ক্লিক

ট্রেন ছাড়া মাত্র কথা নেই বার্তা নেই এমন প্রকৃতির ডাক এলো যে সৌগতর মনে হতে লাগলো বসে থেকে উঠে দাঁড়ালেই বুঝি কাপড়-চোপড়ে হয়ে যাবে। ট্রেনের দুলুনিতে বেচারার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। পিঠের ব্যাগটাও ভারী। কোনোমতে ব্যাগটা সিটে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে ভাবছে, কি মরতে তারাপীঠে এসেছিলো পুজো দিতে! নেহাত এই হালের ঘটনাটা না ঘটলে হয়তো সে তারাপীঠে আসতোই না! এমনিতে জুলোজির প্রফেসর সে, বিজ্ঞানী মানুষ, দেবদ্বিজে কোনো ভক্তি নেই তার। এমনকি কৌশাম্বীর শত অনুরোধেও সে দক্ষিনেশ্বর যায়নি! কৌশাম্বীর দক্ষিনেশ্বর যাওয়ার দিনের কথাটা মনে পরে যাচ্ছিলো। লালপাড় গরদ শাড়ীতে মাখনরঙা মেদবহুল শরীর যেন ফেটে পড়ছিলো। দেরি হয়ে যাওয়ার উৎকণ্ঠা ও সৌগত সঙ্গে না যেতে চাওয়ার অভিমানে লালচে ঠোঁটদুটো।

হ্যাঁচকা ব্রেক মেরে ট্রেন থামলো মল্লারপুর স্টেশনে। মন অন্যদিকে চলে গেছিলো, ট্রেন থামামাত্র হুঁশ না থাকা মানুষের মতো উর্দ্ধশ্বাসে ট্রেন থেকে নামামাত্রই ট্রেন ছেড়ে দিলো। শুনশান স্টেশনে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে একটা ঝোপের আড়ালমতো খুঁজে বসে পড়লো। জুলোজির প্রফেসর সৌগতর রিসার্চটাই সাপ নিয়ে। তাই সাপখোপে ভয় তার নেই একেবারেই। তবে লোকলজ্জা আছে।

মিনিট দুয়েকের মধ্যে মুক্ত হওয়ামাত্র বাস্তববোধগুলো ফিরে আসতে লাগলো। নিজেকে একটা জম্পেশ চার অক্ষরের গালি দিলো সৌগত। ট্রেনে রয়ে গেছে পিঠের ব্যাগ। তবে এখন সেটা ভাবারও সময় নেই তার। এদিক ওদিক দেখে দেখতে পেলো এক ভদ্রলোককে, তার ট্রেন থেকেই নেমেছিল বোধহয়। এখন তার দিকেই এগিয়ে আসছে। নিজের কৃতকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে না থেকে সৌগত বুদ্ধিমানের মতো সেই ব্যক্তির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো, কলকাতা যাওয়ার পরের ট্রেন কটায় বলতে পারেন? আজ তো আবার সেই বিকেলে ট্রেন, আজ যে এখানে ভোট আছে, তারিখটা দেখে বেরোননি নাকি?
এতক্ষণে এমনকি তারাপীঠ মন্দিরের লাইনেও তুলনামূলক ভিড় কম থাকার কারণটা খেয়াল হলো। দোষ কাটানোর পুজো, তাই সকাল থেকে খালিপেটে ছিল। গতকাল রাতের রাস্তার ধারের সস্তা খোলা তেলে ভাজা ছোলে-ভাটুরে খেয়ে পেটটাও গড়বড় করছিলো। এখন পেট খালি হয়ে গিয়ে একসঙ্গে খিদে-তেষ্টা চাগার দিয়ে উঠলো। জলের বোতলটাও ব্যাগেই রয়ে গেলো। ওয়ালেট সঙ্গে আছে ভাগ্যিস!
ও মশাই, বিকেলের আগে তো ট্রেন নেই, কলকাতা ফিরতে হলে এই চড়া রোদে কেন স্টেশনে বসে থাকবেন? চলুন পাশেই আমার বাড়ি, গিন্নির হাতের চা-টা খেয়ে একদম বিকেলে বেরোবেন।

একবার ঠাঠা রোদে এই শুনশান স্টেশনের দিকে তাকিয়ে সৌগতর মনে হলো এ যে মেঘ না চাইতেই জল। ব্যাগে জলের বোতল ছাড়া আর যে জিনিসটা আছে সেটা এখন থাকা-না-থাকা সমান মনে হলো তার কাছে। ধীরপায়ে লোকটির সাথে হেঁটে চললো সৌগত, কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ছে চোখেমুখে।

ওরকম গন্ডগ্রামের সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ি যেমন হয়, তেমনি বাড়ি ভদ্রলোকের। তবে বাইরের ঘরটায় ঢুকে থতমত খেলো সৌগত। পর্দায়, দেওয়ালের ছবিতে, সোফার কুশনে বিলাসিতার নয়, রুচির ছাপ। কিন্তু সবকিছুই সাদা-কালো কম্বিনেশন, তাদের নিজেদের ফ্ল্যাটের মতোই। তবে কি, কৌশাম্বীর মতো সাদা-কালো জ্যামিতিক নকশার ফ্যান আরো অনেকেই আছে। সৌগতর নিজের জাড়তুত দাদার বাড়ির সব ইন্টেরিয়র সাদাকালোই। তবে দেয়ালেব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট মোনালিসার ছবি দেখবে আশা করেনি সৌগত। তার বেডরুমেও আছে মোনালিসার সাদাকালো ছবি, কৌশাম্বীর টাঙানো। হঠাৎ একটু ঘেমে উঠেছিল সে। ফ্যানের হাওয়াটা বড্ড তৃপ্তিদায়ক মনে হলো। এক বোতল জল সামনে রেখে ভদ্রলোক তাকে বসতে বলে ভিতরে গেলেন। সৌগত সোফায় আরাম করে বসতে গিয়ে কিছুতে খোঁচা খেয়ে উঠে দেখে একটা চুলের ক্লিপ। মৃদু হাসিতে ভরে উঠলো তার মুখ। অমন চুলের ক্লিপ কৌশাম্বীকেও পরতে দেখেছে। শ্রেয়সী অবশ্য ক্লাচার পরে। ছিপছিপে শ্রেয়সীর শরীরটা নৃত্যশিল্পীদের মতো। শাড়ী পরলে ক্লাচের দিয়ে শ্রেয়সী চুল বাঁধে। তার ফুলদানির মতো ঘাড় উন্মুক্ত পিঠ কলসীর মতো কোমরের বাঁক মনে পড়তে লাগলো সৌগতর। উফফ এই কৌশাম্বীর ঝামেলায় শ্রেয়সীর কাছে তার যাওয়াই হয়নি গত একমাস। রহস্যটা রাখতে জানে শ্রেয়সী। দুদিন না দেখলেই মনে হয় এই বুঝি পালিয়ে গেলো! কৌশাম্বীর মতো উজাড় করে ভালোবাসতে শ্রেয়সী কি পারবে তাকে কোনোদিন! আর এইখানেই তো মজা! শ্রেয়সী হলো চুম্বক,লোহার পেরেকের মতো সৌগতকে আটকে রাখে। ফটোগ্রাফার কৌশাম্বীর ডেস্কটপে এডিটিং- এর সময়েই হবু কনে শ্রেয়সীর প্রি-ওয়েডিং এর শিফন শাড়ীপরা ছবি দেখে মাথা ঘুরে গেছিলো সৌগতর। জেনে নিয়েছিল এন.আর.আই পাত্রের সাথে বিয়েটা হবে দশমাস পর। ছোট থেকেই প্লেবয় সৌগতর নিজের ওপর অগাধ আস্থা। আজ অবধি তার পাতা ফাঁদে পা দেয়নি এমন মেয়ে খুব হাতে গুনে রয়েছে। কৌশাম্বী স্বয়ং তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। অভিজাত রক্ষণশীল পরিবারের সাধাসিধে কৌশাম্বী বিয়েশাদী ছাড়াই তার হাত ধরে চলে এসেছিলো সমাজসংসার ভুলে! প্রফেসর সৌগতর শখ, যাকে বলে হবি এটা, কথার ও বুদ্ধির মায়াজালে মেয়েদের ভোলানো! পেশা ও চেহারা দুটোই বড় ভদ্র তার, তার ওপরে প্রবাসে বাবামা থাকায় কলকাতায় তার একার ফ্ল্যাট। জানতো তো, মাস ছয়েকের ব্যাপার, তারপর তার শখ মিটে যাবে। আগেও তো হয়েছে কত! মেয়েগুলো করেছে কিছুদিন, তারপর সমাজে মুখ দেখানোর ভয়ে মুখ বুজে চলে গেছে। কেউ কেউ তো শ্রেয়াসীর মতো, স্বাদ বদলাতে এসেছে তার জীবনে। সুখেই ছিল সৌগত, কিন্তু গন্ডগোল হলো এই মেয়েকে নিয়ে। কুচবিহারের কৌশাম্বী বড্ড ভালো মেয়ে। সৌগতকে নিয়ে অন্য শহরে পাতা তার ছদ্ম সংসার, রান্না-খাওয়া, সৌগতর প্রবল আদর ও ফোটোগ্রাফি নিয়ে বড্ড শান্তিতে ছিল সে। বাবা-মা দাদা-বৌদি কারোর ডাক শুনে বাড়ি ফিরে যাবে না বলে ফোন নম্বর পাল্টে সব সোশ্যাল মিডিয়া ডিলিট করে দিয়েছিলো। রক্ষণশীল অভিজাত পরিবার থেকে ঘেন্নায় তাকে কেউ ফেরাতে আসেও নি।
প্রথম মাস তিনেক তার মোটাসোটা ফর্সা শরীরটার সাথে বোধহয় তার ভিতরে থাকা সহজসরল মনটাকেও ভালোবেসে ফেলছিলো সৌগত। কিন্তু স্বভাব কোথায় যাবে? শ্রেয়সীর ফ্ল্যাটে কৌশাম্বীর এসিস্টেন্ট পরিচয়ে ছবি পৌঁছতে গিয়ে ওর নিখুঁত শরীরটাকে বোধহয় চোখ দিয়েই। বুদ্ধিমতী শ্রেয়সীও ইঙ্গিতটা পড়ে ফেলেছিলো সঠিক ভাবেই। তারপর থেকে টানা দুমাস শ্রেয়সীর ফ্ল্যাট হয়ে উঠেছিল সৌগতর লীলাক্ষেত্র। বোকা কৌশাম্বীর আড়ালে চললো খেলা। এমনকি কনফারেন্সের বাহানা দিয়ে একবার করে দীঘা-শান্তিনিকেতনও হলো।
স্নান করবেন তো? আদিত্যর গলার স্বরে চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেলো সৌগতর। ও হ্যাঁ, যার বাড়ী, সেই ভদ্রলোকের নাম আদিত্য।

বাথরুমে ঢুকে মাথা খালি মনে হলো সৌগতর। পারফিউমের ভীষণ শখ কৌশাম্বীর। যে বিশেষ গন্ধটা মাখে ও স্নান সেরে, সেটা প্যারিসের ব্র্যান্ড, ভারতে খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়। তার নিজের বাড়ির বেডরুমে গতকাল সকালেও যে পারফিউম দেখে এসেছে, মল্লারপুরের মত গ্রাম জায়গায় বাথরুমের আয়নার সামনে সেই পারফিউম দেখবে আশা করেনি সৌগত। এ কি সত্যি দেখছে সে! কেমন গা ছমছম করে উঠলো হঠাৎ। টাইমকলের জল রয়েছে এখনো ভাগ্যিস। ট্যাংকের জল তো গায়ে ছ্যাঁকা দেবে। কচি বাচ্চাদের মতো ত্বক কৌশাম্বীর, সামান্য একটু গরমজল গায়ে লাগলেই ফোস্কা পড়ে যায়। মনটাও বাচ্চাদের মতো। শ্রেয়সীর মেসেজগুলো পড়ে ফেলার পর অভিমান করলো, রাগ দেখালো, জিনিসপত্র ভাংচুর করলো, মনের দুঃখে না খেয়ে রইলো, তারপর পায়ে ধরে ভিক্ষে চাইতে লাগলো। বোকা মেয়ে বোঝেও নি যে কোনোদিনই সৌগত তাকে ভালোবাসেনি। তারপর অবশ্য মেয়েটা সাংঘাতিক সব কাজ করতে লাগলো। সৌগতর অফিসের কলিগদের, বন্ধুদেরকে ধরে অনুরোধ করতে লাগল যাতে তারা সৌগতকে বোঝায়, বিষ খাবার হুমকি দিলো, তারপর সৌগতর বাবা-মায়ের কাছে জব্বলপুরে গিয়ে হানা দিলো। বাবা মা অপমান করে ওকে তাড়িয়ে দিলে স্টেশনে ট্রেনের তলায় যাওয়ার চেষ্টা করলো। বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে আনলেও সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছিলো সৌগতর। কৌশাম্বী বড্ড জোর করছিলো বিয়ের জন্য।

জল চলে গেলো হঠাৎ। স্নান অবশ্য হয়েই গেছিলো। পোশাক পরে বেরোতে বেরোতে মনটা একবার খচখচ করে উঠলো সৌগতর। পিঠের ব্যাগে কৌশাম্বীর প্রায় আড়াইলক্ষ টাকা দামি লেন্সসমেত ক্যামেরাটা রয়ে গেলো ট্রেনে।

বাথরুমের দরজাটা খুলে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো সৌগতর। বাথরুমের বাইরে ধুধু মাঠ, কোনো বাড়ি নেই, ছাদ নেই, কিচ্ছু নেই। পিছন থেকে খচাৎ করে ক্যামেরায় ক্লিক, খিলখিল করে কৌশাম্বীর হাসির শব্দ ভরিয়ে তুললো তার চারিদিক। কোনো মতে পিছনে তাকিয়ে দেখলো বাথরুমটাও নেই, তার বদলে একটা বড়সড়ো কেউটে সাপ ফণা তুলেছে তার দিকেই।

পুলিশের চোখে ধুলো দেয়ার আর তো রাস্তা জানা ছিল না তার! নিজের রিসার্চের কাজে রাখা বিষধর সাপটার খোলা বাক্সে কৌশাম্বীর হাতটা জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। পোস্টমর্টেমেও তো ধরা পড়েনি। খালি মন খচখচ করায় আজ এসেছিলো পুজো দিতে তারাপীঠে। তখনই তো ক্যামেরাটাও ট্রেনেই ফেলে নেমে এলো যে!

কোনোমতে পিছন ফিরে দৌড় দেওয়ার চেষ্টামাত্রই নির্ভুলভাবে সাপের ছোবল এসে লাগলো তার খালি পায়ে। স্নান করবে বলে জুতো ছিলোনা পায়ে। নির্জন মাঠে একা বিষধর সাপের কামড়ে নীল হয়ে যেতে যেতে শেষ মুহূর্তে একবার যেন আবছা দেখতে পেলো কৌশাম্বীকে। না, কাঠের মতো শক্ত বিষে নীল কৌশাম্বীকে নয়, দেখতে পেল মাখনরং, লালচে ঠোঁট, লালপাড় সাদা শাড়িপরা সেই পৃথুলাকে, যে একগাল হেসে যখন তখন ক্যামেরায় ক্লিক করে ওর ছবি তুলে নিতো।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত