যে জীবন ববিতা’র

আশির দশকের রুপালী সময়ের সোনালী নায়িকা ববিতা। পুরো নাম ফরিদা আক্তার পপি হলেও ববিতা নামেই বেশি পরিচিত । ববিতার জন্ম ১৯৫৩ সালের ৩০ শে জুলাই । বাগেরহাটে জন্ম নেয়া ববিতার পৈতৃক বাড়ি যশোরে। সরকারি চাকুরে বাবা নিজামুদ্দীন আতাউবের চাকরি সূত্রে ববিতার জন্ম বাগেরহাট জেলাতে হলেও তাঁর শৈশব কৈশোর কেটেছে যশোর শহরের সার্কিট হাউজের সামনে রাবেয়া মঞ্জিলে। তিন বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে বড়বোন সুচন্দা চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, বড়ভাই শহীদুল ইসলাম ইলেট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেজভাই ইকবাল ইসলাম বৈমানিক, ছোটবোন গুলশান আখতার চম্পা চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং ছোটভাই ফেরদৌস ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। এছাড়াও অভিনেতা ওমর সানী তাঁর ভাগ্নে এবং অভিনেত্রী মৌসুমী তাঁর ভাগ্নে বউ (ওমর সানীর স্ত্রী) এবং অভিনেতা রিয়াজ তাঁর চাচাত ভাই। চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান তার ভগ্নিপতি।

ববিতার পরিবার একসময় বাগেরহাট থেকে ঢাকার গেন্ডারিয়াতে চলে আসে। তার মা ডাক্তার হওয়ায়, ববিতা চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে।

ববিতার একমাত্র ছেলে অনীক কানাডায় পড়াশোনা করেন, তাই বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি  কানাডায় অবস্থান করেন।

যশোর দাউদ পাবলিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ববিতা। সেখানে অধ্যয়নকালে বড়বোন কোহিনুর আক্তার চাটনীর (সুচন্দা) চলচ্চিত্রে প্রবেশের সূত্রে পরিবার সহ ঢাকায় চলে আসেন। গেন্ডারিয়ার বাড়ীতে শুরু হয় ববিতার দ্বিতীয় কৈশোর।

এখানে তিনি গ্লোরিয়া স্কুলে পড়াশুনা করতেন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারেননি।  তবে, ববিতা ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন। দক্ষতা অর্জন করেন ইংরেজিসহ কয়েকটি বিদেশী ভাষায়। নিজেকে পরিমার্জিত করে তোলেন একজন আদর্শ শিল্পীর মাত্রায়।

সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রাঙ্গণে ববিতার পদচারণা শুরু। ববিতার চলচ্চিত্রে আসা নিয়ে একটি মজাদার গল্প প্রচলিত আছে। তেতাল্লিশের মন্বন্তর এবং তার প্রেক্ষিতে গ্রামীণ বাংলার আর্থ-সামাজিক পটপরিবর্তন ছিলো অশনি সংকেত চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য।

চলচ্চিত্রের প্রাক্কালে সত্যজিত রায়ের নির্দেশে ভারতীয় চিত্রগ্রাহক নিমাই ঘোষ স্বাধীনতার পর ঢাকায় এফডিসিতে আসেন, এবং সেখানে ববিতার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ আলোকচিত্র তুলেন। এর কিছুদিন পর ববিতার বাসায় ভারতীয় হাইকমিশন থেকে প্রাথমিক মনোনয়ণের কথা জানিয়ে  চিঠি আসে। এরপর ববিতা এবং তাঁর বোন সুচন্দা ভারতে যান সত্যজিৎ রায়ের সাথে দেখা করতে। সত্যজিত ববিতাকে দেখে প্রথমে অনেক লাজুক ভেবেছিলেন। তাই ইন্দ্রপুরের স্টুডিওতে তিনি তাকে আবার নানারকম পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সত্যজিত বলেন, “আমি অনেক খুশি, আমি “অনঙ্গ বউ” আজকে পেয়ে গেছি। আমি ভাবতেও পারিনি এই মেয়েটি সেদিনের সেই মেয়েটি। আজকে এই মেয়ে সম্পূর্ণ অন্য মেয়ে। এই আমার অনঙ্গ বউ।” ববিতাও অনেক চাপের মুখে ছিলেন তাকে নেয়া হয় কিনা। এজন্য ভেতরে-ভেতরে অনেক মানত-টানত করে শেষে জানলেন, ছবিটির জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।

ববিতার চলচ্চিত্র জীবনে আসার পেছনে বড়বোন সুচন্দার অনুপ্রেরনা রয়েছে। বড়বোন সুচন্দা অভিনীত জহির রায়হানের সংসার চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে ১৯৬৮ সালে ববিতার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই চলচ্চিত্রে তিনি রাজ্জাক-সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর প্রাথমিক নাম ছিলো “সুবর্ণা”। সে সময় তিনি কলম নামের একটি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছিলেন। জহির রায়হানের জ্বলতে সুরুজ কি নিচে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গিয়েই তার নাম “ববিতা” হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রে নায়িকা চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন । ১৯৬৯ সালের ১৪ই আগস্ট চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় এবং ঐদিন তার মা মারা যান।  অভিনয় জীবনের শুরুতে ভগ্নিপতি জহির রায়হানের পথ প্রদর্শনে চললেও পরে তিনি একাই পথ চলেছেন। ৭০’-এর দশকে শুধুমাত্র অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি গোটা দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।

‘টাকা আনা পাই’ সিনেমাটা ছিল তাঁর জন্য টার্নিং পয়েন্ট যা পরিচালনা করেছিলেন জহির রায়হান। এরপর তিনি নজরুল ইসলামের ‘স্বরলিপি’ সিনেমাতে অভিনয় করেন যা ছিল সুপারহিট সিনেমা।

১৯৭৬ সালে প্রবর্তিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রথম আসরে বাঁদী থেকে বেগম চলচ্চিত্রে একধারে কচুয়ানের মেয়ে, নর্তকী এবং জমিদারের কন্যা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ববিতা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন।

নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত লাঠিয়াল ছবিতে তিনি বানু চরিত্রে অভিনয় করেন। পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং চর দখলের কাহিনী নিয়ে আবর্তিত এই চলচ্চিত্রটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রথম আসরে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে।

পরবর্তীকালে তিনি আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮) ও গোলাপী এখন ঢাকায় (১৯৯৪) ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন।

নয়নমনি ছবিতে নাম চরিত্র মনি ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য তিনি টানা দ্বিতীয়বারের মত শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৭৭ সালের মার্চে মুক্তি পায় চিত্রনায়ক রাজ্জাক পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র অনন্ত প্রেম। এই চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে রাজ্জাক-ববিতার গভীর চুম্বনের একটি দৃশ্য ছিলো যা সেই সময়ে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিল। তবে পরে চুম্বনের দৃশ্য বাদ দিয়ে

চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেয়া হয়। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া অনন্ত প্রেম  চলচ্চিত্রটির জন্যই চিত্রায়িত হয়েছিল ঢাকাই সিনেমার প্রথম চুম্বন দৃশ্য।

একই বছর তিনি ইলিয়াস জাভেদের বিপরীতে ইবনে মিজান পরিচালিত নিশান চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এছাড়া ওই বছরই তিনি কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র অবলম্বনে নির্মিত বসুন্ধরা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ছবিটিতে ববিতার বিপরীতে অভিনয় করেন নবাগত ইলিয়াস কাঞ্চন।একজন চিত্রকরের তার স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা এবং তার সন্তানের প্রতি স্ত্রীর মার্তৃত্ববোধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে ‘ ছবি ‘ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি টানা তৃতীয়বারের মত শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ক্যাটাগরীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ববিতা পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করা শুরু করেন।

১৯৯১ সালে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত পদ্মা মেঘনা যমুনা চলচ্চিত্রে প্রথম পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সেই বছর চলচ্চিত্রটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেয়।

২০০২ সালে বাঙালি গীতিকবি হাছন রাজার জীবনী অবলম্বনে নির্মিত হয় হাছন রাজা চলচ্চিত্র। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ছবিটিতে হাছন রাজার মায়ের ভূমিকায় দেখা যায় ববিতাকে। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে এবং ববিতা শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর জন্য বাচসাস পুরস্কার পান । ২০০৩ সালে চিত্রনায়িকা মৌসুমী পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।এই ছবিতে ববিতাকে দীর্ঘ ১৪ বছর পর রাজ্জাকের বিপরীতে দেখা যায় ।

প্রযোজক হিসেবে ববিতা

১৯৯৬ সালে পোকামাকড়ের ঘর বসতি চলচ্চিত্রটি প্রযোজনার মাধ্যমে প্রযোজক হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন ববিতা। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের পোকামাকড়ের ঘর বসতি নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন আখতারুজ্জামান। ববিতা এই ছবিতে অভিনয়ও করেন। তার বিপরীতে ছিলেন খালেদ খান এবং খলচরিত্রে অভিনয় করেন আলমগীর। ছবিটির জন্য ববিতা প্রযোজক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ছবিটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ আরও তিনটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে।

প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র অঙ্গনে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন ববিতা। আর্ট ফ্লিম দিয়ে ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক ছবিতেও সমান সফল তিনি। ক্যারিয়ারের একসময় পুরোপুরি বাণিজ্যিক ঘরানার ছবির দিকে ঝুঁকে পড়েন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ববিতা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। নায়িকা হিসেবে তাঁর স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষণীয় ছিল। অভিনয়, গ্ল্যামার, স্কিন পার্সোনালিটি, নৃত্য কুশলতা সবকিছুতেই তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন।

গ্রামীণ, শহুরে চরিত্র কিংবা সামাজিক অ্যাকশন অথবা পোশাকী সব ধরনের ছবিতেই ববিতার সাবলীল অভিনয় দর্শক ও বোদ্ধামহলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্বাধীনতার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। স্বর্ণালী সিনেমার রুপালী সময়ে ফ্যাশন সচেতন শহুরে মেয়েদের দারুনভাবে প্রভাবিত করেন তিনি।

নগর জীবনের আভিজাত্য তার অভিনয়ে ধরা পড়েছিল। সত্তর দশকের প্রথমার্ধে রুচিশীল, সামাজিক সিনেমা মানেই ছিল ববিতার সিনেমা।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত