শিকাগো ডায়েরি (পর্ব-৫)

চতুর্থ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

  কুমড়ো  vs স্কোয়াশে

শিকাগোর লিটল ইটালি হল  ইলিনয় ইউনিভার্সিটি ভিলেজের মেডিক্যাল ডিস্ট্রিক্ট এর মধ্যে একটি অধ্যুষিত জায়গা। ইটালিয়ান কমিউনিটির মূলতঃ আবাস ছিল এই অঞ্চল। তাই এমন নাম। প্রচুর ইটালিয়ান ইমিগ্রেন্টস ঢুকেছিল একসময়। আমাদের থাকা এখানেই, লিটল ইটালিতে, ছোট্ট একতলার বাড়িতে। সেই নভেম্বরের থ্যাংকসগিভিংয়ের সময় থেকে বরফের দাপট শুরু হয়েছিল। একটানা পাঁচ-ছ’মাসের পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস বসন্তের আগমনে। আশপাশ, চারদিক যেন দুধসাদা বরফের সমাধি থেকে হঠাত জেগে উঠে রঙীন হতে শুরু করেছে  সবেমাত্র।  বসন্তের রং নিয়ে জেগে উঠেছে গাছপালা। নিঃস্বপাতা শূন্য শুকনো ডালের মুকুলিত শাখায় লালের ছোঁয়া। রোদ এসে পড়েছে কচি ফ্লোরেসেন্ট  সবুজ পাতার আগায়। ব্যাকড্রপে আকাশের নীল রং যেন চুঁইয়ে পড়ছে সেই গাছের ওপর।

রবিবারের ভোর হতেই সবার মনে পড়ল সাপ্তাহিক বাজারের কথা। মুসলী টক দৈ তে ভিজিয়ে রেখেছিল নীলাঞ্জনা। অপূর্ব ফলার।তিল থেকে তিসি, কুমড়োর বীজ থেকে কিয়া, সূর্যমুখী থেকে আরো সব কি সব শুকনো দানাগুলো ফুলে উঠলো দৈয়ের মধ্যে। এবার তার মধ্যে ড্রাই ফ্রুটস, মধু ছড়িয়ে উত্তম স্বাস্থ্যকর দধিকর্মা দিয়ে প্রাতঃরাশ হল।

এবার চল, চল। মাত্র মাইলখানেক হেঁটেই গ্রসারি স্টোরস। রোদের আলো মেখে রবিবারের শুনশান রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা। হাতের মুঠোয় ফোনের ফর্দে চোখ। শুক্তোর বাজার লিস্ট মিলিয়ে, চিংড়ি ভাপা, চেট্টিনাড চিকেন মশালা, ডানকিন ডোনাটস, তুলতুলে ক্রোয়েসান্ট, বাটার্ড পেকন আইসক্রিম, বেলজিয়ান ওয়্য়াফল আরো কত কি সব কেনাকাটি। সবজীর তাকে চোখ পড়তেই মায়ের চোখ পড়ে কচি কচি ছোট্ট ছোট্ট রাঙামূলোর দিকে। ও মা! শাক সমেত মূলো?  শিগ্‌গির নিয়ে নে। ভিটামিন ই, কে, আরো কত কিছু থাকে মূলোশাকে। মা, তুমি মূলো দেখে এমন করছ? ছেলে জানেনা তো বছরের প্রথম মূলো দেখে আমাদের মায়েরাও এমনি করে এখনো। রন্ধন পটিয়সীদের এমনি হয় বুঝি।  শুক্তো, চচ্চড়ির অবিচ্ছেদ্য অনুপান এই সাধের রাঙামূলো। পাশেই কাঁচকলা,বেগুণ, বরবটি, করলা। এক আকাশের নীচে সবাই একত্রে । তারপর আলু। ফ্রিজে নাকি সমাধিস্থ কিছু ডাঁটা পড়ে আছে।  বড়ি এসেছে সুদূর প্রাচ্য থেকে। কড়াইয়ের ডালের হিং দেওয়া বড়ি।

সেই কবে জানি রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন, যার জন্যে যা তা দিতেই হবে। পাঁচফোড়ন কিনে আনিয়ে রান্না হয়েছিল তাঁর জন্যে। অতএব ফোড়ন বিনে বাঙালীর রান্না অচল। মূলো বিনে শুক্তো নৈব নৈব চ।  এবার সুদ্দুর পাশ্চাত্যে ছেলে বৌ’কে লাবড়া খাওয়ানোর বাজারে মন দিলেন কলকাতাইয়া মা। কুমড়ো নেই তো কি? এক রকম দেখতে ছোট্ট ঘন সবুজ স্কোয়াশ আছে। তাতেই দৌড়বে লাবড়া। সবশেষে উবের ধরে বাড়ি ফেরা।

কেমন করে যেন সময় চলে যায় এখানে। ফেরার সময় দেখি, বেলায় জেগে উঠেছে জনতা। কেউ গাড়ি ধুচ্ছে, কেউ ব্যাক ইয়ার্ড সাফ করছে। কেউ সিঁড়ি, কেউ জানলার কাঁচ। এবার লিটল ইটালির লিটল কিচেনে দশে মিলি করি কাজ। দুপুরেই নেমে গেল সাজানো লাঞ্চ ব্যুফে। মায়ের হাতে রুড ফুড ফ্রম বেঙ্গল টাটকা মূলো শাকভাজা দিয়ে শুরুয়াত। আর কলকাতার আমের শুকনো চাটনী দিয়ে শেষ। মাঝে ছিল আরো কিছু। হটপটে বৌ’কে মুগ-মুসূর ডাল শিখিয়েছি আজ। সামান্য ঘিয়ের মধ্যে জিরে, তেজপাতা, গোটা গরম মশলা আর গ্রেট করা আদা দিয়ে সাঁতলে একেবারে বসিয়েছি ১ঃ১ মুগ-মূসুর। সেদ্ধ হতেই নুন, মিষ্টি, হলুদ আর  ওপর থেকে আরেকটু গ্রেট করা আদা, চেরা কাঁচালঙ্কা। জমে গেছে ডালের সঙ্গে পোস্ত, কালোজিরে দেওয়া  ছোট্ট ছোট্ট ভাজা বড়ি।

বাগদা চিংড়ির রেসিপিটা শিখে গেলি তো তোরা?প্যাকেটের গায়ে লেখা ফ্রম ইন্ডিয়া আর অফকোর্স শিরা, মাথা বাদ দেওয়া।মাছগুলো ধুয়ে ম্যারিনেট করে রাখবি নুন, হলুদ আর লংকার গুঁড়ো দিয়ে। পোস্ত জলে ভিজিয়ে গ্রাইন্ড করে নিবি লংকা দিয়ে । একটা বাটিতে পোস্তর পেস্ট, সর্ষের গুঁড়ো, নুন দিয়ে ফেটিয়ে রাখবি। এবার নন স্টিক প্যানে মাছগুলো পাতিয়ে দিবি। সরষে-পোস্ত বাটা দিবি ফুটে উঠলে চেরা কাঁচা লংকা আর সরষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে নিবি। তোরা  অত ভাপার টেকনোলজি পারবি না। এতেই দৌড়বে পোরষে চিংড়ি।পোরষে গাড়ি আর পোর্ষে চিংড়ি এই দুয়ের ফ্যান সে ছোট থেকেই। তাই অমন নাম দিয়েছে এই রেসিপির।

[ক্রমশ]

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত