বাঙালির সার্কাস

স্বর্ণালী চট্টোপাধ্যায়

ভাবতে পারেন সেই ১৯০১ সাল নাগাদ এক বঙ্গ ললনা ( প্রথম ভারতীয় নারী) সুশীলা সুন্দরী একটি নয়, দু দুটি রয়েল বেংগল টাইগারের খাঁচায় কনো রকম অস্ত্র তো দূরের কথা এক গাছি ছড়িও না নিয়ে অবলীলায় ঢুকে পড়ছেন এবং তাদের সংগে নানা রকম খেলা দেখাচ্ছেন।তাকিয়া করে এক জনের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছেন — আরও অদ্ভুত ব্যাপার যে সেই বাঘগুলির নাম ” লক্ষী- নারায়ণ “।

বাংলার গর্ব, শ্রী প্রিয়নাথ বসু বা প্রফেসর প্রিয়নাথ বসু র ” Great Bengal Circus ” য়ে এই সব কিছুই সম্ভব ছিলো। ইউরপীয় Wilson’s Great World Circus বা Chirny’s Circus র যোগ্য জবাব ছিল Great Bengal Circus.

২৪ পরগনার ছোট জাগুলিয়ায় প্রসিদ্ধ কবি ও নাট্যকার ” হিন্দুমেলার” অন্যতম উদ্যোগী মনোমহন বসুর কনিষ্ঠ পুত্র হলেন প্রিয়নাথ বসু ।কলকাতায় পদার্পণ করেন মেট্রপলিটন ইন্সটিটিউশনে শিক্ষালাভ করার জন্য।

প্রিয়নাথ ছোটবেলা থেকেই ব্যায়ম চর্চা করতে ভালোবাসতেন। কলকাতায় এসে কুস্তিগীর গৌরমোহন মুখপাধ্যায়ের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করলেন এবং ক্রমে তার প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠলেন।প্রথমে ব্যায়ম চর্চা করতেন এবং পড়ে জিমন্যাস্টিকস শেখেন। তিনি সিমুলিয়া অঞ্চলে ভোলানাথ মিশ্র ও #আউল চারু র সংগে মিলে একটি জিমন্যাস্টিক ক্লাব গঠন করেন। এরপর এই একটি আখড়ার থেকে সিমলা থেকে লেবুতলার মধ্যে আরো ৫০ টি আখড়া তৈরি হয়।

বাংলাদেশ তখন জাতীয় ভাবের প্রবল অন্দলনে উদ্বেলিত।

১৮৭২ সালে ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ঐতিহাসিক বাড়িতে
নবগোপাল মিত্রের জাতীয় সভার আয়োজন হয়। তিনি ন্যাশনাল পেপার,ন্যাশনাল সোসাইটি, ন্যাশনাল স্কুলের সংগে তৈরি করেন প্রথম বাঙালী সার্কাস – ন্যাশনাল সার্কাস।১৮৮১ সালে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে তৈরি হয় ভারতের দ্বিতীয় সার্কাস। (মহারাস্ট্র – সাংগলিতে ১৮৮০ সালে প্রথম সার্কাস তৈরি করেন চাত্রে) পরিকল্পনা ও অর্থের অভাবে সে উদ্যোগ অচিরেই শেষ হল বটে কিন্তু বীজটা রয়ে গেল৷ সেই বীজ মহীরুহের আকার পেল প্রিয়নাথ বসুর হাতে৷ ১৮৮৭-তে মৃতপ্রায় ন্যাশনাল সাকার্সের জিনিসপত্র ও জন্ত্ত-জানোয়ার কিনে নেন প্রিয়নাথ বসু৷ এবং শুরু করেন # গ্রেট বেংগল সার্কাস। এর মধ্যে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস বলে আর একটি সার্কাস তৈরি হয় ।রাজা রামমোহন রায়ের পৌত্র হরিমোহন রায় গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস পরে কিনে নেন এবং এই দল ” হরিমোহনের দল ” হিসাবে খেলা দেখায়।

প্রিয়নাথ বসুর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস ১৮৮৭ থেকে ১৯২০খ্রিস্টাব্দ অবধি খেলা দেখিয়েছিল । প্রফেসর বোস ছিলেন প্রথম বাঙালী যিনি পিরামিড অ্যাক্ট, জাগলিং অ্যাক্ট, প্যারালাল বার, হরাইজন্টাল বার, ও ঘোড়ায় চড়া খেলায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন । তাঁর সার্কাসে বাঙালি পরিচালক, ক্রীড়াবিদ, অশ্বারোহী, পশু-শিক্ষক এবং বাঙালী মেয়েরাও ঘোড়ায় চড়া, বাঘের খেলা, ট্র্যাপিজের খেলা দেখাতেন । ভারতের প্রথম মহিলা সার্কাস খেলোয়াড় সুশীলা সুন্দরী এবং তাঁর বোন কুমুদিনী এই সার্কাসে খেলা দেখাতেন । বাঙালী মেয়ে মৃণ্ময়ী এখানে হাতির পিঠে বসে বাঘের খেলা দেখাতেন।বোসের সার্কাসের মুকুটমণি ছিলেন বাদল চাঁদ।এই বীর, বাঘের সংগে মল্লযুদ্ধ করতে পারতেন।

বইটা পড়তে পড়তে একটা অন্য জগতে চলে গেছিলাম। হয়ত ময়দানের সেই সার্কাসের তাঁবুতে, যেখানে অজস্র মানুষের করতালি কুড়িয়ে নিচ্ছিল বাঙালীর সার্কাস। কবে থেকে বাঙালী ভীতু আখ্যা পেয়েছিল কে জানে?

তথ্যসূত্র: বাঙালীর সার্কাস, অবনীন্দ্র কৃষ্ণ বসু

#The astonishing courage of one of the ladies, Miss Sushila makes the spectators sit spell bound when she enters with easy grace a cage of two large tigers and makes them all growling, display their open jaws, stand up, sit and lie down, while she reclines by their side using one of them for a pillow… Daily Telegraph,1901.

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত