেন। আ-রে মঈন যে-, বসো-বসো কেরসিন তক্তার টুল দেখিয়ে দেন বসার জন্য। আড়ে তাকিয়ে  দূরে থাকা ম্যাসিয়ারকে নবাবি ঢং-য়ে চা দিতে বলেন। পূর্বের কথার আর শেষ টানতে পারেন না, দুলালের চায়ের দোকানে চলতি কথা এভাবেই খেই হারায়। আবার নতুন করে শুরু হয় অন্য কোনো প্রসঙ্গ। এসব আলাপের নির্বিশেষ কোনো সুনির্দিষ্টতা হয় না। গন্তব্যহীন, শুরু আছে— শেষ নেই। ছেঁদ পরল, ‘তো শেষ! পূর্বের প্রসঙ্গ-ই শেষ।’
দুলালের ডালপুরি দোকানের আড্ডায় বিজ্ঞের তালিকা করলে মুনসুর ভাই, ফরহাদ ভাই আর মিজান ভাইয়ের নাম সিরিয়ালে সর্বাগ্রে বলে দেবে— চায়ের দোকানের যে কেউ। 
সংক্ষিপ্ত, সুস্পষ্ট আর ইঙ্গিতবহ কথা বলার ওস্তাদ হলেন মুনসুর ভাই। তিনি আর্টিস্ট। ফরহাদ ভাই ভালোবাসেন সাহিত্য, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া মুদ্রণ যন্ত্রখানাটা না থাকলে তিনি যে কি করতেন- বলা মুশকিল। আর মিজান ভাই আছেন সাংবাদিকতা নিয়ে। আমরা সবাই তাঁদের গুণমুগ্ধ শ্রোতা। পালাক্রমে দুলালের দোকানে তাঁরা ঢুঁ-ঢাঁ মারেন। আমরা বেকাররা তাদের উপস্থিতিতে চা পান করলে বিল তারাই মেটান। এই তিন ব্যক্তি এক সাথে হলে, দিনরাতের বালাই নেই। আড্ডা চলছে তো চলছেই… ম্যারাথন গতি। 
ফরহাদ ভাই হয়ত একদিন মিজান ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে বললেন, তোরা তো কবিতা পড়িস না, একটি আস্ত সমুদ্রের উপস্থিতি থাকে কবিতায়। কুলে দাঁড়ালে দৃশ্যত মনে হবে জল আর জল, কিন্তু জলে পা ফেললেই গভীরে ডুবে যেতে হবে। কবিতার ভেতরটাই এমন। একবার যাকে কবিতায় পায় মৌচাকের মধু তার না হলেও চলে। যদিও আমাদের বাঙালিরা সারাক্ষণ নিউজ পড়ে। ইনফরমেশন ডিপো হয়ে থাকতে চায়, সমুদ্রে নামতে চায় আর ক’জন! তিনি এমন এক ঈঙ্গিত দেন, এ ঈঙ্গিত যেন মিজান ভাইয়ের কানে মুনসুর ভাই পৌঁছে দেয়। আবার ফরহাদ ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে মুনসুর ভাই হয়ত ছবির নানা দিক আলোচনায় আনেন। একদম গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ। বিস্তির্ণ ধারণাগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে দেন যেন খোলা মাঠে একাই চার-ছয় হাকিয়ে যাচ্ছেন। গগাঁ, অঁরি দ্য তুলুজ লোত্রেক, পল সেজান, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ তো আছেই। উনিশ শতকের নবীন শিল্পীদের আলোচনা পাবলো পিকাসোতে এসে ঠেকান। শিল্প উৎপাদনের কুশলী গঠন বিন্যাস, পৃষ্ঠতল, কিউবিক বা অভিব্যক্তিশীল কোলাজ উৎপাদনে নানা শৈলী আলোচনা করতে তিনি ভালোবাসেন। বলেন, শত শত পৃষ্ঠায় যা প্রকাশ করা যায় না, তা তুলির আঁচড়ে একটা ক্যানভাসই যথেষ্ট, বুঝলি! কি বুঝলি? কে বোঝাবে ফরহাদকে! রঙ-তুলির যোগফল আর আনন্দ হলো সবচেয়ে বড় শিল্প। আমরা বুঝতে পারি মনসুর ভাইয়ের ঈঙ্গিতটা ফরহাদ ভাইয়ের দিকে। ফরহাদ ভাই, মুনসুর ভাই যখন যাই বলুন না কেন, আমরা সায় দিয়ে যাই। গুরু যা বলেছেন! সেটাই সত্য।
মিজান ভাই হলেন আরেক ধাঁতের। মুনসুর ভাই আর ফরহাদ ভাই এই দু’জন কিভাবে প্রেমে ব্যর্থ হয়েছিলেন। জীবনে ক’টা প্রেম করেছেন, রসিয়ে রসিয়ে সেই আলাপ দিতেন। আমরা মিজান ভাইকে এই কারণে বিশেষ পছন্দ করি। ‘প্রেম এবং প্রেমের ব্যর্থতা’ -এরচেয়ে সহজ আলাপ কার না বোধগম্য হয়! এই হলো আমাদের আড্ডার কম্পোজিশন। এর বাইরে পরিবেশবাদী বকুল ভাই মাঝে মাঝে আসেন এখানে। তিনি আসলে, তার সঙ্গে করে নিয়ে আসেন রাজনীতি। পরিবেশ ঠিক করতে গিয়ে তিনি হাড়েহাড়ে টের পান বাধাটা যতটা না অর্থনীতির তারচে’ ঢের বেশি রাজনীতির। এই সিদ্ধান্তে তিনি উপনিত- এটা প্রমাণ করেন আলোচনায়।
দুই. 
একদিন মিজান ভাইয়ের ওপর ক্ষেপে গেলেন মনসুর ভাই…। বললেন, ওর কাছে কেন আমার প্রেম কাহিনী তোদের শুনতে হবে! আমি কী বোবা হয়ে গেছি! শোন তাহলে- 
ছবি আঁকতে একবার নিরিবিলি এক রেল স্টেশনে ইজেলে রঙ মেশাচ্ছি। ট্রেন আসলে মানুষ উঠছে নামছে হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু হকার স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে। ট্রেন আসলে ওদের গলা পাওয়া যাচ্ছে, চিৎকারে সরব হচ্ছে। বিচিত্র গলায় পণ্যের নাম নিয়ে ডাকাডাকি হাকাহাকি করছে। লোকাল ট্রেন আসলে এক ধরনের হল্লা, মানে জীর্ণ শীর্ণ  মানুষ ভিড়। আবার ইন্টারসিটি এলে কেতাদুরস্ত মানুষের আগমন ঘটছে। বাহনে আয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ যাত্রী। আমি আঁকায় মনোনিবেশ করেছি, আঁকছি শেডের নিচে একটা মা কুকুর শুয়ে আছে পাশে বসে আছে, দু’টো তুলতুলে বাচ্চা। ওরাও জায়গা করে নিয়েছে আমার ক্যানভাসে। আঁকা অনেকটা শেষ করে এনেছি ঠিক তখন একটা কণ্ঠ পেলাম।
একটি মেয়ে এসে বলল, আপনার নাম… এই প্রথম কোনো নারী আগবাড়িয়ে আমাকে আমার নাম জিজ্ঞেস করল। ভারি মিষ্টি তার গলা। সন্দেহ হলো আমাকেই বলছে তো? হুম, আমার আশপাশে আর তো কেউ নেই। এর আগে এমনটা হয় নি বলে আমাকে একটু সময় ক্ষেপন করতে হলো। কিছু বলার আগেই সে আবার বলল, আপনি কী অরূপদা? 
আমার মুখে তখনও কথা নেই, ডানেবামে মাথা নাড়লাম। 
ওহ্, আপনি একদম অরূপদার মতো দেখতে! 
তখনও আমি একটাও কথা বলি নি মেয়েটার সাথে। মেয়েটা আমার চেয়ে অনেক সাবলীল। ও দমল না! বলল, মানুষের চেহারায় কি করে এত মিল হয়! 
সে অবাক হয়ে আমাকে দেখছে… না না, আমার ছবি আঁকা দেখছে আসলে।
আমি অস্বস্তি কাটিয়ে এই প্রথম মুখ খুললাম। বললাম, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? 
বলল, যাচ্ছি না আসলাম। 
আপনার বাড়ি কী এখানেই? 
হ্যাঁ, মাস্টার পাড়া। আমি প্রতিদিন যাতায়াত করি। আমাদের ভর্তি কোচিং করাতেন অরূপদা। হুবহু আপনার মতো দেখতে। 
আমি বললাম কি কোচিং করতেন? 
বলল, মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং। 
আমি বললাম, যাক, চারুকলা না তাহলে।
মেয়টা এবার দমে গেল! ভুলটা কোথায় বুঝতে পারল।
পরিচয়ের শুরু এখান থেকে। আমি সবে পাশ করেছি। একদম তরুণ। ছবির মডেলকে পেমেন্ট দেয়া সম্ভব নয়। এই মেয়ে হয়ে গেল আমার মডেল। আমি তাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি ছবি এঁকে ফেললাম। কাশফুলের কাছের ছবিগুলোর নাম দিলাম, ‘আনন্দ- এক, দুই, তিন’, নদীর কাছেরগুলোর নাম দিলাম, ‘বিষণ্ণত-এক, দুই, তিন’। রেল স্টেশনগুলোর নাম হলো, ‘অপেক্ষা- এক, দুই, তিন  কেবল শেষ করেছি। শেষ ছবিটাও ছিল অপেক্ষা সিরিজের। স্টেশনের বেঞ্চিতে বসে আছে অনিকা, সেদিন ছিল তুমুল বৃষ্টি। অনিকার চেহারায় সত্যি সত্যি একটা অপেক্ষার ছাপ। রিনঝিন রিনঝিন অবিরত ঝরছে বৃষ্টি। একটা কাক ভিজে জুবুথুবু অবস্থা। রেল স্টেশনটা ছিল টিনশেডের।। বৃষ্টির শব্দগুলো ছিল স্পষ্ট। দানা বাঁধছিল শ্রুতিতে। লাইনের পাথরগুলোও ভিজে ভিজে মনে হলো নরম হয়ে গেছে। ওই দিন অনিকা-আমি টের পাই আমরা ওই পাথরের চেয়ে বেশি কিছু। পরের দিন অনিকা আমার জন্য একটি আফটার সেভ লোশন হাতে দিয়ে বলে, এটা আপনার। আমি অবাক হই নি। যে কোনো উপহার আলাদা প্রণোদনা সৃষ্টি করে। পরের দিন আমার উস্কোখুস্কো দাড়ি কেটে যখন লোশন লাগালাম মনে হল অনিকা উপস্থিত হয়ে গেছে আমার কাছে। একটি লোশন কি করে ইলিউশন সৃষ্টি করে আমি প্রতিদিন আফটার সেভ লাগাতে গিয়ে টের পেয়ে গেলাম। অনিকা যখন একটা জায়গা করে নিল আমার মধ্যে ঠিক তখন অনলাইনে আমার ছবি বিক্রির একটি অর্ডার এল। 
তিন.
আজ ছবি ডেলিভারি। অনিকা আমি দু’জনেই খুশি। ‘অপেক্ষা- দুই’ সিলেক্ট করেছে। একটি অফিসের রিসিপশনে ছবিটি বসবে। অফিসের মালিক রিসিপশনে অপেক্ষা করার কনসেপ্ট থেকে ‘অপেক্ষা’ ছবিটি বেছে নিয়েছেন। আমরা যখন পৌঁছুলাম অফিস মালিক নিজেই তার রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। অনেকক্ষণ ছবিটা দেখলেন। একবার অনিকাকেও দেখলেন। বললেন, তাহলে আপনিই বসেছিলেন। অনিকা একটু লজ্জা পেল। আমাদের পেমেন্ট দ্রুত দেয়ার কথা বলে বললেন, সম্ভব হলে আগামীকাল বিকেলে একবার আসুন। ছবি নিয়ে কথা বলা যাবে। অনিকাকে বললেন আপনিও আসবেন কিন্তু। এই প্রথম বড় অংকে আমার ছবি বিক্রি। পরেরদিন সময়মতো অনিকা আর আমি চলে গেলাম তার অফিসে। পঞ্চাশোর্ধ ভদ্রলোক মনে হলো তৈরি হয়েছিলেন আমাদের জন্য। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাইরে এলেন। আমরা বেশ লাক্সারি একটি গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি ক্যাফে গ্যালারিয়া এসে থামল। ঘন্টাখানেক গল্প হলো। এবার আমরা উঠব। ভদ্রলোক আমাকে একটি রিস্টওয়াচ গিফট করলেন। অনিকাকে একটা দামি মোবাইল দিলেন। বললেন, এখানে একটি নতুন সিমও আছে। শুরুতে আমরা একটু ইতস্তত করলাম। সবাই মিলে বেরিয়ে এলাম। ওখান থেকেই বিদায় দিলাম তাকে। 
চার.
পরেরদিন অনিকাকে ফোন দিলাম, ফোন সুইচড্ অফ। যতবার ফোন করি বন্ধ। হয়ত নতুন সিমে নতুন করে কথা বলছে অনিকা। অনিকার আনন্দ-বিষণ্নতার সিরিজ ছবিগুলো আমার ঘরে। ‘অপেক্ষা- এক’, দুই, সিরিজের প্রথম ছবিটি ড্রয়িংরুমে এখনও ঝুলছে…

One thought on “ইরাবতী গল্প: বর্গী । মাহমুদুল হক আরিফ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত