নববর্ষের লোকজ আয়োজন চড়ক মেলা

Reading Time: 5 minutes
।।দী প ং ক র গৌ তম।।
নববর্ষের লোকজ আয়োজন চড়ক মেলা  বাংলাদেশের লৌকিক ও জনপ্রিয় উৎসব। এ উৎসবের শুরু বেশ আগে থেকেই। চড়ক  বর্ষ গননায় চান্দ্র মাসের পরিচিতি বহন করে। এ দেশে মেলার উৎপত্তি সাধারণত গ্রাম্য সংস্কৃতি থেকে। গবেষকদের মতে, বাংলায় নানান ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান ও উৎসবের সূত্র ধরেই মেলার উৎপত্তি। সেদিক দিয়ে  এ দেশের মেলার প্রাচীনত্ব হাজার বছরেরও অধিক। এ দেশের প্রাচীন পর্যায়ের উৎসব ও কৃত্যানুষ্ঠানকেন্দ্রিক মেলাগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে জীবন ধারনের আহার্য কৃষিশস্য এবং বিশেষ করে কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রোদ ও বৃষ্টির কথা। প্রাচীন বাংলার মানুষ চাঁদ ও সূর্যকে ‘বুড়াবুড়ি’ নামে অভিহিত করেছে এবং এর ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয়েছে ‘বুড়াবুড়ির মেলা’। উল্লেখ্য বুড়াবুড়ির মেলা পরবর্তীতে সূর্যমেলা, সূর্য ঠাকুরের ব্রত, চৈত্রসংক্রান্তি  ব্রতের মেলা, চড়কমেলা ও শিবের গাজন মেলায় রূপ নিয়েছে। মূলত চৈত্র সংক্রান্তি থেকে এ মেলা শুরু হয় যেটার লক্ষ্য থাকে বর্ষবরণ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন। সাধারণ মেলার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে নির্ধারিত স্থানে, নির্ধারিত তারিখ বা তিথিলগ্নে একটি আয়োজন। যেখানে  নরনারী, শিশুকিশোর এমনকি বৃদ্ধদেরও সমাগম ঘটে। তবে মেলার বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে, ব্যবহার্য পণ্য ও গৃহ সামগ্রীর বিশাল সমাবেশ এবং চিত্তবিনোদনের জন্যে  লোকজ সব পালা বা সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের উপস্থাপনা। যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচ ইত্যাদির আসর। সনাতন সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমন ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো। ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল হালখাতা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাবের বই বুঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাবের বই বন্ধ করে নতুন হিসাবের বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানিরা ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত মফস্বলের বিভিন্ন দোকানে। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে নববর্ষ আর মকর সংক্রান্তি বা চৈত্রসংক্রান্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষ করে গ্রামে-গঞ্জে আয়োজিত হয় নীল পূজা বা চড়ক পূজা। কেউবা বলে শিবের গাজন। চড়ক মেলায় বাণ-বড়শি ফুঁড়ে মানত পূর্ণ করে এক দল বিশ্বাসী মানুষ। চড়ক মেলার মধ্যেই বিশাল মেলার আয়োজন হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এ সময়ের লোকাচারগুলোও উপভোগ্য। ‘শিব বলে পার্বতী তুমি হইলা যুবতী আমি হইলাম জটাধারী তাতে তোমার ক্ষতি কি? হর-পার্বতী বা শিব-দুর্গা সেজে দুজন লোক গান গেয়ে গেয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গে থাকে ভরা চৈত্রের রোদ পোড়া একদল দুরন্ত কিশোর যুবা। দলে থাকে একজন শিব ও দু`জন সখী। সখীদের পায়ে থাকে ঘুঙুর। তাদের সঙ্গে থাকে ঢোল-কাঁসরসহ বাদকদল। সখীরা গান ও বাজনার তালে তালে নাচে। এদেরকে নীল পাগলের দলও বলা হয় আবার অষ্টকের দলও বলা হয়। এরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাজনের গান গায় এবং নাচ-গান পরিবেশন করে। বিনিময়ে দান হিসেবে যা কিছু পাওয়া যায় তা দিয়ে হয় পূজা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে যা চড়ক সংক্রান্তির মেলা নামে অভিহিত। বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুতত্বপূর্ণ লোকো উৎসব এটি। চৈত্রের শেষ দিন এ পূজা অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু প্রস্তুতি চলে একমাস আগে থেকে। সমাজের উচ্চ স্তরের লোকদের মধ্যে এ অনুষ্ঠানের প্রচলন খুব প্রাচীন নয়। তবে পাশুপত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীনকালে এ উৎসব প্রচলিত ছিল। ভূমিকেন্দ্রিক সভ্যতার এই  দেশে উর্বরতাও প্রার্থনাস্বরূপ এ পূজার উৎপত্তি বলে উল্লেখ আছে। উর্বরতা শুধু জমিতে নয়, ঘরেও। যেজন্য চড়কের গাছ যে আঙ্গিকে পোঁতা হয় তা পুরুষাঙ্গের আকৃতি বলেই ধরা হয়। এ জন্য চড়ক গাছ যেদিন পুকুর থেকে উঠানো হয় সেদিন যেসব নারীদের সন্তান হয় না তাদের ওই পুকুরে স্নান করানো হয় সন্তান হওয়ার প্রত্যাশায়। চড়ক ঘোরার বিষয়টি চান্দ্র মাসের পরিচয় বহন করে। আধি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা । চিত্রার নামানুসারে এক নক্ষত্রের নাম করা হয় চিত্রা। চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ। তাই হিন্দু ধর্মে চৈত্রের আছে বিশেষ স্থান। চৈত্র মাসের শেষ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বসে বিধাতাকে তুষ্ট করার নানান আয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে অভিনব ও প্রাচীন আয়োজন চড়ক পূজা, সেই সঙ্গে মেলা। চড়ক পূজার ১০-১২ দিন আগে থেকে বিভিন্ন এলাকার পূজারিদের মধ্যে ৪০-৫০ জন সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিব-গৌরীসহ নৃত্যগীত করে মাগন করেন। চড়ক পূজা পর্যন্ত তারা পবিত্রতার সঙ্গে সন্যাসব্রত পালন করে ও আমিষ খাদ্য গ্রহণ করে না। সারা দিন উপবাস পালন করে। চড়ক পূজার ২ দিন আগে থেকে পূজারিরা শ্মশানে গিয়ে পূজা-অর্চনা করে ও শেষে গৌরীর বিয়ে, গৌরী নাচ ও বিভিন্ন গান গেয়ে ঢাকের বাজনায় সরগরম করে গোটা এলাকা প্রদক্ষিণ করে। চৈত্র মাসের শেষ দিন পূজারিরা পূজা করে পান বাটা দিয়ে চড়ক গাছকে নিমন্ত্রণ জানায়। অর্থাৎ দিঘি বা পুকুর থেকে  চড়কগাছ তুলে আনা হয়।তারপর মাঠে গাছ পুঁতে দেওয়া হয়। গাছের চূড়া থেকে প্রায় কোমর পর্যন্ত আড়াআড়ি চারটি পাখার মতো করে বাঁধা হয় চারটি মোটা বাঁশ এবং তাতে যুক্ত করা হয় মোটা-লম্বা রশি। এ সময় শিব ও কালীর নৃত্য দেখানো হয়। নৃত্য শেষে ওই পুকুর বা দিঘিতে স্নান করে সন্যাসীদের জিহবা ও নাকে গহনা গেঁথে দেওয়া হয়। নৃত্যের তালে তালে চড়কগাছ ঘোরানো হয়। দেবতার পূজা-অর্চনা শেষে অপরাহ্নে মূল সন্যাসী চারজনের (কখনও এক বা দুই) পিঠে লোহার দুটি বড়শি গেঁথে রশিতে বেঁধে চড়ক গাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো হয়। চড়ক পূজা মূলত নীল পূজা নামেই পরিচিত। গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজন এই চড়ক পূজারই রকমফের। চড়ক পূজা চৈত্রসংক্রান্তিতে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিবসে পালিত হয়। পতিত ব্রাহ্মণ এ পূজার পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন। পূজার বিশেষ অনুষঙ্গ হলো পাট পূজা বা  শিবের পূজা। একখানা সজ্জিত কাঠ তাতে লালসালু প্যাঁচানো। সিঁদুরে মাখানো মাথার দিকটা। এই পাট একজন মাথায় নেয় আর বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। এই পাটের সামনে কোন গর্ভবতী মহিলা পড়লে তার বিপদের আশঙ্কা থাকে বলে মনে করা হয়। এসব পূজার মূলে রয়েছে ভূতপ্রেত ও পুনর্জন্মবাদের ওপর বিশ্বাস। এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রাচীন কৌমসমাজে প্রচলিত নরবলির অনুরূপ। পূজার উৎসবে বহু প্রকারের দৈহিক যন্ত্রণা ধর্মের অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। চড়কগাছে ভক্ত বা সন্যাসীকে লোহার হুড়কা দিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। তার পিঠে, হাতে, পায়ে, জিহ্বায় এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বাণ শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনো কখনো  লোহার শলাকা তার জিভে ফুঁড়ে দেয়া হয়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এ নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনো তা প্রচলিত আছে। আধুনিকতার অভিঘাতে ঐতিহ্যবাহী মেলাসমূহের চারিত্রিক পরিবর্তন হচ্ছে। তারপরও মেলা শ্রেণিহীন উৎসব। এর কোনো বিকল্প নেই। গ্রাম বংলার মেলার এ আবেদন শেষ শেষ হবে না কখনও। কৃতজ্ঞতাঃ জাগরন    

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>