বাংলা নাটকের একাল সেকাল

আখতার হামিদ খান 

বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে প্রথমেই নাটকের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। প্রত্যেক জাতির লোকনাট্য থেকেই তার নাটকের উৎপত্তি এবং বিকাশ লাভ করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে ঘটেছে এর বিপরীত প্রক্রিয়া। অর্থাৎ যাত্রা নাটকের জন্ম দেয়নি বরং নাটকই যাত্রার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের লোকনাট্য থেকে নাটকের জন্ম না হওয়ায় সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি বলে অনেকের ধারণা। আবার অনেকে মনে করে থাকেন ইংরেজি শিক্ষার পরই আমাদের দেশে নাট্য সাহিত্য প্রসার লাভ করেছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন সংস্কৃত নাটক থেকেই আমাদের নাট্যসাহিত্যের উৎপত্তি।

সংস্কৃতি সাহিত্য এ উপমহাদেশে বহু প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। আর্য জাতির সময় থেকেই এখানে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য প্রচলিত। পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার মাঝে ঋগবেদকেই সর্ব প্রাচীন বলে ধরা যায়। সুতরাং বাংলা নাটক সংস্কৃতের দ্বারা প্রভাবিত হোক বা না হোক উৎপত্তির মূল যে সংস্কৃত তা বলতে বাধা কোথায়?

নাট্য সাহিত্যের উৎপত্তি সম্পর্কে ভারতে মুনির নাট্যশাস্ত্রে যে কাহিনীর উল্লেখ আছে, তাহ’ল সৃষ্টির পর ইন্দ্র ব্র্হ্মার নিকট আবেদন করলেন, চক্ষু কর্ণের আনন্দ বিধায়ক এমন একটি উপায় উদ্ভাবন করার জন্যে, যাতে সকলেরই অধিকার থাকবে। তাঁর আবেদন ব্যর্থ হল না। ব্রহ্মা ঋগবেদ হতে বাণী, সামবেদ হতে গীতি, ঋজুবেদ হতে অভিনয় এবং অথর্ব বেদ হতে অনুভূতি ও রস গ্রহণ করে অপর একটি বেদ সৃষ্টি করলেন। এ বেদই পঞ্চম বেদ বা নাট্য বেদ নামে পরিচিত। দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা ব্রহ্মার আদেশে এক নাট্যশালা নির্মাণ করলেন। ভরত ও তার একমত শিষ্যের তত্ত্বাবধানে যে নাট্যশালায় প্রথম নাটক অভিনীত হয়, সে নাটকের বিষয়বস্তু ছিল দেবগণের পরাভব। নহুষ ইন্দ্রপদ লাভ করলে তিনি চাইলেন, এ নাট্যবেদ পৃথিবীতে প্রচারিত হোক। তাই ভরতের সন্তানগণই পৃথিবীতে প্রেরিত হলেন। তদবধি এ নাট্যবেদ পৃথিবীতে প্রচারিত হয়ে আসছে সকল জাতির সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ঋগবেদ। এ ঋগবেদে এমন কতকগুলো যুক্ত আছে যাকে সম্পূর্ণ নাট্য সাহিত্যের প্রথম রূপ বলে ধরে নিতে কোন অসুবিধা নেই এবং এগুলোর সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এগুলো সংবাদ যুক্ত নামে পরিচিত। ঋগবেদের সময়ই স্ত্রী পুরুষগণ উত্তম পোশাকে সজ্জিত হয়ে নৃত্যগীত করতেন। বেদের সম্পর্কে নাটকের বীজ পরিলক্ষিত হয়। রামায়ন মহাভারতে অনেকস্থলেই দেখা যায় পুরোপুরি নাটকীয় ঘটনার সূত্রপাত এবং তা অভিনয়ের জন্য খুবই উপাদেয়। সুতরাং সংস্কৃত নাটক সৃষ্টির মূলে ঋগবেদ, রামায়ন ও মহাভারতের দান অস্বীকার করা যায় না। অনেকে মনে করেন পুতল নাচ থেকে নাট্য সাহিত্যের উৎপত্তি হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন ছায়ানৃত্য থেকেই এর উৎপত্তি।

বাংলা নাটকের উদ্ভব দুইশত বৎসরেরও পূর্বে। পাশ্চাত্য রঙ্গমঞ্চের অনুকরণে বাংলা রঙ্গমঞ্চ স্থাপিত হওয়ার ফলেই বাংলা নাটক বিদেশী নাটকের মৌলধর্ম, অবলম্বন করেই আত্মপ্রকাশ করেছে। সংস্কৃত ও ইংরেজী নাটকের অনুবাদের মধ্যদিয়েই বাংলা নাটকের সূচনা দেখা দিয়েছিল। বাংলা নাটকের এ আবির্ভাবের সময়কালকে আদি, মধ্য ও আধুনিক নামে তিনটি যুগে ভাগ করা যেতে পারে। ১৭৯৫ হতে ১৮৭২ পর্যন্ত “আদি যুগ, ১৮৭৩ হতে ১৯৮০ পর্যন্ত “মধ্যযুগ” এবং ১৯০০  হতে বর্তমান পর্যন্ত “আধুনিক যুগ” বলে ধরে নেয়া যায়।

প্রথমত : ১৭৯৫ খৃষ্টাব্দে রুশদেশীয় লেবেডেক বাংলাদেশে প্রথম যে নাট্যশালা স্থাপন করেন। তাতে অভিনয়ের জন্যে তিনি তার ভাষা শিক্ষক গোলক নাথ দাসের দ্বারা “লাভ ইজ দি বেস্ট ডক্টর” ও “ডিস্গাইস” এর বাংলা অনুবাদ অভিনীত হয়েছিল। লেবেডেকের অভিনয়ের পর ১৮৩৫ খৃ: শ্যাম বাজারের নবীন চন্দ্র বসুর উদ্যোগে “বিদ্যাসুন্দর” নাটকের অভিনয় হয়। এর কিছুকাল পরই বাংলা নাটকের উদ্ভব ঘটে নিজস্ব ধাঁচে।

১৮৯২ খৃ: বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম মৌলিক দু’খানি নাটক “কীর্তিবিলাশ” ও “ভদ্রার্জুন” রচিত হয়। যোগেশ চন্দ্র গুণের “র্কীতিবিলাশ” বিষদাত্মক নাটক আর তারাশংকর শিকদারের “ভদ্রার্জুন” মিলনাত্মক নাটক, উভয় নাটকই পাশ্চাত্য নাট্য রীতির অনুসরণে লিখিত। এর পূর্বে ও পরে বহু অনুবাদ নাটক রচিত হয়েছিল। তার মধ্যে কিছু ইংরেজী নাটক হাতে নেয়া হলেও অধিকাংশই ছিল সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ। অনুবাদ নাট্যকারদের মাঝে হরচন্দ্র ঘোষ। কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪৩-১৮৭৪), রাম-নারায়ণ তর্করতেœর (১৮৫৪-১৮৭৫) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হবচন্দ্র ঘোষের “ভানুমতি চিত্তবিলাশ” ও রোমীয় জুলিয়েটের অনুবাদ, কালী প্রসন্নের অনুদিত নাটক “বিক্রমোর্বশী” (১৮৫৭) ও ”মালতী মাধব” (১৮৫৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তিনি “রতœবলী” (১৮৫৭), “অভিজ্ঞান শকুন্তলা” (১৮৬১), “মালতী” নাটকে প্রাধান্য লাভ করেছিল এবং পাশ্চাত্য ও সংস্কৃত নাট্যরীতির মাঝে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। বাংলা নাটকের উদ্ভবের ক্ষেত্রে মাইকেল মধুসুদন দত্তের আবির্ভাবের পূর্বে বাংলা নাটক এ দু’রীতির টানা পোড়নে পড়ে যায়। কোনটা গ্রহণ করবে তা ঠিক করা একরকম  অসাধ্য হয়ে দেখা দেয়। ১৮৪৫ খৃ: রাম নারায়ন তর্করতœ মহাশয় “কুলীনকুল সর্বাব” নাটক সর্ব প্রথম সমাজ সমস্যামূলক একখানি মৌলিক নাটক রচনা করেন। এরপরে সামাজিক সমস্যা নিয়ে বহু নাটক রচিত হয়।

মাইকেল মধুসূদনই (১৮২৪-৭৩ খৃ:) সংস্কৃত প্রভাব বর্জন করে সর্বপ্রথম নাটক রচনা করেন। তাঁর প্রথম নাটক “শর্মিষ্ঠা” (১৮৫৯) মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে রচিত। তিনি “পদ্মাবতী”, “কৃষ্ণকুমারী” নামে নাটক এবং “একোট বলে সভ্যতা” ও “বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ” দু’খানি সার্থক প্রহসনও রচনা করেন। মাইকেলের পরে দীনবন্ধু মিত্রের (১৮৩০-৭৬ খৃ:) নাম উল্লেখ করতে হয়। তিনিই বাংলা নাটকের যুগশ্রেষ্ঠ নাট্যকার। তাঁর “নীল দর্পন: (১৮৬০) বাংলা নাট্য সাহিত্যে নিঃসন্দেহে সর্বাপেক্ষা আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাটক। এছাড়া আরও অনেক নাট্যকার নাটক রচনা করেছেন। তার মধ্যে মীর মোশাররফ হোসেন, কালীদাস স্যানাল, মতিলাল রায়, হরিমোহন কর্মকার, ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

মীর মোশাররফ হোসেন “বিষাদ সিন্ধু” নামক মহররম বিষয়ক শোকোচ্ছ্বাসপূর্ণ গদ্য রচনার জন্য পরিচিত। কিন্তু তিনি একাধিক বাংলা নাটকও রচনা করেছিলেন। তাঁর সর্ব প্রথম নাট্য রচনা “বসন্ত কুমারী” ১৮৭৩ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। তিনি সংস্কৃত নাটকের অনুসরণে “বসন্তকুমারী” নাটক রচনা করলেও তাঁর সংলাপের ভাষা সংস্কৃত ঘেঁষা ছিল না বরং নিতান্ত সহজ ও সরল ছিল। “জমিদার দর্পণ” নাটকে তাঁর উদারচেতা মনের পরশ পাওয়া যায়। হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির লক্ষ্যে এবং সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করে তিনি যেভাবে “জমিদার দর্পণ” রচনা করেছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়।

মধ্যযুগে বাংলা নাটকে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক নাটকের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। যদিও শেষদিকে কিছু সামাজিক নাটক রচিত হতে দেখা যায়। তবু গীতাভিনয় নিয়েই বাংলা নাট্য সাহিত্যের এ যুগের সূচনা হয়। এবং এত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, কোলকাতার সদ্য প্রতিষ্ঠিত রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ লাভ করে। আদি মধ্যযুগের সন্ধিক্ষণের মনমোহন বসুর (১৮৬৭-১৮৯০  খৃ:) আর্বিভাব। তিনি আদিযুগের প্রভাব না কাটাতে পারলেও যে প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিলক্ষিত হয় তাকে বাংলা নাটকের মধ্যযুগের অগ্রদূত বলে অভিহিত করা যায়। তিনি পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে “রামাভিষেক”, “সতীনাটক”, “হরিশ্চন্দ্র নাটক”, “পার্থপরাজয়” প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নাটক রচনা করেন। তাঁর সামাজিক নাটকের মধ্যে “প্রণয় পরীক্ষার” নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি সর্বশেষ “আনন্দময় নাটক নাগাশ্রমের অভিনয়” নামে একটি প্রহসন রচনা করেন। ব্রাহ্ম সমাজকে আক্রমণের উদ্দেশ্য রচিত বলে এটি কোন দিক দিয়েই রসোত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ যুগের অন্যান্য নাট্যকারদের মাঝে জ্যোতিরিন্দ্র নাম ঠাকুর (১৮৭৫-১৯০০ খৃ:), গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৭৭-১৯১২), অমৃতলাল (১৮৭৫-১৯০০ খৃ:), রাজকৃষ্ণ (১৮৭৫-১৮৯৩) ও অতুলকৃষ্ণ মিত্র (১৮৭৬-১৯০০) প্রভৃতি নাম উল্লেখযোগ্য।

এ যুগের নাট্যকারদের মাঝে একমাত্র গিরীশ চন্দ্র ঘোষই সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তাঁর নাটকে বাংলার কথা সর্বত্র প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি অনেক পৌরাণিক চরতি নাটক। রোমান্টিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটক রচনা করেছেন এবং এর মাঝে প্রহসনও ছিল। গিরীশ চন্দ্র ঘোষ বাংলা পৌরাদিক নাটক রচনায় যে দক্ষতা দেখিয়েছেন তা আর কেউ দেখাতে পারেননি। পৌরাণিক নাটকগুলোর মাঝে রামায়ণের কাহিনী অবলম্বনেই তিনি কয়েকটি নাটক রচনা করেন। তিনি বেশ কয়েকটি চরিত নাটক রচনা করেছেন ভারতীয় মহাপুরুষদের জীবনী অবলম্বনে। তিনি কয়েকটি রোমান্টিক নাটকও রচনা করেন। তার মাঝে “বিষাদ” “মুকুল মঞ্জুরা”, “মনের মতন”, ইত্যাদির নাম উল্লেখ করা যায়। তার সামাজিক নাটকের মাঝে “প্রফুল্ল”, “হারানিধি”, “বলিদান”, “শাস্তি কি শাস্তি” প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার। “কালা পাহাড়”, “রানা-প্রতাপ”, সিরাজদ্দৌলা” প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক নাটক।

উপরোক্ত নাট্যকার ছাড়াও এযুগে বিহারীলাল, অমরেন্দ্র নাথ, শ্যামলাল মুখোপাধ্যায় ও আরো অনেকেই নাটক রচনা করেছেন।

বাংলা নাটকের তৃতীয় যুগ বা আধুনিক যুগ শুরু হয়েছে বিংশ শতাব্দীর আরম্ভকাল থেকে। দ্বীজেন্দ্রলাল (১৮৬০-১৯১৩ খৃ:) থেকেই এ যুগের শুভ সূচনা এবং ঐতিহাসিক নাটকের মধ্যদিয়ে তিনি একসঙ্গে সুগভীর দেশ প্রেম ও বিশ্ব মানবতার আদর্শ প্রচার করেছেন। তাঁর “মেবার পতন”, শাহজাহান”, “চন্দ্রগুপ্ত” প্রভৃতি নাটক আজও জনপ্রিয়তার আসনে সমাসীন। তাঁর প্রহসনগুলোর মাঝে “সমাজ বিভ্রাট”, “কল্কি অবতার”, “পূণর্জন্ম” প্রভৃতি প্রধান। “পাষানী”,“সীতা,” ও “ভীষ্ম” নামে কয়েকটি পৌরাণিক নাটকেরও তিনি রচয়িতা। ক্ষীরোজ প্রসাদ (১৮৬৩-১৯২৭ খৃ:) “পদ্মিনী”, “বঙ্গে রাঠোর”, “আলমগীর”, “আলীবাবা” প্রভৃতি নাটক রচনা করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। এ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) নাট্য রচনায় হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর রচনা ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি বহু গীতি নাট্য, কাব্য নাট্য, কমেডি, সাংকেতিক নাটক, সামাজিক নাটক ও নৃত্য নাট্য রচনা করেন, যা আজও আমাদের নাট্য সাহিত্যে ও নাট্য জগতে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। স্বাধীনতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত আর যারা ঐতিহাসিক নাটক রচনা করে খ্যাতিমান নাট্যকার রূপে পরিচিত হয়েছিলেন তাদের মাঝে মহেন্দ্র গুপ্ত, নিশিকান্ত বসু রায়, মতিলাল বন্দোপাধ্যায়, যোগেশ চৌধুরী, রকেশ গোস্মামী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সামাজিক নাটক রচয়িতাদের মাঝে বিধায়ক ভট্টাচার্য্য, শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, তারা শংকর চট্টোপাধ্যায়, বনফুল, শরবিন্দু জলধর চট্টোপাধ্যায়, যোগেশ চৌধুরী, আয়াকান্ত বংশীর নাম উল্লেখ করা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলা নাট্যজগতে নবনাট্য আন্দোলনের সূচনা হয়। এ সময় তুলসী লাহিড়ী, বিজন ভট্টাচার্য্য, সলিল সেন, দিজেন্দ্র বন্দোপাধ্যায় ছিলেন বিশেষ খ্যাতিমান নাট্যকার, তাছাড়াও কিরণ মিত্র, ছবি বন্দোপাধ্যায়, ধনঞ্জয়ী বৈরাগী, উৎপল দত্ত, উমানাথ ভট্টাবাস্য, বীরু মুখোপাধ্যায়, গিরিশংকর, সোমেন নন্দি, অজিত গঙ্গোপাধ্যায়, রমেন লাহিড়ী, সুনীল দত্ত, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, বাদল কর, প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

আধুনিক কালে নাটক মঞ্চনির্ভর। তাই মঞ্চের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকলে সফল নাটক রচিত হতে পারে না। মঞ্চের দৃশ্য পরিকল্পনা, আলোক সম্পাত, শব্দ সংযোজনা, প্রভৃতি কলাকৌশলের প্রয়োগের মাধ্যমেই নাটক হয়ে উঠে সাবলীল ও প্রাণবন্ত এবং সহৃদয় দর্শকও পায় রস ঘন বিমল আনন্দ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পূর্বে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্থায়ী রঙ্গমঞ্চের অভাবে নাট্য সাহিত্যের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যার জন্যে পেশাদার বা সৌখিন কোন নাট্য সম্প্রদায় গড়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে যে কজন নাট্যকার নাটক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন তাদের মধ্যে শওকত ওসমান, শাহাদাৎ হোসেন, মুনীর চৌধুরী, আবুল ফজল, ইব্রাহীম খান, নুরুল মোমেন, আকবর উদ্দিন, ইব্রাহিম খলিল, গোলাম রহমান, জসীম উদ্দিন প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। সমাজ সচেতন নাট্যকার হিসেবে মুনীর চৌধুরীর কৃতিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁর রচিত “কবর” ও “মানুষ’ দু’টি উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্ম। এদের মধ্যে আসকার ইবনে সাইখ “বিরোধ”, “পদক্ষেপ”, “বিদ্রোহী পদ্মা”, “দুরন্ত ঢেউ” ইত্যাদি নাটক রচনা করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। মুসলিম নাট্যকারদের মাঝে অমিত্রাক্ষর ছন্দে সর্বপ্রথম নাটক রচনা করেন কবি ফররুখ আহমদ।

বর্তমানে বাংলাদেশে ও পশ্চিম বাংলায় (ভারতের) যথাক্রমে ঢাকা ও  কোলকাতাকে কেন্দ্র করেই নাট্য জগতে ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ক্ষীণ ধারা প্রবাহিত থাকলেও তা এতক্ষণে যে, লোকচক্ষুর অন্তরালেই তার পরিসমাপ্তি। তাই বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে ঢাকার কয়েকটি গ্রুপ থিয়েটার কোলকাতা থেকে আমদানী করা নাটক ছাড়াও দেশী কিছু নাটক উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে। পশ্চিম বাংলাতেও দেখা যায় কোলকাতার বিশেষ কয়েকটি গ্রুপই এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধারা বাংলাদেশের মতই জরাজীর্ণ। এর কারণ হয়ত পরিবেশ পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল। ঢাকা ও কলিকাতাতে যেখানে বেশ কিছু নাট্যশালা বা রঙ্গমঞ্চ নির্মিত হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে কিছু দর্শক, সেখানে গ্রামাঞ্চলে এ দুটোরই বেশ অভাব, সুতরাং এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বা নাট্য সাহিত্যের প্রসার ও এ শিল্পকে সর্বজনীন করতে হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর ধারা অক্ষুন্ন রাখতে হবে। আর সর্বোপরি প্রয়োজনে উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা যা এ শিল্পকে উত্তরোত্তর এগিয়ে দেবে প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত