আবারও মুগ্ধ হলাম- ‘বয়ান’ পাঠে

 শীতঘরে ঘুমোচ্ছিল আমার খাতা কলম, আড়মোড়া ভাঙল বসন্ত বাতাসে। ধুলোর আস্তরণ কেবল ফুঁ দিলেই যায় না, অনেক সময় ঘষেমেজে সাফ করতে হয়। সম্পাদক অমিতা চক্রবর্তীর গল্প পত্রিকা “বয়ান” আমায় কলম ধরতে বাধ্য করল।

 

তিন বৈঠকে বয়ান-১৪তম সংখ্যা (জানুয়ারি-মার্চ ২০১৯) পড়ে শেষ করলাম। পাঠক বাধ্য নয় যে একটা বই এক বসায় পড়তে হবে, বা পড়বে। কিন্তু যখন বইয়ের লেখা ভালো হবে তখন পাঠক সব কাজকর্ম ভুলে বইয়ের পাতায় ডুব দেবে। বয়ানের প্রধান বৈশিষ্ট্য- এখানে ঠাঁই নেওয়া প্রতিটি গল্প একটা আরেকটার চেয়ে ভালো। বয়ানের প্রতিটি সংখ্যা এমন ভালোর ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। আমরা প্রায় একটা কথা বলি, ভালো গল্পের অভাব, অভাব ভালো গল্পকারের। কিন্তু ‘বয়ান’ পড়ার সময় অমনটি মনে হয় না। তখন আরেকটি কথা মনে ভাসে- এই লেখকরা প্রচারের আলোয় নেই কেন?

তাহলে কারা প্রচারের আলোয় থাকে সারা বছর? কাদের গল্প সাহিত্যপাতা, ম্যাগাজিনের পাতা ভরে থাকে, কারা মিডিয়া দখল করে আছে? কারা মিডিয়ার স্নেহ ও দোয়া পায়? যারা প্রচারের আলোয় নেই, তাদের বলি- জানেন তো, ভালোর প্রচার কম, ভালো কদর কম হয়। তবে এই ‘কম-ই’ খাঁটি এবং অকৃত্রিম। আবার জানবেন, সব কলম কেবল মিথ্যের ঝুঁড়ি-ই ভরে না, কেউ কেউ সত্যর জয়গান গেয়ে যায় নিরবে…!

জাহিদুল মাসুদ। ‘ডাকাত’ গল্পের লেখক। এ-প্লাস একটা গল্প। লেখাটা পড়তে আরাম লেগেছে। মেদহীন। প্রকৃতির বর্ণনাও সুন্দর ছিল। গল্পের শেষে ইকবালের পাথর হওয়াটা ভালো লেগেছে। তারপর দুজনের হেঁটে যাওয়ার বর্ণনাও দারুণ দারুণ ছিল। গল্পের পরিসমাপ্তি আমার মন যা চাচ্ছিল তা হলেও ভালো লাগত। তবে গল্পে দুজন যেভাবে হেঁটে গেল তা বুকে লাগে, তবু তা ভালো লাগল।

আরেকটা এ-প্লাস গল্প “ছায়ার বিদায়”। লেখক আনোয়ার পাশাকে বলতে চাই- খুব সুন্দর, অন্যরকম একটা গল্প পড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। মন ভরে গেছে। যদি গল্পের শেষটায় মন বিষাদে ভরে উঠেছিল।

বীথি চৌধুরীর “এখানে গ্রহণের কাল” গল্পটিও এ-প্লাস গল্প। পাক্কা লেখকের পাক্কা গল্প। গল্প বলার ধরণটা ভালো লেগেছে। স্থানীয় ভাষায় সংলাপগুলো উপভোগ্য ও আন্তরিক, মানুষ ও জীবনের কাছাকাছি। লেখকের কাছ থেকে নিয়মিত গল্প পাবো- সে প্রত্যাশা।

‘রক্ত থেরাপি’। মনি হায়দার। পরিচিত নাম। সুলেখক। সহজ ভাষায়। তরতরে লেখা। তবে সাধারণের বলা আর লেখকের বলার মধ্যে সুক্ষ্ম একটা তফাত অবশ্যই থাকবে। যা এখানে খামতি আছে বলে আমার পাঠক মন বলল। গল্পের থিম, গল্পের শুরু আর শেষটা চমকপ্রদ।

গল্প “একটি ঘটনা ও তার পরস্পরা”। লেখক শামসুল কিবরিয়া। চিরচেনা বিষয়ের ওপর গল্প। এমন বিষয়ের গল্প আর কত পড়তে হবে আমাদের? প্রশ্নটা রাখছি সবার কাছে? আমার তো আর ভালো লাগে না। স্টপ, প্লিজ স্টপ। আমি লেখকের দোষ দেখছি না। আমার ক্ষোভটা প্রকাশ করলাম সমাজের উদাসিনতার দিকে, রাষ্ট্রের দিকে। রিতার কষ্টটা আমাদেরও। পাঠক মনেরও। ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। গল্পের শুরুর পরই আন্দাজ করে নিয়েছি ‘ঘটনা’। আন্দাজ ভুল হয়নি। লেখক একটা ঘটনার যে যে চিত্র আমাদের দেখাতে চেয়েছেন তা আমরা প্রথমেই বুঝে যাই। বিস্তারিত দৃশ্যের আর প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। কোথায় আড়াল করবেন আর কোথায় প্রকাশ করবেন তা লেখককেই বুঝতে হয়। পরিমিতবোধ লেখকদের বেশি থাকবে।

সাম্য রাইয়ান এর “অভিসার” মোটেও মনে ধরেনি। হয়ত অন্য আরেকজন পাঠকের কাছে এ গল্পটি চমৎকার বা সেরা মনে হতে পারে। পাঠকভেদে ভালো লাগার রকমফের হয়। লেখকের আরও লেখা পড়ার অপেক্ষা করবো।

সায়মা খাতুন এর “তফুরা” গল্পটিও মোটের ওপর ভালো লেগেছে। লেখকের চেষ্টা ছিল। এরপর শিবশঙ্কর পাল এর ‘পতঙ্গজীবন’ যাপিতজীবনেরর গল্প, সহজ, সরল, সুন্দর গল্প। এরকম জীবন আমরা অনেক দেখতে পাই, আবার অনেক গল্প আড়ালে থেকে যায়। গল্পের প্রদীপ আর অর্পনাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। ওরা আমাদের খুব কাছের মানুষ। লেখককে ধন্যবাদ।

১৬টি গল্প। আস্ত একটি বই পাঠের আনন্দ উপহার দিয়েছে। বয়ানের চেষ্টার ফল বলতে পারি। সেক্ষেত্রে “বয়ান” সফল ও সার্থক। পাঠকের প্রতি সবিনয় নিবেদন- ‘বই কিনুন। বই পড়ুন। বই উপহার দিন’। আবারও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ‘বয়ান’ সম্পাদক অমিতা চক্রবর্ত্তীকে। যদিও তা তার জন্য খুব কম হয়ে যায়। বিজ্ঞাপনহীন এমন একটা পত্রিকা বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। তার এই সাহস, পরিশ্রম সার্থক-সফল হোক। পাশাপাশি ‘বয়ান’-র সঙ্গে জড়িত সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।

‘বইয়ের আলোয় আলোকিত হোক মানুষের মন।’

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত