বহু যুগের ওপার থেকে

।। ছন্দা বিশ্বাস ।।

 

অস্থিরভাবে সেনা প্যারেড গ্রাউন্ডে পায়চারি করছিলেন মিস্টার সাহানি। মনটা ভীষণ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। গত সপ্তাহে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হলেন ক্যাপ্টেন বিজয় সিংহ। বায়ুসেনা বিভাগের গ্রুপ ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি। মাত্র কয়েক বছর হল এখানে জয়েন করেছেন। অথচ এর মধ্যেই ভারতীয় বায়ুসেনাকে একটা বিশেষ জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন তিনি।

সেদিন সকাল দশটার দিকে দশ কিমি দূরের শহরে গিয়েছিলেন। চণ্ডীগড় থেকে বাবা-মা এসেছেন। কিছু কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলেন। মিসেস নম্রতারও সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেরনোর সময়ে শাশুড়ি প্রীতি সিংহের হঠাৎ শরীরটা খারাপ হওয়ায় বিজয় সিংহ একাই বেরিয়ে পড়েন।

দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হয়ে এল। নম্রতা বারংবার ফোন করেও বিজয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারল না। প্রতিবারই সুইচড অফ শোনাচ্ছে। অস্থির হয়ে উঠল নম্রতা।

কী হল বিজয়ের? কোথায় গেল ও? নম্রতা ধৈর্যহারা হয়ে শেষমেশ ওর দীর্ঘদিনের বন্ধু মিস্টার সাহানিকে ফোন করলে মিস্টার সাহানি তৎপরতার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন কয়েকজন স্টাফকে নিয়ে। কয়েকদিন চিরুনি তল্লাশি চালিয়েও কোনও খোঁজ পাননি বিজয়ের। গাড়িটা মেন রোডের ধারে তালাবন্ধ হয়ে পড়ে ছিল।

সেদিন বিজয়ের কোয়ার্টারে গিয়ে মিস্টার সাহানি দেখেন অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন বিজয়ের পিতা গুরুপ্রীত সিংহ। একমনে বিড়বিড় করে কী যেন বলে চলেছেন। চিন্তার ভারে মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। জানলার কপাটে মাথা ঠেকিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন মা প্রীতি সিংহ। চিবুকে, গলায় জলের ধারা শুকিয়ে যাওয়ার চিহ্ন স্পষ্ট। কান্নার শক্তিও বুঝি ফুরিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর দীর্ঘশ্বাস ছা়ড়ছেন তিনি। তাঁরা বেড়াতে আসায় কত খুশি হয়েছিল বেটা তাঁর! কথাটা ভাবতেই বুকের ভিতরটা ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠেছিল থরথর করে। বেশি টেনশন নিতে পারেন না প্রীতি সিংহ। গতমাসে বাইপাস অপারেশন হয়েছিল তাঁর। কয়েক মাস নির্মল বিশ্রামের জন্য ছেলের কাছে এসেছিলেন।

গত রবিবার সকালে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন বিজয়, বাবা-মাকে আনতে। মিস্টার সাহানিকে কিছু সময়ের জন্য দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। বিজয়ের দু’চোখে খুশির ঝিলিক দেখতে পেয়েছিলেন মিস্টার সাহানি সেদিন। মিস্টার সাহানি বিজয়ের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও দু’জনের ভিতরের বন্ধুতার ফারাক কিন্তু এতটুকু কমবেশি ছিল না। দুই পরিবারের ভিতরে হৃদ্যতাও ছিল নিখাদ। নম্রতাকে সাহানি ছোট বোনের মতোই স্নেহ করেন। নিজের তো আপনার জন বলতে কেউই নেই। একটা গভীর শ্বাস ছাড়লেন তিনি কথাগুলো ভাবতে ভাবতে।

কয়েক দিন বাদেই ভারতীয় বায়ুসেনার ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালন করবেন সেনারা। জোরকদমে তারই মহড়া চলছে। তার ভিতর দিয়ে একটু সময় বের করে শহরে গিয়েছিলেন বিজয়। বন্ধু মিস্টার সাহানিকে বলে গিয়েছিলেন, ‘‘এদিকটা একটু দেখে, ঘণ্টা দুয়েকের ভিতরে ফিরে আসব।’’

সকাল থেকেই উৎসবের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। তেজপুর থেকে আগামিকাল তিনটে সুখোই-৩০ এসে পৌঁছবে। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এটি। এ ছাড়া এমআই-১৭ হেলিকপ্টারের মহড়া, স্কাইডাইভিং ইত্যাদি দেখানোরও মহড়া চলছে।

ভারত-চিন যুদ্ধের সময় যে এরোব্যাটিক্স টিম ‘দ্য থান্ডারবোল্ট’-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, বর্তমানে তার কমান্ডার হলেন মিস্টার সাহানি। বিজয়ের খুব কাছের বন্ধু। মিস্টার সাহানি বললেন, ‘‘একদিন বাড়িতে সময় দাও, এদিকটা আমি ঠিক সামলে নেব।’’

মাত্র কয়েক দিন পরিবারের সঙ্গে থাকবেন বিজয়, তারপরেই তাঁকে চলে যেতে হবে সিকিম-ভুটান সীমান্তে। মিস্টার সাহানি সবই জানেন। তাই বিজয়কে একটু পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে দিতে চান।

নর্থ সিকিমের সীমান্তে ‘ফিঙ্গার চিপ’ অঞ্চলটাকে চিন দীর্ঘদিন তাদের নিজেদের অঞ্চল বলে দাবি করে আসছে। সিকিম-তিব্বত সীমান্তের ‘চুম্বি ভ্যালি’-তে গত কয়েক দিনের ভিতরে চিনারা বিপুল সৈন্য মোতায়েন করেছে। এই চিনা সৈন্যদের মোকাবিলা করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর ফিল্ড লেভেল অপারেশনের স্ট্র্যাটেজি তৈরি হয় সুকনার এই সেনা ছাউনি থেকে। যার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন বিজয় কুমার সিংহ এবং মিস্টার সাহানি।

গত সপ্তাহে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ এখানকার কয়েকটা বৌদ্ধগুম্ফা থেকে বেশ কয়েকজন চিনা গুপ্তচরকে আটক করেছে। তিব্বতি শরণার্থী সেজে নেপাল-সিকিম হয়ে এখানে এসেছিল তারা। নিরাপত্তা এজেন্সিগুলো তাই গুম্ফাগুলোর উপরে কড়া নজরদারি চালাচ্ছিল। সেদিন দলাই লামা এসেছিলেন ধর্ম সম্মেলনে যোগ দিতে। তিন দিন ধরে চলল সেই মহাসম্মেলন। ধর্মচক্র বিহারের পিছনের মাঠে বিপুল লোকসমাগম হয়েছিল। বহু দূর-দূরান্ত থেকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়াও সাধারণ মানুষ এসেছিলেন শুধুমাত্র শান্তির বাণীর প্রচারক এই মহান মানুষটিকে দেখার জন্য, তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী শোনার জন্য।     

সেই ধর্মমহাসভার ভিতর থেকে গোয়েন্দারা চিনা গুপ্তচর সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেন। গত কয়েক দিন ধরে তাঁরা নজরদারি চালাচ্ছিলেন নিতান্ত সাধারণ বেশে।

 

গত দু’দিন দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি নম্রতা। শাশুড়ি ঘুমের ওষুধ খান তাই অনিদ্রা কী তিনি বুঝতে পারেন না। শ্বশুরমশাই সারাটা দিন-রাত অস্থিরভাবে পায়চারি করেছেন কোয়ার্টারের চৌহদ্দির ভিতরে। চিন্তা করতে করতে মাথার ভিতরটা গরম হয়ে মনে হচ্ছে ঘিলুটা তরল বাষ্প হয়ে মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে।

অবস্থা বেগতিক দেখে মাথায় জল ঢেলেছে নম্রতা। নিজের দুশ্চিন্তা, কষ্টকে গোপন রেখে সান্ত্বনা দিয়েছে শ্বশুর, শাশুড়িকে। ‘‘অত চিন্তা করবেন না, দেখবেন আপনার ছেলে কয়েক দিনের ভিতরেই ফিরে আসবে।’’

একমাত্র সন্তানের জন্য যে কী গভীর দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, মর্মযাতনা হচ্ছে নম্রতা সেটা উপলব্ধি করতে পারছে। তাই কোনও সান্ত্বনাবাক্যই তাঁদের ভিতরের অস্থিরতাকে প্রশমিত করতে পারছে না।

গতরাতে কী একটা শব্দ শুনে নম্রতা দরজা খুলে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। গভীর রাত। চারিদিক শুনশান। জঙ্গলের ভিতরে তাদের আবাসন। সেনা ছাউনি ছাড়ালেই বৈকুণ্ঠপুরের ঘন অভয়ারণ্য। রাত-বেরাত হাতি, হায়না, লেপার্ড ঘুরে বেড়াচ্ছে যেখানে সেখানে। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে মাঝে মাঝে হিংস্র লেপার্ড ঢুকে পড়ছে ওদের চৌহদ্দির ভিতরে। সেদিন তো একটাকে ঘুমপাড়ানি গুলি করে জাল দিয়ে মুড়ে জঙ্গলে ছেড়ে দিলেন বনবিভাগের লোকেরা। মাঝে মাঝে দুরন্ত বাইসনও দল বেঁধে চলে আসে। তবে ওরা কাঁটাতার ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকতে পারে না।

সারাদিনের উৎসব-শেষে সবাই গভীর নিদ্রায় মগ্ন। শুধু জেগে আছে তিনজো়ড়া চোখ। অন্তহীন অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ঠিক রাতের নক্ষত্রের মতো। নির্বাক বিস্ময়-ঘোর চাহনি।

নম্রতা দেখল শ্বশুরমশাই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে সিধা শালগাছের তলায় এসে দাঁড়ালেন। আলোয় আলোকিত কোয়ার্টারের সামনেটা। কিন্তু সেই আলোর চৌহদ্দি ছাড়ালেই নিকষ কালো অন্ধকার। নম্রতার বুকের ভিতরে জমাট বাঁধা অন্ধকারের মতোই গাঢ়। এই আলো যেন অন্ধকারকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। সে জানে না বিজয় এখন কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন নাকি আদৌ —। ভাবতে পারছে না, কিছু ভাবতে পারছে না ও।

ফাল্গুন চলে গেলেও এখনও শীত-শীত ভাব। চারিদিক কুয়াশায় ঢাকা। দূরে জঙ্গল থেকে হায়নার পৈশাচিক হাসি শোনা যাচ্ছে। সঙ্গে বন্য কুকুরের উল্লাসধ্বনি। শিয়ালের ডাক মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে-বহুদূরে। এ রাত শুধুমাত্র অরণ্যের সন্তানদের ভোগদখলে।

একটু অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিল নম্রতা। দেখল সামনে একটা ছায়ামূর্তি। ক্রমশ তাদের কোয়ার্টারের দিকে হেঁটে আসছে। নম্রতা ভাবল নিশ্চয়ই সিকিওরিটির কেউ। কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেদ করে বাইরের কেউ প্রবেশ করতে পারে না এখানে।

সামনের রাস্তা ধরে যিনি হেঁটে আসছিলেন তিনি গুরুপ্রীতের সামনে এসে দাঁড়ালেন। জি়জ্ঞাসা করলেন, ‘‘এত রাতে বাইরে কেন, বাবুজি?’’

‘‘ঘুম আসছে না,’’ কাঁপা-কাঁপা গলায় বললেন গুরুপ্রীত।

‘‘তবু, এত রাতে একলা এইভাবে বাইরে বেরনো ঠিক না। হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের বিশ্বাস নেই। যান, ঘরে যান।’’

কথাটা বলে গুরুপ্রীতকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন তিনি। নম্রতা দেখল মিস্টার সাহানি। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘‘বিপদে ধৈর্য ধরা ছাড়া আর তো কোনও পথ নেই। স্বরাষ্ট্র দফতর পর্যন্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। আশা করছি শিগগির বিজয়ের খোঁজ পেয়ে যাব।’’

নম্রতা জানে কতটা দুঃখী এই মানুষটা। জঙ্গিরা ওঁর পুরো পরিবারটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। বাবা, মা, বউ আর দু’মাসের শিশুপুত্র — কাউকে বাঁচিয়ে রাখেনি জঙ্গিরা। সাহানি তখন মধ্যপ্রদেশে থাকতেন। বস্তারে।

তবুও তো তিনি বেঁচে আছেন। দেশকে রক্ষা করার জন্য আজও ছুটে যান দুর্গম থেকে দুর্গমতর এলাকায়। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য তাঁর। কী কঠিন দৃঢ় সংকল্পে মোড়া মন। বিজয়ের থেকে বছর দশেকের বড়। অথচ মেশেন বন্ধুর মতো। ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন বিজয়কে।

পূব আকাশে শুকতারাটা জ্বলজ্বল করছিল। স্মৃতির আঁধি চলছে মনের ভিতরে। তপ্ত মরুবাতাস ছুটে যাচ্ছে হু হু করে। নম্রতা একইভাবে তাকিয়ে থাকে সারাটা রাত।

দিদির বিয়েতে প্রথম দেখা হয়েছিল বিজয়ের সঙ্গে। তারপর ভাললাগা, প্রেম। তখন কত বা বয়স নম্রতার — পনেরো কি ষোলো। বিজয়ের তেইশ। তারপর ও জেএনইউ-তে হিস্ট্রিতে মাস্টার্স করে বিয়ের পিঁড়িতে বসল। দুই পরিবারের ভিতরে সুন্দর হৃদ্যতা, গভীর বোঝাপড়া। সুন্দর যুগলবন্দি!

বিয়ের দু’দিন বাদে নম্রতাকে নিয়ে সোজা কাশ্মীরে উড়ে চলে এসেছিলেন বিজয়। সেই সময়ে বরফের চাদরে মোড়া ছিল ভূস্বর্গ। পাইন, দেবদারু আর উইলো গাছেরা যেন তখন আস্ত বরফ গাছ। ডাল লেক জমে বরফ। হাউজ়বোটগুলো সঙ্গীহীন। শিকারাগুলো পরপর সাজানো, মালিকবিহীন। বরফে মোড়া পীরপঞ্জাল পাহাড়শ্রেণি। হু হু করে ছুটে চলেছে শৈত্যপ্রবাহ। সঙ্গে তুষারপাত। নম্রতা তখন বিজয়ের বলিষ্ঠ চওড়া বুকের গভীরে ডুবে গিয়ে উত্তাপ নিচ্ছে এবং দিচ্ছেও।

ক্যাপ্টেন বিজয় সিংহের অপহরণের পর থেকে ভারতের গোয়েন্দাবাহিনী গুম্ফা রহস্যের সন্ধানে বেশ তৎপর হয়েছে। সিকিম, দার্জিলিং এবং কালিম্পং-এ গুম্ফার সংখ্যা হঠাৎ করে এত বেড়ে যাওয়ার কারণ কী, কারাই বা এদের অর্থসাহায্য করছে, নিয়মিত কাদের সঙ্গে এদের যোগাযোগ রয়েছে সে ব্যাপারেও জোর তল্লাশি চলছে।

এই মুহূর্তে স্বরাষ্ট্র দফতর পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই তিনটি জায়গার বিভিন্ন মনাস্ট্রিগুলোতে চিনের প্রভাবের কথা শোনা যাচ্ছে।

ভারত-নেপাল সীমান্তেও চিনের সক্রিয়তা বেড়েছে। চিনা গুপ্তচরেরা নেপালকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ভারতবিরোধী কাজকর্ম চালাচ্ছে। ঝাপা, ইলম এবং পঞ্চথর নামে সীমান্তের তিনটি জেলায় চিনের নিয়ন্ত্রণে যে এফএম রেডিও স্টেশন আছে, সেখানে সারাদিন ভারতবিরোধী প্রচার চলছে। এই সব গ্রামের তরুণ-তরুণীদের টাকার বিনিময়ে নানা কুকর্মে নিযুক্ত করছে চিন। কাজের সুবিধের জন্য তাদের ম্যান্ডারিন ভাষাও শেখানো হচ্ছে। পয়সার বিনিময়ে নেপালিরা গুপ্তচরের কাজ করছে। আর তার জন্য শিলিগুড়িকে তারা বেছে নিয়েছে।

সারা দিন-রাতের ভিতরে মিস্টার সাহানি একবার না একবার বিজয়ের কোয়ার্টারে পা রাখেনই। হালকাভাবে কথা বলে গুরুপ্রীত-প্রীতির চিন্তা লঘু করার চেষ্টা করেন। নম্রতাকে বলেন, ‘‘বহেনজি, কড়া করে এক কাপ আদা-চা হয়ে যাক।’’

নম্রতা চা বানাতে বানাতে শোনে মিস্টার সাহানির কথাগুলো। দিল্লি প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। খুব কড়া ভাষায় চিনের স্বরাষ্ট্র দফতরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ক্যাপ্টেন বিজয় সিংহকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।

‘‘গোয়েন্দারা কী বলছেন? বিজয় ভারতেই আছে?’’ কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চান গুরুপ্রীত।

‘‘ওদের অনুমান বিজয় এখন ভারতেই আছেন। এটুকু সময়ের ভিতরে ওরা কিছুতেই ওকে চিনে নিয়ে যেতে পারেনি।’’ মিস্টার সাহানির গলায় আশ্বাসের সুর।

‘‘কিন্তু যদি বিমানে নেপাল কিংবা চিনে নিয়ে যায়?’’

‘‘সেটা সম্ভব হয়নি হয়তো। বিমানবন্দরে যা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা।’’

‘‘তা অবশ্য ঠিক। তবে —।’’ গুরুপ্রীত মাথা নাড়েন।

নম্রতা গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে দু’কাপ চা নিয়ে যায়। চায়ের কাপটা হাতে নিতে নিতে মিস্টার সাহানি বলেন, ‘‘ডাক্তারবাবু এসেছিলেন?’’

‘‘হ্যাঁ।’’ ঘাড় নাড়ে নম্রতা।

গুরুপ্রীত জানান, ডাক্তারবাবু আর ওঁর মিসেস আজ অনেকটা সময় ওঁদের সঙ্গে কাটিয়ে গেছেন। ডাক্তারবাবু যে ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন তাই খেয়েই দু’জনে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। প্রীতি তো এখনও ঘুমচ্ছেন।

মিস্টার সাহানি এলে গুরুপ্রীতই যা কথা বলার বলেন। ঘরের ভিতর থেকে চুপচাপ নম্রতা শোনে কথাগুলো। নম্রতা আজকাল চুপচাপই থাকে সারাটা দিন। খুব প্রয়োজন না হলে একটা বাক্যও শোনা যায় না তার মুখ থেকে।

গুরুপ্রীত এখন অভয় দেন ওকে, ‘‘চিন্তা কোরো না, ওদের একটা দাবি আছে। চিনা গুপ্তচর সন্দেহে যাদের ধরেছে, তাদের ছেড়ে দিলেই ওরা বিজয়কে ছেড়ে দেবে। একজন ক্যাপ্টেনকে মেরে ফেলার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত ওরা নেবে না। এ বিশ্বাস আমার আছে।’’

প্রীতি বিড়বিড় করেন, ‘‘তুমি থাকো তোমার বিশ্বাস নিয়ে। কী করেছে গোয়েন্দারা? মানুষটা কোথায় আছে তাই-ই বলতে পারছে না!’’

‘‘গুপ্তচরদের গোয়েন্দারা এই মুহূর্তে কিছুতেই ছাড়বে না। ওদের মুখ থেকে নানা তথ্য বের করার চেষ্টা করছে। তা হলে তো ওরাও বিজয়কে ছাড়বে না!’’ নম্রতা ভাবতে ভাবতে বহুদূর এগিয়ে যায় আবার পিছনে ফেরে।

সেনা ব্যারাকের উলটোদিকে ছোট্ট চায়ের গুমটি বানিয়েছিল নেপালি ছেলেটা। কী সুন্দর ব্যবহার। বিকেলের দিকে সেনারা ওর দোকানে আড্ডা মারত বা খেত।

সপ্তম ছেলেটা কারও কারও কোয়ার্টারেও ঢুকত। এমনই সুসম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছিল। ও-ই যে অপহরণের ছক কষেছিল তলে তলে তা কেউই বুঝতে পারেনি।

বিজয় সিংহ অপহরণের পর থেকে সপ্তম উধাও। যে মোবাইল ফোনে সারাক্ষণ কথা বলত, সেটা এখন সুইচড অফ। বিজয় কোয়ার্টার থেকে বেরনোর পর সপ্তমের চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিছু কথাবার্তাও হয়েছিল। যারা দেখেছে তারা বলছে, গাড়িতে নাকি সপ্তমও সেদিন উঠে বসেছিল। গোয়েন্দাদের ধারণা, টাকার বিনিময়ে সপ্তমই এ কাজ করেছে। বিজয়কে আটকাতে পারলে চিনের অনুপ্রবেশ সহজ হবে।

 

মিস্টার সাহানির কথাগুলো গল্পের মতো শোনাচ্ছিল। বিজয়কে অপহরণের ছকটা ওরা নাকি বেশ কিছুদিন ধরেই করেছিল। এতদিনে স্পষ্ট হল বিজয়কে কারা কীসের জন্য অপহরণ করল। সেনাপ্রধানকে অপহরণ করলে সৈন্যদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে।

নম্রতা ভাবে, সেদিন যদি ও একা ওভাবে শহরে না যেত, তা হলে তো ওরা বিজয়কে অপহরণ করতে পারত না! সেক্ষেত্রে কী করত? আগে থেকে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেনি কেউই।

মিস্টার সাহানির মনে পড়ল বেশ কিছুদিন আগে হাসিমারায় বায়ুসেনার এক অনুষ্ঠানে একজন সামরিক প্রধানের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিল। তিনি অরুণাচল প্রদেশের পার্বত্য ডিভিশনের সেনাপ্রধান। তিনি বলেছিলেন, ‘‘চিন কিন্তু তোমাদের সুকনার ওই তেত্রিশ নম্বর কোয়ার্টারকে টার্গেট করেছে। অতএব সাবধান!’’

এত সাবধানতা সত্ত্বেও কিন্তু শেষরক্ষা হল না। শেষ পর্যন্ত বিজয় সিংহকে অপহৃত হতে হল।

গুরুপ্রীত আর ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না। সেদিন মিস্টার সাহানি এলে গুরুপ্রীত একটা কথা জিজ্ঞাসা করলেন। ‘‘ছেলেটা বেঁচে আছে তো?’’ তীব্র অভিমানের সঙ্গে একটা অসহিষ্ণুতা বেরিয়ে আসে।

সাহানি বোঝেন, এটা স্বাভাবিক। এখন এই চিন্তাগ্রস্ত, আবেগবিহ্বল, উৎকণ্ঠিত  লোকগুলোর সামনে দাঁড়াতে গেলে তাঁর যেন নিজেকেই অপরাধী মনে হয়। নতুন কোনও সংবাদ দিতে না পারায় তাঁর উপর গুরপ্রীতের বিশ্বাসে চিড় ধরতে শুরু করেছে।

প্রীতিও আজকাল মন দিয়ে তাঁর কথা শোনেন না। নির্বাক আকাশের নীরব তারাদের সঙ্গে যেন নিজের নীরবতা মিশিয়ে দিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন সুদূর নক্ষত্রলোকে। কবে কোন সময়ের বাঁকে যেন তাঁর ছেলে হারিয়ে গেছে, আর তার ছায়াপথ আঁকা আছে আকাশের বুকে। 

নম্রতা বুঝতে পারে, এবারে একাই তাকে লড়তে হবে। এ লড়াই ওর একার লড়াই। প্রথম প্রথম যে তোড়জোড় চলছিল, তার অনেকটাই এখন থিতিয়ে গেছে। শুধু ওর মনের দাবানল দিনকে-দিন সব পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে। কী আছে ওর ভাগ্যে? কঠিন কোনও অভিশাপ? নাকি পরম প্রশান্তি?

মিস্টার সাহানি ফিরে গেছেন চুম্বি ভ্যালিতে। বিজয়ের জায়গায় তাঁকেই এখন দায়িত্ব নিতে হয়েছে। ভারতীয় সেনাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখছেন। যাওয়ার সময়ে নম্রতা এবং বিজয়ের মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে গেলেন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার সময়ে গুরুপ্রীত বললেন, ‘‘যাও বেটা, যে উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি যাচ্ছ, তা যেন সফল হয়।’’

নম্রতা জলভরা চোখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। ধীর পায়ে মিস্টার সাহানি বেরিয়ে এলেন ওদের কোয়ার্টার থেকে। নম্রতার সহসা মনে হল ও যেন অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ল। এই একটা মানুষই এই বিপদের দিনে মনে ভরসা জোগাত, সাহস এবং সান্ত্বনার কথা বলত।

নম্রতা একাই একদিন বেরিয়ে পড়ল। দিল্লিতে পৌঁছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করল সে। নম্রতার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনলেন মন্ত্রীমশাই। স্বামীর জন্য ভারতীয় মেয়েরা যে কতদূর যেতে পারে, তার উদাহরণ সুদূর পৌরাণিক যুগ থেকে চলে আসছে। সেইসব কাহিনি তাঁর অজানা নয়। সতী-সাবিত্রী-বেহুলার দেশ এই ভারতবর্ষ।

কিন্তু এই মেয়েটিকে তিনি যত দেখছেন তত অবাক হচ্ছেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তিনি। অথচ এরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়নি। নম্রতা এসেছে তাঁর কাছে শেষ আশা নিয়ে।

নম্রতা রাষ্ট্রপতির কাছে এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরে ই-মেল পাঠিয়েছে। ফেসবুক, টুইটারের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তার ‘ফ্রেন্ডস’ মারফত। কোনও কিছুর বিনিময়ে সে স্বামীকে হারাতে পারবে না। প্রয়োজনে বন্দিদের মুক্তি দিয়ে সে তার স্বামীকে ফিরে পেতে চায়।

নম্রতা সেদিন সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলে, ‘‘পরের পর বিনিদ্র রজনী কাটাচ্ছেন অশীতিপর বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি। তাঁদের কাছে তাঁদের সন্তানকে ফিরিয়ে দিন। ক্যাপ্টেন বিজয় সিংহ নিরপরাধ। দেশের প্রতি যিনি কর্তব্যপরায়ণ এমন একজন সেনানায়ককে কেন চিনা গুপ্তচরদের বিনিময় হিসেবে চিনা অপহরণকারীদের হাতে বন্দি থাকতে হবে?’’

যুদ্ধ করতে করতে ক্যাপ্টেন বিজয় সিংহ যদি শহিদ হতেন তা হলে নম্রতা সেই মৃত্যুকে মেনে নিয়ে মনকে সান্ত্বনা দিতে পারত। তা ছাড়া সে এখন আর একা হয়। তার সমস্ত সত্তার সঙ্গে মিশে আছে বিজয়ের আগামি দিনের স্বপ্ন, ইচ্ছা, যাকে নম্রতা একটু একটু করে বড় করছে গর্ভে।

নম্রতার শেষ কথাগুলো মন্ত্রীমশাইয়ের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি নম্রতার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তার এক চোখে বেদনার অশ্রু আর অন্য চোখে প্রতিজ্ঞার আগুন।

মন্ত্রীমশাই কথা দেন, ‘‘আগামি আটচল্লিশ ঘণ্টার ভিতরে বিজয়ের কেসটার একটা হেস্তনেস্ত তিনি করবেনই।’’

স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে বেরিয়ে নম্রতা দিল্লির রাজপথে পা রাখে। একটা জনজোয়ার ঘিরে ধরেছে তাকে। অসংখ্য মুখ, অসংখ্য ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, রিপোর্টাররা গিজগিজ করছে। কী কথা হল জানার জন্য সকলে উদগ্রীব।

নম্রতা সেই ভিড় ঠেলে গাড়িতে উঠে বসল। তারপর সোজা এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিল। শুধু মনে পড়ছিল — আর মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা তাকে অপেক্ষা করতে হবে। একটা উত্তেজনা অনুভব করল সে। ও কি ফিরে পাবে বিজয়কে?

ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল নম্রতা। গুরুপ্রীত এবং প্রীতি ওর সঙ্গে ঘরে এসে দাঁড়ালেন। একদিনে কী হাল হয়েছে মেয়েটার! মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। চোখের নীচে কালি পড়েছে। শরীর শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। শুধু পেটটা বুঝিয়ে দিচ্ছে সে একা নয়। সেই হরিণ-পায়ে ছুটে বেড়ানো মেয়েটা এখন অনেক ধীর, শান্ত।

কী বার্তা নিয়ে এল মেয়েটা? ভিতরে ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করছেন গুরুপ্রীত-প্রীতি। কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারছেন না। সময় হলে নিজের সব কিছু তাঁদের বলবে এ বিশ্বাস তাঁদের আছে।

ড্রেস ছেড়ে চোখেমুখে জল দিয়ে বিছানার উপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল নম্রতা। প্রীতি মাথার উপরের পাখাটা চালিয়ে দিলেন নিঃশব্দে। নম্রতা চিন্তার সাগরে ডুব দিল সহসা। মন্ত্রী তাঁর কথাটা রাখবেন তো? নাকি শুধুই মিথ্যে সান্ত্বনা দিলেন তাকে! বিজয় কি বেঁচে আছেন? ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো টুকরো স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে। আধো ঘুম আধো জাগরণে নম্রতা যেন দেখতে পাচ্ছে বিজয়কে। সেই হাসিমুখ, সেই চাহনি, সেইসব খুনসুটি।

বিয়ের পর একবার সিকিমে এসেছিল নম্রতা-বিজয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। দিনে-রাতে তুষারপাত হচ্ছে। সঙ্গে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। ঘরের ভিতরে আগুন জ্বলছিল। বিজয়ের বুকের সঙ্গে লেপ্টে কম্বলের ভিতরে শুয়ে বিজয় নম্রতাকে ইন্টারনেটে দেখাচ্ছিলেন চুম্বি ভ্যালি। একেবারে টপে। দুটো মেন পাস আছে — নাথু লা পাস এবং জেলেপ লা পাস। প্রায় সাড়ে ন’হাজার ফিট উপরে এই উপত্যকা। সেই সময়ে চারিদিকে ফুলের মেলা বসেছে। সবুজ পাতার ভিতরে ফুটে আছে হলদে রঙের ফুলগুলো। জঙ্গল আলো করে আছে ‘পেডিকুলারিস চুম্বিকা’। যার নামানুসারে এই চুম্বি ভ্যালি। গভীর আবেশে বিজয়ের কথাগুলো শুনেছিল নম্রতা। অবাক হয়ে ওকে দেখত।

নম্রতা যেন আবছা ভাসা ভাসা চোখে পাচ্ছে বিজয় ওদের কোয়ার্টারের দিকেই হেঁটে আসছেন। হাতে সেই হলদে ফুল। মচমচ ধ্বনি তুলে শুকনো পাতার উপর দিয়ে আসছেন তিনি। নম্রতা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে তাঁর আগমনধ্বনি। এ শব্দ নম্রতার খুব চেনা। একটু বাদেই গেটের কাছে পৌঁছে যাবেন বিজয়। তারপর কলিং বেলটা টিপবেন আলতো করে। ডিংডং, ডিংডং, মাত্র দু’বার। মাঝের এই সময়টুকুর পার্থক্য থেকে বিজয়কে চিনতে পারে নম্রতা। এ বিজয় না হয়ে যায় না।

কলিং বেল টেপার আগেই নম্রতা দরজা খুলে দিয়েছিল। দেখল, কয়েকজন জওয়ান একটা কফিন এনে তার দরজার সামনে দাঁড়াল। চমকে উঠল নম্রতা। সহস্র বজ্রের কুটিল রেখা আকাশটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল সহসা। ঘরের ভিতরে প্রীতি চিকন সুরে কাঁদতে লাগলেন। বৃদ্ধ গুরুপ্রীত মেঝেতে নতুন একটা গালিচা পেতে দিয়ে তার উপরে সুন্দর বেডকভার বিছিয়ে দিলেন। জওয়ানেরা কফিন থেকে বিজয় সিংহের দেহটা তুলে মেঝেতে সুসজ্জিত বিছানার উপরে শুইয়ে দিল। গুরুপ্রীত খুব সাবধানে আস্তে আস্তে ছেলের স্পাইক লাগানো জুতোজোড়া খুলতে খুলতে বললেন, ‘‘খুব ছোটবেলায় বেটা আমার এরকমই কাঁটা লাগানো জুতো পরবে বলে বায়না করত।’’

কথাগুলো এত আস্তে আস্তে বলছিলেন গুরুপ্রীত যাতে ছেলেটার ‘ঘুমের’ ব্যাঘাত না ঘটে। বিজয়ের মুখের দিকে ঝুঁকে পড়লেন গুরুপ্রীত। তারপর উঠে গিয়ে নম্রতাকে বললেন, ‘‘একটা তোয়ালে ভিজিয়ে ওর মুখটা মুছিয়ে দাও। সাবধানে, যেন ঘুম না ভাঙে।’’

নম্রতা তোয়ালে ভিজিয়ে এনে আস্তে আস্তে বিজয়ের মুখটা মুছে দিল। তারপর ওর গলায়, বুকে, সর্বাঙ্গে কোমল হাতটা বোলাতে লাগল। দেখল, মৃত্যুর এক গভীর মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছে মুখখানা। ও যেন নিজের ভিতরে নিজেই বিলীন হয়ে গেছে।

পাথরের মূর্তির মতো নম্রতা বিজয়ের খুব কাছে বসে ভাবতে লাগল। কে এই মানুষটা, যাকে এতটা কাল ও আপনার বলে জেনেছে? যার সঙ্গে একীভূত হয়েছে দিনের পর দিন। এ তো তার কেউ নয়! মৃত্যু এসে বলে গেল সেই মানুষটা আর এ দুটো আলাদা ‘সত্তা’। সামনে যার মরদেহ পড়ে আছে সে-ই সত্য।

বিয়ের আগে পর্যন্ত ওর আর বিজয়ের দুটো আলাদা হৃদয় ছিল। মৃত্যুর পরে দু’জনের চিরবিচ্ছেদ ঘটে গেল। তা হলে মাঝের ওই ক’টা দিন কি মিথ্যে? মায়া? প্রবঞ্চনা?

নম্রতা বিজয়ের বুকের উপরে মাথা রেখে অনুভব করতে লাগল। দেখল সেখানে মৃত্যুর হিমশীতল নীরবতা। নম্রতা বিজয়ের সমস্ত শরীর তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনও দরজা পেল না যেখান দিয়ে এই দুর্ভেদ্য দুর্গে ও প্রবেশ করতে পারে। মৃত্যু নামক কঠিন প্রাকারে আবদ্ধ এই দুর্গ।

নম্রতা মৃত্যুর সামনে নতজানু হয়ে বসল। মৃত্যু যেন বলে দিল তোমরা ছিলে আলাদা দুটো নদী। নম্রতা চোখ মেলে দেখতে লাগল চিরপরিচিত অথচ অপরিচিত এই সত্তাটিকে। যে শিশু জন্ম নেবে আগামি দিনে, তার সঙ্গে কোনওদিন পরিচয় হবে না তার। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাসকে সম্বল করে বয়ে বেড়াতে হবে আমৃত্যুকাল।

গুরুপ্রীত চাইছিলেন নম্রতা কাঁদুক। তাই নম্রতা আর বিজয়ের বিশেষ বিশেষ দিনের মুহূর্তগুলোকে তুলে ধরতে লাগলেন। ওয়ার্ড্রোব খুলে বের করলেন দামি কাশ্মিরী শাল। বিজয়ের খুব পছন্দের শালটা নম্রতার হাতে দিয়ে বললেন, ‘‘ওর গায়ে জড়িয়ে দাও।’’

এরপর কাচের গ্লাসে একগ্লাস দুধ আনতে গিয়ে সহসা গ্লাসটা হাত থেকে মেঝেতে সশব্দে পড়ে যেতেই নম্রতা ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল সেই শব্দ শুনে। এতক্ষণ কি তা হলে ও স্বপ্ন দেখছিল?

‘‘বাবা…মা…নম্রতা…’’

বিজয় ডাকছেন তাদের। সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর অথত নম্রতা যেন বুঝে উঠতে পারছে না। এ কার কণ্ঠস্বর? কে ডাকছে তাদের? ধড়ফড় করে উঠে বসল নম্রতা। দুরুদুরু বুকে সে দেখল দরজার কাছে বিজয় দাঁড়িয়ে। আর তাঁর বুকে দু’জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। আকুল নয়নে কাঁদছেন তাঁরা।

বিজয় ফিরে এসেছেন। অপহরণকারীরা বিজয়কে ছেড়ে দিয়েছে। মিস্টার সাহানি না থাকলে বিজয়ের সঙ্গে আর কোনওদিন হয়তো তাদের দেখা হত না। নম্রতার কাছে সব যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। মিস্টার সাহানি কীভাবে খোঁজ পেলেন বিজয়ের?

স্বপ্নের ঘোরটা নম্রতার কাটতে চাইছে না কিছুতেই। মনে হচ্ছে বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে আসছে কার কণ্ঠস্বর। খুব চেনা গলা অথচ অচেনা। মানুষটা কে? বিজয় তো? বিজয় সিংহ? ক্যাপ্টেন শ্রী বিজয় সিংহ? নম্রতার ভাবী সন্তানের পিতা?

 

 

 

 

 

কৃতজ্ঞতা : সানন্দা

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত