সত্যজিৎ রায়ের ব্যাচেলার ব্যোমকেশ


সোমনাথ রায়


 

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিড়িয়াখানা’র চিত্রায়ণে শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়েছিলেন সত্যজিত্‍ রায়৷ গল্পে নেই, এমন ঘটনাও ছবিতে দেখান তিনি, কখনও বাজেট কমাতে, কখনও তাঁর নিরীক্ষণের যুক্তিতে৷





সত্যজিত্‍ রায়ের কয়েকজন সহকারী পরিচালক (রমেশ সেন, অমিয় সান্যাল প্রভৃতি) মিলে স্বাধীনভাবে একটি ছবি পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন৷ শুধু পরিচালনাই নয়৷ ছবি প্রযোজনার উদ্যোগটিও তাঁরা নিয়েছিলেন এবং স্টার প্রোডাকশনস নামে একটি প্রযোজনা সংস্থাও তাঁরা এই উদ্দেশ্যে তৈরি করে ফেলেন৷

‘নায়ক’ ছবির শুটিং চলাকালীন-ই এঁরা উত্তমকুমারকে রাজি করিয়ে ফেলেছিলেন তাঁদের প্রযোজিত কোনও ছবিতে কম পারিশ্রমিকে কাজ করার জন্য৷ উত্তমকুমার রাজি হয়েছিলেন একটি শর্তে যে ছবিটি পরিচালনা করবেন সত্যজিত্‍ রায়৷ প্রাথমিকভাবে সত্যজিত্‍ পরিচালনা করতে রাজি হননি৷ কিন্তু সহকারীদের আর্থিক সংস্থানের কথা ভেবে ছবির চিত্রনাট্য লিখে দিতে রাজি হয়ে যান এবং সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বও তিনি গ্রহণ করেন৷ গল্প ঠিক হয় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ব্যোমকেশ কাহিনি- ‘চিড়িয়াখানা’৷ ঠিক হল সত্যজিতেরই ঠিক করে দেওয়া ‘নায়ক গোষ্ঠীর’ নামের আড়ালে সহকারীরা ছবিটি পরিচালনা করবেন৷
শুটিং শুরু হওয়ার দিন সত্যজিত্‍ সেটে গিয়েছিলেন সহকারীরা কেমন কাজ করছে সেটা দেখতে৷ তাঁকে সেটে দেখে সহকারীরা হাতে চাঁদ পেলেন৷ সবাই মিলে সত্যজিত্‍কে অনুরোধ করেন ছবিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিতে৷ সত্যজিত্‍ও ছবিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়ে যান৷ এই হল সলতে পাকানোর ইতিহাস৷

বিভূতিভূষণের গল্প যেমন সত্যজিত্‍ রায়ের হাত দিয়েই প্রথম চিত্রায়িত হয়েছিল তেমনই ব্যোমকেশ কাহিনিও প্রথম চিত্রায়িত হয় সত্যজিত্‍ রায়ের হাতে৷ মূল উপন্যাসে কাহিনির সময়কাল ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হবার ঠিক পরে এবং ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ঠিক আগের মধ্যবর্তী এক সময়৷ কিন্তু ব্যয় সংকোচের কারণে সেই সময়কালকে আরও উনিশ-কুড়ি বছর এগিয়ে আনা হয়, যখন শহরতলির যাত্রীদের জন্য সদ্য লোকাল ট্রেন-(ইএমইউ কোচ)-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ বাংলা ছবিতে এই প্রথম ইএমইউ কোচ ইলেকট্রিক ট্রেন দেখানো হয়েছিল৷

এই ছবির জন্য চিত্রনাট্যটি যখন সত্যজিত্‍ রায় লেখেন তখন বাংলা সাহিত্যে ফেলুদা সদ্য এসেছে ফেলুকে যে আজীবন কুমার থাকতে হবে সেটাও তিনি মনে মনে ভেবে নিয়েছিলেন৷ তাই বিনা কারণেই গল্পের শরদিন্দু বর্ণিত বিবাহিত ব্যোমকেশ এবং কুমার অজিতকে তিনি ছবিতে কুমার ব্যোমকেশ এবং বিবাহিত অজিত রূপে হাজির করেন৷ এর স্বপক্ষে ছবিতে সত্যজিত্‍ যুক্তি খাড়া করেন৷ অবিবাহিত বলেই তদন্তের প্রয়োজনে ব্যোমকেশ হুট বলতে কোথাও বেরিয়ে পড়তে পারেন৷ কিন্তু অজিতের পক্ষে সেটা সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না- বিবাহিত হবার কারণে৷ জমাট চিত্রনাট্যটিই ছবির মূল চালিকাশক্তি৷ এই ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয় এবং ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিতেও তাঁর অসামান্য অভিনয় একত্রে উত্তমকুমারকে সেই বছরের জাতীয় স্তরে সেরা অভিনেতার ‘ভরত’ পুরস্কার এনে দিয়েছিল৷ সেই বছর থেকেই সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার ‘ভরত পুরস্কার’ দেওয়া শুরু হয়েছিল৷

চিত্রনাট্যটির প্রধান গুণ হল এর গতি৷ শেষে অপরাধী নির্ধারণের দীর্ঘ কথোপকথনের দৃশ্যেও সেই গতি রুদ্ধ হয়নি৷
চিত্রনাট্যের গোড়াতেই সাপ নিয়ে অজিতের বিড়ম্বনাটুকু উপভোগ করে ব্যোমকেশ, তার পরামর্শ চায় পোষ্য সাপটির নামকরণের ব্যাপারে৷ ব্যোমকেশ নিজেই ‘বাসুকী’ নামকরণ করার পরই অজিত পরামর্শ দেয় ‘ডুন্ডুভি’ নামটি রাখতে৷ ‘ডুন্ডুভ’ শব্দটির অর্থ ঢোঁড়া সাপ- যা বিষহীন৷ ব্যোমকেশ-এর পোষ্যটি যে সাপ-এর মূল অস্ত্র থেকে বঞ্চিত সেই দিকে কটাক্ষ করে অজিত তার সদ্য প্রাপ্ত বিড়ম্বনাটুকুর এক মধুর প্রতিশোধ নেয়৷

শরদিন্দু সৃষ্ট ব্যোমকেশের চরিত্রে অজিতের অস্বস্তি ঘটিয়ে অযথা বিড়ম্বনায় ফেলার এই বৈশিষ্ট্যটুক ছিল না৷ এটা বোধহয় চলচ্চিত্র বানানোর সত্যজিতিয় স্বাধীনতা৷ দ্বিতীয় যে ঘটনায় সত্যজিতের কৌতুকবোধের পরিচয় পাওয়া যায় সেটা হল যখন গোলাপ কলোনিটা ঘুরিয়ে দেখানোর সময় নিশানাথ জাপানি ব্যোমকেশ ও ছদ্মবেশী অজিতকে নিয়ে গোশালার সামনে এসে দাঁড়ান৷ নিশানাথ সম্ভবত গোশালার ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়ে ছদ্মবেশী অজিতকে গরুগুলি দেখিয়ে মজা করে বলেন, Our Holy Cows৷ অজিতও গরুগুলি ব্যোমকেশকে দেখিয়ে ছদ্ম জাপানিতে বলে ওঠে ‘গো মোতো, গো মোতো৷’ যা জাপানি সাজা ব্যোমকেশকেও কিছুটা বিব্রত করে তোলে৷ তাই ব্যোমকেশও শুধু ঘাড় নাড়ার পরিবর্তে নিজেও বলে ওঠে ‘গো মোতো’৷ সত্যজিত্‍ রায়ের ব্যঙ্গকৌতুকের তৃতীয় নমুনাটাও আমরা পাই অজিতকে নিয়েই৷ অজিত খালি ঘরে ইজিচেয়ারে বসে একটা ইংরেজি বই পড়ছে৷ সেই সময়ে ব্যোমকেশ কাবুলিওয়ালা সেজে ভুজঙ্গ ডাক্তারের পিছন পিছন তাকে অনুসরণ করছে৷ অজিত বইটা মুড়ে একটা হাই তোলে৷ বইটা মুড়তে আমরা তার নাম দেখতে পাই- Best Horror Stories৷ বইটা মুড়ে আনমনে ডানদিকে ঘাড় ঘোরাতেই তার কঙ্কালটির দিকে চোখ যায়৷ সে অস্বস্তিতে পড়ে৷ বাঁদিকে ঘাড় ঘোরাতেই তার চোখ যায় খাঁচায় রাখা পাইথন সাপটির দিকে৷ দেখা গেল মৃতের কঙ্কাল দেখে যে অস্বস্তি অজিত পেয়েছিল জীবিত সাপটিকে দেখেও তার থেকে কম কিছু অস্বস্তি হচ্ছে না৷ এই ডবল অস্বস্তি কাটাতে অজিত আবার Horror Stories বইটিতেই মনোনিবেশ করে৷

এ ছবিতে সত্যজিতের সেন্স অব হিউমারের সেরা পরিচয়টা আমরা পাই একেবারে ছবির শেষে গিয়ে৷ অপরাধী চিহ্নিতকরণের দিন সবাই নিশানাথবাবুর বসার ঘরে একত্রিত হয়েছেন৷ ব্যোমকেশ একে একে সেই পুরনো গল্পগুলি এবং সুনয়না দেবীর গাওয়া ‘ভালবাসার তুমি কি জানো’ ইত্যাদি শুনিয়ে এবং নানা প্রশ্নের মাধ্যমে ড. ভুজঙ্গধরকে কোণঠাসা করে তার অপরাধ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে তখন ভুজঙ্গডাক্তার তার এত নিখুঁত এবং প্রায় প্রমাণহীন অপরাধ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে এবং উত্তেজনায় ঘেমে নেয়ে একসা এবং পকেট হাতড়িয়ে রুমাল পাচ্ছেন না তখন পাশে বসা নেপালবাবু, যিনি ভুজঙ্গ ডাক্তারকে একেবারেই পছন্দ করেন না, তাঁকে রুমালটি বাড়িয়ে দেন মুখের ঘাম মোছার জন্য এবং ঘাম মোছা হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় কেড়েই রুমালটি ডাক্তারের কাছ থেকে ফেরত নিয়ে নেন৷ তাঁর কোথাও হয়তো মনে হয়ে থাকবে ডাক্তারের অপরাধপ্রবণ মন হয়তো রুমালটি হাতিয়ে নেবার লোভটিও সামলাতে পারবে না৷

সদ্য চালু হওয়া (শিয়ালদা-বনগাঁ লাইনে ১৯৬৪) ইলেকট্রিক ট্রেন বা লোকাল ট্রেন (ইএমইউ কোচ)৷ ব্যোমকেশ-এর কাবুলিওয়ালা ছদ্মবেশ ধারণ করা ছিল সত্যজিত্‍ রায়ের চমত্‍কার নিরীক্ষণ ক্ষমতার আর একটি নমুনা৷ এদের দেখলেই ঋণগ্রহীতারা সুদের (বা আসল) টাকা জোগাড় করতে না পারার এবং লোকলজ্জার ভয়ে গা ঢাকা দিত৷ এবং কাবুলিওয়ালারাও সেই লোকটির বাড়ির আশেপাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে৷ যে কারণে ডাক্তারের বাড়ির সামনে কাবুলিওয়ালাবেশী উত্তমকুমারকে দেখে প্রতিবেশীদের মায় স্বয়ং ডাক্তারেরও কোনও অস্বাভাবিক ঠেকেনি৷

চিত্রনাট্যে সবচেয়ে বড়ো ইমপ্রোভাইজেশন যা সত্যজিত্‍ রায় করেছিলেন সেটা হচ্ছে অপরাধী এবং গোয়েন্দা দু’জনেরই কার্যসিদ্ধির জন্য পোর্টেবল টেপরেকর্ডার ব্যবহার করা দেখানো- যা মূল গল্পে ছিল না৷ পিকচার গ্যালারির ব্যাপারটিও সত্যজিত্‍ রায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত এবং বলাই বাহুল্য বাংলা ছবিতে অভিনব ছিল৷ গোলাপ কলোনির সব অধিবাসীকেই সম্ভাব্য অপরাধী ধরে তাদের প্রত্যেকের ছবি দিয়ে একটি গ্যালারি তৈরি করেছিল ব্যোমকেশ৷ বিশেষত, ডিটেকশনের যে অংশটুকু চার দেওয়ালের মধ্যে করতে হয় তা গোয়েন্দারা সাধারণত নীরবেই করে থাকেন এবং সেখানে দর্শকদের সংযুক্ত করার কোনও সুযোগই থাকে না৷ কিন্তু এই পিকচার গ্যালারির মাধ্যমে পরিচালক শুধু দর্শকদেরই সংযুক্ত করেননি, গোয়েন্দার সহকারীকে পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ করে তুলতে পেরেছিলেন৷

পিকচার গ্যালারিতে যে কয়জন সম্ভাব্য অপরাধীর ছবি টাঙানো ছিল, তার সবই তুলেছিল ব্যোমকেশ৷ তাদের অজান্তে নয়৷ কিন্তু বনলক্ষ্মীর ছবি যে ব্যোমকেশ কখন তুলেছিল সেটা ছবিতে দেখানো হয়নি৷ অথচ বনলক্ষ্মীর ছবি তো পিকচার গ্যালারিতে ছিল৷ তা হলে? এই ঘটনাটি কোথাও যেন গোলাপ কলোনিতে বনলক্ষ্মীর পরিচয় লুকিয়ে থাকার ব্যাপারটিকে ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিল৷ ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে ব্যবহূত একটি মাত্র গান- ‘ভালবাসার তুমি কি জানো’-এর কথা একটু বলি৷ ছবিতে দেখানো হয়েছে যে ১৯৫৮ সালে জি কে প্রোডাকশনের ‘বিষবৃক্ষ’ ছবিতে কমলমণির লিপে গানটি ছিল (ছবির মধ্যে ছবি)৷ এই গানটির সূত্র ধরেই তদন্ত শুরু করেছিল ব্যোমকেশ৷ গানটির গীতিকার ও সুরকার বলাই বাহুল্য সত্যজিত্‍ রায়৷

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত