রিভিউ : ব্লু জেসমিন

 

ব্লাক কমেডি ধারার ব্লু জেসমিন দেখলাম। আবাসন কোম্পানির এক মানি ম্যানেজারের স্ত্রীর উপর নির্মীত ছবি। কী অদ্ভূত না? তাও আবার সত্য ঘটনা অবলম্বনে। ঐ মানি ম্যানেজারের ইউ এস পেনালকোডে ২৫০ বছর জেল হয়েছিল প্রতারণার দায়ে। পরে জেলে বসেই সে আত্মহত্যা করে।

তার উন্নাসিক অর্ধশিক্ষীত, সুন্দরী ও বেহিসেবী স্ত্রী জেসমিন পড়ে যায় বিপদে কেননা, সরকার তার স্বামীর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং তার নিজের সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। একরকম রিক্ত অবস্থায় সে আশ্রয় নেয় তার প্রায় গরীব ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ক্যাশিয়ার বোনের বাসায়। লাগামছাড়া খরুচে ধনী জীবনাচারণে অভ্যস্ত প্রায় মধ্যবয়ষ্ক জেসমিনের ঘটনার টানাপোড়েনে  নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়। চ্যাটারবক্স জেসমিন কাউকে পেলে অনবরত কথা বলতে থাকে আবার একা থাকলেও একা একা কথা বলে পাগলের মত। জেসমিনের কথায় বোঝা যায়, সে তার পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে মেনে নেয়নি কিন্তু বাস্তবতার সাথে যখন সে ধাক্কা খায় তখন খেই হারিয়ে ফেলে। সে তার অতীত জীবনাচারণের অবসেশন কোনভাবেই কাটাতে পারেনা, যদিও সে এসব থেকে চায়।

স্বামীর আত্মহত্যার জন্য যখন সৎ ছেলে তাকে দোষারোপ করে, তখন সে নিজেকে ডিফেন্ড করে। সে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়। সে ভাল জবের জন্য চেষ্টা করে বুঝতে পারে তার কোন দক্ষতা নেই, তাই সে নতুন করে স্কুলিং শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আসলে কোনকিছুতেই কাজ হয়না। নতুন জীবন শুরু করার জন্য নতুন প্রেমিকের কাছে সে আবার মিথ্যে বলে। মানে পূর্বকার জীবন যাপনের ফাপা অহংকার, অভ্যাস আর বর্তমান জীবনের দ্বন্দ্বে সে পালিয়ে বাঁচতে চায়। সে যেখানেই যায়, যার কাছেই যায়, সবাই তার স্বভাব ও জীবনাচরণে প্রভাবিত হয় তাদের জীবনও ওলটপালট হয়ে যায়। তবে কাহিনীর ভিজুয়ালাইজেশন বা লেখকের ক্রাফট এমন যে, এতকিছুর পরেও প্রোটাগনিস্ট এর প্রতি দর্শকের সহমর্মীতা জাগতে বাধ্য। কেননা আসলে কাহিনীর টোন কোন ব্যাক্তিগত সমস্যা নয় বরং দুনিয়ার আর্থসামাজিক সেটিংসে যে পার্ভার্শন তৈরি হয়েছে সেদিকে আঙ্গুল তুলেছে। ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় একটি বিধেয় মাত্র, তাই ভালনারেবল জেসমিনের পরিনতির জন্য দর্শকের খারাপ লাগে।

প্রশ্ন জাগছে বিদ্ধস্ত ও বিপর্যস্ত একটি চরিত্র নিয়ে করা একটি ছবি, যার প্রায় প্রতিটি দৃশ্যেই এক অর্ধ উন্মত্ত ও মধ্যবয়ষ্ক বিপর্যস্ত নারীকে দেখা যায়, তাকে কেন দেখেছে দর্শক? বাজেটের পাঁচ গুণেরও বেশি ব্যবসা করা এই ছবি পেয়েছে সমালোচকদেরও অকুন্ঠ প্রশংসা। জিতেছে অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা, ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্পিরিট আ্যওয়ার্ডসহ অনেক পুরষ্কার, সেইসাথে একাধিক ক্যাটাগরিতে নমিনেশনতো আছেই।

এই ছবি দেখার অনেকগুলো কারণের মধ্যে দুটো হল, উডি আ্যলেনের ব্ল্যাক কমেডি আর কেট ব্লাঞ্চেটের অভিনয়। এটা সত্য কেট ব্লাঞ্চেট মানেই দারুন কিছু। অন্তত স্ক্রিপ্ট বা কাহিনী যে লিটারারি মাস্টারপিস ও ইন্টেন্স হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই কেটের যেকোন ছবি চোখ বুজে দেখা যায়। আর জেসমিনের মত এমন কঠিন চরিত্র কেট ব্লাঞ্চেট ছাড়া আর কেউ এতটা নিখুতভাবে করতে পারত কিনা সন্দেহ। একারণেই সে ২০১৪ সালের সমস্ত পুরষ্কার পেয়েছে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে।

মুগ্ধ হয়েছি উডি আ্যলেনে।

কঠোর বাস্তব জটিল ও মানসিক বিকারগ্রস্ত এক মহিলার বিপর্যয়ের কাহিনীকে তিনি উপভোগ্য ও কৌতুহলোদ্দীপক করে তুলেছেন শুধু হিউমার দিয়ে। আর সেই হিউমার কোন ধার করা বা তরল হিউমার না, বাস্তব। শুধু সেখানেই শেষ নয়, এই ছবি দেখার সময় দর্শক হাসলেও শেষ করার পরে দেখা যাবে মাথার মধ্যে অজস্র ভাবনার পোকারা জেগে উঠেছে। পোকা বললাম একারণে যে বাস্তবে ধনী এবং যারা ক্ষমতার অপব্যাবহার করেন তাদের জীবন যে কেমন ফাঁপা ও শূন্যতায় ভরা, তা মনে পরে এছবি দেখে। সবকিছু থেকেও যেকোনসময় নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে তারা। জেসমিনের স্বামীর পরিনতি সেটাই হয়েছে। জেসমিন হয়তো ব্যবসায়িকভাবে কারও সাথে প্রতারণা করেনি, কিন্তু সে নিজের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে। তাই তার পরিনতিও করুন হয়েছে। সে রিক্ত, ভঙ্গুর, ভারসাম্যহীন ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। আধুনিক সমাজের এই শূন্যতার নগ্ন রূপ মননশীল দর্শককে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

এমন Thought provoking কমেডি ড্রামা একযুগে হয়তো একটা হয়। তাই এই ছবি Timeless। এর কৃতিত্ব পুরোটাই কাহিনীকার ও স্ক্রিন প্লে রাইটার উডি আ্যলেনের।

শেকসপিয়র লিখেছিলেন মিড সামার নাইট’স ড্রিম। প্রায় ৫০০ বছর পরে উডি আ্যলেন লিখেছিলেন মিড সামার নাইট’স সেক্স। শেকসপিয়রের ক্লাসিক কমেডি যেমন, উডি আ্যলেনের রিয়েলিস্টিক খুড়ধার হিউমার ও ব্লাক কমেডিও তেমন। এবং একবার সেই হিউমারে ডুবে গেলে, জেগে ওঠা অসম্ভব। তাই তালিকায় তার নাম ওঠালাম। আমার একটা তালিকা আছে, যেখানে এমন সব লেখক, পরিচালক আর শিল্পীদের যুক্ত করি, যাদের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে সারাজীবন ডুবে থাকবো বলে ঠিক করেছি। সেখানে উডি আ্যলেনকেও যুক্ত করে নিলাম।

লেখক, পরিচালক, কমেডিয়ান ও হিউমোরিস্ট (শেষোক্ত শব্দগুলোর বাংলা শব্দার্থ জানালে বাধিত থাকবো) হিসেবে সম্ভবত আমেরিকায় তিনি এখন জীবন্ত কিংবদন্তি। ষাটোধিক বছরের লম্বা ক্যারিয়ার! মানুষ বাঁচেইতো টেনেটুনে ৬০ বছর! তাও আবার কাজের মানে কোন খামতি নেই এই ভদ্রলোকের। বিষ্ময় জাগে এমন প্রতিভা দেখলে আসলে।

তিনবার লেখক ও স্ক্রিন প্লে রাইটার এবং একবার পরিচালক হিসেবে অস্কার জিতেছেন, ঝোলায় আছে আরও অজস্র পুরষ্কার। তার আ্যনিহিল, ম্যানহাটন, মিডনাইট ইন প্যারিস এবং সর্বশেষ ব্লু জেসমিন দেখার পর মনে হচ্ছে, কাহিনীর চরিত্র এবং দর্শকের হৃদয় নিয়ে তিনি আসলে রীতিমত ছেলেখেলা করেন। তার কাছে মানুষের মনস্তত্ব আর কাহিনী হল এটেল মাটির মত, তিনি সেগুলো দিয়ে যেমন খুশি তেমন মূর্তী গড়েন, এবং যা গড়েন তাতে পৃথিবী একটু একটু করে সুন্দর হয় প্রতিদিন।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত