বৃষ্টিভুক

শুনেছি কোথাও নেমেছে বৃষ্টি। এখানে এখনো আসেনি মাতাল হাওয়া, নামেনি বৃষ্টির ঝুম। তবু আমি উন্মুখ। খুলেছি জানালা। আহা। সেই লালমাইয়ের পাহাড়চূড়ার থেকে গড়িয়ে পড়া জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে বরষা এসেছে আমার ঘরে। তিনতলার উপর মাটির জমিন বিছিয়ে বাবা করেছিলেন লেবুর গাছ। ওতে প্রতি বর্ষায় সাদা ফুল। সবুজ পাতার সুঘ্রাণে লেবুর ফুল চুইয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির জল যেন অমৃত। আমি আজন্ম পান করে এক নীলকণ্ঠ। মেঘমেদুর আকাশের দিকে কেবল তাকিয়ে থাকা চাতক। কখন নামবে বরষা, কখন! বৃষ্টি নামলো তো কথা নেই ঝুল বাড়ান্দার পুরোটা জুড়ে আমার উন্মাতাল বরষা যাপন। লেবুফুল চুইয়ে পড়েছে জল। আদরে আদরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বৃষ্টির ফোটা আমার শরীরে জ্বালছে নিকোনো আলোর কণা। দূর অজানার আলোতে আলোতে হৃদয়ের গভীরে বরষা, দিনের আলোতে বর্ষা, বাদুরের পাখায় নিভন্ত দিনের শেষের বর্ষা – এত গভীর, যাপিত জীবনের প্রত্যন্ত জুড়ে। কে জানে! বৃষ্টিরে বড় ভালোবাসি। জলের সাথে সখ্যতা বছর পাঁচ কি ছয়ে। সুইমার বড় ভাই জলের উপর ভেসে থাকা শেখাতো। আমার ছোট্ট শরীর, পেটের নীচে হাত রেখে হাত পা ছুঁড়তে বলতো। আমি হাত পা ছোঁড়ায় যখন গভীর মনোযোগী তখনই সে পেটের নিচ থেকে হাত সরিয়ে নিত। কখন জানতেও পারতাম না। একসময় দেখতাম জলে একাই ভেসে রয়েছি। তারপর থেকে রিমঝিম কি প্রবল বর্ষায়ও ছাড় নেই। বাধানো পার থেকে জলে ডাইভ দিয়ে যতদূর যাওয়া যায়। কত কম সময়ে এপার ওপার করা যায় পুরোটা পুকুর। আর বৃষ্টির জলে পুকুরে ডুব দিয়ে জলের উপর জল পড়ার শব্দের মিহি আড়তালের ছন্দ, আহা…জীবন করেছে মধুময় চিরকৈশোর। মনে পড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পালিয়ে প্রেম। তখন ব্রহ্মপুত্র দিনগুলো। বৃষ্টি এলেই উন্মাতাল প্রেমভাব। বাড়ি থেকে বের হতে পারলেই এক ছুটে নদী। মাঝ নদীতে নৌকা ভাসান। যাব ওই পারে। এ পারে পড়ে থাক আমার বালুচর আর চখাচখির ঘর। ওপারে কাশবন, চরে জেগে ওঠা কারো ঘর। তারও পরে আরও দূরে ঘন বন। ওখানে কয়েক মুহুর্ত কাটিয়ে আবার ফিরে আসা। ঝকঝকে দিন। পাল উড়িয়ে নৌকা সবে ভেসেছে জলে। ছেড়া পালে জোড়া দেয়া রঙের বাহার যেন শিল্পীর তুলিতে কোলাজ। হঠাৎ কালো মেঘে আকাশ অন্ধকার। তখন নতুন নতুন চশমা লেগেছে চোখে। দীঘল আইল্যাশে লেগে থাকা চশমার কাঁচ তার উপর বড় বড় ফোটায় ধূমল বৃষ্টি। দূরু দূরু বুক। নদীর জলে পাগলা বাতাস। ঠেউ্য়ে ঘূর্ণি। নৌকার ভেতর দুজন মানুষ। উন্মাতাল বৃষ্টিধারায় স্নাত হতে চলেছে নতুন অনুভব। ঠোঁটে ঠোট। প্রগাঢ় আলিঙ্গন। নৌকাটা হঠাৎ কাত হতে হতে কোনোমতে সামলে নেয় দক্ষ মাঝি। না হলে প্রগাঢ় আলিঙ্গনের মাঝেই সলিল প্রপাত। তবু ‘এসো বৃষ্টি, জলে ধুয়ে নেই গত জন্মের সকল পাপ।’ ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে ভিজবোনা বলে কলাভবনের বিশাল বটগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে থেকেছি কতদিন দুজন মানুষ প্রায় একজন হতে চাওয়ার দূরত্বে! তবু বটের পাতা ভিজে টুপটাপ তারপর ঝমঝম করে বৃষ্টির জল ভিজিয়ে গেছে। একসময় নিজেই সরিয়েছি বটের পাতা উন্মুখর। মেখেছি গায়ে মাতাল হাওয়া। শুনেছি কানে বৃষ্টির গান। আর কানে পড়েছি জোড়াপাখি দুল। 

তখন বৃষ্টিও ছিল প্রচুর। জল হাওয়া আর গাছের আরাধনায় ঝুম ঝুম বৃষ্টি হতো যখন তখন। সেবার কে জানে কেন? তুমুল বর্ষার দিনে হঠাৎ ক্ষরা। হবে মাস দুয়েক। সূর্য নেভানো কালো মেঘ নেই আকাশে। হঠাৎ বরষায় কাঁপন নেই জুঁই কিংবা বেলির শরীরে। কলা ভবনের বটের পাতায়ও প্রবল তৃষ্ণা, মাঠের ঘাসে নিভন্ত উনুন। আকাশ রোদ্রছাওয়া। মনে পড়ে সবে রিক্সায় হুড তুলে বসেছি দুজন। অমনি আকাশ কালো করে কী যে বৃষ্টির ধুম। আমারে আয় কে পায়। ফেলে দেই রিক্সার হুড। তারপর আমুল ভিজে ভিজে উদোম হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো, উদ্দাম। সেদিনও তুমুল বৃষ্টি, বাইকের পেছনে বসে আমি। সন্ধ্যে সাতটেতে হলের গেট বন্ধ হয়ে পড়বে। বাইকে স্পিড মাত্রাতিরিক্ত। যে করেই হোক পৌঁছাতে হবেই হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। হলের ঠিক কাছাকাছি এসে বাঘের ভয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। বাইকটা পিছল খেয়ে ছিটকে পড়লো। আমি আর বাইক চালক দু’জন দুদিকে ছিটকে পড়লাম। বিশাল এক ট্রাক কোনোমতে আমার ঠিক কাছটাতে এসে কোনোমতে ব্রেক কষতে না পারলে আজ মাটির তলায় বৃষ্টির গান শুনতে শুনতে সাপের ছোবল খেতাম।

এখনো বৃষ্টি নামে অঝোর ধারায়, শুনি শ্রাবনে এমনকি শরতেও। তবে এখন আর সখ্যতা নেই তার সাথে তেমন। তার ভালোবাসা মাখবো গায়ে এমন সময় কই? তাই জানালায় বসে ঘনকালো আকাশ দেখি। রিমঝিম বৃষ্টির জল চুইয়ে ঝরে পড়ে আমার কান্না। যেখানে বৃষ্টি নেই সেখানে আমি নেই। যেখানে জলের সাথে তুমুল মাতামাতি নেই সে জীবন আমার জীবন নয়। ফুল পাখি লতা আর নষ্ট সময় নিয়েছে কেড়ে ‘বৃষ্টি”। ওরা আমার ”বৃষ্টিভুক’’।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত