বেড নাম্বার ১৪২৪ (পর্ব-১)

Reading Time: 2 minutes

বিতস্তা ঘোষাল আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ইরাবতী পরিবার তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে। কিছুদিন আগেই হাসপাতালের দিনগুলো নিয়ে ধারাবাহিক  লিখেছিলেন কেবিন নং ৩০৪। আজ থেকে শুরু করলেন বেড নাম্বার ১৪২৪ নামে এক নতুন লেখা। ডায়েরির মত করে লেখা এই আখ্যান কেবল একজন রুগীর নয়, একজন কবির চোখে দেখাও বটে।


১৮ জুন

জীবন আর মৃত্যুর মাঝে যে হাইফেন সেটা বড় করতে করতে এই সবে বাড়ি ফিরেছিলাম।ভেবেছিলাম কী মজা চারদিকে কত রৌদ্র। কিন্তু হাইফেন বড় করতে গিয়ে দেখা হয় নি ভিতরে ওত পেতে রয়েছে অন্য জীবাণু। তারা শূঁড় ডানা সব নিয়ে নীরবে বিস্তার করেছে অন্য যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আমি নেহাতই অপারগ এক সৈন্য । বিরুদ্ধ পক্ষ আমাকে পুরো আঁটঘাট বেঁধে ধরাশায়ী করে দিয়েছে। আমি প্রাণপন চেষ্টা করছি তার থেকে বেরতে। এর আগের নার্সিংহোমটা ছিল বাড়ির সামনে।কেবিনে। সিস্টার নার্স আটেনডেন্ট সকলে কখন যেন আমার আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিল। এখানে আমার রুম নাম্বার নেই। জেনারেল ওয়ার্ড বেড নং ১৪২৪। কেবিন পাওয়া যায়নি। এই হাসপাতাল সম্পর্কে আমার খুব আতঙ্ক ।মনে পড়ে আগুনে পুড়ে যাওয়ার কথা । সকাল থেকে যখনি কথা শুরু হয়েছে এখানে ভর্তির, আমি সেই সব পুড়ে মরে যাওয়া প্রেতাত্মাদের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি ।কিন্তু রোগীর কথা আর কখন শোনা হয়! ডাক্তার টোডি, অসাধারণ ডাক্তার।তার অধীনে এনে সটান ভরতি করে দিল সনাতন, বিপাশা আর রম্যানি।

শুরু হল যন্ত্রণা।প্রথমে কাঁপুনিতে মরে যাচ্ছি , কোনো ব্ল্যাঙ্কেট নেই।গলা শুকিয়ে যাচ্ছে , জল নেই।অপেক্ষা অপেক্ষা । শেষ অবধি গোলাপি পাজামা শার্ট পরা প্রিয়াঙ্কাকে বকতেই হল।এবং ফল হাতে নাতে।আসা মাত্র পোশোক পাল্টে খয়েরি সাদা পাজামা শার্ট ।হাতে চ্যানেল দিয়ে শুরু হল স্যালাইন ।কিন্তু ডাক্তার দেখার পর বন্ধ করে দেওয়া হল। এরপর রক্ত নেওয়া হল। ভরতি হয়েছি চারটেয়।এখনো কেবল ওমেজ দিয়ে রেখেছে ।শুনলাম সাড়ে নটায় আন্টিবায়টিক। বেশ ।এই জন্য কী দরকার ছিল ভরতির! বাড়ির লোকেদের ধারনা আমি অস্থির হয়ে পড়েছি।হ্যাঁ ।পড়েছি।একটা মাছের বাজারে যদি রোগি থাকে তবে কী করবে সে! পাশের বেডের প্রবীণা সারাক্ষণ চেঁচিয়ে চলেছে সিস্টারদের সঙ্গে , তার পাশে পাঁচ বছরের বাচ্চা নিয়ে মা।কতবার যে রক্ত নিল বাচ্চাটার।বাচ্চা কেঁদে যাচ্ছে , মা কোলে আরেকটি বাচ্চা ও ফোনে তার অন্য বাচ্চাদের সামলাচ্ছে। আর আমি মাথার যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি ।কারোর কাছে নালিশ জানাবার নেই।কারন প্রতিটি রোগী তাঁদের যন্ত্রণায় চেঁচাচ্ছে । সাড়ে ছটায় চা আর ওটস দিয়েছিল।বমি করে ফেলেছি ।সাড়ে আটটায় দিল গলা ভাত।পায়েস।কুমড়োর ঘন্ট।ডাল।পনির। গলা ভাত পেয়ে সেই ছোটবেলার গলা ভাত এসে গেছের গল্পটা মনে পড়ল।ক্লেপ প্যালেট অপারেশনের পর সেই প্রথম আমাকে ভাত দেওয়া হয়েছে ।আর আমি খুশিতে চিৎকার করছি গলা ভাত এসে গেছে । আজ এতদিন বাদে শৈশব আর চল্লিশ উর্ধ্ব এক নারী যেন পাশাপাশি দাঁড়ালো। প্রিয়াঙ্কার বদলে তোড়া এসেছে , যদিও নিজের নাম বলছে তুড়া মানে ফুলের গুচ্ছ ।আর এসেছেন ড:দেবর্ষি ।ভদ্র, মার্জিত।বললেন, আপনির নাকি অনেক অভিযোগ ।আমাকে বললে আমি চেষ্টা করব সলভ করতে। আমি হাসলাম ।কোনো অভিযোগ নেই।রোগী থাকলে তারা চেঁচাবে।বিশেষ করে বাচ্চা ।কিন্তু আমিও ঠিক নেই।তাই কষ্ট। উনি আর কিছু বললেন না।কীই বা বলবেন! আমিও তো মা।একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার কষ্ট যে আমাকেও ছুঁয়ে যায়? তোড়া ত্রিপুরার মেয়ে । সে বলল, বাচ্চা টা এখনি শিপট হবে ১ তলায় ।কাল ওর হার্ট অপারেশন । আমি বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম ।ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সে এখন খেলছে।আর তার হার্টের ফুটো! হঠাৎই চোখ বেয়ে জল নেমে এল।নিজেকে বললাম তোমার যন্ত্রনা কী এর থেকেও বেশি ! ধৈর্য ধরো।শান্ত হও ।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>