বেড নাম্বার ৩১১৮ (পর্ব-৫)

হাসপাতালে বসে রোজ রোজ আশেপাশের মানুষগুলোকে নিয়ে লিখতে লিখতে কোথাও যেন আমি ক্রমশ একা হয়ে পড়ছি। মনে হচ্ছে মানুষগুলো কেউ আসলে এখানে নেই, সব কেমন চরিত্র। আমি তাদের সব কিছু উন্মোচিত করে তুলছি। গোপন মনিটারে তুলে নিচ্ছি তাদের গোপনীয়তা। রোগ, দুঃখ। হ্যাঁ, আমি নির্মম এক লেখকের মত কেবল লিখে চলেছি।
কিন্তু কেন? এদের কথা লিখে কেন আমার ভালো লাগে, কেন মনে হয় এদের সব কিছুই আসলে আমার বৃহত্তর পরিবারের বিভিন্ন মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি স্বত্তা।আর প্রতিটি স্বত্তার ভিতরে আশ্রয় নিয়েছে এক ভয়।আমি কালকের সূর্য, কালকের ভোর দেখব তো? আজ যারা ভিজিটিং আওয়ারে আমাকে দেখে গেল তাদের কাল দেখতে পাব তো!
পুরোটাই  অনিশ্চিত। একলা ডুব ডুব প্রান।কখন হাওয়াটা বেরিয়ে যাবে কেউ জানে না।
আমিও জানি না।
মানুষগুলো যখন আমার সামনে অকপটে বলে,  তাদের অসুখের কথা, টুকরো টুকরো ভাবে পরিবারের কথা , আমার সেই মুহূর্তে মাথার কিবোর্ড বাজতে থাকে।যাবার আগে যখন সেই মানুষ জিজ্ঞেস করেন, কি লিখছিলে তুমি, আমি বলি, তোমার কথা , তোমাদের কথা।
সে দাঁড়িয়ে যায় আমার বেডের সামনে। বলে, শোনাও।
আমি শোনাই।কেউ কাঁদে , কেউ বলে কী করে তুমি মনের কথাটা লিখে ফেললে! এতকিছু তো আমি বলি নি।
কেউ ভীষণ গম্ভীর হয়ে বলে, তুমি আমাকে তোমার লেখার চরিত্র বানিয়েছ? এত সাহস কে দিল তোমাকে!
তারপরেও বলে, কিন্তু তোমার উপর রাগ করতে পারছি না।কারন তুমি একটাও মিথ্যে কথা লেখনি।
মিথ্যে! হে ভগবান! জীবন মৃত্যুর সূক্ষ্ম সুতোটায় আমরা ঝুলে আছি । উনিশ বিশ হলেই. . . । সেই স্তরে দাঁড়িয়ে মিথ্যে সত্য কোনটাই কাজ করে না।কেবল তৃষ্ণার্ত পথিকের মত পান করি সব সুধা।কারন আমি কালকের ভোর দেখতে চাই। আমাকে কেবল সেই কথাগুলো লিখতে হবে যা লিখলে আমি মনের দিক থেকে সুস্থ থাকব। আমি ততটাই তাদের মনের অন্দরমহলে কড়া নাড়ব যতটা তারা বলবে।এর বাইরে আমি আর তার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই।
আমি হেসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিই। বলি ভালো থেকো।
চলে যাবার পর ফাঁকা লাগে অল্প কিছুক্ষণ। জানি একটু বাদেই সেই স্থানে আবার কেউ চলে আসবে।
শুয়ে শুয়ে ভাবি, আচ্ছা উল্টো দিকে যদি সত্যি কোনো সাহিত্যিক থাকতেন, তবে তিনিও নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে এভাবেই কিছু লিখতেন। অথচ এই দীর্ঘ পর্যায়ে সেই সৌভাগ্য হল না।
এখানে আমি একাই রাজা।লিখে চলেছি নিজের মত।
তবে আর হাসপাতাল নিয়ে লিখব না। কেমন নেশাড়ুর মত লিখে যাচ্ছি আর বারবার ভর্তি হচ্ছি।বাড়ির লোকে ফতোয়া জারি করেছে , বন্ধুরা বলেছে তুই কী ইচ্ছে করে এসব লিখবি বলে ভর্তি হচ্ছিস? কী ভাবছিস তুই, তোর খুব মনের শক্তি, সব কষ্টকে উপেক্ষা করে অন্যের যন্ত্রণা নিয়ে লিখে যাবি? আর আমরা রোজ চিন্তায় মরব তোর জন্য?
আমি হাসি। সত্যি আমি কারোর জন্য কিছুর জন্য লিখি না। না লিখলে করব কী!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত