৩০৪ নং কেবিন (পর্ব-৭)

আজ পিয়ালির বদলে শর্মিলাদি তার দেখভাল করার জন্য এসেছে। এক নজরে দেখলে অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর বলে ভুল হতে পারে। কিন্তু মুখে কোনো হাসি নেই। এসেই বলল, বিছানা থেকে নামা যাবে না। রিপোর্ট আছে চ্যানেল বারবার খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এতবার খোলা বন্ধের জন্য।

মেঘ বলে, কিন্তু আমার তো হাঁচি আসছে বারবার, আর তাতে জামা ভিজে যাচ্ছে, বিছানাও।

সে যা ভেজে ভিজুক, কিন্তু নামা যাবেনা।

মেঘ বেশ বিরক্ত হয় এবার। এমনভাবে কথা এ’কদিনে তার সঙ্গে কেউ বলেনি। বিরক্তি চেপে রেখে বলে, এত সুন্দর দেখতে তুমি। একবারে নায়িকা শর্মিলার মতো। কিন্তু তোমার মেজাজটা এমন কেন গো! বাড়িতে বুঝি বরের সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছ?

শর্মিলা অবাক হয়ে মেঘের মুখের দিকে তাকায়। তারপর বলে, কেন বলো তো! তোমার কী আমাকে ঝগরুটে মনে হচ্ছে?

না, আমার মনে হল, তুমি খুব রেগে আছ। কিন্তু আসলে তো তুমি এমন মানুষ নও। খুব নরম মনের স্নেহময়ী মা তুমি। তোমার চেহারা তাই বলছে।

শর্মিলা এবার আরো অবাক হয়। সামনের সোফায় বসে পরে। তুমি কী হাত দেখতে পারো? বলে হাত দুটো বাড়িয়ে দেয়।

মেঘ বলে, নাগো, আমি তোমার মুখ দেখে বললাম।কী নিয়ে এত চিন্তা করছ? ছেলেকে নিয়ে?

শর্মিলা এবার পুরোপুরি নিশ্চিত মেঘ হাত দেখতে জানেই। সে বলল, তুমি কী করে জানলে? আমার ছেলেই আছে?

মেঘ কী বলবে ভেবে পেল না সেইমুহূর্তে। সে নিজেও জানে না শর্মিলার ছেলে আছে। খানিকটা আন্দাজেই বলেছিল। সে কথা ঘুরিয়ে বলল, ছেলের রেজাল্ট ভালো হবে, চিন্তা কোরো না।

এবার শর্মিলার মুখ হাসিতে ভরে গেল। আমার ছেলে মাধ্যমিক দিল। মঙ্গলবার রেজাল্ট বেরবে। বলছে তো ভাল রেজাল্ট হবে।

কোন স্কুলে পড়ে?

রামকৃষ্ণ মিশন।

মেঘ এবার একেবারে নিশ্চিত ভাবেই বলল, তোমার ছেলে স্টার পাবেই।মিলিয়ে নিও।

শর্মিলার অঙ্গভঙ্গী, কথাবার্তা সব বদলে গেল। তোমার কোনো অসুবিধা নেই দিদি যতক্ষণ আমি আছি। বলে ফুলে যাওয়া হাতে তখনি থম্বোকম লাগিয়ে দিল। তারপর গা গরম দেখে স্পঞ্জ করে মাথায় জল পট্টি দিয়ে দিল।

মেঘ বিস্মিত হয়ে দেখছিল শর্মিলাকে। ঘরে ঢুকেই যে কর্কশ ভাষার মহিলাকে সে দেখেছিল, এখন তার অনেক পরিবর্তন। বাবা ঠিকই বলতেন, আমরা কেউ জানিনা কে কোন পরিস্থিতিতে কেমন আচরণ করে! অযথা তাকে আক্রমণ না করে শান্ত মাথায় তার সঙ্গে কথা বলো, দেখবে পৃথিবীতে কেউ খারাপ মানুষ নয়। সবার মধ্যেই ভালো লুকিয়ে থাকবেই।

এখানে এসে থেকে মেঘের বাবার জন্য মন খারাপ বেড়ে গেছে। বারবার মানুষটাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। অথচ কোথায় কতদূরে, কত আলোকবর্ষ পেরোলে তাকে আবার পাওয়া যাবে সেটা আর বোঝা হয় না তার।

রাতে সুইপার মেয়েটি আসে। হালকা সবুজ রঙের সিফনের শাড়ি আর পিঠ পুরোটাই কাটা, খালি একটা ফিতে দেওয়া হলুদ ব্লাউজ পরে। এসেই বলে, শরীরটা একদম ঠিক নেই। আজ রাতে তোমার ঘরেই শোবো দিদি।

শর্মিলা বলে, এইটুকু ঘরে কী করে শোবে? সারারাত দিদির স্যা্লাইন চলে, সিস্টার দিদিরা বারবার আসে। তুমি শুয়ে থাকলে তারা ঢুকবে কী করে!

মালা নামে ধপধপে সাদা গোলগাল চেহারার সেই মেয়েটি বলে, তুমি খুব খারাপ। লোকের পিছনে দিন রাত লেগে থাকো। তোমার কখনো ভালো হবে না।

শর্মিলা রেগে উঠে বলে, তোমার নামে আমি এখনি নালিশ করব। তোমার খুব বাড় বেড়েছে। রোজ এসেই অসভ্যতা করো।

মালা বলে, যাকে ইচ্ছে বলো। আমার কিচ্ছু যায়-আসে না। তোমার ঘরের কাজ আমি করব না। আমি এক বাপের বেটি আছি।

মেঘ দেখে পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এদের ঝগড়া কোন দিকে মোড় নেবে সে বুঝতে পারেনা। তাড়াতাড়ি দুজনকেই ধমক দেয়। মালা শান্ত হও। তোমার শরীর খারাপ লাগছে? একটু বোসো এখানে। আমি সিস্টার দিদিকে বলে ওষুধ দিচ্ছি।

শর্মিলা বলে, সব ওর ঢং দিদি। রোজ এমনি ন্যাকামি করে। গুচ্ছের করে পাতা খাবে আর শরীর খারাপের অ্যাক্টিং করবে! একদম বসতে দিও না দিদি।

মেঘ গম্ভীর মুখ করে শর্মিলাকে চুপ করতে বলে মালার দিকে তাকায়। তুমি পাতা খাও?

না মানে হ্যাঁ খাই। নেশা না করলে এতবড়ো হাসপাতাল, হাগা মোতা বমি পরিস্কার করা সম্ভব? তুমিই বলো দিদি? উত্তরের প্রত্যাশা না করেই শর্মিলার দিকে তাকিয়ে বলল, এই যে এদের দেখছ সব আলালের ঘরের দুলাল। পেশেন্টের কোনো কাজ করে না, বেড প্যা্ন দিলে সেটা পর্যন্ত ধুয়ে রাখেনা। জাপা কাপড় কাচে না। খালি পয়সা নেয় বসে বসে।আর বড়ো বড়ো লেকচার। সব শালাকে চেনা আছে। পার্টির কাছে এমন ভাব দেখাবে যে তার মতো ভালো কেউ হয় না। নেকুপুষু সব।

মেঘ বলে, মালা চুপ করো।কোথায় থাক তুমি?

টালা।

তুমি ভগবানে বিশ্বাস করো?

না করাই উচিত। তবু ওই আর কি! রাম সীতা মাইয়া হনুমানজীর পাঠ হয় ঘরে।

রামায়ন মহাভারত পড়েছ?

ওই কৃষ্ণ ভগবানের?

হ্যাঁ।  শোনো যুদ্ধের সময় কৃষ্ণ অর্জুনকে যা যা বলেছিল সেগুলো একটা বইয়ে লেখা আছে। তার নাম গীতা। সেখানে বলেছে, তুমি তোমার কাজ যা সেটা মন দিয়ে করে যাও, বাকিটা ভগবান তোমার জন্য করবেন। তুমি খুব ভালো মেয়ে মালা। তোমার মুখে এসব গালাগাল শুনতে কষ্ট হচ্ছে। মেঘ শান্ত গলায় বলে।

হায় রাম! বলে মালা হঠাৎ মেঝেতে বসে পরে। মুখের উপর দুটো হাত রেখে কাঁদতে শুরু করে।

মেঘের শরীর খারাপ করছিল এতক্ষণ ধরে চলা এসব দৃশ্যে। সে চোখ বুজে ধ্যান করতে শুরু করল।

খানিকবাদে মালা বলে, দিদি তোমার মতো যদি সবাই হতো তবে এ জগতটা ভালো হতো। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি তোমার ঘর, জামাকাপড় সব পরিষ্কার করে দেব। কোনো বেশি টাকা লিব না। মালা এক মরদের বউ আছে। বেইমান না।

মেঘ বলে, মালা এবার আমি একটু শুই, শরীরটা ভালো লাগছে না।

মালা উঠে বসে। শর্মিলার উদ্দেশ্যে বলে, এই যে লাট সাহেবের বউ, দিদির দিকে খেয়াল রাখবে। ঘুমিয়ে রাত কাবার করে দেবে না। যদি দেখি দিদি জেগে আর তুমি ঘুমচ্ছ নাক ডেকে সোজা চাকরি থেকে বের করে দেব।

শর্মিলা কিছু বলার আগেই দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে যায় মালা।

দেখলে দিদি এই অসভ্য মেয়েমানুষটার ব্যবহার! ইচ্ছে করে মেরে দিই। ইউনিয়ন করে বলে খুব চোপা।একদিন বাগে পাই, এমন দেব না!

শর্মিলা চুপ করো। আমার মাথা ঘুরছে। আমি শোবো। লাইট নিভিয়ে দাও, বলে মেঘ আর কথা না বাড়িয়ে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে পরে।

চ্যানেলে টান ধরে। সে আবার সোজা হয়ে শোয় বোনেদের অপেক্ষায়।

সবে রাত ন’টা। সাড়ে নটায় জিয়া আর সুমা এলে শান্তি।বড় ক্লান্ত লাগছে তার।চোখ বন্ধ করে দেয় সে যতক্ষণ না দিদি ডাকটা কানে আসে।    

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত