বয়স 36

আকাশে পূর্ণিমার জোয়ার। ঝুম ঝুম করে ঝরে পড়ছে জোৎস্নার আলো। তারই নিচে অজস্র ধারায় যেন স্নান করে চলেছে নিরালা। তার শরীরে বিন্দু বিন্দু করে জ্বলে উঠছে ম্লান নক্ষত্র আলো। শিরশিরে কাঁপন তুলছে রক্তে স্নায়ুতে তুখোর। আশ্বিনের এই হালকা শীত শীত আমেজে মন কেমন কেমন করে। মধ্য প্রহরে পা দিতে চলেছে রাত। নিরালা একা বসে ঝুলানো বারান্দার ইজি চেয়ারটাতে। নিচতলার বাড়ির সামনে একটা শিউলি ফুলের গাছ। প্রায় দোতলা অবধি উঠে এসেছে তার ডালপালা। গাছটি যেন এই রাতের প্রহরে প্রহরে একটু একটু করে মেলে ধরছে শরীর। ফুটে উঠছে একটি দুটি করে শিউলির কলি ফুল হয়ে। তারই সুঘ্রাণ বাতাসে ভেসে ভেসে উঠে আসছে ওপরে। নিঝুম বারান্দাটাতে নিঃশব্দে প্রলয় তুলছে। এ প্রলয়ের আগ্রাসন কেবল নিরালাই অনুভব করতে পারে। আজকাল এমন প্রলয় ওঠে প্রায়ই। গ্রাস করে নেয় যাপিত জীবনের সকল সুন্দরতা। তৃষিত শরীরে কাতর নিরালার তখন শূন্য শূন্য লাগে সব। নিজের কাছে ভিখেরির মতো মনে হয় নিজেকে। আজকাল নিজেকে একটা অদ্ভুত অদৃশ্য চাদরে মুড়ে ঘুমিয়ে থাকে বিধু। এমনিই ঘুমিয়ে থাকে সে প্রায় রাতই। সকালে জেগে স্নান সেরে নাস্তার টেবিলে যেতে যেতে একটা চুমু খায় নিরালার গালে। ঠিক দুপুর দেড়টায় ফোন করে একবার খোঁজ করে নিরালা খেয়েছে কি না। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে সাত কি আট। টিভিতে খবর দেখে। ভালো কোনো সিনেমা দেখলে রাত জাগে। তা নয়তো ১১ টা নাগাদ রাতের খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ে। রান্না ঘরের কাজ সেরে বিছানায় গা এলাতে নিরালার প্রায় রাত বারোটা কি সাড়ে বারোটা। ক্লান্ত বিধুকে জাগাতে ইচ্ছে করেনা নিরালার। কিন্তু বিধুরই কী ঘুম আসে! অস্থিরতা নেই তার কোনোই! নিজের সব কেমন অজানা লাগে নিরালার। ছেলেটা মায়ের গা হাত পা ছেড়েছে কেবল। নিজের ঘরে একাই ঘুমায়। ছেলেটা দূরে সরতেই আজকাল অদ্ভুত সব নিরালার। বয়স তিরিশ পার করেছে বছর ছয়েক। স্বামী সঙ্গের আনন্দ কিংবা সুখ একটা সময় বিরক্তি এনেছে ঠিক। ছোট বাচ্চার যাবতীয় কাজ সামলে সকাল সন্ধ্যা অফিস করে ভীষন পরিশ্রান্ত শরীরে যখন ঘুমোতে যেত তখনই বিধু ওকে জড়িয়ে ধরতো। নিরালা জানে বিধু অপেক্ষা করতো কখন ও শুতে আসবে। ওকে কাছে পেয়েই আলতো চুমু খেত ঠোঁটে। চোখের পাতায়। নিরালার ঠোঁটে ফুটে উঠতো না কোনো জবাবের ফুল। চোখের পাতায় ভোরের আলোর মতো উজ্জ্বল আলোটা কোথায় উধাও তাই খুঁজে মরতো বিধু মনে মনে একা একা। তখন রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে নিরালার চোখে। ভোর ভোর জেগে উঠতে হবে। ছেলেকে নাস্তা খাইয়ে রেডি করে স্কুলে পাঠাতে হবে। তারপর নিজে গুছিয়ে অফিস ধরতে হবে। রাতের ঘুমটা বেশ জমপেশ না হলে অফিসে কাজ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। তাই বিধু যখন আবেগে থরোথরো নিরালা তখন হিসেব কষতো এই খেলা শুরু হলে শেষ হবে কখন। তারপর ক ঘন্টা ঘুমোনেরা সুযোগ পাওয়া যাবে। হায়। জীবন এক অদ্ভুত প্রচ্ছদ। তবু বিধুর জন্য মায়া হতো। ও একজন পুরুষ মানুষ। কতই বা ছাড় দেবে। কত অপেক্ষা করাবে ওকে। রক্ত মাংশের শরীর। এ তো অদ্ভুত এক খেলা। না হলেও চলে না। বার বার চাই। আরও চাই। আরও। প্রতিদিন ক্ষুধার্ত। প্রতিদিন তৃষ্ণা। কোনো কোনো রাতে নিজেকে খুলে দিত নিরালা ইচ্ছের বিরুদ্ধেই। আবেগহীন উচ্ছ্বাস বিহীন এই পরাজয় কী বিধুর বুকে বাধতো না। বিধু কী কিছুই বুঝতো না! একসময় তাই নিজেকে সামলে নিতে শুরু করে বিধু। কিন্তু আজকাল নিজেকে নিজের খুব অচেনা লাগে নিরালার। শরীরে এক অদ্ভুত প্রত্যাশা খেলা করে। এক আশ্চর্য কামনা। বিস্ময়কর দহন। সেই প্রথম যৌবনের দিনগুলোর মতো। এখনো তেমন ভীষন উত্তাল নদী। সমুদ্রে তরঙ্গ প্রবল। এই বয়সে এমনও হয়! নাকি এ তার কোনো শারিরীক সমস্যা! আজও মাত্রা ছাড়া সকল। আর চলছে না। শরীরটা কত কালের তৃষিত! ইজি চেয়ারটা ঠেলে পেছনে সরিয়ে উঠে দাঁড়ায় নিরালা। ঘুমোতে আসে। কিন্তু ঘুম কী আসবে? নীল ডিম লাইটের আলোয় নিষ্পাপ পরিচ্ছন্ন দেখায় বিধুর মুখ। মায়াময়। আসি আসি শীত। মধ্যরাতের দিকে বেশ ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। বিধু নিজের গায়ে হালকা কাঁথাটা কখন যেন বেশ মুড়িয়ে শুয়েছে। ওর পাশে শুয়ে নিরালা নিজের গায়েও কাঁথাটা জড়িয়ে নেয়। বিধুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। বিধু যদি একবার ওকে জড়িয়ে ধরে অমনিই নিরালা ফুটতে থাকা শিউলির মতো মেলে ধরবে কলি, ফুটতে শুরু করবে অজস্র ফুল। একটা সুন্দর ভাবনা থেকে বিধুর নির্বস্ত্র বুকের ওপর হাতটা রাখে নিরালা। কোনো স্পর্শকাতরতা টের পায় না। আলতো করে বিধুর গালে একটা চুমো খায়। বিধু নিরালাকে জড়িয়ে ধরে আবার গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। নিরালার বিধুর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ওর ঠোঁটে একটা চুমো খায়। এরপর আর না জেগে উপায় থাকে? বিধু তীব্র গতিতে উঠে বসে পড়ে

-কি হয়েছে বলতো? এই মধ্যরাতে পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করেছ?

আকষ্মিক এই তীব্র আক্রমণে বিস্মিত নিরালা। আত্মসম্মানে খুব লাগে। তাৎক্ষণিক সেও জবাব দেয়

-হোয়াট স্যুড আই ডু? প্লিজ টেল মি।

-ইউ স্যুড স্লিপ নাও। ভোরে অফিস যেতে হবে। তোমারও অফিস আছে। অতএব ঘুমোও।

-আচ্ছা। তোমার কী আমাকে মানুষ মনে হয়না?

-হাউ ফানি। এই মধ্যরাতে কী সব বলতে শুরু করেছ? ঘুমোও তো। ঘুমোও।

শুয়ে পড়ে বিধু আগেরই মতো কাঁথাটা গায়ে টেনে। কিন্তু নিরালায় বুকে মাথায় পুরো শরীরে তীব্র জ্বালা। একটানে কাঁথাটা সরিয়ে দেয় বিধুর গা থেকে।

-এভাবে কত কাল বলতো? আমাকে ভালো না লাগলে বলতে তো পারো?

-কি সব আজে বাজে বকছ? অদ্ভুত লাগছে আমার!

আজ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না নিরালা। উদ্ধত প্রলয়োন্মুখ তার মন আর শরীর। বাঁধ ভাঙবে যে কোনো সময়। তড়িতে বিধুর হাতটা ধরে নিয়ে নিজের স্তনের ওপর রাখে;

-তোমার কী আমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে না?

নিজের নির্মেদ পেটে বিধুর হাতটা ছুঁইয়ে দিয়ে বলে

-তোমার কোনো শারিরীক প্রয়োজন নেই? একটা জীবন্ত দারুণ নারী শরীর তোমার পাশে শুয়ে থাকে। আর দিনের পর দিন তোমার তার দিকে ফিরে তাকাতেও ইচ্ছে করে না?

বিধুর উদ্ধত ভঙ্গিটা কেমন যেন স্তিমিত হয়ে আসে। নিরালার নিভাঁজ নরম পেটের ওপর থেকে আস্তে নিজের হাতটা নিজের মধ্যে টেনে নেয় নীরবে। কোনো কথা বলে না। কিন্তু আজ কি যে হয়েছে নিরালার। সে নাছোড়বান্দা। এক ঝটকায় উঠে বসে পড়ে। নিজের গায়ের কাপড়টা একটানে খুলে ফেলে। অদ্ভুত সুন্দর অনাবৃত দুটো স্তনের দিকে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকে বিধু। আসলেই একটি নয় দশ বছরের ছেলের মা হয়েও অদ্ভুত সুন্দর এখনো নিরালার শরীর। উরু কিংবা পেটে নেই একরতি মেদের ছোঁয়া। নিভাঁজ চামড়া। নাভীর গভীরে নিটোল অন্ধকার। পেটের নিচের দিকটাতে একটা খুব হালকা চিকন সিজারিয়ান অপারেশনের দাগ। কিন্তু এই জোৎস্নার আলোটা যখন নিরালার নিরাভরণ শরীরের ওপর পড়েছে তখন সেই হালকা দাগটি একটি দারুণ রশ্মির মতো আলো ছড়াচ্ছে। অস্বাভাবিক সুন্দর এই জোৎস্না রাত। যে কোনো পুরুষ এই জোৎস্নার আলোতে এমন গ্রীক দেবীর সৌন্দর্য স্পর্শ পাওয়া বাঙালি নারীর শরীর দেখলে কামনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো। কিন্তু তার বদলে বিধুর কেমন ভয় ভয় করতে থাকে। নিরালা নিজের হাতেই বিধুর পরণের শর্টসটা খুলে ফেলে। তার ধারণা ছিল বিধু ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠবে। দীর্ঘদিন ধরে আবেগের এই সুতীব্র অস্পর্শিত অনুভব থেকে দূরে থাকার পর আজ হয়তো অবশেষে বিধু জ্বলে উঠবে। এর বাইরে যেটুকু গত কয়েক বছরের চর্চাহীন যৌনজীবন তা হয়তো মুহূর্তেই অন্তর্হিত হবে। বিধুর মুখটা দুহাতের অঞ্চলিতে ধরে সুতীব্র একটা চুমু খাবার পর বিধু খানিকটা জ্বলে ওঠে। নিরালার দুহাতের কোমল তালুর মধ্যে হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে যেন বিধুর উত্তপ্ত লৌহকঠিন পৌরুষ। নিরালার চোখদুটো যেন আনন্দে ঝলকে ওঠে। সেই আগেরই মতো রয়েছে বিধু। ঠিক আগের মতোই। বিধুর আত্মবিশ্বাস বেশ খানিকটা ফিরে আসে। নিরালা ততক্ষণে নিজেকে নিশ্চিন্তে সমপর্ণ করেছে বিধুর কামনার দহনের মাঝখানে। কোমল আঘাত আর প্রতি আঘাতের মাঝখানেই হঠাৎ ফিকে হয়ে আসে আলো। দিনের মাঝখানে কেন হঠাৎ সূর্যটা ডুবতে শুরু করেছে বুঝে উঠতে পারে না নিরালা। যখন তার শরীরে তীব্র কামনার স্রোতস্বীনি ধারাপাত। অধরা নদীর সঘন মাতাল প্রপাত। নিরালার শরীরের ভেতর থেকে কেনই বা বের হয়ে আসবে বিধু! নিরালা অপ্রস্তুত। নেশাসক্ত। কামনা মগ্ন। অস্থির। এক ঝটাকায় উঠে বসে;

-কি হলো বিধু?

ওর মুখটা তখন বিধুর চোখে অদ্ভুত বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। নিজেকেও চিনতে পারছে না বিধু। বিধুকে বার দুয়েক ধরে ঝাঁকায় নিরালা।

-কি হয়েছে। খুলে বলো আমাকে। কি হয়েছে?

এত ছোট ছোট লাগছে নিজেকে নিরালার কাছে। তবু সত্য বলাই শ্রেয়তর। তাই চোখ কান বন্ধ করে মাতালের মতো বলে বসে নিধু

-ভালো লাগছে না।

-কি ভালোলাগছে না? আমাকে? আমার শরীর তোমার ভালোলাগছে না?

-জানিনা। কিচ্ছু জানি না। আমি এনজয় করতে পারছি না নিরালা।

-এর মানে কী?

বিধু চুপ করে থাকে। নিরালা আবার বিধুকে ধরে ঝাঁকাতে থাকে;

-কী বলতে চাও বিধু। এতদিন পর, তোমার আমাকে ভালোলাগছে না? কেন? ইজ দেয়ার এনি থার্ড পারসন?

বলতে বলতে কাপড়টা গায়ে চড়িয়ে ভীষন অস্থির পায়ে ওয়াশরুমের দিকে আগাতে শুরু করে নিরালা।

-না।

বিধুর না শব্দটি খানিকটা আর্তনাদের মতো শোনায় নিজেরই কাছে। আর নিরালার চোখের অবিশ্বাসের ছায়া কেমন যেন সারাটা গায়ে অক্টোপাশের মতো জড়িয়ে যায়। বিঁধতেই থাকে। বিঁধতেই থাকে।শেষের না শব্দটি কি শুনতে পেয়েছে কি না বুঝতে পারে না বিধু। নিরালা ততক্ষণে এক ছুটে মাস্টার বেডরুমের এটাচ বাথরুমটাতে ঢুকে পড়েছে।নিরালা জানে না, সেই সময়গুলোতে বিধুর কিছু করার ছিলনা। শরীরে যখন তীব্র জ্বালা। মাথা ধরে যেত রাতে রাতে। যে কোনো নারী শরীর দেখলেই ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করতো তখন। অথচ ঘরে বউ তার অবসন্ন। তার স্পর্শ নিরালার পরিশ্রান্ত শরীরের গ্লানিকে পরাজিত করতে পারে না। বরং নিজেই পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে নির্বাক সমাধানের পথে। একা ওয়াশরুমে। কে জানতো আজই নিরালা চড়াও হবে তার সকল শারিরীক ক্ষুধা আর তৃষ্ণা নিয়ে! আজও তেমনি হয়ে গেছে রাতে ঘুমোতে যাবার আগে। এখন এই বয়সে আবার দ্বিতীয়বার নিরালার সাথে এই যুদ্ধে নামার মতো শারীরিক শক্তি তার নেই।মনে মনে ভাবে বিধু ঈশ্বর কেন পুরুষকে এই জায়গাটাতে এতটা শক্তিহীন করে রেখেছেন কে জানে। পুরুষ কেন নারীর মতো বার বার অজস্রবার প্রিয়সঙ্গমে সমর্থ নয়! তাহলে নিশ্চিত সে নিরালাকে আজ শান্ত করতে পারতো। খুব মায়া হয় ওর নিরালার জন্য।

তারপর গত হয়েছে কয়েক মাস। আর কখনো নিরালা বিধুকে বিরক্ত করেনি। নিয়মিত মাস্টারভেশনে অভ্যস্ত বিধুও আর আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়নি কখনো। কেমন যেন ফিকে হয়ে আসে সংসারের তীব্র উজ্জ্বল আলোটা। সংসারটা নিরালার কাছে খুব ভারবহ লাগতে থাকে। চাকরীটা ছিল বলে হয়তো কিছুটা সময় স্বস্তির। আজকাল বিধুকে দেখলেই গায়ে জ্বালা করে ওঠে। নিজের জানতেও আর ইচ্ছে হয় না কী উত্তর হতে পারে এ রহস্যের। তাছাড়া নিজের স্বামীর রহস্য ঘাটবার মতো মানসিকতাও তার নেই। স্বামী প্রেমে পড়েছে কি না। অন্য নারীর সাথে রাত্রিযাপন করে কি না। বয়স চল্লিশেই তার স্বামী অক্ষম কি না। প্রায় সব বাঙালি পুরুষই কি এই বয়সেই অক্ষম হতে শুরু করে কি না, এসব জেনে কী হবে! নিরালার মানসিক কাঠামো ঠিক তেমন নয়।

 

 

বহুদিন পর আজ দিন শেষে বন্ধুদের গেট টুগেদারে নিরালাকে কেমন নিঃসঙ্গ দেখায়। বন্ধু বান্ধবীদের আড্ডায় প্রাণ পায় না সে। নিজেকে একটা বাসী ফুলের মতো নিস্তেজ অসহায় লাগতে থাকে। এক কাপ গরম কফি নিয়ে জানালায় উদাস তাকিয়ে থাকতে দেখে ওর কাছে এসে বসে দিলীপ;

-কি রে? কি হয়েছে? এমন চুপচাপ?

নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বলে;

-না। এইতো। তোর খবর বল। শুনেছি প্রমোশন পেয়েছিস? পোস্টিং নোয়াখালি?

-হুম। কিন্তু বলিস না দোস্ত, কুত্তার জীবন বুঝলি কুত্তার জীবন।

-ধ্যাৎ।কি বলছিস।

-হ বন্ধু। ঠিক কইতাছি। বিশ্বাস কর। সরকারী আমলাগো কোনো জীবন নাই। বউ পোলাপান নাই। আবার কুত্তার কোনো কাম নাই। দৌড় ছাড়া হাঁটাও নাই।

এটা দিলীপের পুরানা অভ্যাস। মজা করতে করতে প্রায়ই সে আঞ্চলিক কথ্যভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়। দিলীপের কথা শুনে নিরালা অবাক;

-কত প্রেসটিজিয়াস জব। সামাজিক স্টেটাস। সরকারী গাড়ি, বাড়ি। কত উঁচু মর্যাদা। আর তুই বলছিস কুত্তার কোনো কাম নাই? ধ্যাৎ

-তা আছে ঠিক। কিন্তু মন্ত্রী আর সচিবদের পেদানী খেতে খেতে আর জবাবদিহি করতে করতে তো জীবন শ্যাষ।

-তাতো কিছু জবাবদিহি করতেই হবে।

-আরে যা তা নারে ভাই। এইতো সেদিন। বউ পোলাপান অপেক্ষা করে আছে কবে যাব ঢাকা। আমি ডেট দেই আর পিছাই। ডেট দেই আর পিছাই। এরই মধ্যে ইলেকশনের আগে পিছে। সেই যে ধানের শীষে ভোট দিতে গেছিল বলে মার্ডার করে দিল যে মহিলাটাকে। বুঝবি নারে ভাই, কি এক ফ্যাকরা যে শুরু হইলো। দৌড়াও ঘটনাস্থলে। মধ্যরাত অবধি সব গুছায়া সাইরা কোয়ার্টারে ফিরছি কেবল। থানা থেকে ফোন। আবার দৌড়াও। তন্মধ্যে ঢাকা থেকে তলব সচিব সাহেবের। ভাইরে ভাই, মনে কয়,আমি সচিব সাহেবের জাস্ট একটা ভৃত্য। এমন ধমক ধমকাইল। খাড়ায়া খাড়ায়া শুনলাম;

-হ্যাঁ বলুন, কি করে হলো এত বড় মার্ডারটা? বলুন আমাকে। সরকার আপনাকে পাঠিয়েছে কী জেলায় বসে বসে আঙুল চুষতে? দায়িত্বে এ ধরণের গাফিলতি কিন্তু দ্বিতীয়বার বরদাস্ত করা হবে না। মনে রাখবেন।

কিছুটা দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করে;

-ক, এইডা হইলো কিছু? এত কষ্ট কইরা বি সি এস পাশ দিয়া চাকরী। তারপরেও লবিং গ্রুপিং। প্রমোশন, জানছই তো আর কোথায় কি পরিমাণ টাকার বাণিজ্য হইছে। তারপর চাকর বাকরের মতো যখন তখন তলব। যখন তখন বকা ধমক।

এইসব কথার মধ্যে এসে যোগ হয় জহির। একটু ফোরণ কাটে

-বউ থাকবো তো বন্ধু?

-হা হা হা। বউ আবার থাকবো না? মাইয়ারা আর কিছু পারুক না পারুক বরের উচ্চপদ আর শান শওকতটা ‍জান দিয়া ভালোবাসে। স্বামীকে ভালো বাসুক না বাসুক স্বামীর সাইনবোর্ডটা, জৌলুশ শান শওকতটারে খুব ভালোবাসে। এইটা মনে রাখবা দোস্ত। গত চারমাস বউয়ের কাছে যাইতে পারি না। হাত মারতে মারতে হাতে ফোষ্কা পইরা গেল।

-হা হা হা।

পরিস্থিতিটাকে তরল করে দিলীপ। সবাই হেসে ওঠে। নিরালাও হাসে। নিরালার হাসি অদ্ভুত সুন্দর। ঝকঝকে দাঁতগুলো সমান করে বসানো। আজ হাসতেই যেন মুক্তোর মতো ঝিলকে ওঠে চারপাশ। অথচ কবেকার কথা। দেখা। বন্ধুত্ব। কলাভবনে একই ক্লাসে কত কত দিন পার করেছে। নিরালা প্রেম করতো বিধুর সাথে। আর দিলীপ দিপালীর সাথে। দিপালীর সাথে বিয়ে হয়নি দিলীপের। কিন্তু নিরালা বিধু সংসার পেতেছিল ঠিক। দিলীপের ভাবনায় ছেদ পড়ে নিরালার কথায়;

-এবার বল, বউ সংসার কেমন চলছে?

-কেমন আর। একে বউ সন্দেহবাতিক গ্রস্থ। তার ওপর দিনের পর দিন বাড়ি যেতে পারি না। ঘরে খিস্তি খেউর লেগেই আছে। এই সংসার আমার আর ভাললাগে না রে। বয়স তো কম হলো না। কই এতদিন পর বাড়ি গেলে বউ একটু আদর সোহাগ করবো। মিঠা মিঠা কথা কইবো। সত্যি মিথ্যা মিলাইয়া মন ভরানো কথা কইবো। তা না। এইটা কেন হইছে? ওই মাইয়াডা ক্যান ফোন করছে। ক্যান অতক্ষণ ওর লগে কথা কইছ। মনে হয় লাত্থি মাইরা যাই গা সব ফালায়া। বাদ দে এসব। তুই নিজে কেমন আছিস বলতো?

প্রশ্ন করতে করতে আনমনে নিরালার হাতটা ধরে দিলীপ। তাতে নিরালা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে বুঝতে পারে না দিলীপ। অবাক হয়। ওরা বন্ধু। কত এভাবে হাত ধরে বসে থেকেছে কলাভবনের মাঠে। একপাশে দিপালী আর এক পাশে নিরালা। কই এমন তো কখনো দেখেনি নিরালাকে। আজ কী হলো!

-তোর কী হলো রে হঠাৎ?

নিরালা ভীষন অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যায়।

-না কই। এভাবে কেঁপে উঠলি ক্যান?

বহুদিন পর একটা পুরুষ মানুষের হাত কেমন যেন ইপ্সিত মনে হলো নিরালার। এমন আদর করে মমতায় ভরে বহুদিন যেন কেউ হাতটা ধরেনি। অমনি কেঁপে উঠলো। কথা বলতে গিয়ে ওর ঠোঁটটাও কাঁপছে।

-না এমনি।

-তোকে নিতে বিধু আসবে?

-না।ও বাড়ি গেছে ওর মাকে দেখতে। ফিরবে দিন তিনেক পর। আমি একাই চলে যাব।

-কিভাবে যাবি? আমি তোকে পৌঁছে দেই? আমার সরকারী গাড়ি ছেড়ে দিয়েছি। বলেছি আমার বাসার গাড়িটা নিতে আসবে।

-গাড়ি আসবে?

-আরে নাহ। মিথ্যে কথা বলেছি ড্রাইভারকে। বাসায় বললে উপায় আছে? এতক্ষণে কবার ফোন করতো বউ। তাই বলিনি যে তোদের সাথে আছি। একেবারে বাড়ি গিয়ে সারপ্রা্ইজ দেব।চল তোকে আমি পৌঁছে দিয়ে আসি।

 

 

সে রাতে আর বাড়ি ফেরা হয়না দিলীপের। সেই পুরোনো দিনের গল্প। বন্ধুত্ব। স্মৃতিকাতর সময় যাপন। কত কি যে কথা হয় দুজনের মধ্যরাত পর্যন্ত। বহুদিন পর কেমন এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভেসে যায় নিরালার সব। বিধুর সাথে সম্পর্কটা কেমন একটা নির্বাক দূরত্বে দাঁড়িয়েছে। ওর সাথে মনখুলে কথা বলা বেড়াতে যাওয়া ওসব আর এখন সহ্য করতে পারে না নিরালা। আজ দিলীপের সাথে কথায় কথায় যেন দীর্ঘতর নির্বাক যুগের অবসান। বারান্দায় মুখোমুখি বসে দুজনে কথা বলছিল। নিচতলার বাড়ির শিউলি গাছটা আজও মাতাল। তার ঘ্রাণে কেমন অবশ বিবশ করে তুলছে চারপাশ। হালকা চাঁদের আলোয় নিরালার মুখটা অদ্ভুত সুন্দর দেখায় দিলীপের চোখে;

-একটা কথা বলি ? কিছু মনে করবি না তো?

-বল না।

ভেতরে কী খানিক কেঁপে উঠেছে নিরালা!

-তোরে একটা চুমু খাইতে ইচ্ছে করছে।

-কী বলিস? তোর বউ অপেক্ষা করে আছে।

-সত্যি কথা বলি? বউরে চুমু খাইতে ইচ্ছেই করেনা

-কী অদ্ভুত কথা? কেন? প্রেম নেই তোদের মধ্যে

-ধ্যাত্তেরি তোর প্রেম। সংসারে খ্যাসখ্যাসানি বউর লগে আবার প্রেম হয় না কি! আজও অন দ্য ওয়ে, টেলিফোনে কী সব ঝগড়া করতে করতে এসেছি জানিস? রাগ উঠে গেলে এমন চোখ বড় বড় করে যাতা কথা বলে। আর ওরে চুমা খাইতে গেলেই আমার সে কথা মনে পড়ে যা। গা কেমন ঘিন ঘিন করে ওঠে। মনে হয়.. থাক;

-ধুর কি বলিস? তোর বউ টের পায়না?

-অভিনয় করি।

-তাতে কী। টের পাওয়ার কথা।

-হয়তো পায় হয়তো পায় না। কে এসব ধরে বসে থাকবে। বহুত কাম পড়ে থাকে আমার। এক গ্লাস পানি আন তো।

ডাইনিং টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসতে আসতে সারাদিনের পরিশ্রান্ত শরীরটা এলিয়ে দেয় গেস্টরুমের বিছানায় দিলীপ। পানিটা নিয়ে এসে মুখোমুখি বসে নিরালা। গ্লাসটা রেখে উঠতে যেতেই হাতটা ধরে ফেলে দিলীপ। নিরালার মুখটা দুহাতের তালুতে যেন পুরে নেয়। কী যে অদ্ভুত এক মায়াময় নেশা শরীরে শরীরে। কেউ কাউকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। মহূর্তে ঘটে যায় সকল প্রলয়।প্রগাঢ় উষ্ণতায় চুমু খায় দুজনেই। আলতো দিলীপের হাত নেমে আসে নিরালার বুকের ওপর।

-তুই এখনো এত সুন্দর!

মুগ্ধ বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে দিলীপ। নিরালা কেঁপে ওঠে আবেগে বিষ্ময়ে। একটানে নিরালাকে বুকের ওপর তুলে নেয় দিলীপ। ঠোঁটে ঠোঁটে সংঘার্ষিক প্রজ্জ্বলন আগুণ জ্বালতে থাকে দুটো শরীরের কোণায় কোণায়। এক উন্মাতাল আবাহন। কী করে ঠেলে সরাবে নিরালা! এই মহূর্তে ক্ষমতারহিত এক আদি নারী যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে দিলীপের সামনে;

-তুই কী ভেনাস? নাকি আফ্রোদিতি বলতো আমাকে!

দারুণ আদরের ভাষা। কামে প্রেমে মধুরতর বাক্যে স্বর্গ নেমে আসে মর্তে আজ রাতে। কত কালের তৃষার্ত শরীরের কাছে এ যেন এক গভীর সম্মোহন। নিজেই জানে না কোথায় কোনদিকে চলছে সে। দিলীপের দুহাতের মাঝখানে নিরালার স্তন। কি মধুর এক আবেশে বিহ্বল করে তোলে নিরালাকে। যেন আগে কোনোদিন এমন অপরূপ সুন্দরের সাথে দেখা হয়নি তার। বয়স পঁয়ত্রিশেও এমন হয়! নিজের কাছে অবাক লাগে সব নিরালার।দিলীপের ঠোঁট নেমে আসে ওর বুকের মাঝখানে। চুমোয় চুমোয় বিধুর রাত। মগ্ন দিশাহীন স্রোত। পিচ্ছিল প্রপাতে কামনার সাতরং। দিলীপ তখন উদ্ধত শিখায় অনির্বাণ। সঘন আবেগে থরোথরো কাঁপছে ঠোঁট।

-আমাকে একটু ছুঁয়ে দেখ।

বলতে বলতে দিলীপ নিরালার দু হাতে নিয়ে রাখে নিজের উদ্ধত শিশ্নর ওপর। নিরালার ছোঁয়া পাওয়া মাত্র জ্বলে ওঠে তীব্র সঘন আবেগ। নিরালা দুচোখ বন্ধ করে। আবেদনে নিবেদনে গ্রহণ আর বর্জনে সমর্পণের সকল পুজা সমাপ্ত হবার পথে যখন অস্থির দশদিক। শরীরে শরীর। তীব্র কামনার শেষ মার্গে উত্তীর্ণ স্থির অচল মহাসংসার। ঠিক তখনি হঠাৎ নিরালার শরীর থেকে নিজেকে বের করে আনে দিলীপ। হঠাৎ যেন নিদ্রাভঙ্গ হয় নিরালার! নির্বস্ত্র শরীর। নিরালাকে খুব আদরে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে দিলীপ। ঘটনার আকষ্মিকতায় আর পূণরাবৃত্তিতে মূক হয়ে থাকে নিরালা। ওর মুখের দিকে চেয়ে দিলীপ নিজেকে ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধ করে:

-শোন। এখানে সবটা হয়ে গেলে বাড়ি গেলে এই বয়সে আর বউকে সামলাতে পারবো না রে। বাড়িতে অশান্তি বেধে যাবে, তারপর….

-থাক

দিলীপকে থামায় নিরালা।অদ্ভুত অপমানে আর অস্থিরতায় তখনো নিরালার শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাইরে দারুণ জোৎস্নার আলোটা ম্লান হতে শুরু করেছে। অবাক রাতের অন্ধকারে ফুটে ‍ওঠা শিউলির ঘ্রাণ এত যে মাতাল করেছিল রাত। এখন আর তার লেশমাত্র টের পায়না। রাত ফুরিয়ে এল বোধ হয়। অসহায় নিষ্কলুষ নিরালা চোখের জল ধরে রাখতে পারে না আজ আর। বাথরুমের ঝর্ণাটা ছেড়ে দিয়ে তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয়। জল ঝরে পড়ে শরীরের তীব্র আগুনে। যদি অবাধ জলের প্রপাতে এভাবেই ধুয়ে মুছে ফেলে দেয়া যেত জীবনের সব দহন। যদি ধুয়ে যেত এক জীবনের সকল ক্লেদ..

দিলীপের আর নিরালার সাথে দেখা হয় না। একটা চিরকূট লেখে

-নিরালা, আজ কেন যেন তোকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে খুব। তোকে ভালোও বাসতাম সেই ছাত্রজীবনের দিনগুলোতে। তুই যখন বিধুর সাথে এনগেজ হয়ে গেলি তখন খুব মনমরা হয়ে থাকতাম। তখনই দিপালী আমাকে সঙ্গ দিত। ওর সাথেও সংসার হলো না আমার। বউ সংসারের কথাতো বলেছি তোকে। আজ রাতের এই একাকী নিরালায় তোকে মনে হল খুব আপন। তোর কিছু এখনো আমার বুকের ভেতরে কোথায় যেন স্পর্শ করে আছে। অথচ সত্যিটা কী জানিস, দিনের পর দিন মাস্টারভেশন করতে করতে এতটাই কঠিনে আসক্ত হয়ে গেছে শরীর, আজই টের পেলাম নারীর কোমল শরীর আর আমাকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারার নয়। ক্ষমা করিস…।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত