বুড়ি আনজুমান

ম্যাড়ম্যাড়ে সাদা দালানটার সামনের জায়গাটা ব্যস্ত, জনাকীর্ণ। ফুটপাতে মানুষের আসা-যাওয়ার সীমা পরিসীমা নাই। দাঁড়-করিয়ে-রাখা প্রাইভেট কার আর মোটর সাইকেল সামনের রাস্তাটাকে সংকুচিত করে ফেলেছে; তাই অন্য গাড়িগুলিকে চলতে হচেছ ধীরে ধীরে, ধুঁকতে ধুঁকতে। দৃশ্যটা অবশ্য স্বাভাবিক।
বুড়ি আনজুমান দালানটার প্রবেশপথের সামনে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কখনও কখনও শীর্ণ, চামড়া-কুচকে-যাওয়া হাতে দুমড়ানো মোচড়ানো টিনের থালা বাড়িয়ে দিচ্ছে ধাবমান পথচারির দিকে।
টং করে একটা শব্দ হল। সম্ভবত, দুই টাকার কয়েন ।
দালানটার ভেতরের দৃশ্যপট ভিন্ন। কক্ষে কক্ষে সারি সারি কম্পিউটারের সামনে ক্রেতা-বিক্রেতারা বসে আছে। শেয়ার কেনা-বেচা চলছে। দুনিয়ার তাবৎ পেশার লোক এসে জড়ো হয়েছে; তবে যাদের মাস শেষে টাকা বাঁচে।
অপরিসর এবং প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন সিঁড়িতে মানুষের অবিরাম উঠা-নামা পুরো দালানটাকে বিস্ফোরণোন্মুুখ করে তুলছে। এর ভেতরকার অস্থিরতা চুইয়ে চুইয়ে বাইরে গড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকাকে গ্রাস করে ফেলছে।
বুড়ি আনজুমান অবশ্য এই অস্থিরতার অংশীদার নয়। দালানটা তার জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। আর ব্যবসাটা যে কি তা সে জানে না।
– চলুন, লাঞ্চ সারি।
– একদম ক্ষুধা নেই, শুধু একটা স্যান্ডউইচ খাব।
– আমার বউ ফোন করে বলেছে রাশিফলে আজ আমার অর্থভাগ্য শুভ। বলে প্রথমজন একটু হাসল।
লোক দু’জন বিল্ডিংটা থেকে বেরিয়ে ঠিক তার পাশেই একটা ফাস্টফুডের দোকানের দিকে গেল।
টং করে আর একটা শব্দ হয়। দুই টাকার কয়েন সম্ভবত। কখনও কখনও পাঁচ টাকারও হয়। বুড়ি আনজুমানের রাশিফল জানা নাই। তাই নিজের ভাগ্যটাকে জানতে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় মানুষের উঠা-নামার পথের মুখে, লাঠিতে ভর দিয়ে। ফ্যাঁকাশে মুখটাতে অসহায়ত্বের সমস্ত ছাপ নিয়ে।
– কী মনে করেন, বিশ্বমন্দার ধাক্কা আমাদের বাজারে লাগবে?
– গ্লোবালাইজড্ ওয়ার্ল্ড! লাগতেও পারে। বলা মুশকিল।
– মনে হয় না লাগবে। ঝড় সবসময় উঁচু গাছে লাগে।
– তবে উঁচু গাছ ভেঙ্গে তো তলার ছোট গাছের উপরই পড়ে।
– তা অবশ্য ঠিক। তা, আজকে কত টাকার কিনেছেন?
– কিনিনি, ছেড়ে দিয়েছি।
টং করে আবার শব্দ হয়। বুড়ি আনজুমানকে পয়সা বাঁচাতে হয়। তাই সে দুর্বলতায় কাঁপতে-থাকা-হাতে থালাটা ধরে থাকে পথচারির সামনে। তাকে কেরানীগজ্ঞ যেতে-আসতে নৌকার ভাড়া দিতে হয়। হাঁটা-পথ বেশিরভাগ সময় সে হেঁটেই চলে। তবু তাকে দুপুরের খাবার ছেড়ে দিতে হয় রাতের খাবার জোগাতে।
‘দুইটা স্যান্ডউইচ দেন।’ অর্থভাগ্য-শুভ লোকটা ফাস্ট-ফুড দোকানিকে বলল।
বুড়ি আনজুমান খাদ্য-বস্তুটার নামের সাথে পরিচিত। এদিকে, তার আধপাগল মেয়ে ফুলবানু খাদ্য-বস্তুটার নাম না জেনেই মরে গিয়েছিল। তারা ভিক্ষায় বের হযেছিল বর্ষায়। রেলস্টেশনে অলস দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়ির বগির ডালা পড়ে যায় ফুলবানুর উপর। বগির পাশে পড়ে থাকে তার মেয়ের লাশ। তার ডান হাতে ধরা ছিল যাত্রীর ফেলে দেওয়া আধ-খাওয়া স্যান্ডউইচ।
‘ঐ বুড়ি, ভাগ! ভাগ এখান থেকে!’
নিরাপত্তাকর্মীরা কুঁজো, নোংরা-ন্যাকড়ার-মতো কাপড় পরা ভিখারিনীটিকে তাড়িয়ে দেয়।
বুড়ি আনজুমানকে তাই ধীরে সরে যেতে হয়। হয়ত অন্য কোন দালান বা মার্কেটের সামনে অথবা ফুটপাতে, কারন সে তো জীবনের কাছ থেকে ভেগে যেতে পারে না।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত