ব্রহ্মার কৃপাধন্য বিঠুর

উত্তরপ্রদেশের কানপুর সেন্ট্রাল থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জনপদ বিঠুর একইসঙ্গে নানা ধার্মিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনার লীলাভূমি। উইকএন্ডের টুকরো ছুটি কাটাতে আর কোলাহলপূর্ণ শহুরে জীবনযাপন থেকে একটু রেহাই পেতে গঙ্গার ডান তীরে প্রকৃতির কোলে অবস্থিত এই শান্ত ভূখণ্ডটির জুড়ি মেলা ভার। দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত, আর গাছ গাছালির মায়াময় পরশ ছুঁয়ে চওড়া পিচের রাস্তা ধরে বিঠুরের পথে যেতে হয়। যাবার সময় যদি বাইরের দিকে খেয়াল রাখেন ময়ূরের দেখা মিলবেই মিলবে। সময়ে সময়ে চোখে পড়তে পারে নীলগাইয়ের দলও।
হিন্দুধর্মের বহু প্রাচীন পুঁথিতে এই স্থানটির উল্লেখ আছে। জনশ্রুতি আছে, শ্রীবিষ্ণু কর্তৃক ব্রহ্মাণ্ড গঠনের কালে স্বয়ং ব্রহ্মা এই বিঠুরেই অশ্বমেধ যজ্ঞ ও তপস্যা করেছিলেন এবং যজ্ঞের সমাপনে যজ্ঞস্থলে একটি খুঁটি পুঁতে দিয়েছিলেন। ব্রহ্মার নামানুসারেই বিঠু্রের মূল গঙ্গা ঘাটের নাম হয় ব্রহ্মাবর্ত এবং তা থেকেই ক্রমেবিঠুর নামটির উৎপত্তি।
বিঠুরে ঢোকার মুখেই জায়গাটির সঙ্গে বেনারসের মিল খুঁজে পাবেন। রাস্তা বেশ সরু আর দুপাশে বহু পুরনো আমলের ছোট ছোড় বাড়ী, বাইরের দিকের দালানে স্থানীয় বাসিন্দাদের বসে থাকতে দেখবেন। আর দেখবেন যত্রতত্র পাটনাই গাই রাস্তা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাওবা কারও বাড়ীর দরজায় দাঁড়িয়ে খাবার চাইছে। ওদের বাঁচিয়েই আপনাকে গাড়ী নিয়ে এগোতে হবে। গঙ্গার ঘাটের একটু আগেই এখন গাড়ী রাখতে হয়। সামান্য টাকার বিনিময়ে কুপন পাবেন। তবে, লালমুখো বাঁদর থেকে কিন্তু খুব সাবধান। আপনার হাতে খাবার দেখলে ওরা ঠিক পিছু নেবে। আমি মূলত পশুপালন বিভাগের কাজে যাই বলেই ব্যাপারটা আমার কাছে খুব পরিষ্কার। কুকুর আর বাঁদরেরা ঘাটের কাছেই থাকে। মন্দির থেকে খাবার জোটে বলেই বোধহয়! ওদের খাওয়াতে গেলে আমাকে প্রায়শই কুকুর ছানা আর বাঁদর ছানার ঝগড়া থামাতে হয়। তবে ওদের ওই প্রাণবন্ত স্বভাব আমাকে মুগ্ধ করে। খাবারের কাড়াকাড়িতে মানুষের ঝগড়ার মতো বিদ্বেষ বিষ নেই। ঘাট সংলগ্ন অংশে ছোট ছোট অনেক দোকান আছে। পুজোর সামগ্রী, প্রসাদের ঝুড়ি, দেবতাদের ছবিওয়ালা লকেট, চাবির রিং এইসব পাওয়া যায় আর কী! গঙ্গার ধারে অনেক জটাধারী সন্ন্যাসী বাস করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মহাকালের মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত। এঁরা কেউ অঘোরী বলে শুনিনি। দেখেও মনে হয়না। তবে হ্যাঁ, বছরের বিশেষ একটা সময়ে কানপুরে অঘোরীরা আসেন। সে গল্প আমি স্থানীয় মানুষের মুখে শুনেছি। গঙ্গায় জল কম থাকলে চরে নেমে গিয়ে উল্টোদিকে তাকিয়ে দেখলে মনে হয়, যেনো কোনো একটি প্রাচীন দুর্গের কিছুটা অংশ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। লাল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলে একদিকে ব্রহ্মাখুঁটি আর ব্রহ্মার পাদুকা এবং অন্যদিকে মহাকালের মন্দির। মন্দিরটার কারুকাজ বেশ সুন্দর। দর্শনার্থীদের বসার জন্য মন্দির প্রাঙ্গণে লোহার বেঞ্চ পাতা আছে। তবে গঙ্গার অবহেলিত রূপ দেখলে মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। আশা রাখি যে “নির্মল গঙ্গা” অভিযান আমাদের পবিত্র নদীটিকে একদিন ঠিক দূষণমুক্ত আর নির্মল কে তুলবে।

এক ঝলকে বিঠুর

রাজনৈতিক ইতিহাসঃ

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ করে ১৮৫৭ এর সিপাহী বিদ্রোহে বিঠুরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মণিকর্ণিকা অর্থাৎ ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মীবাঈয়ের শৈশব বিঠুরেই কেটেছে। লক্ষ্মীবাঈয়ের পিতা মরুপান্ত তাম্বে বিঠুরের পেশোয়া আদালতে চাকুরী করতেন। বাবা আদালতের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেই লক্ষ্মীবাঈ সেই যুগের নারীদের থেকে অনেক বেশী স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। বিঠুরের মাটিতেই এই বীরাঙ্গনা ঘোড়সওয়ারী, তলোয়ার চালানা, তীরন্দাজি, আর্চারি বিদ্যা, বারুদ তৈরি ও যুদ্ধের নানা কৌশল শিখেছিলেন। তিনি তাঁর সহচরীদের নিয়ে একটি দলও গঠন করেছিলেন। অর্থাৎ নেতৃত্বদানে রাণী লক্ষ্মীবাঈয়ের হাতেখড়ি বিঠুরেই হয়েছিলো। ব্রিটিশ শাসনকালে বিঠুর তদানীন্তন কানপুরেরই অংশ ছিলো। ১৮৫৭ এর ১৯ শে জুলাই জেনারেল হ্যাভলক বিঠুর অধিঃগ্রহণ করেন। সেইসময় নানাসাহেব পেনশন প্রাপ্ত হয়ে একপ্রকার বন্দীদশাতে বিঠুরে বাস করছিলেন। ব্রিটিশ সরকার নানা সাহেবের বিভিন্ন অনুরোধ খারিজ করে দেন। প্রায় একই সময়ে রাণী লক্ষ্মীবাঈয়ের সঙ্গেও ইংরেজ শাসকের মতবিরোধ শুরু হয়। ফলে নানাভাবে ব্রিটিশদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নানাসাহেব, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ একযোগে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পেশোয়াদের আমলের বহু ইমারতের ধ্বংসাবশেষ আজও এখানে বর্তমান। তবে অনেকেই হয়তো জানেননা যে তাতিয়া টোপের পরিবারের বংশধরেরা আজও বিঠুরে বাস করেন।
বিঠুর জনপদের সিংহভাগ বাসিন্দাই হিন্দু ব্রাহ্মণ। মূলতঃ উত্তরপ্রদেশের মানুষের বাসভূমি হলেও এখানে মারাঠী সম্প্রদায়ের মানুষও বাস করেন। নানা সাহেবের পরবর্তী চার পাঁচ পুরুষ বিঠুরে বাস করেছিলেন।

বাল্মীকি আশ্রমঃ

রত্নাকরের দস্যুবৃত্তি ত্যাগ ও মহৎ জীবনের পথে যাত্রা, লব ও কুশের জন্ম, সীতার পাতাল প্রবেশ এবং সর্বোপরি মূল রামায়ণের রচনা ইত্যাদি নানা পৌরাণিক ঘটনার নির্বাক সাক্ষী এই স্থান। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুসারে রাবণ বধের পর, রাম যখন চোদ্দ বছরের বনবাস পর্ব কাটিয়ে অযোধ্যায় ফিরে আসেন এবং তাঁর প্রজাদের মধ্যেই দেবী সীতার সতীত্ব নিয়ে নানা সমালোচনা শুরু হয়, তখন তিনি সীতাকে পরিত্যাগ করেন। সেই সময় সীতা নিজের পিত্রালয়ে ফিরে যাবার পরিবর্তে এই বিঠুরেই মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। আজও সীতাকে এখানে “বনদেবী” বলা হয়ে থাকে। এই আশ্রমেই বনদেবী অর্থাৎ দেবী সীতা লব ও কুশের জন্ম দেন। পরবর্তী সময়ে এই বিঠুরেই মাতা সীতা অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছিলেন। সীতার পাতাল প্রবেশ দ্বারটি চিহ্নিত করার জন্য জায়গাটিকে সিমেন্ট দিয়ে চৌকোনা কূপের মতো বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে পয়সা ও ফুল দিয়ে পূজো দেবার রীতি প্রচলিত। ওই কূপ সংলগ্ন একটি মিনারে গায়ে ফলক খোদাই করে তাতে মূল রামায়ণের কথা লেখা আছে। বাল্মীকি আশ্রম মন্দিরটি গঙ্গা ঘাটের কাছেই অবস্থিত। আশ্রমে যেমন শিবের মূর্তি পুজিত হয়, তেমনি রামচন্দ্রের মূর্তিকেও ভগবান জ্ঞানে পুজো করা হয়।
আবার আশ্রমের একটি অংশে প্রতীকী রান্নাঘরও রয়েছে। মাটি ও পাথরের তৈরি ছোট খাটো বাসন রাখা আছে সেখানে। বছরের পর বছর ধরে অনুমান করা হচ্ছে সীতা মাতা ওইখানেই রন্ধন কার্য করতেন।

ব্রহ্মাবর্ত ঘাটঃ
গঙ্গার পবিত্র ঘাটগুলির মধ্যে পবিত্রতম হলো ব্রহ্মাবর্ত। ব্রহ্মার ভক্তরা গঙ্গাস্নান সেরে উঠে ব্রহ্মদেবের পাদুকার পুজো দেন। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মনুষ্য প্রজাতি সৃষ্টির পূর্বে ব্রহ্মদেব এইখানেই একটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। ভক্তদের বিশ্বাস ব্রহ্মাবর্ত ঘাটে স্বয়ং ব্রহ্মার ঘোড়ার নালটি পোঁতা আছে। অনুমান করা হয় এই ঘাটটিই ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রস্থল। উৎপলারণ্য নামক স্থানটিই পরবর্তীতে ব্রহ্মাবর্ত নামে পরিচিত হয় যা থেকে বিঠুর নামের উৎপত্তি। ব্রহ্মা এইখানে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন। শিব এখানে ব্রহ্মেশ্বর নামে পুজিত হন।

পত্থর ঘাটঃ

আওয়াধের মহারাজ টিকাইত রাই নির্মিত লাল পাথরের ঘাটটি পত্থর ঘাট নামে পরিচিত। এটি সেই আমলের শিল্প কর্মের একটি অপূর্ব নিদর্শন। কষ্টি পাথর দিয়ে তৈরি বিশালায়তন একটি শিবলিঙ্গ এই ঘাটের মূল আকর্ষণ। উত্তরপ্রদেশের নানা গ্রাম থেকে ভক্তরা এই শিবের মাথায় গঙ্গা জল আর দুধ ঢালতে আসেন।

ধ্রুব টিলাঃ

রাজা উত্তানপদের রাজত্বকালে উতপলারণ্যের রাজধানী ছিলো ব্রহ্মাবর্ত। রাজা উত্তানপদের পুত্র ধ্রুব ব্রহ্মদেবকে সন্তুষ্ট করার জন্য দীর্ঘদিন কঠোর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। কথিত আছে, ব্রহ্মদেব সন্তুষ্ট হয়ে ধ্রুবকে কেবলমাত্র দেখাই দেননি, নক্ষত্রলোকের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও পথনির্দেশক নক্ষত্র হিসেবে তিনি ভক্ত ধ্রুবকে নক্ষত্র জগতে স্থান দেন। রাজপুত্র ধ্রুবের তপস্যাস্থলটি আজও “ধ্রুব টিলা” নামে খ্যাত।

ইস্কন মন্দিরঃ

বিঠুর রোডেই ময়নাবতী মার্গে ইন্টারন্যাশানাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণা কনশাসনেস অর্থাৎ ইস্কনের একটি সুদৃশ্য মন্দির রয়েছে। ভ্রমণার্থীদের কাছে সেটিও একটি আকর্ষণ বটে! সুন্দর উদ্যান সম্বলিত মন্দির প্রাঙ্গণ, শ্রীকৃষ্ণের মনোলোভা মূর্তি, ছিমছাম সাদামাটা পরিবেশ, আর সর্বোপরি সুস্বাদু ভোগ মন কেড়ে নেবেই।

সিদ্ধিরাম আশ্রমঃ

বিশ্ব শান্তি মিশনের আধীনস্থ সুধাংশু জ্বী মহারাজ আশ্রমটি সিদ্ধিরাম আশ্রম নামে পরিচিত। আশ্রমের ক্যাম্পাসটি যেমন বড়ো তেমনি সুসজ্জিত। একটি রাধা কৃষ্ণ মন্দির আর কৃত্রিম কৈলাস ট্যুরিস্টদের মন ভরিয়ে দেয়।
এছাড়াও সাইবাবার মন্দির, লব-কুশের মন্দির, রাম জানকী মন্দির, জাহাঙ্গীরের মসজিদ ও নানা সাহেব স্মারক বিঠুরকে একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত করেছে।

কানপুরের বাসিন্দা হবার সূত্রে আমার কাছে বিঠুর শনি কিংবা রবিবার বিকেলের একটু ঘুরে আসার জায়গা। তবে বাইরে থেকে যাঁরা আসবেন তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি, রেলপথ, সড়কপথ অথবা আকাশপথে কানপুর পৌঁছে গেলে বিঠুর একেবারেই পাশের পাড়া। প্রসঙ্গতঃ বলি, ধর্মপ্রাণ বয়স্ক মানুষদের বেড়ানোর জন্য বিঠুর আদর্শ জায়গা।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত