বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প : বাঁশিওয়ালা

আজ ১৪ জুলাই কথাসাহিত্যিক বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনিকা ক্লেন্সিং মিল্ক দিয়ে মুখের মেক আপ সরাচ্ছিল।
খানিক আগেই পার্টি থেকে ফিরেছে। পার্টি ছিল সুপ্রকাশদের ওখানে। অতনু এর মধ্যেই জামাকাপড় বদলে ফেলেছে।
বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিল। মণিকা এখনও পার্টির মুডেই। আয়নার সামনে নিজেকে বিভিন্ন ভঙ্গীতে দেখছিল এতক্ষণ, আশ মিটিয়ে। এবার রাত পোশাকে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে।
আমাকে কেমন লাগছিল আজ? তুমি তো কিচ্ছু বলোই না আজকাল।
অতনু সতর্ক হল। আলোচনা এভাবে শুরু হয়ে অন্য দিকে মোড় নিতে পারে। আজকে কি মণিকাকে কমপ্লিমেন্ট দেওয়া হয় নি ? তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে মণিকার পিছনে দাঁড়াল। দুটো হাত রাখল গাঢ় নীল গাউনের সরু ফিতের সীমানা ছাড়ানো অনাবৃত সুডৌল কাঁধে। আঙ্গুলের ছোঁয়ায় নিজের প্রশংসা জানিয়ে আয়নার মধ্যে দিয়ে মণিকার চোখে চোখ রাখল – খুব অ্যাট্রাক্টিভ লাগছিলে আজ। ইররেসিস্টেব্লি চার্মিং ।
মণিকার গলা থেকে আহ্লাদের ঘড়ঘড়ে শব্দ বেড়োল – ইস , এখন এত ! আর পার্টিতে তো সুমির উপর থেকে চোখই সরাতে পারছিলে না । ওর দিকে বার বার এমন হাঁ করে চাইছিলে কেন? আর নাচের সময় তো -!
মণিকার কথায় সুমিতার ছবিটা আবার মাথায় ফিরে এল। সুমিতার প্রতি তার একটা সুপ্ত দুর্বলতা আছে। কিন্তু, অতনু সেটা মনের গভীরেই লালন করতে চায় তাই নিজেকে সামলে নিল। আয়না দিয়ে মণিকা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মনের ভাবনা আড়াল করার সহজ উপায় হিসাবে মণিকার ঘাড়ে নিজের ঠোঁট গুঁজে দিল অতনু। মণিকার সাড়া পেয়ে নিশ্চিন্ত হল।
আঃ , কি হচ্ছে ! ছাড়ো তো, চেঞ্জ করতে দাও, মণিকার গলায় প্রতিরোধের থেকেও আহবান ছিল বেশি। ড্রিঙ্কের লেগে থাকা হাল্কা নেশাটা অতনুর মাথায় আবার ছড়িয়ে যাচ্ছিল। ছড়িয়ে যাচ্ছিল সুমিতাও। আজ পার্টিতে একটা নাচে সে ছিল সুমিতার সাথে, নাচের সাথে সাথে দুই একবার কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে নিয়েছিল। বুকের কাছে লেপ্টে থাকা সুমিতার ঘ্রানের স্মৃতি অতনুকে উত্তেজিত করল।
সুমিতার প্রশ্রয় ছিল অবশ্যই। কিন্তু সেটা সবসময়ের মত কিছু দূর যাবার জন্য, তার বেশি নয়। অতনুর কেন যেন মনে হয় এতে সুপ্রকাশেরও প্রচ্ছন্ন অনুমোদন আছে। সে যে সব ব্যাপারেই জিতে আছে সেটা জানানোর এটাও একটা উপায় ওর। সুমিতাকে মুহুর্তের জন্য শরীরের কাছাকাছি পাওয়ার সেই অনুভূতিকে ফিরিয়ে আনতে মণিকাকে আরও জোরে বেষ্টন করল অতনু।
এই, আজ ক পেগ খেয়েছ বল তো? নেশা হয়ে যায় নি তো – মণিকার গলার সুখের ঝংকার।
তোমার নেশার থেকে কখনো বেরতে পারলে তবে না অন্য নেশায় ডুবব – কথার জাল বোনা চলে।
আচ্ছা, সুমিতার গলার ডায়মন্ড পেন্ড্যান্টটা দেখেছিলে , কি সুন্দর না? কিরকম দাম হবে বলতো?
অতনু কাছে প্রসঙ্গটা মনোমত হল না – ডায়মন্ড কিনা কে জানে, জহুরী তো নই। শো অফ করতে সুপ্রকাশ যেরকম ভালোবাসে, কলেজ জীবন থেকে দেখছি। শুনলে না, কতবার করে ওর এই ভিলা বানাতে কি কি খরচ হয়েছে সেসব শোনাচ্ছিল ।
বাড়িটা কিন্তু সত্যিই খুব সুন্দর করেছে, আর রান্না ঘরটায় তো তুমি যাও নি, কি নেই ! আমার আর কিচ্ছু চাইনা তনু, শুধু সুমিতার মত একটা বাথরুম করে দাও – মার্বেলে মোড়া, মাঝখানে গোল বাথটব আর দেওয়াল জুড়ে আয়না।
অতনু নিজেকে অসহায় বোধ করে – আমাদের সব কিছু থেকেও যেন যথেষ্ট নয়।
আছে অনেক ওদের, সেটাওতো সত্যি। সুপ্রকাশের নতুন মোবাইলটা দেখেছো। বাড়ির সমস্ত সিকিওরিটি ওটা দিয়েই কন্ট্রোল করে। আমাকে দেখাচ্ছিল।
অতনু রাগে গড়গড় করে ওঠে – তুমি ওর কোলের কাছে বসে সেটাই দেখছিলে বুঝি? ভেবেছ আমি কিছু দেখিনি।
মণিকা খিলখিল করে হেসে ওঠে – সুমির সাথে নাচতে নাচতেও তাহলে নিজেকে একেবারে হারিয়ে ফেলোনি। নিজের বউয়ের উপর নজর রেখেছিলে। তাও ভাল।
রাগটা সুপ্রকাশের প্রাচুর্য না মণিকার ওর সাথে অকারণ ঘেঁষাঘেঁষি, অতনু নিজেও বুঝতে পারে না। মণিকা ততক্ষণে ভাবনার গভীরে, সুমিতার গলার পেনন্ডেন্টের মত একটা কোথায় যে খোঁজ করা যায়।
মনিকা এক্সপ্রেস অ্যাভিনিউতে হালকা পায়ে ঘুরছিল। এটা ওর ‘মী টাইম’। পৃ্থিবীর সাথে নিজের মত করে যোগাযোগ করা। চকচকে, ঝলমলে পৃথিবী। দুহাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে। সে ডাকের আকর্ষণ কি দুর্নিবার ! রোজ আসলেও যেন তার আশ মেটে না। পুরনোও তো হয় না, রোজই কেমন নিত্য নতুন। এখানে আসলেই তাই শরীরে শিহরণ জাগে মণিকার। মন ভাল হয়ে যায়।
আজ যেমন নিচের ফ্লোরটা ইস্টার উপলক্ষে সাজিয়ে তুলেছে। কি সুন্দর রং বেরঙের বড় বড় ইস্টার এগ বানিয়েছে পুরো ফ্লোরটা জুড়ে। তার সাথে দোকানে দোকানে নতুন জিনিসের ঢল। অন্তত পুরনো জিনিসকে নতুন করে সাজানর ত্রুটি নেই। বিভিন্ন দোকানে ঘুরে তারও সেই নিত্য নতুন সাজানো পসরাকে যাচাই করে দেখা। নতুন নতুন পোশাকে নিজেকে আবার করে আবিষ্কার করা। এটা একটা প্রিয় খেলা মণিকার। এ খেলার আকর্ষণ অমোঘ, অনিবার্য।
আজকে অবশ্য সেই আহ্বান কাটিয়ে মণিকা সোজা গেল তানিষ্কের প্যাভেলিয়নে। সুমিতার গলার হারটা মন থেকে কিছুতেই মুছতে পারে নি। খুঁজে খুঁজে বের করল হিরের পেন্ড্যান্ট, ঠিক সুমিতার মত। আসলে এটা তার চেয়েও যেন একটু বড়। আরও ভাল, মণিকার মনে হল। কেমন সাত রঙ্গে ঝলকাচ্ছে। নিজের গলার কাছে এনে ধরে মণিকা। আয়নায় নিজেকে দেখে মোহিত হয়ে গেল।
এতদিনে যেন তার নাম সার্থক। হীরের দ্যুতি তার চোখে মুখে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। এরপরেই প্রাইস ট্যাগটা দেখে অবশ্য দ্যুতিটা একটু কমে গেল। বাব্বা, এত ! ক্রেডিট কার্ডের বিল দেখলে অতনু খুব ঝামেলা করবে, হাজারে তো নয় এটা। একটু দমে গেল মণিকা।
ইস, এমন একটা হিরের পেন্ড্যান্টের শখ তার কতদিনের ! যাক, নেক্সট অ্যানিভারসারিতে আদায় করতে হবে।
এমন সময়ে অতনুর ফোন এল। খুব এক্সাইটেড।
হোয়াট? এরকম সময়ে? মনে হচ্ছে কোন ভাল খবর?
হ্যাঁ, আমেজিং আর আনেক্সপেক্টেড!- উৎফুল্লতা গড়িয়ে পড়ে অতনুর গলায়।
এবার মণিকাও কৌতূহলী হল – প্রমোশন?
আরে না না , তার চেয়েও বেটার ! আমি এমন একটা গাড়ি পাচ্ছি , তুমি ভাবতেও পারবে না।
মার্সিডিজ? অডি? কোথা থেকে? কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না মণিকা।
না-না , দিস ওয়ান ইজ ভেরী স্পেশাল। লিমিটেড এডিশন, অনলি ফর চোসেন ফিউ। সুপ্রকাশও কিনতে পারবে না, ইচ্ছা করলেও। অতনুর গলায় টেক্কা দেবার আবেশ।
মণিকা এখনও অন্ধকারে, বুঝতে পারছিল না অতনু কেন এত এক্সাইটেড। তাদের তো দুটো গাড়ি আছেই। এতে কিভাবে সুপ্রকাশদের ছাড়িয়ে যাওয়া হল। কিন্তু এটুকু বুঝল , এই মুহূর্তে অতনু খুব খুশি , কল্পতরু হবার মেজাজে আছে। এটাই সুযোগ।
এই শোন না, আমি এখন তানিষ্কে দাঁড়িয়ে আছি। একটা ডায়মন্ড পেন্ড্যান্ট দেখছিলাম। সেদিন যেটা সুমিতার গলায় দেখেছিলে না , তার চেয়েও বড়। আমাকে যে কি মানাচ্ছে না, ভাবতে পারবে না ! কিনি?
অতনুর মন এখন তার সদ্য পাওয়া আকিউজিসনে। বলল – যা করবার তাড়াতাড়ি করে বাড়ি চলে আসো। আমিও আসছি। তারপর দুজনে মিলে গাড়িটা কলেক্ট করতে যাবো । দুজনকেই একসাথে যেতে হবে। আই জাস্ট কান্ট ওয়েট !
একবার পেন্ড্যান্টটার দামও জানতে চাইল না। কিনতে বলল, নাকি বুঝতেই পারেনি যে মণিকা কেনার কথা বলেছে? এত ভাবতে বয়েই গেছে। তার এতদিনের শখ। মুখ ফস্কেও যদি হ্যাঁ বলে থাকে, তাতেই বা কি ! তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল । দুটো গাড়ি থাকতেও অতনু যদি আবার নতুন গাড়ি নেয় , সে কেন নতুন গয়না কিনবে না?
গয়না নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে অতনু এসে গেছিল। আসতেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। ভাবতেই পারছি না , আমাদের ভাগ্যেই এটা এসে যাবে। ওহ , হোয়াট এ ড্যাম গুড লাক !
কিসের লাক? বুঝতে পারছি না, দুটো গাড়ি থাকতে তুমি আবার কেন গাড়ি নেবে। আর এতে সুপ্রকাশদের থেকে কি বেশি হয়ে যাবে? তাছাড়া রাখবেই বা কোথায়? পার্কিং তো শুধু দুটো গাড়ির। একসাথে এতগুলো প্রশ্ন তুলে হাঁফাচ্ছিল মণিকা। নিজেকে অতনুর বাহু বন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিল।
সেদানটা বেচে দেবো, দু’ বছর তো হয়েই গেছে। তাহলেই আর পার্কিং-এ অসুবিধা হবে না।
কিন্তু কেন? এসবের বেলায় তোমার কোন ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের কথা মনে হয় না? রাগ হয়ে যায় মণিকার। তার কিছু কেনবার থাকলেই তখন যত আপত্তি। আননেসেসারি আবার একটা গাড়ি যদি কিনবে, তার আগে ওকেও কিছু কিনে দিক। ক্ষণিকের জন্য ভুলে গেল আজকেই সে ডায়মন্ড পেন্ড্যান্টটা কিনে এনেছে।
বিজয়ীর হাসি হাসে অতনু। মণি, এ এমনি-সেমনি গাড়ি নয় । ড্রাইভার-লেস কার, সেলফ ড্রিভেন। ক্যান ইউ ইমাজিন? হাউ এক্সক্লুসিভ ইট উইল বি?
হোয়াট? সেলফ ড্রিভেন? তার মানে কেউ গাড়ি চালাবে না? সে আবার হয় নাকি? এটা কি সায়ান্স ফিকশন?
হবে, হচ্ছে । ভবিষ্যতটা খুব কাছে এসে যাচ্ছে মণি। ফিউচুরা – কি অ্যাপ্রোপ্রিয়েট না গাড়ির নামটা? কিন্তু খুব কম লোকই ভবিষ্যতের এই গাড়ির মালিকানা পাচ্ছে শুরুতে। আর সেই গোনা গুনতি লোকেদের মধ্যে আমরা।
ড্রাইভার না থাকলে তাহলে রাস্তা দেখে গাড়ি চলবে কি করে? অ্যাক্সিডেন্ট করার জন্য চড়বো ওই গাড়িতে? পাগল হলে? মণিকার গলা বিস্ময় থেকে দ্রুত বিরক্তির পথে হাঁটা দেয়। আমি কক্ষনো চড়বো না ওই গাড়িতে। আর তোমার যদি চড়তে হয়, সেল অফ ইওর ওন কার। আমার গাড়ি আমি কিছুতেই ছাড়ব না।
কাম অন মণি। ফিউচুরা একটা আল্ট্রা মডার্ন কার , সামথিং রিয়ালি ফ্রম দ্য ফিউচার। ইন ফ্যাক্ট এটা এখনও কমারসিয়ালি বিক্রিও শুরু হয় নি। ওরা স্মার্ট কাপলস খুঁজছিল। আমিও তাই অনলাইনে আমাদের ডিটেলস দিয়ে অ্যাপ্লাই করেছিলাম। অ্যান্ড সি হোয়াট! উই আর চোসেন। হাউ লাকি উই আর !
লাকি নাকি গিনিপিগ? সন্দেহের জাল কাটে না মণিকার।
নো, অন দ্য কনট্রারি উই আর পারফেক্ট রিপ্রেসেন্টেটিভ অফ দ্য মার্কেট সেগমেন্ট। আমরা এই যুগের ভয়েস। উই ক্লিয়ারলি ম্যাচ দ্য ক্রাইটেরিয়া দ্যাট ডিফাইন্স টুডেজ আপওয়ারডলি মোবাইল, আমরা ভিরাট।
ভিরাট? সে আবার কি? ভিরাট কোহলি? মণিকা খেই হারিয়ে ফেলতে ফেলতে তীর খুঁজে পায়।
মণিকার গলায় মোড় ঘোরার ছবি দেখতে পেয়ে উতসাহিত হল অতনু। মণি, ওরা অনলাইনে একটা ক্যারাকটার তৈরী করেছে , যার নাম দিয়েছে ভিরাট – স্মার্ট, সুয়েভ, নতুনকে এক্সপিরিয়েন্স করতে সব সময়ে তৈরী, অ্যাহেড অফ দ্য প্যাক ! আর তার সঙ্গিনী নাতাশা স্লিম আর সেক্সি , ফ্যাশন ট্রেন্ড সেটার, ইন স্টেপ উইথ নিউ এজ।
এবার বাজী জেতার হাতটা খেলে অতনু – নাতাশা ঠিক যেন তোমার মত। তাইতো আমাদের প্রোফাইল ভিরাট আর নাতাশার সাথে ম্যাচ করে গেল ।
মণিকা স্বপ্নের বেলুনে চড়ে। সত্যি তো সে আর অতনু সবার থেকে আলাদা, যাকে বলে হাটকে। জানত সে সবসময়ে, এবার বাইরের পৃথিবীও স্বীকার করছে। আনন্দে গান গেয়ে ওঠে মণিকা – আমরা অদ্ভুত , আ-আমরা নতুন যৌবনেরই দূত – সোৎসাহে গলা মেলায় ভিরাট মানে অতনু আর মণিকাকে কোমর জড়িয়ে শূন্যে তুলে নেয়।
দাঁড়াও দাঁড়াও, একটু ভাবতে দাও। মনিকা বর্তমানে ফিরতে চায়। ওরা কি আমাদের ফ্রিতে দিচ্ছে? ইভেন ইফ ইট ইস ফ্রি, কি হবে যদি কোন অ্যাকসিডেন্ট হয়? সে দায়িত্ব কে নেবে? ওই গাড়িতে বসে আমাদের কিছু হলে? মণিকা সাবধানি গলায় বলে।
সব কিছুর উত্তর পেয়ে যাবে মণি। সেখানেই তো যাবো দুজনে। আজকের মধ্যে ওদের সাথে কথা বলে অ্যাক্সেপ্টেন্স পেপারে সাইন করত হবে , না হলে দে মে অফার দিস টু নেক্সট কাপল ইন দ্য লিস্ট। অতনু মণিকার কাছে ঘন হয়ে দাঁড়ায়। জাস্ট ইমাজিন মণি, গাড়িটা এমনি এমনি চলছে , নো ড্রাইভার। আর পিছনের সিটে আমরা দুজন। রিমেম্বার উই ফ্যান্টাসাইজড, মেকিং লাভ অন আ মুভিং কার? নাউ ইট ক্যান বি ট্রু ! অতনু মণিকার দোটানার খুঁটি ধরে টান মেরে আবার নিয়ে যায় স্বপ্নের দুনিয়ায়।
আমার কিন্তু কেমন কেমন লাগছে। মনে হচ্ছে যেন রোবটের দুনিয়ায় চলে যাচ্ছি । এটা নেবার আগে, আরও দুই একজনের সাথে কথা বলে নাও না। অন্তত সুপ্রকাশের সাথে, ওতো গ্যাজেট-ফ্রিক, জানবে অনেক কিছু।
আর ইউ ম্যাড? হি ইজ দ্য লাস্ট পারসন আই উইল কনসাল্ট। ও কক্ষনো চাইবে যা ওর হাতের বাইরে সেরকম কিছু আমাদের হোক? এটা দিয়ে আমি ওর মুখ এবার ভোঁতা করে দেবো। হি নীডস টু বি সারপ্রাইজড। জানতে পারলে জ্বলবে ও। জ্বলুক এবার। সুপ্রকাশকে জ্বলানোর তৃপ্তিতে অতনু নিঃশব্দ হাসিতে মুখরিত হল।
মনিকা এবার পেন্ড্যান্টটা বের করল – জ্বলবে এটা দেখেও । সেদিনের পার্টিতে সুমিতার গলারটা দেখেছিলে তো , এটা তার থেকেও …
প্রথমে একটু একটু ভয় লাগছিল মণিকার , অতনুরও । যদিও টেস্ট ড্রাইভের সময়ে ফিউচুরার মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ ওদের সাথেই ছিল । কিন্তু তবুও একটু অদ্ভুত লাগছিল । এ গাড়ির কোন স্টিয়ারিং নেই । এমনকি ফ্রন্ট সীটই নেই , পিছনের সীটটা পিছনে থেকেও হয়ে গেছে সামনের । সেই দূরত্ব থেকে ড্যাশবো্র্ডের বিভিন্ন কাঁটার নামা ওঠা তাদের অপরিহার্যতা হারিয়েছে । অতনুর হাতে রিমোট , যেটা দিয়ে অতনু গন্তব্য স্থির করে দেবে , মেপে দেবে সর্বোচ্চ গতি । আর ফিউচুরা আলাদীনের ম্যাজিক কার্পেটের মত অনায়াস সফলতার সাথে পৌঁছে দেবে যেখানে যেতে চায় সেখানেই । গাড়ির সাথে কথাও বলা যায় । এক তরফা । হুকুম তালিম করা জীনের মত গাড়ি শোনে আর চলতে থাকে তার গন্তব্যের দিকে । গাড়ি অতনুর সাথে কথা বলে না , কিন্তু ওর ভাষায় যোগাযোগ করতে থাকে ট্রাফিক সিস্টেমের সাথে , ন্যাভিগেশনের ম্যাপের সাথে । এমনকি যোগাযোগ করতে পারে অন্য ফিউচুরা গাড়ির সাথেও । পারে সবকিছু , কিন্তু করতে থাকে এক অদ্ভুত আবেগ বিহীন যান্ত্রিক এফিসিয়েন্সির সাথে । রাস্তায় যখন চলছিল , অনেকে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করেছে । অতনু আর মণিকার অস্বস্তি লেগেছে । তাও ভাগ্যিস চারদিক কাল কাঁচে ঢাকা , এমনকি সামনেটাও । ফিউচুরার স্পেশ্যাল পারমিশন আছে তার জন্য, কারন ড্রাইভার ছাড়া গাড়ি দেখলে রাস্তায় যদি প্যানিক শুরু হয়ে যায় । কিন্তু মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক লোকেই জানে , তাই যেখান দিয়েই যায় রাস্তার লোক হাঁ করে দেখে এই গাড়ি , কেউবা ভয়ে পালায় । রাস্তার কৌতুহলী চোখ ফিউচুরার কম্পিউটার সিস্টেমে কোন ছাপ ফেলে না । ড্রাইভার-হীন গাড়িকে টেক্কা দেবার জন্যও অনেকে আসে । তাদের গতি যদি অতনুর বেঁধে দেওয়া গতির থেকে বেশি হয় , ফিউচুরা অবলীলায় তাদের রাস্তা ছেড়ে দেয় । সেটা অতনু কোনদিন পারত না । কোন পুরনো অ্যাম্বি ওকে ওভারটেক করে চলে যাচ্ছে দেখলে অতনুর হাতে গাড়ি পাগলা ঘোড়া হয়ে যেত । কিন্তু ফিউচুরা গৌতম বুদ্ধের প্রসন্নতায় রাস্তা ছাড়ে । কেউ রাস্তা পার হচ্ছে দেখলে ফ্রেঞ্চ কার্টসির পরাকষ্ঠা দেখিয়ে নিজেকে থামিয়ে দেয় । এসব দেখে অতনু ক্রমে নিশ্চিন্ত হল যেই জীন ওদের গাড়ি চালাচ্ছে ওদের থেকে গাড়ি চালানটা তার আসে ভাল । কিন্তু মনিকা এখনও অতনুকে ছাড়া একা চড়তে চায় না । অদ্ভুত এক অস্বস্তি হয় তার । অনুপস্থিত চালক তার অনুভুতিতে ছেয়ে থাকে । যদিও অতনুর সাথে ফিউচুরায় ঘুরে বেড়াতে তার যথেষ্ট উৎসাহ । আর সমান উৎসাহে অতনুর সাথে গাড়ির বিষয়ে ভাল ভাল কথা লিখতে থাকে ফেসবুকে আরে ব্লগে । রোজ । এই গাড়ীতে চড়া আর এর অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্লগ লেখার জন্য তারা দায়িত্ব বদ্ধ ।
এই গাড়ির দৌলতে ওরা এখন মিনি সেলিব্রিটিও । নিউজ আওয়ারে বেশ কয়েকবার ডাক পড়েছে নানা চ্যানেলে। অটো শোতেও । প্যানেল ডিসকাশনে যোগ দেয় তারা ভারতের অন্যান্য শহরে তাদের মত আরও ভিরাট আর নাতাশাদের সঙ্গে । চেন্নাইতেও আরও নজন ভিরাট আর নাতাশা আছে , তবুও এটা একটা এক্সক্লুসিভ ক্লাব । যে ক্লাবে সুপ্রকাশদের প্রবেশাধিকার নেই ।
প্রথম যখন অতনু বন্ধু মহলে খবরটা ছড়িয়েছে সুপ্রকাশ খুব সন্দিগ্ধ ছিল । খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেছে কিভাবে অতনুরা এটা পেল ।
তার মানে তোরা টেস্ট ড্রাইভ করছিস ? আর তোদের টেস্ট ড্রাইভ হয়ে গেলে, সব ইম্প্রুভমেন্টগুলো ইনকর্পোরেট করার পরে আমরা এই গাড়ি কিনতে পারব ।
কথাটার মধ্যে দিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন অবজ্ঞার চেষ্টা ছিল অবশ্যই । কিন্তু অতনু সেটা উপেক্ষা করেছে । বরং সোৎসাহে বলেছে – ঠিক, বলতে পারিস আমরা নতুন যুগের অগ্রদূত । আমাদের মতামতেই ঠিক হবে , কি হবে এই গাড়ির ভবিষ্যত । তবে কিনতে না পারলেও চড়তে পারিস আমার সাথে । কবে চলবি বল । বলতে পেরে অতনু এক অদ্ভুত আত্মশ্লাঘা বোধ করেছে ।
এখন অতনুর এটাও একটা কাজ । তাদের বন্ধুদের এক একজনকে নিয়ে ফিউচুরায় করে ঘুরিয়ে বেড়ানো । কোম্পানির দিক থেকে এটাও একটা কন্ডিশন ছিল । নিয়ম অনুযায়ী ওদের একজনকে গাড়িতে থাকতেই হবে । মনিকা অতনুকে ছাড়া এখনও চড়ে না, তাই অতনুর কাজ বেড়েছে । প্রতি সপ্তাহান্তে কাউকে না কাউকে গাড়িতে চাপিয়ে শহরে বা শহর ছাড়িয়ে টহল দেওয়া । তাদের প্রশ্ন করে অভিজ্ঞতা জানা আর তাই নিয়ে লেখা । অতনুর খুব খারাপ যে লাগে তা নয় । বরং এর মাধ্যমে বিভিন্ন পেজ থ্রি সারকেলে তাদের ডাক পড়ছে ইদানীং । নতুন চেনা হচ্ছে , তাদের আবার গাড়িতে করে ঘোরাচ্ছে। রিয়াল ফান ।
সুপ্রকাশই একমাত্র উৎসাহ দেখাল না ফিউচুরার টুওরে । অতনু মনিকাকে বলেছিল – হিংসেয় জ্বলছে ও , বুঝতে পারছ না ?
কিন্তু সুমিতার খুব ইচ্ছা চড়ার । মণিকার একটু কিন্তু-কিন্তু ছিল । সুমিতাকে সে সহ্য করতে পারে না । কিন্তু নাই বা বলে কি করে , আর সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে । তাই আজ অতনু বেরিয়েছে সুমিতাকে নিয়ে ।
অতনু বলেছিল – মনি তুমিই নিয়ে যাও না ওকে । বেশ তোমাদের গার্লস ডে আউট হয়ে যাবে । যদিও জানত মণিকা রাজী হবে না । এখন ড্রাইভারহীন কাল কাঁচে ঢাকা ফিউচুরায় সুমিতার পাশে নরম গদিতে ডুবে যেতে যেতে এক এক অদ্ভুত উত্তেজনায় আচ্ছন্ন হল অতনু ।
কোথায় যাবে বল সুমি, কতদূর যেতে চাও ?
তুমি যেখানে নিয়ে যাবে , যতদূরে । আজ আমি তোমার হাতে । সুমিতা মিষ্টি হেসে অতনুর চোখে চোখ রাখে ।
সেই দৃষ্টির গভীরতায় অতনু একটু নার্ভাস ফিল করে তাড়াতাড়ি গাড়ির গুন ব্যাখ্যান করতে শুরু করে । সুমিতার উৎসাহ খুব । এই গাড়িতে কি আছে আর কি নেই , নিজের গাড়ির সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে জেনে নিচ্ছিল । গাড়িতে গাড়িতে কথা হয় শুনে বেজায় অবাক হল সুমিতা – এ যেন ছোটবেলায় পড়া রোবটের দুনিয়ায় ঢুকে যাচ্ছি ।
ঘূর্ণায়মান গাড়ির সীট ওকে সবচেয়ে মুগ্ধ করল । সীটটা ঘুরিয়ে পেছন দিকে মুখ করে সুমিতা শিশুর মত হাততালি দিয়ে ওঠে ।
জানো , তোমার গাড়ির এই ফিচারটা খুব ভাল । পিছন দিকে মুখ করে সব কিছুকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার যে অনুভুতি হয় সেটা সামনে মুখ থাকলে কক্ষনো হয় না ।
সুমিতার এই ভাল লাগাটা অতনু উপভোগ করছিল । আরও উৎসাহ পেয়ে দরাজ গলায় বলল , এবার স্ট্রেট ব্যাক । বলতেই সীট সামনে প্রসারিত হয়ে , হয়ে গেল যেন এক ছোট্ট ডিভান । সীট হঠাত শুয়ে পড়তে সুমিতা প্রথমে হকচকিয়ে গেছিল , কিন্তু সামলে নিয়ে বলল – ওয়াও , আমার তো এবার ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে । এরকম হলে তো মনে হবে আর থামি না , চলতেই থাকি ।
আর গান গাই – এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত – হা হা করে হেসে ওঠে অতনু ।
মন্দ হত না , তাই না ? এরকম চলতেই থাকতাম । তোমার আপত্তি আছে ? সুমিতার গলায় যেন স্বপ্নের হাতছানি ।
ও , তাই নাকি ? আর সুপ্রকাশের কি হত ? কথার খেলাটা অতনুর বেশ ভাল লাগছিল ।
ওর জন্য তোমার এত চিন্তা , কক্ষনো মনে হয়নি তো ।
আমি ভাবতাম তুমি আর সুপ্রকাশ – অতনু বুঝতে পারে না সে ঠিক কি বলতে পারে ।
নতুন কিছু পাওয়ার ইচ্ছাটা কি অন্যায় ?
এর থেকে বড় আহ্বান আর কি হতে পারে ! অতনু রিমোটে চাপ দিয়ে সুমিতার সিটটাকে সোজা করতে থাকে। সিট সুমিতাকে নিয়ে অতনুর দিকে এগিয়ে আসে । সুমিতার চোখের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে অতনু ঝুঁকে পড়ে এগিয়ে আসা সুমিতার দিকে ।
দাঁড়াও, দাঁড়াও , তোমার গাড়িকে বলেছ আমরা কোথায় যাচ্ছি । কোন দূরের পথে? সুমিতার চোখে দুষ্টুমির হাসি । হঠাত তোমার বাড়ির সামনে গিয়ে থেমে গেলে তোমার জন্যে মোটেই ভাল হবে না সেটা ।
তাই তো , অতনুর চমক ভাঙ্গে । গাড়িকে তো বলাই হয় নি , অথচ নিজেই কেমন দিব্যি চলেছে । অতনু কাল কাচের ভিতর থেকে দেখে গাড়ি শহর ছাড়িয়ে এর মধ্যেই হাইওয়েতে ।
আরে , একি অন্তর্যামী হয়ে গেল ? আমাদের মনের কথা পড়ে ফেলে নিজে নিজেই দুরের পথে পাড়ি দিয়েছে। অতনু আশ্চর্য হয় , এরকম তো হওয়ার কথা নয় মোটেই।
খিলখিল হাসিতে গড়িয়ে পড়ে সুমিতা । তার মানে তোমার গাড়িরও আমাদের হারিয়ে যাওয়ায় পারমিশন আছে বল । আমাদের নতুন কোন দিগন্তের দিকে নিয়ে চলেছে ।
কিন্তু অতনুর কিরকম ভয় হতে লাগল । সব কিছু যেন ঠিকঠাক চলছে না , কোথাও কোন গন্ডগোল হয়েছে নিশ্চয় । সে রিমোটের উপর ঝুঁকে পড়ল ।
সামথিং মে বি রং সুমি । আমাকে একবার বুঝে নিতে দাও ।
অতনু বুঝতে পারছে না গাড়ি কোন দিকে চলেছে । তাই রিমোটে দিক পরিবর্তন করতে গেল নিজের বাড়ির দিকে । কিন্তু ফিউচুরার কন্ট্রোলের কোন পরিবর্তন হল না , যেমন চলছে সেরকমই চলতে থাকল । অসহায় ভাবে সুমিতার দিকে তাকাল – আমি গাড়ির দিক পরিবর্তন করতে পারছি না , ও নিজের মত চলেছে আজ ।
অতনুর আতঙ্ক সুমিতাতে ছড়িয়ে গেল । রিমোটে ঝুঁকে পড়ে বলল – দেখ না , আমার বাড়ির দিকে ফেরে কিনা । একবার চেষ্টা কর ।
অতনু সে চেষ্টাও করে । কিন্তু কিচ্ছু লাভ হল না ।
তাহলে অন্য কোথাও , অন্য কোনখানে ?
অতনু দ্রুত হাতে রিমোটে এই কদিনের আরো যাওয়া জায়গাগুলোয় যাবার নির্দেশ দিতে থাকে । কিন্তু ফিউচুরা বিনা দিক পরিবর্তনে চলতে থাকে তার নিজস্ব নির্দেশিত পথে ।
সুমিতা এবার অস্থির হয়ে ওঠে । এ তুমি কি গাড়িতে চড়ালে আমায় অতনু ? থামাও এই অদ্ভুত গাড়ি তোমার । আমি এখানেই নেমে যাবো ।
সে চেষ্টা কি করেনি অতনু ? কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না । শেষ ভরসা অতনু ফিউচুরার হেল্পলাইনে কল করল ।
অস্থির হাতে যান্ত্রিক স্বরনির্দেশ অনুযায়ী হেল্প ডেস্কের অপশন টিপতে থাকে অতনু । অবশেষে ফোনের অন্য প্রান্তে জীবন্ত মানুষের উপস্থিতি অতনুকে আশ্বস্ত করল ।
হ্যালো , ফিউচুরা হেল্প লাইন ?
হ্যাঁ বলুন ।
আমি অতনু মল্লিক বলছি , ভিরাট থ্রি । আমার গাড়িতে কিছু গণ্ডগোল হচ্ছে । আসলে গাড়ি চলছে ,কিন্তু কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না । ন্যাভিগেশন কন্ট্রোল আমার নির্দেশ মানছে না ।
জানি , এই প্রবলেম অন্য সব গাড়িতেও হয়েছে । আমাদের ইঞ্জিনীয়াররা ব্যাপারটা দেখছে ।
সব গাড়িতে এক সাথে , কি সর্বনাশ ! অস্থির উদ্বেগে ভেঙ্গে পড়ে অতনু – হাউ লং উইল ইট টেক ?
দেখুন , সেটা বলা খুব মুশকিল । ফিউচুরা নেট ওয়ার্কে ভাইরাস অ্যাটাক হয়েছে –
ভাইরাস ? হোয়াট ভাইরাস ।
হ্যামলিন , ভাইরাসের নাম হ্যামলিন । ইটস আ নিউ ভাইরাস , তাই আমাদের অ্যান্টি ভাইরাস সফটওয়্যার এটাকে প্রিভেন্ট করতে পারে নি ।
ফোনের অপর প্রান্তের নিরাসক্ত উত্তরে রাগে ফেটে পড়ে অতনু । পারে নি মানে ? আমাদের কি হবে? আমরা কি এভাবে চলতেই থাকবো ? কোথায় চলেছি আমরা ?
আপনি শান্ত হন । আমরা তো দেখছি । আমরাও জানি না , কোথায় চলেছে । এটুকু জানি , সব গাড়িই চলেছে একই দিকে ।
শুনতে শুনতে অতনুর মুখ বিবর্ন হয়ে যাচ্ছিল , তার প্রাণ যেন ব্লটিং পেপারে করে কেউ শুষে নিচ্ছিল ।
কি হল অতনু , কিছু বলছ না কেন ? কার সাথে কথা বলছ তুমি ? সুমিতা দুহাতে অতনুকে ঝাঁকাতে থাকে ।
আপনারা আটকান , যেভাবে পারেন – গলা ভেঙ্গে আসছিল অতনুর – এভাবে আমাদের প্রাণ নিয়ে খেলতে পারেন না । আমি কোম্পানির নামে কেস করব , ইউ আর প্লেইং উইথ আওয়ার লাইফ ।
ধৈর্য ধরুন । আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা কিছু একটা করবেই । আমরা আপনাকে খবর দিতে থাকব । হঠাত করে নিজে কিছু করার চেষ্টা করবেন না ।
ফোন কেটে গেল । এপারে অতনুর নীরবতা সুমিতাকে উত্তেজিত করল – এভাবে হাতে হাত দিয়ে বসে থাকলে হবে , কিছু কর ।
কি করব বল , আমাকে বারন করল নিজেরা কিছু করতে ।
আর কিছু না পার , দরজা খুলে চলো ঝাঁপ দিই।
গাড়ি চললে দরজা লকড থাকে , খোলা যায় না সুমি । গাড়ি না থামলে আমরা বেরোতেও পারব না । কিচ্ছু করার নেই , অপেক্ষা করা ছাড়া ।
বলতে বলতেই অতনু আর সুমিতার চোখ গেল গাড়ির কাঁচের বাইরে । এখন তাদের গাড়ি আরও একটা ফিউচুরার পিছনে চলেছে । না , না , শুধু একটা নয় , পরপর অনেকগুলো । সব কটা যেন লাইন করে চলেছে ।
দেখতে দেখতে তাদের গাড়ি উঠল স্টেট হাইওয়ে ছাড়িয়ে ন্যাশানাল হাইওয়েতে । সেখানে তাদের গাড়ি আরও অন্য শহর থেকে আসা ফিউচুরাদের মিছিলে যোগ দিল । লাইন করে বিভিন্ন রঙের ফিউচুরা গাড়ির মিছিল হাইওয়ে ধরে চলছিল । কেউ জানে না কোথায় যাচ্ছে । কিসের টানে কোন গন্তব্যে । জানে হয়তো শুধু হ্যামলিন ভাইরাস।
দূরের আকাশে সূর্যাস্তের লালিমা ছড়িয়ে যাচ্ছে । এক ঝাঁক পাখি ঘরে ফিরছে , দল বেঁধে । ঠিক যেন দল বেঁধে চলা ফিউচুরা গাড়িগুলোর মত । শুধু ওরা জানে ঘরে ফেরার ঠিকানা , অতনুরা জানে না ।
অতনু আর সুমিতা হাতে হাত আঁকড়ে বসে রইল, পথের শেষের আশায় ।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত