বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এবং জাহানারা ইমামের আন্দোলন: আগামীর চ্যালেঞ্জ

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন না ফেরার দেশে পাড়ি জমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই সেনানী। জাহানারা ইমাম মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত মা, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সংগঠক। ইরাবতী পরিবার এই মহান সেনানীর প্রয়াণ দিবসে জানায় বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের একটি প্রবন্ধ থাকছে ইরাবতীর পাঠকদের প্রতি এই শোকাহত দিনে।


 

পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ নেই যেখানে কোনও রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি সে দেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় দর্শন, জাতির পিতা কিংবা সংবিধানের মূলনীতি অস্বীকার করে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে। শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা ও দর্শনে যারা বিশ্বাসী তাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দিতে পারে। বাংলাদেশ হচ্ছে সেই অসম্ভবের দেশ, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা শুধু হুমকি নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষদের হত্যা করে বিচার থেকে অব্যাহতিও পেতে পারে।
১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং পাঁচ লক্ষাধিক নারীর চরম ত্যাগের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি তা নিছক একটি ভূখণ্ড প্রাপ্তি কিংবা পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের জন্য ছিল না। এই রাষ্ট্রের মূল নীতি ও লক্ষ্য কী হবে তা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করেছেন। বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, কল্যাণরাষ্ট্র হবে⎯ এ প্রত্যয় মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার বহু আগে স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে প্রতিফলিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, তাঁর সম্পর্কে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, তাঁর বিভিন্ন ভাষণ এবং সমকালীন রাজনীতিবিদ ও গবেষকদের রচনায় নানাভাবে বিধৃত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের চেতনা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা, যা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমরা বুঝি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, যা রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে ১৯৭২-এর সংবিধানে বিধৃত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর প্রধান সহযোগী, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতায় এসেই তারা সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বানাবার জন্য মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান সহযোগী নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশের মাটিতে পূনর্জন্ম প্রদান করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। সেই ’৭৫ থেকে আমরা দেখছি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীতে পাকিস্তানের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দর্শন প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াত ও বিএনপি একজোট হয়ে কীভাবে কাজ করেছে।
১৯৯২-এর ১৯ জানুয়ারি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলন সূচিত হয়েছে তার লক্ষ্য⎯ বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির পাকিস্তানিকরণ প্রতিহত করে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দাবিতে জনগণকে সচেতন করেছে এই আন্দোলন। এই সচেতনতার ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মহাজোট ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ করেছে, যা ছিল জাহানারা ইমামের আন্দোলনের এক বড় বিজয়।
দীর্ঘ সাতাশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর কেউ কেউ বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি ক্ষমতায়, সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরে এসেছে, শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও সম্পন্ন হয়েছে⎯ এখন আর নির্মূল কমিটির আন্দোলনের কী দরকার? এ কথা সত্য যে, আমাদের ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের, বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বেড়েছে। আমাদের আন্দোলন না থাকলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতো না, সংবিধানের মৌলবাদীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ বন্ধ করা যেত না। তারপরও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রধর্মের কলঙ্ক থেকে সংবিধান মুক্ত করা যায় নি। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এবং অনেকের মনোজগতে এখনও মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা শেকড় গেঁড়ে বসে আছে।
জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শূন্য সহিষ্ণুতার কারণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী যে কোনও দেশের চেয়ে বাংলাদেশ ভাল অবস্থানে আছে। কদিন আগে শ্রীলঙ্কায় খৃষ্টান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ পরব ‘ইস্টার সানডে’তে (২১ এপ্রিল ২০১৯) আইএস-এর অনুসারী স্থানীয় মুসলিম মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা যে নৃশংস আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে সেরকম হামলা শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বাংলাদেশে ঘটে নি। ২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরায় আইএস সমর্থক সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলার পর আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দেশীয় জঙ্গীদের অনেকগুলো সম্ভাব্য হামলার উদ্যোগ পূর্বাহ্নে বানচাল করে দিয়েছে, তবে এ নিয়ে আত্মসন্তুষ্টির সুযোগ নেই। শ্রীলঙ্কার গীর্জায় সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করে আইএস-এর প্রধান আবু বকর আল বোগদাদীর ভিডিও ভাষণ তাদের ব্লগে প্রচার করা হয়েছে, যাকে এতদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও পশ্চিমা গণমাধ্যম মৃত বলে প্রচার করেছে। আইএস মরে নি। সম্প্রতি আইএস-এর মুখপত্রে বলা হয়েছে⎯ বেঙ্গলে তারা জনৈক আবু মুহাম্মদ আল বেঙ্গলীকে সংগঠনের আমীর হিসেবে ঘোষণা করেছে। (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১ মে, ২০১৯)

 

দুই

সম্প্রতি (৭ এপ্রিল ২০১৯) গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ওয়াজে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদে উস্কানিদাতা ১৫ বক্তাকে চিহ্নিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এদের বিরুদ্ধে তদন্ত আরম্ভ হয়েছে। (পরিশিষ্ট-১ দ্রষ্টব্য) ওয়াজের নামে ভিন্নধর্ম, ভিন্নমত, সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নারী, নাস্তিক এবং বাঙালির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কদর্য ভাষায় যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয় তাদের সংখ্যা ১৫-এর দশগুণ হলেও আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই এ কারণে যে, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির ধারাবাহিকতায় এই প্রথম ধর্মব্যবসায়ী সন্ত্রাসী মওদুদিবাদী, ওহাবি মোল্লাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। অতীতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ধর্মীয় ও এথনিক সম্প্রদায়ের উপর যে সব হামলা হয়েছে, যেভাবে মুক্তচিন্তার অনুসারী তরুণ লেখক ও ব্লগারদের হত্যা করা হয়েছে, যেভাবে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড-বোমা হামলা ও হত্যা হয়েছে, যেভাবে রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানে ও উদীচীর সম্মেলনে, সুফীসাধকদের মাজারে, লালনের অনুসারী বাউল সম্প্রদায় এবং নিরীহ আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যাকাণ্ড হয়েছে সে সবের প্রধান অনুঘটক হচ্ছে জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী এবং তার মতো বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন মওদুদিবাদী ওয়াজ ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ সহ অনেক দেশে আইএস ও আল কায়দার মতো ইসলামের ধ্বজাধারী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভ্রান্ত তরুণদের তাদের জিহাদী বলয়ে যুক্ত করছে। ২০১৪-১৫ সালে সিরিয়ায় আইএস-এর জিহাদে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে প্রায় পাঁচ হাজার শ্বেতাঙ্গ তরুণ-তরুণী যোগ দিয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনলাইন প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে।
পুরনো মুদ্রণ যন্ত্রে প্রচারসামগ্রী প্রকাশ ও বিতরণ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দেশে-বিদেশে যাবতীয় জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠন অনলাইনে তাদের সচিত্র মুখপত্র প্রকাশ করছে, যা বিনামূল্যে পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের সকল প্রান্তে। আইএস-এর অন্যতম প্রকাশনা ‘লোন উলফ’ (Lone wolf )-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় (মার্চ, ২০১৯) বলা হয়েছে, কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে ‘গ্লোবাল জিহাদ’-এর অন্তর্গত করতে হবে। কীভাবে তাদের ভাষায় ‘মুরতাদ’, ‘নাস্তিক’ শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন ও সুলতানা কামালদের হত্যা করতে হবে ‘লোন উলফ’-এর বর্তমান সংখ্যায় তার বিষদ বিবরণ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে দলের কর্মী ও অনুসারীদের। এ বিষয়ে ২৯ এপ্রিল (২০১৯) বাংলা ট্রিবিউন-এ একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। (পরিশিষ্ট-২ দ্রষ্টব্য)
আইএস ও আলকায়দা দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের সন্ত্রাসী জিহাদী নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে তথাকথিত ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ বা চূড়ান্ত জিহাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা হাদিসের কিছু প্রক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি দিয়ে বলছে বিশ্বব্যাপী ইসলামী হুকুমত কায়েমের চূড়ান্ত জিহাদ হবে হিন্দুস্থানের মাটিতে। তাদের ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’-এর রণনীতি ও রণকৌশল না বুঝলে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসের আদর্শিত বয়ানের বিরুদ্ধে কখনও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।
যখন এ লেখাটি লিখছি (২৯ এপ্রিল ২০১৯) আহমদীয়া মুসলিম জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতা টেলিফোনে জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে প গড়ে পুলিশ প্রশাসন তাদের নির্ধারিত জলসা করতে দিচ্ছে না। আড়াই মাস আগে (১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯) প গড়ে মওদুদিবাদী ওয়াজসন্ত্রাসীরা আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদান করে স্থানীয় অনুসারীদের উস্কানি দিয়ে আহমদীয়াদের মসজিদে এবং বাড়িঘরে হামলা করে কয়েকজনকে আহত করেছে। বাংলাদেশে মওদুদিবাদী সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত দুর্বল আহমদীয়া সম্প্রদায়ের উপর হামলা করছে। ১৯৫২ সালে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদি বই লিখে কাদিয়ানিদের কাফের ঘোষণা করেছিলেন, যার ধারাবাহিকতায় জামায়াতিরা তখন পাকিস্তানের লাহোরে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। ১৯৫৩ সালে কাদিয়ানি হত্যাকান্ডের পর পাঞ্জাবের সামরিক আদালতে নিরীহ মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাসের উস্কানিদাতা মওদুদিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল, যা পরে সৌদি বাদশাহর হস্তক্ষেপের কারণে কার্যকর হয়নি। তখন থেকে মওদুদিবাদী সন্ত্রাসী মোল্লাদের ওয়াজে আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে নিরীহ আহমদীয়া সম্প্রদায়, যাদের জলসার ব্যানারে সব সময় লেখা থাকে ‘সকলের জন্য ভালবাসা, কারও জন্য ঘৃণা নয়।’ বছর দশেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের মেরীল্যাণ্ডে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের এক আন্তর্জাতিক জলসায় দেখেছি শান্তি ও সম্প্রীতির ইসলামের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে সকল ধর্মের শীর্ষ নেতারা তাদের জলসায় এসেছেন শুভেচ্ছা ও সহমর্মিতা জ্ঞাপনের জন্য।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে বলা হয়েছে⎯ সন্ত্রাসের উস্কানিদাতা ওয়াজকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে। আমাদের দাবি হচ্ছে⎯ শুধু ওয়াজ বা বক্তৃতা নয়, যে কোনও প্রচার সামগ্রীতে যদি ভিন্নধর্ম, ভিন্নমত কিংবা বাংলাদেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাস ও চেতনাবিরোধী কথা বলা হয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসনে যারা মওদুদিবাদী সন্ত্রাসী মোল্লাদের প্রশ্রয় দেবে, তাদের হুমকির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভিন্নমত ও ভিন্নধর্মের প্রতি বৈরি আচরণ প্রদর্শন করবে, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করবে, তাদেরও বিচার ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। না হলে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি যেমন থাকবে, পাশাপাশি মানবাধিকার সূচকে বাংলাদেশ ক্রমশঃ নিম্নগামী হবে।
মওদুদিবাদী সন্ত্রাসীরা জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সরব উপস্থিতি বাংলাদেশে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ক্ষেত্র প্রসারিত করছে। সাঈদীর মতো বহুল আলোচিত একজনের ওয়াজ মাঠে শোনার জন্য খুব বেশি হলে দশ বার হাজার মানুষ উপস্থিত থাকে। কিন্তু সেই ওয়াজ যখন ইউ টিউবে প্রচার করা হয় তখন তা লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বর্তমানে সাঈদী ’৭১-এর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জেল খাটলেও ইউ টিউবে তার শত শত ওয়াজ প্রতিনিয়ত শোনা যাচ্ছে। ২০০৪ সালে প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের উপর নৃশংস হামলা ও হত্যার আগে ও পরে জামায়াত নেতা সাঈদী কী ভয়ঙ্কর সব কথা বলেছেন তা এখনও ইউ টিউবে আছে, অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসী ওয়াজীদের তালিকায় দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর নাম নেই।
গত ১০ এপ্রিল (২০১৯) ফেণীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীর (১৮) নৃশংস হত্যাকাণ্ড গোটা জাতিকে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। মাদ্রাসার দুর্বৃত্ত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার যৌন হয়রানির শিকার নুসরাত অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি চেয়ে মামলা করেছিল। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং তার সহযোগীরা নুসরাত ও তার পরিবারকে হুমকি দিয়েছিল মামলা প্রত্যাহার করার জন্য। নুসরাতের পিতাও একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তারা অপরাধীদের হুমকি অগ্রাহ্য করায় নির্যাতক সিরাজের সহযোগীরা নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার উদ্যোগ নেয়। গুরুতর অগ্নিদগ্ধ নুসরাত পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। নুসরাত হাসাপাতালে থাকতেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পক্ষে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। যার ফলে নারীনির্যাতনকারী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা, তার সহযোগী সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের দুজন স্থানীয় নেতা সহ অভিযুক্ত সকলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী নুসরাতকে সিঙ্গাপুর পাঠাতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে নুসরাত আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষের যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করে নুসরাত শহীদের মৃত্যু বরণ করেছে। দুর্বৃত্ত এই জামায়াত নেতা গ্রেফতার হওয়ার পর জানা গেছে মাদ্রাসার আরও অনেক ছাত্রী তার যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হলেও প্রাণভয়ে কিংবা লোকলজ্জার কারণে তারা প্রতিবাদ করেনি। নারীদের উপর সহিংসতা বৃদ্ধি, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ক্ষেত্র প্রসারের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জামায়াতে ইসলামী বাঙালি নারীদের ‘গণিমতের মাল’ আখ্যা দিয়ে বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়েছিল এবং এর পাশাপাশি বহু নারীকে তারা নিজেরাও ধর্ষণ করেছিল। নারীদের নিম্নশ্রেণীর প্রজাতি এবং যৌনসম্ভোগের সামগ্রী বিবেচনা করে তাদের সম্পর্কে অশ্রাব্য কুৎসিৎ মন্তব্য⎯ দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সহ সমচরিত্রের মওদুদিবাদী মোল্লাদের ওয়াজের অন্যতম বিষয়।
২০১৩ সালে জামায়াতের সহযোগী কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের সর্ববৃহৎ সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলামে’র সন্ত্রাসের সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেফাজতপ্রধান আহমদ শফীর নারী বিষয়ক একটি ওয়াজ ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে নারীদের ধর্ষণে তার অনুসারীদের তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন। নারীদের বিরুদ্ধে জঘন্যতম অশ্লীল ও উস্কানিমূলক ওয়াজের জন্য হেফাজতে ইসলামের প্রধান আহমদ শফী ‘তেঁতুল হুজুর’ নামে পরিচিত হলেও তার নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তের তালিকায় নেই। বরং আমরা জেনেছি যাদের নামে তদন্তের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাদের কয়েকজন হেফাজতপ্রধান আহমদ শফীর সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তিনি তাদের আশ্বস্ত করেছেন⎯ এরকম কিছু হবে না।
আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠপর্যায়ে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাস দমনে যথেষ্ট সাফল্য প্রদর্শন করলেও জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রামে তেমন কোনও সাফল্য দৃশ্যমান নয়। মওদুদিবাদী সন্ত্রাসের প্রধান অবলম্বন হচ্ছে কোরাণ ও হাদিসের মনগড়া ব্যাখ্যা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার এবং ইসলামকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে যাবতীয় হত্যা, সন্ত্রাস ও মানবতাবিরোধী অপরাধকে বৈধতা দেয়া। সরকার কর্তৃক নিযুক্ত কিছু আলেম মাঝে মাঝে মওদুদিবাদীদের বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিবৃতি দেন, বক্তৃতায়ও বলেন। এদের অনেকে আবার মওদুদির ফতোয়া⎯ ‘কাদিয়ানিদের কাফের ঘোষণা’র সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।

 

তিন

বাংলাদেশে শুধু নয়, প্রতিবেশি দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার জমিন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ ও উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মাঠপর্যায়ে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে জামায়াত এখন কোনঠাসা অবস্থায় আছে। ’৭১-এর গণহত্যার দায়ে দল হিসেবে জামায়াতের বিচার এখন আরম্ভের অপেক্ষায়। এই বিচার থেকে অব্যাহতি পাওয়া এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য জামায়াত মিশর ও তুরস্কের জ্ঞাতি ভাইদের মতো নতুন নামে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আত্মপ্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে আমার একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ গত ১৫-২০ মার্চ (২০১৯) দৈনিক জনকণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যার শিরোনাম⎯ ‘জামায়াতে ইসলামী খোলস বদলায়, স্বভাব বদলায় না।’ জামায়াতীরা যে নামেই দল করুক মওদুদিবাদের মূল কথা হচ্ছে ইসলামের নামে রাজনীতি, জিহাদের দ্বারা ক্ষমতা দখল এবং শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
গত ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতের অন্যতম নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দল থেকে পদত্যাগ করে জামায়াতকে তুরস্ক, মিশর ও তিউনিসিয়ার মতো অতীতের ভুল স্বীকার করে বাংলাদেশের বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন নামে, নতুন নেতৃত্বে, নতুন কর্মসূচি নিয়ে রাজনীতি করার পরামর্শ দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতের মজলিশে সুরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু গত ২৭ এপ্রিল জামায়াত থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতের যে কোনও নেতা এখন যদি বুকের রক্ত দিয়েও লিখে দেন⎯ তিনি বাংলাদেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে রাজনৈতিক দল করবেন, তারপরও ’৭১-এর গণহত্যার দায় থেকে জামায়াতের কোনও পর্যায়ের নেতা অব্যাহতি পেতে পারেন না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দল বা সংগঠনের অপরাধ থেকে দলের কোনও নেতা অব্যাহতি পেতে পারেন না। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বা মঞ্জু ’৭১-এর ভুল স্বীকার বলতে বোঝান রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানকে সমর্থন বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা। তারা কখনও ’৭১-এর গণহত্যার জন্য জামায়াতকে দায়ী মনে করেন না। কারণ এখনও তারা ‘মওদুদিবাদ’ বুকের গভীরে লালন করেন। রাজ্জাক, মঞ্জুদের প্রতারণায় বিভ্রান্ত হয়ে অনেকে বলছেন⎯ ’৭১-এর অবস্থানের জন্য ভুল স্বীকার করে বা ক্ষমা চেয়ে জামায়াতের কোনও তরুণ নেতা, ’৭১-এ যার জন্ম হয়নি⎯ বাংলাদেশের সংবিধান মেনে যদি নতুন নামে রাজনীতি করতে চান তাহলে অসুবিধে কোথায়? আমাদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট। জামায়াতের নেতারা ’৭১-এ জন্মাক কিংবা তার পরে জন্মাক অধিনায়কের দায় বা ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’’ কিংবা মওদুদিবাদী হওয়ার দায় থেকে তিনি কখনও অব্যাহতি পাবেন না। ’৭১-এর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ ছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশের পর থেকে দল হিসেবে জামায়াত-শিবির যে সব হত্যা, নির্যাতন ও সন্ত্রাস করেছে তার বিচার আজ হোক কিংবা কাল হোক⎯ হতেই হবে। কোনও নেতা দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা বহিষ্কৃত হলে কিংবা অতীতের কোন ‘ভুলের’ জন্য দুঃখ প্রকাশ করলে দলের অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাবেন⎯ এমনটি কখনও হতে পারে না।
জামায়াত নতুন নামে দল করতে চাইছে এটা রাজ্জাক বা মঞ্জুর ইচ্ছা অনুযায়ী নয়। জামায়াতের হেড কোয়ার্টার পাকিস্তানে। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’ কীভাবে জামায়াতের অভিভাবকত্ব করছে এর বহু প্রমাণ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। জামায়াতের একটি অংশ নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করবে, পুরনো জামায়াতও থাকবে, তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক অটুট থাকবে⎯ এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। সবই হচ্ছে কর্তা ‘আইএসআই’-এর নীলনকশা অনুযায়ী। ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ শুধু আলকায়দা বা আইএস-এর তত্ত্ব নয়, জামায়াতেরও তত্ত্ব। এর জন্য কোনও সেকুল্যার নামগ্রহণেও তাদের আপত্তি নেই। ‘লোন উলফ’ বা ‘জন আকাঙ্খার বাংলাদেশ’ খুবই সেক্যুলার নাম, কিন্তু মেষের চামড়া দিয়ে গা ঢাকলে নেকড়ে যে কখনও মেষ হয় না এ প্রবাদ হাজার বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে।
এসব কারণে শহীদজননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে আরও বেড়েছে। আগামীর এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আন্দোলনের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এবং ৩০ লক্ষ শহীদের স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অব্যাহত রাখতে হবে। মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূলের নিদান রয়েছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমাদের প্রধান কাজ হবে দেশে ও বিদেশে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার দর্শন বহুমাত্রিকতায় তুলে ধরা। শহীদজননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে উদ্ভাসিত করা, মনোজগতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। দেশ ও জাতিকে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার তামসিকতা থেকে মুক্ত রাখতে হলে এর কোনও বিকল্প নেই।

 

 

 

 

প্রচ্ছদ : নাওয়াজ মারজান

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত