স্মরণ: অপ্রকাশিত দশটি কবিতা । অমিতাভ পাল

Reading Time: 3 minutes০৫ ডিসেম্বর কবি, কথাসাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী অমিতাভ পালের শুভ জন্মতিথিতে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
 
তোমাকে নিয়ে আপাতত
 
 
 
 
১.
 
বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো তোমাকে দেখছিলাম-
কোনঠাসা সতর্ক আর
দাঁত নখ নিয়ে লাফিয়ে পড়তে চাওয়া একটা আক্রমণাত্মক 
বিড়ালের মতো
বাইরের পৃথিবীটা যেন বিরাট একটা কুকুর
তোমাকে দেখলেই যে তেড়ে যায়-
আমি ঠিক ওই কুকুরটার মতো
তোমার সঙ্গে আমার আবহমান কালের ঝগড়া আর মিল
 
আমরা দুজনেই গৃহপালিত
 
 
 
 
২.
 
হায়! তোমাকে না চেনার দিনগুলি যে কোথায় হারালো
 
তখন তুমি ছিলে একটা না দেখা দূর্গের উঠানের মতো
আর আমার সাধারণ চোখ দূরের গ্রামবাসীর মতো
তোমাকে নিয়ে কতকিছুই না ভাবতো
প্রবেশাধিকার বঞ্চিত আমার ছিল চরমতম
হাহুতাশের জ্বালা
 
এখন ঘর সংসারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমি দূর্গাধিপতির মতো
জেনে গেছি তুমিও ঠিক আমার মতোই মানুষ 
দেবতাদের অগম্য রহস্য হিসাবে তোমার পরিচিতি
আসলে একটা বানানো কথার কথা
 
দূরত্বই রহস্যের প্রাণ
 
 
 
 
৩.
 
সামাজিক নিয়ম মোতাবেক দুই ধরণের তুমির সঙ্গে
 
দেখা হয় আমার
 
একজন ঘরের লোক আর অন্যজন দূরের
 
ঘরের তুমি আমার নিজের রাজত্ব
 
যখন তখন এই রাজত্বের যেকোন জায়গায় আমি যেতে পারি স্বচ্ছন্দে
 
পছন্দের প্রধানমন্ত্রীর মতো সেইসব জায়গায়
 
আমি জনসভা করলেই
 
সমর্থনের জনসমাগমে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়
 
ব্যানারগুলি হাসতে থাকে
 
আবেগের বেলুন ফেটে ছড়িয়ে পড়ে 
 
আমাকে গ্রহণ করবার আনন্দে
 
আর আমিও জনপ্রিয়তার বন্যায় ভেসে যেতে যেতে
 
নিজেকে সমর্পন করি গভীর আলিঙ্গনে
 
 
 
 
 
 
 
এইবার ধরো অপরিচিত আর দূরের তোমার কথা
 
এই তুমি বড়জোর আমার পাশে বসতে পারো
 
একটা প্রতিবেশী দেশের মতো
 
এইসব ক্ষেত্রে তোমার শরীরের সাথে আমার ছোঁয়া লাগলেই
 
অভিযোগ ওঠে আকাশসীমা লঙ্ঘনের
 
জাতিসঙ্ঘে জরুরি সভা বসে
 
কেউ বলে অবরোধের কথা
 
কারো মুখে সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তাব
 
একটা অনিশ্চিত ও উৎকণ্ঠায় ভরা ভবিষ্যতের আশংকায়
 
তখন আমার যা তা অবস্থা
 
আর আমি ভাবতে থাকি একই মাটির পৃথিবীতে
 
একটা পেন্সিলে আঁকা সীমান্তরেখা 
 
কতই না ভয়ংকর
 
 
 
 
 
 
 
তুমি আর আমি গভীরভাবে আটকে গেছি
 
একটা টেবিল গেইমের ফাঁদে
 
আমাদের নিজের কোন ইচ্ছা নেই
 
 
 
 
 
 
 
৪.
 
পৃথিবীর যেকোন জায়গাতেই কিছু না কিছু দেখার আছে
অবিকল তোমার শরীরের মতো
আর তাই বিছানাতেই আমি পৃথিবী দর্শন করি
আমার যাবতীয় ভ্রমণ তোমার পরিসীমা পর্যন্ত
 
আমার ট্রাভেল ট্যাক্সের নাম প্রেম
 
 
 
 
 
 
 
৫.
 
অফিস ফেরতা বাসে তুমি আর আমি পাশাপাশি 
সিটে বসে এলাম
আমরা ছিলাম দুটি অচেনা ভাষার দুই দূর্বোধ্য শব্দের মতো দূরে
শুধু আমাদের দুই কাঁধ মাঝেমাঝে পরস্পরকে
ছুঁয়ে দিচ্ছিল এমন একটা হাইফেনের মতো
যা তৈরি করতে পারে নতুন শব্দবন্ধ
অর্থের নতুনতর মোহ
আর এভাবেই সারাটা রাস্তা আমরা পার হয়ে এলাম
নতুনের গন্ধে বিভোর হয়ে
 
তারপর যাত্রা শেষ হওয়ার পরে 
আবার আমরা ফিরে গেলাম নিজের নিজের ভাষায়
আর আমাদের বাসা 
দরজা খুলে দিল আমাদের নিজেদের ডিকশনারির 
পবিত্র মলাটের মতো
 
এখন আমরা শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছি আমাদের পরিচিত অর্থে
পরিচিত উ চ্চারণে
আমাদের কোথাও কোন সংশয় নেই
 
 
 
 
 
 
 
৬.
 
তুমি আর আমি
কিন্তু আমরা কে
আমি আমার সমস্ত পোশাক খুলে দেখেছি
আমার কঙ্কালের শরীরে মেরুদন্ডের জায়গায়
একটা কোমল লতা ঝুলছে
না না এখনি হেসো না
আমিওতো তোমাকে নগ্ন দেখেছি যৌনতার কালে
তুমিওতো একটা জেলির মতোই থকথকে
যেকোন পাত্রের আকারে নিজেকে সাজাতে
তোমার কোন সময়ই লাগেনা
আর এরজন্যই আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরতে পারি
আমাদের কোন আড়ষ্ঠতা নেই
 
তুমি আর আমি
রিজিড হলে কি আমাদের চলে
 
আমরা বেঁচে আছি নম্রতার কৌশলে
 
 
 
 
 
 
 
৭.
 
মেয়েটা কাছে এসে দাঁড়ালো
সাথেসাথেই আমার প্রাণে বইলো প্রেমের তুফান
আমার হাতে ছিল দিকবিদিক ছুটে চলার বৈঠা
আর পায়ে রোলার স্কেট
অথচ সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে
আমি হয়ে গেলাম একটা প্রেমের সমাধি
 
মানুষের শেষ গন্তব্য আরেকজন মানুষ
 
 
 
 
 
 
 
৮.
 
মেয়েদের চোখ রাস্তার কুকুরগুলির চোখের মতো নড়বড়ে 
আমি যতবার ওদের চোখে স্পষ্টভাবে চাই
ততবারই ওরা একটু তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নেয়
ফলে চোখের ঝিলে আমার আর ডুবুরী হয়ে নামাই হয়না
হাস্যোজ্জ্বল মুক্তা কখন পাবো
 
চোখের জলকেই মুক্তা বলে চালিয়ে দিচ্ছে
মেয়েদের দল
 
 
 
 
 
 
 
৯.
 
তুমিই আমার শারীরিকতার বোধ
আর আমি তোমার
তাই আমরা পরস্পরের ঘামের গন্ধ সহ্য করতে পারি
ত্বকের সীমান্তে বসাতে পারি আড্ডাবাজ চায়ের দোকান
যেখানে আমরা নিয়মিত পতাকা বৈঠক করি
সকল সংঘর্ষ শেষে
 
তুমি আর আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রতিবেশী
 
 
 
 
 
 
 
১০.
 
তোমারতো গ্রহণের রীতি- আমার দেবার
তোমার আমার সাথে দেখা হয় তাই বারবার
পৃথিবীর সব ঘাটে সব প্রেমে সব আলিঙ্গনে
তোমার আমার বাসা আমাদের কল্পনায় মনে
সেখানে সংসার করি আমাদের যুগ্ম বাসায়
রতির ভীষণ ঘোরে আমাদের দিন কেটে যায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>