ছোটবেলার পুজো

Reading Time: 3 minutes

শ্রীজাত

ছোটবেলার পুজো, কথাটার কোনও বিকল্প নেই। কেননা আজ মনে হয়, আমার বা আমাদের কারও কারও পুজো যেন সেই ছোটবেলাতেই আটকে আছে। সেখান থেকে খুব বেশিদূর সে এগিয়ে আসতে পারেনি। বা বলা ভাল, চায়ওনি। এখন পুজো কেমন কাটে, সে কথায় যাচ্ছি না। ইদানীং কালের সমস্তটাই খারাপ, এমন যারা মনে করেন, আমি তাঁদের দলে এখনও নাম লেখাইনি। তাই এখনকার পুজোতেই নিজেদের মতো একটুখানি সময় কাটিয়ে নিই। তবে হ্যাঁ, ছোটবেলার পুজোর সঙ্গে তার তুলনা করব, এমন মিথ্যুকও আমি নই। ছোটবেলার পুজো নিয়ে বলতে গেলে সে চলতেই থাকবে, থামবে না। এত রকমের, এত ধরনের অনুসঙ্গ তাতে জড়িয়ে ছিল যে, পুজো মানেই স্মৃতিদের লম্বা তালিকা। সেই তালিকার সব নামে দাগ না দিয়ে বরং পুজোয় নতুন বই আর গানের কথাটুকুই মনে করি, যা এখন সবচাইতে বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে আছে, পুজোর আগে থাকতে মুখিয়ে থাকতাম, কবে পূজাবার্ষিকী বেরোবে। বড়দেরগুলো নয় মোটেই, ওসব বাবা মায়েরা পড়েন। আমার নজর থাকত, স্বভাবতই, কিশোর আর খুদেদের জন্য বেরনো পূজাবার্ষিকীতে। বাবা কাজ করতেন খবর কাগজে, একটু কম দামে কিনতে পারতেন সেসব সংখ্যা। আমার দাবি থাকত, পুজোয় জামা হোক আর না হোক, পূজাবার্ষিকীরা যেদিন যেদিন বেরোবে, সেদিন সেদিন যেন তারা বাবার কাঁধঝোলায় চেপে বাড়ি ঢোকে। সে দাবি যে পূরণ হতো সব সময়ে, এমন নয়। বেরনোর বেশ কয়েকদিন পরেও বাড়িতে আসত সেসব মোটা মোটা রংচঙে, চকচকে, সুগন্ধী সংকলন। কিন্তু সেইখানেই শুরু হতো সমস্যা। ততদিনে জেনে গেছি কোন সংখ্যায় কে কে লিখছেন, কী তাঁদের গল্প বা উপন্যাসের নাম এবং সে নিয়ে রোমাঞ্চও যাকে বলে একেবারে তুঙ্গে, কিন্তু না। ফাঁকা গোল পেয়েও অনেক সময়ে যেমন বল বার-এ লেগে ফিরে আসে, তেমনই হাতে লেগে আবার বাবার ঝোলাতেই ফিরে যেত সেসব পুজোসংখ্যা। কারণ আর কিছুই নয়, তখন নিশ্চিত ভাবে স্কুলের কোনও না কোনও বিচ্ছিরি পরীক্ষা চলত। এবং আমার বাবা মা জানতেন, ছেলে সারা বছর বই দেখতে অবধি পায় না। অন্তত পরীক্ষার দিন ক’টা যদি একটু পড়ার বই না খোলে, একে পাশ করায় কার সাধ্যি। অতএব, একবার স্পর্শ করে, চক্ষু সার্থক করে, ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে চকচকে পাতার ভাঁজে একটিবার ডুবিয়ে তুলে নেওয়া। ব্যাস। তারপরেই সেসব বই দেরাজবন্দি। ততক্ষণে কিন্তু মহালয়া পার হবো হবো ব্যাপার, বা হয়তো হয়েও গেছে। পাড়ার মোড়ের প্যান্ডেল সেজে উঠেছে ঝালরে, সন্ধের পরপর বেরোলে খুব সামান্য একটা শিরশিরানি টের পাওয়া যাচ্ছে হাওয়ায়, মাঝেমধ্যে বক্সে বেজে উঠছে পুজোর সব নতুন গান। এদিকে মন দিতে হচ্ছে পরীক্ষায়। সত্যি বলতে কী, মনও বন্দি থাকত ওই দেরাজেই। আমি বরাবর রাতচরা প্রাণী। সকলে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ার পর পা টিপে টিপে দেরাজের কাছে পৌঁছতাম। ঘরের জানলা খোলা, একটা ছোট ঘুমের আলো জ্বলত তখন, নীলাভ। বাতাসে ছাতিমের গন্ধ চনমন করছে সারাক্ষণ, আর নেশার মতো আমাকে সম্মোহনে টানছে ওই বইলুকনো দেরাজের ডালা। আমি করতাম কী, খুউব আস্তে, যাতে শব্দ না হয়, এমনভাবে দেরাজের ডালা খুলে হাতড়ে কোনও একটা পূজাবার্ষিকী বার করে আনতাম। তাকেই তখন মনে হতো জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রেম, আর সেই স্পর্শ জীবনের প্রথম প্রেমের স্পর্শের চেয়ে কম দামী নয়। অল্প আলোয় অক্ষর কিছুই পড়া যাচ্ছে না, তাও পাতার পর পাতা উলটে ছবিগুলোয় হাত বোলাতাম, গল্প উপন্যাসের প্লট বোঝার চেষ্টা করতাম ওই ছবি দেখেই। একই সঙ্গে শিহরণ আর বিষাদ আসত, কেননা পাঁচ দশ মিনিটের মধ্যেই এই আলিঙ্গন ফুরোবে, এবং আমাকে শুতে যেতে হবে। হতোও তাই। পরের দিন হয়তো অংক পরীক্ষা, প্রশ্নমালা ১৬-র বদলে স্বপ্নে এলেন কাকাবাবু বা প্রফেসর শঙ্কু। সেভাবেই দিতাম পরীক্ষা, জানলার বাইরে টাটকা ঘন নীলের মধ্যে আটকে থাকা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের চুল দেখতে দেখতে। কারা যে ওই সময়ে পরীক্ষার আমদানি করেছিলেন, কে জানে! শেষমেশ ওসব যখন কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারতাম, পাড়ার প্যান্ডেলে এসে পড়তেন দূরদূরান্তের ঢাকিরা, আমারও হাতে উঠে আসত পুজোসংখ্যার ঝাঁক। ওই যে ডুব, তার আনন্দ বোধ হয় সমুদ্রকেও হার মানাবে। আজও বাড়িতে পুজোসংখ্যার সমাহার জারি আছে। মায়ের জন্যে একরকম, দূর্বা’র জন্যে একরকম, আবার কিছু পুজোসংখ্যায় লেখার দরুণ আপনিই চলে আসে। কিন্তু সেই শিহরণ আর বিষণ্ণতা আর ফেরে না। যেমন বাবা আর ফিরবেন না কোনও দিন। ঝোলা কাঁধে। ওঁর সেই মলিন, ক্লান্ত ঝোলায় আমার ছোটবেলার পুজোটা ছিল। সেও ফিরবে না আর।

     

www.anandautsav.anandabazar.com -এ প্রকাশিত

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>