বীথি চট্টোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ কবিতা

কবি বীথি চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১১. ০৬. ১৯৫৭) জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। কবি বরানগরের রামেশ্বর বালিকা বিদ্যালয় থেকে স্কুল শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে স্নাতক হন। তাঁর জীবিকা শুরু করেন সাংবাদিকতা দিয়ে। তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় দেশ পত্রিকায়। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “আগুন রঙা আলপনা”, “বাগান পোশাক”, “একক মেয়েলি সুখ”, “প্রাণাধিকেষু”, “পূর্বপল্লীর রাত্রিবাস”, “একদিন রাতে”, “শ্রেষ্ঠ কবিতা” প্রভৃতি। কবিতা ছাড়াও তিনি লেখেন ছোটো গল্প ও উপন্যাস।

আজ ১১ জুন কবি ও কথাসাহিত্যিক বীথি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মতিথিতে ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

নিজস্ব দিনলিপি

দেখেছি রাত্রি, আকাশে ফুটছে তারা
আসছে যাচ্ছে, ঝরেও পড়ছে কতো,
জন্মের ঠিক থাকে না, আমার-ও নেই
একটা ছোট্ট তেঁতুলচারার মতো।

পথের কুকুর যেভাবে তাকায়; যদি,
বিস্কুটভরা কোনো হাতে থাকে
চায়ের দোকান ঘেঁষে যেভাবে সে শোয়
সেভাবেই আমি নিয়েছি জীবনটাকে।

দু-চারটি মেঘ, কয়েকটি বাজে কথা
অনেক মেরেছে, ভয়-ও পেয়েছে কতো-
এসেছে গিয়েছে; থেকে গেল শুধু প্রেম
মাথায় আলতো আশীর্বাদের মতো।

ছেঁড়া খাতা থেকে কাটাকুটি, মুখে রক্ত
মুখের খাবার দু-চারটি থাপ্পড়
বিস্কুটভরা ঠোঙা পাশে সকরুণ
পথের কুকুর, ফুটপাতে হোলও ভোর।

ফুটপাত জুড়ে বেঁচে আছি আশ্চর্য
রোদ, জল, ঝড়, পোস্টার পলিথিন,
দু-চারটি মেঘ, আকাশের কিছু তারা
ঝরেও প্যড়েছে প্রতিদিন একদিন।

 

অভিশাপ

স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে যেই বউকে বুকে জড়িয়ে ধরবে
তখন তোমার ভীষণভাবে আমার কথাই মনে পড়বে।
আমার বুকের কলহাস্য এবং নিছক বুকের স্পর্শ—
আমার রূপের টুকরো টুকরো অনুষঙ্গ,
হাতের নরম আঙুলগুলো তোমার চুলে খেলা করবে।

এসব কথা বাড়িয়ে বলা একদমই নয়
যখন তুমি আমায় নিয়ে জড়িয়ে ছিলে
তখন থেকেই আমার ভুরু, চিবুকের ডৌল,
শাড়িতে ঢাকা পায়ের পাতা, বিঝতে পারলো
অন্যকোনও মেয়ের সঙ্গে শুয়ে থাকলেও . . .

পাপের মতো এসব কথা শোনায় যেন
কেমন করে পাপের গতি ভয় হারালো ?
পাপও এত পবিত্র হয়! জানা ছিল না।
সে যাই হোক, এবার তুমি যে মুহূর্তেই
প্রেমে পড়বে, তক্ষুনি ঠিক এমনভাবে
আমার খতাই মনে পড়বে।

 

 

সবুজ বিপ্লব

বসন্তের গাছে সবুজ বিপ্লব
রাত্রে জ্বলে কত ছোট তারা,
কিছু থাকবে না, শুধুই পড়ে পাওয়া
দু-তিনখানা ঘোর চুমু ছাড়া।

চাঁদনী রাত নামে, সঙ্গে প্রেম নিয়ে
পাবকশিখা হয়ে উঠছে মন,
নেভাতে পারবে না, বাতাস সরে আসে
আমার ভেঙে পড়া এই জীবন।

একটু তাপ বাড়ে, আকাশ মাঠে মেশে
আকাশ আরো নীলাভ হয়,
দখিন হাওয়া নিয়ে রঙের কামকলা
কেউতো পৃথিবীতে কারুর নয়।

কোথাও কিভহু নেই, কয়েকদিন পর
সবাই যাবে সে তো জানা কথা,
কিন্তু প্রতিবার অবাক করে দেয়
একটি চুম্বন ব্যাকুলতা…

 

গীতাঞ্জলী

একটি কথা সবাই জানি, মুখেও বলি
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন গীতাঞ্জলী।
গীতাঞ্জলী ছাড়লে লোকে কোথায় যাবে?
জীবনদায়ী এমন লেখা আর কি পাবে?
সত্যি ক-জন মনের জোরে বলবে বলো?
দুঃখ থেকে শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলো।
ভয় পেয়ো না, যা বলছে টা বলুক লোকে
নিজের জীবন দেখতে শেখো নিজের চোখে।
পদ্মাপারে গাছের ছায়া নদীর জলে;
সূর্য উঠে নতুন করে লিখতে বলে-
ধুলো উড়িয়ে ঝড়ের মতো দু-চারটি গান
দিনের শেষে ফেরত দেবে সব অপমান,
পুরোনো কথা; নতুন করে আবার বলি
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন গীতাঞ্জলি।

দাঁড়াও পথিকবর

[ফ্রান্সের মার্সেই শহরে অভুক্ত থেকেছেন কবি মধুসূদন ও তাঁর সংসার]

এস্টেট থেকে টাকা আসছে না হাতে
বাচ্চারা প্রায় কিছুই খায়নি রাতে,
না-পেলে খাবে কী? শুধু কটা বাসি রুটি…
পড়ে আছে দেখে, শুতে গেছে গুটিগুটি।

রাত শেষ হয়ে সূর্য ওঠার পরে
কী করে উনুন জ্বলবে কবির ঘরে?
তারা ঝিকমিক করে ফ্রান্সের রাতে
টাকা নেই শুধু সনেট আছে হাতে।

হিন্দু কলেজ বিলেতে ব্যারিস্টারি
রক্তে লুকোনো যশোরের জমিদারি,
বাংলা কবিতা তোলপাড় করে দিয়ে
যিনি বসবেন মেঘনাদবধ নিয়ে।

অভুক্ত তিনি ফ্রান্সের উপকূলে
একটা লাইনে দুনিয়া উঠছে দুলে,
চিঠি লিখেছেন প্রিয়তম বন্ধুকে
সাগরদাঁড়ির ছেলেটি শুকনো মুখে।

-বাচ্চারা প্রায় কিছুই খায়নি রাতে
টাকা নেই শুধু সনেট আসছে হাতে…

 

একা

আমার চোখে বসন্ত দারুণ চৈত্রমাস
চতুর্দিকে শিমূল-পলাশ কৃষ্ণচূড়ার ত্রাস।

ঝড় উঠেছে নিখুঁত কালো বৃষ্টি ভেজা রাত
আঁচল দিয়ে দুঃখ ঢাকি কোথায় তোমার হাত ?

তব্ধ যদি ভালোবাসা প্রেমের-কম্পন
ফিরিয়ে দাও কিশোরীকাল প্রথম চুম্বন।

ভালোবাসার আগুন ঝড়ে চাইনি কোনো দাম
অশ্রুবিহীন চক্ষু হল প্রেমের পরিণাম।

এই সময়েই ভিন্ন হলে এমন চৈত্রমাস
ভালোবাসার ফুটছে কলি, ফাল্গুন বাতাস!

এই যে চোখ এই যে প্রেম, এই যে হা-হুতাশ
এই বসন্তে দেবো কাকে প্রেমের আস্বাস ?

আমার চোখে বসন্ত দারুণ চৈত্রমাস
ভালোবাসা বাসার পরে, ভাঙলে বিশ্বাস!

 

 

 

প্রচ্ছদ কৃতজ্ঞতাঃ প্রনয় ঘোষ

.

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত