সাম্প্রতিক পাঠ বিবেচনায় বিষ্ণু দে’র কবিতা

আজ ১৮ জুলাই কবি ও প্রাবন্ধিক বিষ্ণু দে’র জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


মোহাম্মদ নূরুল হক

টিএস এলিয়ট যে মর্মযাতনা থেকে যুগযন্ত্রণাকে কবিতায় রূপান্তর করেছেন, সে উত্তেজনা ও অন্তর্দ্বন্দ্বই বিষ্ণু দে তার কবিতায় চিত্রায়িত করেছেন। নৈরাশ্য ও নৈঃসঙ্গপীড়িত ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং যুগযন্ত্রণা একই সূত্রে গ্রথিত করেছেন বিষ্ণু দে। ফলে আধুনিক যুগমানস তার কবিতায় প্রতিফলিত, সহজে অনুমেয়। মাঝে-মধ্যে মনে হয়, বিষ্ণু দে অনেকটা সমন্বয়বাদী, কিছুটা বিচ্ছিন্নতাবাদী। সমন্বয়_ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের, ব্যক্তির চিত্তের দার্ঢ্যের সঙ্গে পলায়নপরতার তথা আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সমন্বয়ও তার কবিতার একটি বিশেষ অধ্যায়। মার্কসীয় দর্শন তার কবিতা প্রচ্ছন্ন হলেও শেষপর্যন্ত তিনি দ্বান্দ্বিক। কোনো চূড়ান্ত মতবাদ তার কবিতার মর্মমূলকে আচ্ছন্ন করে না। তার একদিকে প্রবল রোমান্টিক ‘সম্মুখে পথরুধি রবীন্দ্রঠাকুর’ অন্যদিকে অবক্ষয়ী আধুনিকতার সমন্বয় করেছেন। ফলে তার কবিতায় শিল্পগুণের সমান্তরালে এগিয়েছে দর্শনও। সচেতনভাবে কবিতায় দর্শন, বিজ্ঞান এবং পুরানের প্রয়োগ করেছেন। ফলে কবিতা হয়ে উঠেছে যুগযন্ত্রণাক্লিষ্ট নাগরিকের আর্তদীর্ণ স্বর; কিন্তু সে আর্তস্বর কখনো সেস্নাগানে পর্যবসিত হয়নি।
আধুনিক যুগরুচির একটি বৈশিষ্ট্য_ অন্তর্বেদনা প্রকাশের লক্ষ্যে সমষ্টিকে নৈর্ব্যক্তিক সত্তায় বিবেচনা করা। বিষ্ণু দের কবিতায় তার সফল প্রয়োগ রয়েছে। শিল্পের প্রতি তার অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে শব্দের প্রয়োগ এবং বাক্যের সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে। বিষয়-আশয়ে মার্কসীয় দর্শনই আরাধ্য_ ‘ইলোরা’ কবিতায় তারই স্বাক্ষর স্পষ্ট। কবি একটি শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্নে উদ্বেলিত। যেখানে প্রতিটি মানুষ স্বাধীন এবং মুক্ত। মুক্ত সে তার চিন্তায়, কর্মে এবং আচরণেও। পৃথিবী প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকেরই আবাসস্থল; কিন্তু সে পৃথিবীর অধিকার শ্রমিকের পরিবর্তে পুঁজিপতিদের দখলে।
রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত, তারা জনগণের শাসক নন, প্রতিনিধি মাত্র। পুঁজিবাদের ধর্মই হল, প্রতিনিধি হয়েও জনগণকে শাসন করার স্পর্ধা করা। সে স্পর্ধার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানুষ সবাই নন। যে কোনো শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ জানান সংবেদনশীল কবি। কবিই ঘোষণা করেন, ‘আমরা ভাস্কর, নই মূর্তি, মুক্তি আনি কর্মে চাষে/ যন্ত্রের ঘর্ঘরে, নিত্য আন্দোলনে, মুষ্ঠিভিক্ষা আসে/ নীলকণ্ঠ আমাদের মুক্তি নিত্য। আমরা নশ্বর’। শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মুক্তি অর্থনৈতিক মুক্তির ফলেই। সে মুক্তির পথ উৎপাদনে, শ্রমে। আলস্য কিংবা অন্যের শ্রম চুরিতে নয়। সমাজের আমূল পরিবর্তনের জন্য রুখে দাঁড়াতে হবে শ্রমজীবীকে; কিন্তু সে আমূল পরিবর্তনের আগেই ‘যন্ত্রের ঘর্ঘরে, নিত্য আন্দোলন, মুষ্ঠিভিক্ষা আসে’। শ্রমিক যতটা নিজেদের সংগঠিত করে, তারও বেশি করে ব্যর্থ আন্দোলন।
বিপুল পাঠে বিষ্ণু দের মানসকে করেছে সুসংহত ও পরিশীলিত। ফলে তার শব্দব্যবহার ও প্রয়োগে সৌম্য দেখা যায়। নির্মেদ শব্দ ব্যবহারের ফলে তার কবিতার বিষয় ও সুর তার রুচিবোধের একটি উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখে।
‘পলায়ন’ কবিতায় অবক্ষয়ী চেতনার পাশাপাশি পলায়নপরতাও স্পষ্ট। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থতার অভিজ্ঞানে পরিপূর্ণ। তবে সে ব্যক্তিস্বার্থে প্রেমই মুখ্য। প্রেমিক হূদয় একরৈখিক নয়, বহুগামী। তাই একস্থানে দীর্ঘদিন থাকে না সে। কারণ, ‘তীর্থযাত্রী হূদয় আমার/ আর নাহি রয় এ কয়দিনের পান্থশালায়’।
কোনো ঘর বা বন্ধনই তার পথচলা থামাতে পারেনি। কবির জন্য যে কোনো স্থানই ব্রহ্মা-। প্রেমিকপুরুষ মুহূর্তকে দিতে পারে মহাকালের মর্যাদা। ‘ক্ষণিকের মর-অলকায়/ ইন্দ্রিয়ের হর্ষে, জানো, গড়ে তুলি আমার ভুবন’? (উর্বশী)। উর্বশীর উদ্দেশে এ জিজ্ঞাসাপঙ্ক্তি; কিন্তু ছড়িয়ে পড়েছে আত্মজিজ্ঞাসাপ্রবণ প্রত্যেকের মনে।
মানবচরিত্রের ঘোর রহস্যময় ভুবনকে আলোকিত করার শক্তি সংবেদনশীল ব্যক্তির পক্ষে সহজ। চরাচরের সন্ধ্যা নামে সে রকম রহস্যময়তায়। বিষয়টা উপলব্ধির, আত্মপরিচয়েরও। মেঘকে পর্বতমালার সঙ্গে কল্পনা করে তার চাঞ্চল্যকে তুলনা করা হয়েছে মানবহূদয়ে সঙ্গে_ ‘বামদিকে গিরিশৃঙ্গ আকাশকে করেছে আহত,/ শ্যামাঙ্গী দিতিকে যেন মুষ্টি তোলে ক্ষিপ্ত দৈত্য শিশু।/ দুরন্ত পর্বতচূড়া, চোখকে সে এড়াতে চায় যে/ মানুষের মাঠ ফেলে_ আমারই এ-হৃদয়ের মতো!’
বিষ্ণু দে দর্শনগত দিক থেকে মার্কসীয়; কিন্তু ইশ্বরচিন্তায় ভাববাদী। ফলে তার মনে হয়_ ‘বিধাতার মনে আসে বাসনার বিবর্ণ আবেশ’। চিত্রকল্প ও মিথের সংরাগে কবি ঘুরে আসেন নেয়া-াল যুগ, সঙ্গে নিয়ে যান পাঠককেও। ভ্রমণের একপর্যায়ে উপলব্ধি করেন_ ‘দেহ হিম, মন কাঁপে, জাতিস্মর ওঠে অন্ধকার’। কিন্তু কেন? বস্তুগত চিন্তার সঙ্গে ভাববাদী চিন্তার সংরাগে কবি হয়ে ওঠেন প্রবল দ্বান্দ্বিক। শেষপর্যন্ত কবি দ্বান্দ্বিকই। সঙ্গতকারণেই কবি অন্যত্র ঘোষণা করেন_ ‘মানুষের অরণ্যের মাঝে আমি বিদেশি পথিক’ সোহবিভেত্তস্মাদেকাকী বিভেতি’।
তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং আত্ম উদ্বোধনের চূড়ান্তরূপ ঘটেছে ‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতায়। তৃষ্ণার্তের চাই জল, ক্ষুধার্তের অন্ন। আত্মবিস্মৃতের চাই কী? সংশয়ীচিত্ত চূড়ান্ত অর্জনে ব্যর্থ। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শিল্পবিপ্লব এবং সংগ্রামই উপায়; কিন্তু কেবল সংগ্রামও সে মুক্তি এনে দিতে পারে না। কোনো আত্মত্যাগই বিফলে যায় না। সাফল্য বয়ে আনে_ সময় সাপেক্ষ মাত্র।
তাই ‘আত্মাহুতি কি চিরকাল থাকে বাকি’? প্রশ্নের ভেতরই লুকিয়ে থাকে সম্ভাবনার বীজ। জাতীয় মুক্তির সস্নোগান নয়, আত্মপ্রকাশের উজ্জ্বল উদ্ভাস ‘দূর দেশের বিশ্ববিজয়ী দীপ্ত ঘোড়সওয়ার’। কিন্তু ঘোড়সওয়ার কেন? তার দৃঢ়তা আর ক্ষিপ্রতার জন্য? না কি তেজ ও দীপ্ত গতির কারণে? শেষপর্যন্ত ঘোড়া ভারতবর্ষে শৌর্যবির্য আর ক্ষিপ্রতার প্রতীক, ঘোড়সওয়ার তার দীপ্ত চালক। সঙ্গত কারণে যখন হালকা হাওয়ায় ‘লোকনিন্দার দিন’ কেটে যায়, তখন তৃষ্ণার্তের কাছে নিজের দাবিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
মানব আচরণ ও বিশ্বাসের যুগলচিত্র এঁকেছেন ‘কনডিশনড রিফ্লেকস’ এ। ‘এক পৌষের শীত’ কবিতায় নগরজীবনের জটিল ঘূর্ণাবর্তকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘সাত ভাই চম্পা’ মিথ, ঐতিহ্য এবং দেশাত্মবোধের যুগলচিহ্ন। বাঙালি স্বপ্নাতুর, কল্পনাপ্রবণ। চিন্তায় ও কর্মে যুক্তির চেয়ে ভাবালুতা তার বেশি, স্বভাবত স্বপ্নচারী। বাঙালি স্বপ্নচারী, পরিশ্রমীও। কেবল আলস্যে ভর করে তার জীবন কাটে না। মাঝে মধ্যে সংগ্রামে কেঁপে ওঠে, গর্জে ওঠে তীব্র প্রতিরোধে। মার্কসবাদী চেতনায় যেখানে শ্রেণী চেতনা মান্যতা পায়, সেখানে গ্রাহ্য হয়ে ওঠে, ‘হাতুড়ির ঘায়ে, কাস্তের বাঁকা শানে’। ‘সাত ভাই চম্পা এবং পারুল_ এ তিনটি কেবল রূপকথার অনুষঙ্গ নয়, বাঙালির রক্তের সম্পর্ক ও সামাজিক সম্পর্কের অচ্ছেদ্য বন্ধনও।
কবিতায় ‘জীবন যেখানে আকাশে জমাট একটি নিকষ পাহাড়’ সেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? সমস্যাসংকুল সংসারে একদিকে যাপিত জীবনের লাঞ্ছনা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এসব সমস্যা ও রূঢ় বাস্তবতার মধ্যেও কেউ কেউ হয়ে ওঠে ‘সংকল্পের দিগন্ত প্রান্তর’ (ত্রিপদী)। ‘কোণার্ক’ কবিতায় শ্রেণীচেতনার সঙ্গে মহাজাগতিক বিষয়ও অঙ্গীভূত করা হয়েছে। যাপিত জীবনের ঘানি টেনে টেনে শ্রমজীবী মানুষের মনে হয়, ‘মধ্যাহ্নের চন্দ্রভাগা বয়ে যায় কোণার্কে অমস্নান’। ভাববাদীদের প্রার্থনালয় থেকে শুরু করে অন্তিম স্থান পর্যন্ত সর্বত্রই সংশয় এবং বিশৃঙ্খলা। তবু ‘অমর ঐশ্বর্যে বাজে শিল্পীর তন্ময় ধ্যানে সৌন্দর্যে গম্ভির_/ নির্মাণে চঞ্চল ভিড়ে জেগে ওঠে কোণার্কের মন্দির-শ্মশান’।
মিথ ও দেশাত্মবোধের যুগল মিলন ঘটেছে ‘এবং লখিন্দর’ কবিতায়। বাঙালির ঐতিহ্য এবং মিথ একই সূত্রে গাঁথা হয়েছে। লখিন্দর এখানে বাণিজ্য এবং স্মৃতিসত্তার প্রতীক। ‘সে কবে’ একটি ছোট কবিতা। পঙ্ক্তি অসম। দুই স্তবকে সম্পন্ন ও সম্পূর্ণ। অন্তমিল এবং পঙ্ক্তিবিন্যাস কবিতার বিষয়ে ঘটেছে সুসামঞ্জস্য। সময় প্রবহমান, স্মৃতি অক্ষয়। কারো আনন্দের, কারো বেদনার। কৃতার্থ সংকীর্তন করে, মনে রাখে অনেকদিন, সংবর্ধিত ব্যক্তি সময়ে সবই ভুলে যায়। তাই_ ‘সে কবে গেয়েছি আমি তোমার কীর্তনে/ কৃতার্থ দোহার/ পদাবলী ধুয়ে গেছে অনেক শ্রাবণে/ স্মৃতি আছে তার’ বলে কবি ওই অমোঘ নিয়তিকেই ভাস্বর করে তোলেন।
‘শ্রাবণ’ কবিতা যতটা ঋতৃকেন্দ্রিক, তারও বেশি হূদয়বৃত্তির। কবি যখন উচ্চারণ করেন_ ‘যেমনটি যায় তোমার উধাও মুখের ঠোঁটের খোঁজে/ আমার হূদয় মাঠে ঘাটে খালে বিলে’ তখন প্রকৃতি এবং নারীর মধ্যে একটি সংরাগ রচিত হয়। সে সংরাগ মুছে দেয় নারী-প্রকৃতির সব বিভেদ, সূক্ষ্মতম পার্থক্যও।
বিষ্ণু দে কবি, দীক্ষিত পাঠকের। সাধারণ্যে কম পঠিত, তার শব্দ নির্বাচন, গঠন এবং বাক্যবিন্যাসে জটিলতার কারণে। আবিলতাপূর্ণ কবিতা পাঠে অভ্যস্ত পাঠকের কাছে বিষ্ণুদের কবিতা দুর্বোধ্য ও জটিল। অদীক্ষিত পাঠক তারল্য ভরা এবং ভাবালুতা সর্বস্ব পদ্য পড়ে যতটা ভাবালুতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন, ততটা কবিতা পড়ে তৃপ্ত হন না। ফলে বিষ্ণু দে কম পঠিতই থেকে যান; কিন্তু মনোযোগী পাঠক সব ধরনের কবিতাই পড়েন, স্বাদ গ্রহণ করেন সব ধরনের কবিতা থেকেই। বিষ্ণু দে কবিতায় যেমন হৃদয়ের ছোঁয়া মেলে তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিরও।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত